জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বহুমাত্রিক ঝুঁকি বাড়ছে নারীর

ফেরদৌস আরা রুমী:

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে বহুমাত্রিক। এর কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল, নিম্নাঞ্চল, পার্বত্য, হাওরাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও জীবন-জীবিকা এবং পরিবেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। উপকূলীয় এলাকায় প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলোচ্ছাসের আঘাত নিয়মিত ঘটনা। অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে নিম্নাঞ্চল নিমজ্জিত ও লবণাক্ত পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এই অঞ্চলের মানুষের জীবন, জীবিকা, কৃষি, স্বাস্থ্যসহ সকল কিছুর ওপর। আর যেকোন দুর্যোগের প্রথম শিকার হয়ে থাকে সাধারণত নারী ও কিশোরীরা। পরিবারের গৃহস্থালি কাজের জন্য প্রতিদিন সুপেয় পানির প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হচ্ছে নারী ও কন্যাশিশুটিকে। অন্যদিকে পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে। গত কয়েক দশকের হিসাবে উপকূলীয় এলাকায় পানির লবণাক্ততা বেড়েই চলেছে। এ অঞ্চলে বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় গ্রীষ্মকালে পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ে।

লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য:

আইসিডিডিআরবি’র এক গবেষণা বলছে, খাবার পানির সঙ্গে যে পরিমাণ লবণ নারীদের দেহে প্রবেশ করছে তার প্রভাবে দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের গর্ভপাত বেশি হয়। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে যেসব নারী চিংড়ি রেণুপোনা সংগ্রহের কাজ করে তাদেরও প্রজনন স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত লোনা পানির দৈনন্দিন ব্যবহারের ফলে জরায়ুসংক্রান্ত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী নারীরা। সেজন্য অল্প বয়সেই জরায়ু কেটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন এ অঞ্চলের অনেক নারী। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা করানোর মতো অর্থনৈতিক সচ্ছলতা না থাকার কারণে বেশির ভাগ প্রান্তিক নারী জরায়ু কেটে ফেলাকেই স্থায়ী সমাধান মনে করেছেন। কিন্তু এর ফলে তাদের শারীরিক, মানসিক ও সাংসারিক সমস্যা আরো বেড়ে যাচ্ছে। অনেকের ভেঙে যাচ্ছে সংসার। এক পরিসংখানে দেখা গেছে, দেশে প্রতিবছর যে কয়েক লাখ নারী জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ উপকূলীয় অঞ্চলের নারী।

এছাড়া নারীরা দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজ যেমন- গোসল করা, কৃষি কাজ, গবাদিপশু পালন, চিংড়ির পোনা ধরাসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে লিউকোরিয়াসহ সাধারণ পানিবাহিত রোগ এবং চর্মরোগের সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির দৈনিক ৫ গ্রামের বেশি লবণ খাওয়া উচিত নয়। কিন্তু উপকূলীয় এলাকার মানুষকে দৈনিক ১৬ গ্রামের অধিক লবণ খেতে হচ্ছে, যা দেশের অন্য এলাকার জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক গুণ বেশি। খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলার গর্ভবতী নারীদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী, অতিরিক্তি লবণাক্ত পানি গ্রহণের ফলে নারীদের জরায়ু রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন খিঁচুনি, গর্ভপাত, এমনকি অপরিণত শিশু জন্ম দেয়ার হার বেড়েছে।

মিষ্টি পানির অভাবে এসব অঞ্চলের নারী ও কিশোরীদের মাসিককালিন পরিচ্ছন্নতা ও যত্ন সবচাইতে বেশি বিঘ্নিত হচ্ছে। কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার কিশোরীদের সাথে কথা জানা গেছে, এখানকার অধিকাংশ মেয়েরা মাসিকের সময় কাপড় ব্যবহার করে যা তারা লবণ পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে বাধ্য হয়। যা দিন দিন তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। আরো জানা গেছে, এসময় তারা স্কুল কামাই করে। কারণ অধিকাংশের স্যানিটারি প্যাড কেনার সামর্থ্য নেই। আবার অল্প সংখ্যক যারা স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করে উপযুক্ত শুকনো জায়গার অভাবে তা ডিসপোজ করতে পারেনা।

পার্বত্য ও হাওর অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব:

জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের পার্বত্য তিন জেলার ভূমি, ফসল উৎপাদন ও পানি ব্যবস্থাপনার ব্যাপক পরিবর্তন হওয়ায় এসব অঞ্চলেও নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বন উজাড় হওয়ার কারণে পাহাড়ি ছড়াগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে পাহাড়ি নারীদের এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে গিয়ে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এমনিতেই পাহাড়ি নারীরা পুষ্টিহীনতায় ভোগে, তার ওপর পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথ বেয়ে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে তারা অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। তারওপর পাহাড়ি রাস্তায় নিরাপত্তাহীনতা আরেক উদ্বেগের বিষয়। পাহাড়ি দুর্গম রাস্তায় নারীর ওপর সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ইত্যাদি মধ্যেই তাদের দিন যাপন করতে হয়।
হাওড় অঞ্চলের নারী ও শিশুদের চিত্রও ব্যতিক্রম কিছু নয়। বছরের ছয় মাস পানিবন্দি অবস্থায় খাদ্য সংকট, যাতায়াত, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা সবই দুর্লভ হয়ে পড়ে। এসময় জরুরি প্রসূতি সেবার অভাবে অনেক মা ও নবজাতক মৃত্যুর মুখে পড়ে। যারা বেঁচে থাকে তারা পুষ্টিহীনতাজনিত নানান রোগে ভূগতে থাকে।

শিশুবিবাহের ঝুঁকিতে কিশোরীরা:

জলবায়ু পরিবর্তনের কিশোরীদের ১৮ পূর্ণ হওয়ার আগে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বছর বছর ঝড় ও জলোচ্ছাসের প্রভাবে আক্রান্ত পরিবারগুলো যখন ঘরবাড়ি হারাচ্ছে, তখন সেই পরিবারের শিশুরা অর্থ উপার্জনের জন্য কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছে। শিশুদের নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। দায়িত্ব নিতে না পেরে মেয়ে শিশুদের অনেক পরিবার দ্রুত বিয়ে দিচ্ছে। কম বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে অল্প বয়সে মা হতে গিয়ে কিশোরী মায়েরা মৃত্যুও ঝুঁকি পড়ছে। একজন কিশোরী মা জন্ম দিচ্ছে আরেকজন অপুষ্ট শিশু। সবার আগে কিশোরীর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হচ্ছে যা তাকে জীবন ভর টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছে।

প্রয়োজন জরুরি পদক্ষেপ:

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় বিশেষ করে নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের সঠিক সময় এখনই। যদিও এর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সরকার সচেতনতা ও অভিযোজনবিষয়ক বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে কিন্তু তথাপি সমস্যাগুলো এখনো বিদ্যমান। বিশেষ করে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য এখনও চরম ঝুঁকির মুখে। উল্লেখ্য, সরকার বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্রোগ্রাম অব অ্যাকসন (এনএপিএ) অভিযোজন সমাধানের অংশ হিসেবে ব্যাপকভাবে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করেছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত নীতি, কৌশল এবং পদক্ষেপে লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করতে ন্যাশনাল ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড জেন্ডার অ্যাকশন প্লানও তৈরি করেছে।

অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা মোকাবিলায় বিশেষত নারীদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লবণাক্ততা মোকাবিলায় অভিযোজন বা সহনশীলতার সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছয় বছর মেয়াদি (জানুয়ারি-২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২৪) একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর। এছাড়া উপকূলে নারী স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন, প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তার মাধ্যমে নারী সংবেদনশীল সতর্কীকরণ ও দুর্যোগ প্রস্ততি ব্যবস্থা গড়ে তোলার এবং প্রজননস্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দৃশ্যমান উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব নারীর স্বাস্থ্যের ওপর এখনো বিদ্যমান। এই বিবেচনায় নিম্নাক্ত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি-

১. উপকূলীয় অতি লবণাক্ত এলাকায় সরকারি খরচে পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে যাতে সুপেয় পানির পর্যাপ্ততা নিশ্চিত হয়। একইভাবে হাওর এবং পার্বত্য এলাকায় সুপেয় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাদের দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহের জন্য যেতে না হয়।
২. ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রশিক্ষিত নার্সসহ নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত ও বিনামূল্যে উপকরণ (স্যানিটারি প্যাড, জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ ইত্যাদি) সরবরাহ করতে হবে।
৩. অতি লবণাক্ত এলাকায় নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত পুষ্টিসেবা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ ভিজিডি কার্ড বিতরণ করতে হবে।
৪. হাওর ও উপকূলের নারীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য স্থানীয় নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং কাঁচামাল সরবরাহের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য সঠিকভাবে বাজারজাত নিশ্চিত করতে হবে। যাতে তাদের লবণপানিতে নেমে কোন কাজ করতে না হয়।

লেখক: এক্টিভিস্ট ও উন্নয়নকর্মী

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.