জুমরাত, ফাহমিদা ও বাকস্বাধীনতা

জাভেদ ইকবাল:

“শিক্ষাকেন্দ্রে” জুমরাতকে “শিক্ষা” দেয়া হচ্ছে

১। তিন সন্তানের মা উইগুর নারী জুমরাত দাউয়ুতকে ২০১৮ তে চীনা পুলিশ ধরে নিয়ে নামে শিক্ষাকেন্দ্র, আসলে একটা কারাগারে পুরে দেয়, যেখানে তাকে নির্দয়ভাবে নির্যাতন করা হয় এবং সে মানবেতর জীবন কাটায়। তার অপরাধ? চীন সরকার তার ধর্মপালন পছন্দ করে নাই।
এক সময় জুমরাতের অনুমতি ছাড়াই অপারেশন করে জুমরাতকে বন্ধ্যা করে দেয়া হয়।

২। অ্যামেরিকান সাংবাদিকতার ও লেখার জগতে পুলিৎজার পুরষ্কারের সম্মান প্রায় নোবেল প্রাইজের মত।
চীনের বন্দীশালা থেকে জুমরাত দাউয়ুত এর পালিয়ে অ্যামেরিকা আসা, জাতিসংঘে সাক্ষ্য দেয়া, এইসব ঘটনা নিয়ে সচিত্র রিপোর্টের ছবি আঁকার জন্য বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফাহমিদা আজিম এবছর পুলিৎজার পুরষ্কার পেয়েছেন। তার সাথে এই রিপোর্টের জন্য পুরষ্কার পেয়েছে্ন সাংবাদিক অ্যান্থনি ডেল কল, আর্ট ডাইরেক্টর জশ অ্যাডামস ও এডিটর ওয়াল্ট হিকি।

ফাহমিদার জন্ম বাংলাদেশে। বর্তমানে তিনি অ্যামেরিকার ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সিয়াটল শহরে থাকেন। পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়ার আগে রোহিঙ্গা শরণার্থী ১১ বছর বয়সী সামিরার কক্সবাজারের সৈকতে সার্ফিং এর ওপর লেখা বই “সামিরা সার্ফস” এর ছবি আঁকার জন্য ফাহমিদা ‘গোল্ডেন কাইট’ পুরষ্কার পেয়েছিলেন। বর্তমানে ফাহমিদা তার নিজের লেখা “মেগা মেঘা” নামে একটি বইয়ের ওপর কাজ করছেন।

যে রিপোর্টের ছবি আঁকার জন্য ফাহমিদা এই পুরষ্কার পেয়েছেন, সেটার লিংক দিচ্ছি ও সবাইকে পড়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।
https://www.insider.com/comic-i-escaped-a-chinese-internment-camp-uyghur-2021-12

“শিক্ষাকেন্দ্রে” জুমরাতকে “শিক্ষা” দেয়া হচ্ছে

৩। চীন উইগুরদেরকে নির্যাতন করছে শুধু তাদের ধর্মের জন্য। সৌদি আরব উইগুর মুসলমানদের ওপর চাইনিজ নির্যাতনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার সমর্থন জানায় নাই, কিন্তু চীনের বিরুদ্ধে কিছু বলারও সাহস করবে না। আরো আজব ব্যাপার, হেফাজতে ইসলাম, জামাত বা এই জাতীয় নিজেদেরকে ইসলামের রক্ষক বলে দাবী করা দলগুলি ১০০% নীরব উইগুরদের ওপর নির্যাতন নিয়ে।

৪। অ্যামেরিকার সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে বলা আছে, অ্যামেরিকার সংসদ (কংগ্রেস) এমন কোন আইন করতে পারবে না যার মাধ্যমে কোন সরকারি ধর্ম ঘোষণা করা যায় (অর্থাৎ একটা ধর্মকে প্রাধান্য দিতে পারবে না), কারুর ধর্ম পালনে বাধা দেয়া যায়, মানুষের বা প্রেসের বাকস্বাধীনতা খর্ব করা যায়, মানুষের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বাধা দেয়া যায়। কেন এগুলি জরুরি, জুমরাতের প্রতি, উইগুরদের প্রতি চীনের আচরণ দেখলে বোঝা যায়।

৫। অ্যামেরিকা ধোয়া তুলসীপাতা না। সারা বিশ্বে অ্যামেরিকার নাক গলানোর ইতিহাস সুবিদিত। নিজের মাটিতে এখনও অ্যামেরিকান পুলিশের হাতে নির্বিচারে মারা যাচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গরা।

৬। বাংলাদেশেও জুমরাতরা আছে। তাদের বন্দীশালায় হয়তো কাটাতাঁর নেই, তবে সেটা থেকে পালানো একই পরিমাণে কঠিন। তাদের কেউ সারা দিনে হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর ১২০ টাকা বেতন পায়, কেউ গরম খুন্তির ছ্যাঁকায় পুড়ে কাতরায়, কেউ ধর্ষণের শিকার হয়ে পড়ে থাকে রাস্তার পাশে অথবা মরেই যায়। তাদের গল্প এঁকে কেউ পুলিৎজার পাবে না, আমাদেরকেই তাদের কথা মনে রাখতে হবে, আমাদেরকেই তাদের অধিকারের জন্য কথা বলতে হবে।

পুনশ্চঃ এই লেখাটার একটা সংস্করণ ফেইসবুকে আমার ওয়ালে দিয়েছিলাম। সেখানে একজন মন্তব্য করেছেন, মুসলিম উম্মাহর প্রতি আমার মমতা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। আমার উত্তর: হিন্দুদের বা বৌদ্ধদের মূর্তি ভাঙ্গে যে মুসলিম, তাদেরকে আমি ঘৃণা করি। মসজিদ ভাঙ্গে যে হিন্দু, খ্রিষ্টান আর ইহুদি, তাদের আমি ঘৃণা করি। চার্চে বোমা মারে যে মুসলিম, তাদের আমি ঘৃণা করি। ধর্মের কারণে আমি কাউকে পছন্দ বা অপছন্দ করি না, কিন্তু ধর্মের কারণে যে অত্যাচার করে, তাকে আমি ঘৃণা করি, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন। আর অত্যাচারিতকে আমি সমর্থন করি, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন।

—————–
ফাহমিদার আঁকা ছবি insider.com থেকে। উইগুর বন্দিশালার ছবি rfa.org থেকে।
ফাহমিদার আঁকা আরো ছবির জন্য https://fahmida-azim.com/ দেখতে পারেন।

ডাবানচেং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উইগুর এলাকা, জিনজিয়াং, চীন। কাঁটাতারের বেড়া, গার্ড টাওয়ার– এ কেমন “শিক্ষা” প্রতিষ্ঠান
জুমরাতকে অপারেশন করে বন্ধ্যা করে দেয়া হয়
শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.