মি. জাস্টিস, অপরাধ পোশাকের নয়, নজরের!

ফারদিন ফেরদৌস:

১৯৭৩ সালের দিকে বাংলাদেশে চালু থাকা এক টাকার নোট দেখানো গেল | যেখানে ব্লাউজ ছাড়া শাড়ি পরিহিত একজন গ্রামীণ নারী উদূখল বা ঘাইল ছিয়ায় চাল গুঁড়ো করছেন অথবা ধান থেকে চাল অবমুক্ত করছেন |

এই টাকাটি যদি এখনকার বাজারে থাকতো হাইকোর্টের ওই বিচারক বাংলাদেশ ব্যাংককে কী নির্দেশনা দিতেন এটা বড় কথা নয়, তিনি নিশ্চয় এই টাকায় প্রদান করা বেতন গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতেন। কারণ এই ব্যাংক নোটের নারী তার মনমতো ড্রেসআপ করেননি।

বিচারক বলেছেন, সভ্য দেশেও নাকি অমন পোশাক কেউ পরেন না। জানি না তিনি কোন বেসিসে পৃথিবীর দেশগুলোকে সভ্য ও অসভ্যের বিভাজনে বিভক্ত করে দিলেন! সভ্য দেশের প্রসঙ্গ তুলে প্রকারান্তরে নিজের দেশকেই হেয় করলেন তিনি। এটা যে পাক্কা রেসিজম -এই বোধটুকু হয়তো বিচারালয় থেকেই রহিত হয়ে গেছে। অথচ তাঁর ভাষায় তথাকথিত সভ্য দেশে তাঁর মতো করে পোশাক নিয়ে কেউ মাথাই ঘামায় না।

সংবিধানের ২৩ নাম্বার অনুচ্ছেদে জাতীয় সংস্কৃতি বিষয়ে বলা হয়েছে..

“রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলাসমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন।”

মাননীয় কোর্ট বাহাত্তরের সংবিধান ও ৭৩’র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রাখতে সাংবিধানিকভাবেই বাধ্য।

মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া অপরাধপ্রবণতাকে জাস্টিফাই করা এবং হেনস্তাকারীকে গ্লোরিফাই করবার জন্য নির্দিষ্ট কোনো পোশাককে দায়ী করার আগে আমাদের মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআনের ২৪ তম সুরা নূর তথা আলোর ৩০ নম্বর ভার্সে নজর দিতে হবে। সেখানে নারীর পোশাক বর্ণনারও আগে পুরুষকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে,
“তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, এতে তাদের জন্য উত্তম পবিত্রতা রয়েছে।”

মিস্টার জাস্টিস, দেশটাকে কাবুলিওয়ালার দেশে প্রতিস্থাপিত করবার আগে প্লিজ নিজেদের দৃষ্টিকে নিচু করে রাখবেন। মানুষ পোশাক পরে প্রথমত তার নিজের জন্য। আদিবাসী মুরং সম্প্রদায়কে আপনার মনের মাধুরী মেশানো পোশাকের নির্দেশনা দিতে পারেন না। দিলেও তারা শুনবে না। পারলে সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অসাধুতা, লুটপাট, দুর্নীতি, মুনাফাখোরি ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বয়ান দেন; নারীর পোশাক নিয়ে পরে থাকবেন না।

কাজেই যতক্ষণ না মানুষের ক্রিয়াকর্ম রাষ্ট্রবিরোধিতায় পর্যবসিত হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত সর্বমানুষকে যার যার স্বাধীন ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে
সুশান্তিতে থাকতে দিন |✍️

লেখক: সাংবাদিক
১৭ আগস্ট ২০২২

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.