The Stoning of Soraya M. – যে বর্বরতা সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায়!

ফারজানা নীলা:

“আর কোন পথ নেই। হাতে শুধু এক ঘণ্টা সময় বাকি আছে। আমার আন্টি আমাকে তৈরি করছে। আমি জানি তার বুক ফেটে যাচ্ছে আমাকে এভাবে শেষবারের মতো তৈরি করতে। গুনগুন করে তীব্র যন্ত্রণা ক্ষোভ অপারগতা চেপে রেখে আমার চুল আঁচড়িয়ে দিচ্ছে। আমিও গুনগুন করে উঠি। ভেতরে আমার ভয়ের প্রচণ্ড ঝড় বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বাইরে আমি নির্বিকার। কারণ আমার কিছুই করার নেই। আমার চেয়ে অক্ষম প্রাণী মনে হয় এই মুহূর্তে আর দ্বিতীয়টি নেই। বাইরে হঠাৎ আমি মানুষের গর্জন শুনতে পাই। “আল্লাহু আকবর”। ওরা এসে গেছে। আমাকে নিতে। আন্টি আমার কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলে, “এবার দাঁড়াও”। আমি দাঁড়াই। অগ্রসর হই আমার মৃত্যুর দিকে। আমাকে দণ্ডিত করা হয়েছে; পাথর ছুঁড়ে মৃত্যুদণ্ড”।

The Stoning of Soraya M. ফ্রেঞ্চ জার্নালিস্ট Freidoune Sahebjam এঁর ইরানের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত বই La Femme Lapidée (১৯৯০) থেকে ডিরেক্টর Cyrus Nowrasteh পরিচালিত Shohreh Aghdashloo, James Caviezel (জার্নালিস্ট) Mozhan Marnò (সোরাইয়া) অভিনীত এক অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য ও অসহ্য যন্ত্রণার একটি চলচ্চিত্র এই The Stoning of Soraya M (২০০৮)। দেরিতে হলেও মুভিটা দেখলাম। এতোদিন সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করছিলাম ছবিটা দেখার জন্য। ভেবেছিলাম এবার আমি যথেষ্টই শক্তিশালী। কিন্তু হলো কই!

ছবির প্রথমে একটি দৃশ্য মানুষের ভেতরটাকে মুষড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। একজন নারী ভোরবেলায় ছুটে যাচ্ছে নদীর ধারে। ওখানে গিয়ে সে একটি কুকুর তাড়ায়। যে কুকুরটি তার আগের রাতে রেখে যাওয়া একটি বস্তাবন্দি ক্ষতবিক্ষত এবড়ো থেবড়ো লাশের সবটুকুই খেয়ে শেষ করে ফেলেছে। মাটি খুঁজে নারীটি শেষ মেষ কয়েকটি হাড় পায়। যা সে অনেক যত্ন করে পরম মমতায় নদীর পানিতে পরিষ্কার করে, যে পানিতে মিশে যাচ্ছে তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জল। তার ভাগ্নির শেষ দেহাবশেষ যা সে শেষ পর্যন্ত সে কবর দিতে সক্ষম হয়।

মুভিটি দেখার আগে থেকেই জানতাম একজন নিরাপরাধ নারী সোরাইয়াকে পাথর ছুঁড়ে হত্যার ঘটনা নিয়ে এটি নির্মিত। তবুও হত্যার মুহূর্তটি যখন আসে ভেতরে তীব্র উত্তেজনা নিয়ে প্রলাপ বকে যাচ্ছিলাম, “কোনভাবে সোরাইয়া বেঁচে যাক, হয়তো এখনই কিছু হবে এমন, দেখব সোরাইয়া পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে”।
না, এমন কিছুই হয়নি। আমার সকল প্রলাপকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে দেখিয়েছে একজন নিরাপরাধ চার সন্তানের জননী, সৎ, ধার্মিক স্ত্রীকে ব্যাভিচারের দায়ে পাথর ছুঁড়ে সর্বোচ্চ-নিষ্ঠুর-বীভৎস উপায়ে নির্মম-পাশবিক ভাবে হত্যা করা হয়।
তার অপরাধ ছিল সে একজন ভণ্ড জোচ্চোর নারী পিপাসী মানুষরূপী শয়তানের স্ত্রী ছিল। যে অন্য একটি কিশোরী মেয়েকে বিয়ের জন্য সোরাইয়াকে তালাক দিতে চায়। কিন্তু স্ত্রী এবং দুই মেয়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিবে না। দু’ছেলেকে নিয়ে সে শহরে চলে যাবে। সোরাইয়া এতে রাজি না। সে রাজি না তার দু মেয়েকে অনাহারে মরতে দেখতে। সে স্বামীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয় কিন্তু তালাকের জন্য রাজি হয় না।

এক প্রতিবেশির মৃত্যুর পর সেই ঘরের যাবতীয় কাজ আর একটি প্রতিবন্ধী ছেলেকে দেখাশুনার দায়িত্ব পায় সোরাইয়া গ্রামের প্রধান মোল্লা আর মেয়রের অনুমতিক্রমে। সোরাইয়া এই কাজকে আঁকড়ে ধরে, এটাই তার একমাত্র উপার্জনের আশ্রয়। তার দুই মেয়েকে নিয়ে বেঁচে থাকার একমাত্র খুঁটি। সেখানেই এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে সোরাইয়ার স্বামী। এবং ধীরে ধীরে সে সফল হয় তার ষড়যন্ত্রকে বাস্তবায়ন করতে। সে গ্রামের প্রধান মোল্লাকে সাথে নিয়ে ফতোয়া জারি করে তার স্ত্রী ব্যাভিচারি। মোহসেন , যার ঘরে সে রান্নাবান্না দেখাশুনার কাজ করে , তাকে জড়িয়ে নোংরা কাহিনীর জন্ম দেয়। অবশেষে গ্রামের মেয়রকে নিয়ে বিচার ব্যবস্থা শুরু হয়। জারি হয় “ব্যাভিচারিকে পাথর ছুঁড়ে মৃত্যুদণ্ড”।

কিন্তু প্রমাণ কি সে যে ব্যাভিচার করেছে? প্রমাণ, তার স্বামী অভিযোগ করেছে; সে তাকে মোহসেনের সাথে হেসে কথা বলতে দেখেছে, জিনিসপত্র আদানপ্রদানের সময় একে অপরের হাত ধরতে দেখেছে এবং তার সন্দেহ মোহসেনের সাথে সে এমন কথা বলেছে যা একমাত্র স্বামীই শুনতে পারে। তবে শুধু স্বামীর প্রমাণ দিয়েই তো হবে না! আরেকজন সাক্ষী প্রয়োজন। কে হবে সেই সাক্ষী? সোরাইয়া তো এমন কিছু করেনি যে কেউ সাক্ষী দিতে পারবে! কিন্তু নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্র ঠিকই খুঁজে বের করে উপায়। স্বয়ং মোহসেনকেই বাধ্য করে সাক্ষী দিতে, না হলে যে প্রাণ হারাতে হবে তাকে! তার প্রতিবন্ধী ছেলেটি তখন কার কাছে যাবে! মোহসেন জানে সোরাইয়া নির্দোষ, কিন্তু কিছুই করার ছিল না; ছেলের জন্য সে এই কুৎসিত জঘন্য অপরাধে নাম লেখায়।

এই ছিল সোরাইয়ার অপরাধ। তালাক দিতে রাজি না হওয়ায় তার কপালে জুটে ব্যাভিচারির শিরোনাম। আর সাক্ষী শুধুমাত্র দুজনের মৌখিক জবানবন্দী। আর কোন প্রমাণ নেই। দুজন মানুষের মুখের কথা দিয়েই তথাকথিত ধর্মের রক্ষক “ধর্ম বাঁচাও ধর্ম বাঁচাও” বলে একজন নিরাপরাধ মানুষকে তীব্র যন্ত্রণাময় মৃত্যুর দিকে ধাক্কা দিয়ে দিলো।

সোরাইয়ার আন্টি, যে আপ্রাণ চেষ্টা করে সোরাইয়াকে রক্ষা করার জন্য। কিন্তু ধর্মের নামে যারা মনুষ্যত্ব বিক্রি করে দেয় ; সেই সব জানোয়ারের সাথে পেরে উঠা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফতোয়ার জঘন্য রূপ দেখা ছাড়া আর কি করতে পারে সে! অনুনয় বিনয় আকুতি মিনতি সবই ব্যর্থ ওই সব ধর্মের লেবাসধারি হায়েনাদের সামনে।
কিন্তু এভাবেই সব শেষ হতে থাকবে? পৃথিবীর আর কেউ জানবে না এখানে কি পাশবিক নির্যাতন হয় নারীদের উপর?
উপায় পেয়ে যায় সোরাইয়ার অ্যান্টি এক বিদেশী সাংবাদিককে দেখে। তাকে দেয় সে তার আওয়াজ। সাংবাদিক রেকর্ড করে তার মুখ থেকে বের হয়ে আসা সোরাইয়ার করুণ মর্মান্তিক-বীভৎস-অসহ্য-যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর কাহিনী।

প্রচণ্ড শক্তিশালি অভিনয়ের দক্ষতা রাখে Shohreh Aghdashloo, তার চেহারার এক কাঠিন্যময় তীক্ষ্ণ দীপ্তি আছে যা চরিত্রের সাথে মিলে যায় অবিশ্বাস্য ভাবে। এমন দুর্দান্ত ভাবে তিনি চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছেন যে মনে হয়েছে এই চরিত্র না করলে হয়তো উনার অভিনয় জীবনই বৃথা যেতো।

আমি এমন অনেক মুভিই দেখেছি যেখানে আমার চোখ দিয়ে পানি পড়েছে। কিন্তু এই মুভি দেখে আমি কাটা পশুর মতো আর্তনাদ করেছি। আমি বর্ণনা করতে পারবো না সেই দৃশ্যে আমার কেমন লেগেছিল যখন সোরাইয়ার স্বামীর দ্বিতীয়বার ছোঁড়া পাথরের আঘাতে সোরাইয়ার কপাল ফেটে গিয়ে স্রোতের মত রক্ত পড়ে। আমি দু’হাত শক্ত করে চেপে বসেছিলাম। এতই শক্ত যে আমার হাত ব্যথা করতে শুরু করে। রক্ত পড়ার দৃশ্য দেখার সাথে সাথে আমার পুরো শরীর কাঁপতে থাকে। উন্মাদের মতো গোঙাতে থাকি, কিছু একটাকে প্রবল ভাবে চেপে রাখতে চাচ্ছি বুকের সাথে, যেন সেটা সোরাইয়া! যেন সেটাকে চেপে রাখলেই সোরাইয়াও বেঁচে যাবে! একে একে পাথরের বর্ষণ যখন শুরু হয় আমার পুরো শরীর শক্ত হয়ে যায়। এমন অসহ্য তীব্র যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছিল আমার মাঝে যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না।

দাঁড়িয়ে থাকা সব পুরুষ পাশবিক উল্লাসে ফেটে পরছিল। তারা আল্লাহ হুকবার বলে বলে রব তুলছিল। যেন কোন মানুষকে পাথর মারা হচ্ছে না , হচ্ছে কোন হিংস্র জানোয়ারকে। একটি পুরুষ ছিল না যে একটু ‘উহ” শব্দটিও করবে ওই কোমর পর্যন্ত মাটির নিচে দেবে থাকা রক্তাক্ত অসহায় নিরীহ অকল্পনীয় অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর নারীটির জন্য।

কেউ বাদ পড়েনি সেই ধর্ম রক্ষাকারী দলের মধ্যে। সোরাইয়ার বাবা এবং তার নিজের পেটের দুই পুত্রও ছিল সেই দলে। বাবা মেরেছে পাথর তার মেয়েকে, কারণ সে ব্যাভিচারি, ব্যাভিচারির মৃত্যু ছাড়া কোন শাস্তি নেই। শাস্তি না দিলে ধর্ম নষ্ট হবে।
সন্তান মেরেছে পাথর তার মাকে। কারণ সে ব্যাভিচারি, ব্যাভিচারির মৃত্যু ছাড়া কোন শাস্তি নেই। শাস্তি না দিলে ধর্ম নষ্ট হবে।
প্রতিবেশী মেরেছে তার প্রতিবেশীকে। কারণ সে ব্যাভিচারি, ব্যাভিচারির মৃত্যু ছাড়া কোন শাস্তি নেই। শাস্তি না দিলে ধর্ম নষ্ট হবে।

ধর্ম রক্ষা হয়েছে! নির্দোষের নির্মম মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে ধর্ম রক্ষা হয়েছে। আর রক্ষা হয়েছে ঈশ্বরের নিশ্চুপ থাকার প্রতিজ্ঞা। হ্যাঁ, এখানে আমি ঈশ্বরকে জড় পদার্থই বলবো।
যখন মেয়র হাত তুলে প্রার্থনা করছিলো, “আমি যদি ন্যায় করে থাকি, তবে আমাকে শক্তি দাও” তখন ঈশ্বর চুপ ছিল। যখন সোরাইয়ার অ্যান্টি আর্তনাদ করছিল তার ভাগ্নিকে বাঁচানোর জন্য তখন ঈশ্বর চুপ ছিল। যখন সোরাইয়া আকুতি করছিল যে সে নির্দোষ তখন ঈশ্বর চুপ ছিল। পুরুষ শাসিত ধর্মে ঈশ্বর সব সময় নিশ্চুপই থাকে।

মৃত্যুর কিছু মুহূর্তে আগে সোরাইয়া হালকা করে তার চোখ মেলে তাকায়। হয়তো সেই তাকানোর মধ্যে শেষবারের মত বাঁচার আকুতি ছিল। হয়তো সেই চোখ দেখতে চেয়েছিল এই জমায়েত থেকে কেউ হয়তো এসে তাকে বাঁচাবে। অথবা সেই চোখ শেষ বারের মত তার দুই মেয়েকে আবার দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু দেখেছে আবার তীব্র বেগে ছুটে আসা পাথর। তার চোখ নড়ে উঠেছে দেখে তার স্বামী আবার সবাইকে পাথর ছুড়তে বলে। নপুংসকের দল আবার পাথর ছোড়া শুরু করে সোরাইয়ার টলমলে অবশিষ্ট প্রাণটুকু কেড়ে নেওয়ার জন্য।

সোরাইয়ার শেষ কথা ছিল তার অ্যান্টিকে, “আমি কাঁদবো না, তুমিও কাঁদবে না’। কিন্তু সে পারেনি। পাথরের আঘাতে সে যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে গগন বিদারী আর্তনাদ করেছিলো। কিন্তু সেই আর্তনাদ কানে পৌঁছায়নি কোন নপুংসকের। সেই আর্তনাদ কানে পৌছায় নি স্বয়ং ঈশ্বরেরও ।

ছোটবেলার সুরাইয়া।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.