নিজে সুস্থ থাকুন, অন্যদেরও সুস্থ থাকতে দিন

প্রিয়াঙ্কা দাস মিলা:

আমি ছোটবেলা থেকেই ছোট বাচ্চাদের পছন্দ করি। আমরা মামনি বাপির সাথে যে বাসায় থাকতাম, সে বিল্ডিংয়ের নিচতলার বাসায় দুইটা ছোট্ট বাচ্চা ছিলো, একদম পুতুলের মতো। মালিহা ও মাহিন দুই বোন। ওদের আমাদের বাসায় এনে প্রায়ই রাখতাম। ওরা খেলতো, খাওয়া-দাওয়া করতো, ঘুমাতো। এমনকি ওদের টয়লেটও আমরা পরিস্কার করে দিতাম মাঝে মাঝে, এতোটাই পছন্দ করতাম। এতোকিছু করতাম ভালো লাগা বা ভালোবাসা থেকেই। কিন্তু ওদের মা-বাবাকে কিন্তু সব দায়িত্বই পালন করতে হয়েছে। ঘুমে ক্লান্ত, কিন্তু বাচ্চার জন্য রাত জাগা, নিজে ক্ষুধার্ত, কিন্তু বাচ্চাকে না খাইয়ে নিজে খেতে না পারা, অসুস্থ বাচ্চার সেবা শুশ্রুষা করা, বাচ্চাকে পড়ানো, সংসারের কাজকর্ম করা এগুলো সবই কিন্তু বেশিরভাগই মা’কেই করতে হয়েছে, ক্ষেত্রবিশেষে বাবাকেও করতে হয়েছে। আমরা শুধু আদর করেই আমাদের দিন পার করেছি।

আমি সবসময়ই মধ্যম মানের ছাত্রী ছিলাম। মায়ের শাসন আর বাবার আদরমাখা বোঝানোর বিষয় না থাকলে হয়তো এটুকুও হতো না। তারপরও মনের মধ্যে একটা ভয় সবসময়ই কাজ করতো, পড়াশোনা করে চাকরি করতে না পারলে মামনির মতো সারাদিন “গাধার খাটুনি” খাটতে হবে। মামনিকে দেখতাম সেই ভোরে রান্না ঘরে ঢুকেছে, গরমে ঘামে একাকার হয়ে সবার জন্য রান্না করেই যাচ্ছে। বাসায় কেউ বেড়াতে এলে তো কথাই নাই। এটা ভাবলেই ভয় লাগতো যে যদি চাকরি জোগাড় করতে না পারি, আমাকেও এভাবে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হবে!! আর যদি চাকরি পেয়ে যাই তাহলে অন্তত একজন হেল্পিং হ্যান্ড রাখতে পারবো। এই ভয়েই মূলত পড়াশোনাটা চালিয়ে গিয়েছিলাম।

যদিও বেশ অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে ২৬/২৭ বছর বয়সেই আমি দুই বাচ্চার মা হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু ততদিন পর্যন্ত আমি নিজেও আসলে বাচ্চাই ছিলাম। ওই যে বাচ্চা পালার দায়িত্বের সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করছিলাম। দুই বাচ্চা, সংসার , চাকরি এবং পড়াশোনা , নিজেকে কচুরিপানার মতো মনে হতো। পুকুর জুড়ে আছি ঠিকই, কিন্তু কোনো দাম নাই। এতোকিছুর মধ্যে নিজেকে নিয়ে ভাবার বিন্দুপরিমাণ সময় বা ইচ্ছা ছিলো না।

তারপর….
তারপর ৩২ এ এসে আবার অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নিজের মধ্যে একটা অস্তিত্ব টের পেলাম। আবারও মা হলাম। প্রকৃতপক্ষে এবারই আমি সত্যিকারের মা হয়েছিলাম। বাচ্চাটার সবকিছু করতে আমার ভালো লাগতো। সারাক্ষণ বুকে জড়িয়ে থাকতে ভালো লাগতো, ওর হাত-পা নাড়ানো, আধো আধো কথা বলা, দুষ্ট দুষ্ট চোখে মুখের হাসি, সব… কেউ ওকে আমার থেকে নিয়ে গেলে কিংবা বেশি আদর করলে রীতিমতো হিংসা লাগতে লাগলো। কারণ তখন আসলেই আমি মেন্টালি এবং ফিজিক্যালি রেডি ছিলাম একটা বাচ্চার দায়িত্ব নেয়ার জন্য।
তারপর একদিন হুট করে মনে হলো আমি স্কুটি শিখতে চাই। “প্রিয়াঙ্কা চোপড়া” তখন স্কুটির এড করেন। উফফ , সে যে কী অনুভূতি। তারপর আরেকদিন একটা বোরখা পরা মেয়েকে দেখলাম স্কুটি নিয়ে সাঁই সাঁই করে যাচ্ছে। বাসায় জানালাম। নেগেটিভ পজিটিভ অনেক উপদেশ পেলাম। কিন্তু আমি অনড় ছিলাম। স্কুটি চালানো আমি শিখবোই। শিখলাম। তখন আমার স্যার বলেছিলেন, “আপনি স্কুটি চালানো শিখেছেন??” “কিনেও ফেলেছেন?” বাহ প্রিয়াঙ্কা , আপনার মানসিক শক্তির প্রশংসা করতে হয়! এবং স্যার অন্যান্য অনেকের সামনেই আমাকে ডেকে বলেছেন, এই মেয়ে মেন্টালি অনেক স্ট্রং। আপনি চাইলেই ওকে হেলাইতে পারবেন না। তিন বাচ্চার মা হয়েও ৩২/৩৩ এ এসে স্কুটি চালানো শিখছে, ভাবা যায়!!” স্যারের এই প্রশংসা আমার লাইফে অনেক বড় প্রভাব ফেলছে। কারণ একমাত্র মামনি বাপি ছাড়া পুরা লাইফে এরকম প্রশংসা কেউ করেনি, যেটা আমাকে মানসিকভাবে আরও স্ট্রং করেছে। ইয়েস, আমি মানসিকভাবে প্রচণ্ড স্ট্রং।

তারপর একদিন মনে হলো নিজেকে ফিট রাখা দরকার। অন্তত নিজেকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এগুলো থেকে রক্ষার জন্য। কিন্তু আমাকে শুনতে হয়েছে,
“জিমে যাওয়ার কী দরকার?? বাচ্চা কাচ্চার মা’কে কেনো জিমে যাইতে হবে?” “কই, তুমি তো এতো মোটা না, জিমে কেনো যাবা?” “বাচ্চাকাচ্চা হইছে, একটু মেদ তো থাকবেই! নাইলে কী আর মা মা দেখা যায়?? ” “কী বলো, তুমি একাই চারটা ডিম খাবা? বাচ্চারা তাইলে কী খাবে, সব খাবারই তো তোমার একারই লাগবে!” “তুমি এতো স্বার্থপর যে শুধু নিজের জন্য আলাদা করে রান্না করো!” “আচ্ছা তোমার গলা দিয়ে কীভাবে নামে?” “ফিগার বানাইতেছো কার জন্য? ” “নিজের শরীরের যত্ন না নিয়ে বাচ্চার শরীরের দিকে যত্ন নাও”, “বয়স ৪০ হইছে প্রায়, কেউই ফিরে তাকাবে না যতই শরীর বানাও!!”
অথচ বাসায় মুরগী দু ধরনের, রুটি (লাল, সাদা) দুই ধরনের, চাল (লাল, সাদা) দুইধরনের, ক্ষেত্র বিশেষে সবজিও দুই ধরনের রান্না হয়।বাসার কেউই দেশি মুরগি পছন্দ না করলেও স্বামী মহাশয় দেশি মুরগি খেতে পছন্দ করেন। তিনি স্পেশালি রংপুর থেকে মুরগি আনান তার নিজের জন্য।সবাই পাঙ্গাস মাছ খেতে পছন্দ করলেও স্বামী মহাশয় কিছুদিন আগেও পাঙ্গাশ মাছ খেতেন না, এখনও খেতে চান না, বাজারে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধিতে অনেকটা বাধ্য হয়েই খাচ্ছেন। স্বামী মহাশয় সকাল-বিকাল নিয়ম করে হাঁটেন যেন সুগার বেড়ে না যায়!”

উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর আসলে আমার জানা নেই, জানলেও উত্তর দিতে ইচ্ছা করে না। নিজেকে নিয়ে ভাবতে চাইলেই মেয়েরা হয়ে যায় স্বার্থপর নারীবাদী। অথচ মেয়েটা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী! সংসারের খরচের কিছু অংশ সেও বহন করে। ভাত কাপড়ের ওয়াদা করে মা বাপের কোল থেকে তুলে আনা মেয়েটাকে যখন খাবারের জন্য কথা শুনতে হয়, সেটা কি “নির্যাতন” এর মধ্যে পড়ে??

আচ্ছা, শুধু শারীরিকভাবে আঘাত করলেই কি শুধু আঘাত করা হয়? এই যে মানসিকভাবে আঘাত করা, জোর করে মনের মধ্যে হীনমন্যতা তৈরির চেষ্টা, কোন চেষ্টার প্রশংসা না করা, প্রাউড ফিল না করা এগুলো কি আঘাত নয়? কথার তীব্র বুলেটে ঝাঁঝরা করাটাকে আঘাত করা বলে না? অন্যদের সামনে “তুমি কি বোঝো কিংবা তোমার কী যোগ্যতা, এইসব কোন কাজ হলো, তুমি তো কোন কাজেরই না!!” অপমান করা, এগুলোকে কি আঘাত বলে না? এই আঘাত আপনি কাকে দেখাবেন? কাকে বলবেন ঔষধ দিতে? কোনো ঔষধ কী পারবে এই আঘাতে সৃষ্ট ক্ষতকে মুছতে? পারবে না। তাহলে এই কথার আঘাতের শাস্তি নেই কেনো?

কেনো মানুষ এসব আঘাত করার আগে ভাবে না,
প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে একটা ব্যাপার আছে। কেনো ভাবে না, এসব আঘাতে জর্জরিত মানুষগুলো যদি একবার ঘুরে দাঁড়ায়, তাদের প্রতি যে তীব্র ঘৃণা আসবে মনে, সেখান থেকে নিজেকে রক্ষা করবে কীভাবে!! সহ্য করতে পারবে তো!!
আমার এই ৩৬/৩৭ বছর বয়সের জার্নিতে এমন অনেক পরিস্থিতি গেছে যেজন্য আমি “সুসাইড” করতে চেয়েছি। এটেম্পটও নিয়েছি। কিন্তু দেখতেই পাচ্ছেন খুব একটা যুৎসই হয় নাই। মরে যাওয়াটা এতোটা সহজ নয়। নিজেকে শেষ করে দেওয়াটা চাইলেই পারা যায় না… কতটা দুর্বল হইলেই কেবল একটা মানুষ “আত্মহত্যার” মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা আমি আপনি কখনোই বুঝবো না। এর প্রথম এবং প্রধান কারণ হলো
১.অন্যের ব্যাপারে নাক গলানো।
২. কোনো সিদ্ধান্তকে এপ্রিসিয়েট না করা। কেউ যদি আপনার কাছে কোন পরামর্শের জন্য আসে, তাকে যতটা সম্ভব পজিটিভ , নিরপেক্ষ পরামর্শ দিন। সেটা সম্ভব না হইলে আল্লাহর ওয়াস্তে “keep your mouth and eyes shut”
৩. কেউ যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয় সেটাকে এপ্রিসিয়েট করুন। “Let him or her be” আমরা কেউই বাচ্চা নই। ১৮ বছরের পর বাচ্চাকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে শিখান এবং আপনিও শিখুন। সংসারের ছোট বড় সব সমস্যায়ই সবাই মিলে আলোচনা করুন, কিন্তু সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে দিন।দায়িত্ব তাকেই নিতে দিন। হয়তো আপনার আমার মনমতো হবে না। কিন্তু সে মেন্টালি স্ট্রং হবে।যেটা বর্তমানে খুব জরুরী।

গত কয়েকদিন এ আমরা বেশ কয়েকটা আত্মহত্যার ঘটনা দেখেছি। বিভিন্ন বয়সের চারজন নারী আত্মহত্যা করেছেন বিভিন্ন কারনে।আমরা যদি তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক না গলাতাম কিংবা তাদের কাজের এপ্রিসিয়েট করতাম কিংবা বাচ্চাদের সাথে ওপেন আলোচনা করার অভ্যাস করতাম, তাহলে হয়তো , হয়তো এই পরিস্থিতিগুলো তারা সারভাইভ করতে পারতো।

প্রেমের বিয়েতে নাকি বিচ্ছেদ বেশি হয়। কেনো হয় জানেন? কারন দায়িত্ব আর ভালোবাসা দুইটা দুইজিনিস। ভালোবাসলেই আপনি দায়িত্ব নিতে পারবেন ব্যাপারটা এমন নাও হতে পারে কিন্তু দায়িত্ব নিতে গেলে অবশ্যই ভালোবাসার দরকার, রেস্পেক্ট দরকার। নাইলে সেই সংসার আসলে সংসার হয় না হয় জেলখানা। যেখান থেকে কেউই বের হতে পারে না।
দিনশেষে সবাই আসলে মানসিকভাবে স্ট্রং হয় না। সুতরাং জাজ করবেন না। পারলে পাশে থাকুন, নাহলে আপনি আপনার মতো থাকুন। অন্যদেরও থাকতে দিন। নিজে সুস্থ থাকুন, অন্যদেরও সুস্থ থাকতে দিন।

#আহা_জীবন
#আহারে_জীবন_জলে_ভাসা_পদ্ম_যেমন!!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.