আপনার আদরের মেয়েটা কেমন আছে জানেন কি?

লাভলী ইয়াসমীন:

অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে তিন তিনটি মেধাবী মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। তারা হলেন সলিমুল্লাহ্ মেডিকেল থেকে পাশ করা ডাক্তার অদিতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হলের প্রাক্তন ছাএী তুলি, যে কিনা সাংবাদিকতার মতো দু:সাহসিক পেশায় নিয়োজিত ছিল। আর সবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই আরেক ছাএী লাবণী, সেও বিসিএস দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত ছিল।

আমার ভাবনাটা এখানেই। আত্মনির্ভরশীল, স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত মেয়েগুলো কেন আত্মহত্যা করলো?
এদের কেউই নিশ্চয়ই একদিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আত্মহত্যা করেনি! তিলে তিলে নিজেকে গড়ে তোলা আত্মপ্রত্যয়ী মেয়ারা কী আর একদিনে মরে যাওয়ার মত কঠিন সিদ্ধান্তে আসতে পারে, পারে না। সংসার নামক রঙ্গমঞ্চে টিকে থাকার লড়াইয়ে এরা মানসিকভাবে প্রতিনিয়ত মরে। তারপর মরা মন নিয়েই আবার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সবার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে চেষ্টা করে।

আমার মনে হয়, বেশিরভাগ মেয়ে কর্মক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যতটুকু সংগ্রাম করে তার চেয়ে অনেক বেশি সংগ্রাম করে শ্বশুরবাড়িতে ভালো বউ হওয়ার জন্য। যে যেভাবেই নিন না কেন আমি আমার চারপাশের কর্মজীবী মেয়েদের দেখেছি। তাদের অনেককে দেখে আমার মনে হয়েছে, কর্মজীবী মেয়েরা আসলে শ্বশুরবাড়িতে ডিগ্রীধারী দাসী ছাড়া আর কিছুই নয়। ব্যতিক্রম যে নেই একেবারে তা নয়, তবে আমি তাদের কথা বলছি না।

আমি বলছি সেই সব মেয়েদের কথা যারা কর্মক্ষেত্রে দাপিয়ে বেড়ালেও ঘরে ফিরে হয়ে যায় স্বঘোষিত পারিবারিক বুয়া। এবং এই বুয়াদের রেস্ট নেওয়ার নিয়ম নেই। যেহেতু এরা দিনের অধিক সময় বাইরে থাকে তাই ঘরে ফিরে সামান্য যেটুকু সময় পাবে এরা শ্বশুর- শ্বাশুড়ি, স্বামী- সন্তান, দেবর-ননদের খেদমতে কোন কমতি করতে পারবে না। এছাড়াও এই মেয়েদের আরও একটা অশান্তির কারণ তাদের চাকরি থেকে প্রাপ্ত বেতন। বেশিরভাগ স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকেদের চিন্তার অন্যতম বিষয় বউ বেতনের টাকা কী করে? সংসারের ছোট-খাটো কন্ট্রিবিউশন তাদের চোখে পড়ে না। তাদের চাই পুরো টাকার হিসাব। তারা মনে করেন, যেহেতু মেয়েটা তাদের সংসারে ঢুকে পড়েছে, সুতরাং মেয়েটির পুরো টাকার হকদার তারা। অথচ এই মেয়েটিও হয়তো স্বামী- সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সঞ্চয় করে।

ভালো করে খবর নিয়ে দেখলে দেখা যাবে, চাকরীজীবী মেয়েদের অধিকাংশই নিজের বাবা- মায়ের কোন খরচ দেয় না বা দিতে পারে না। অথচ এই বাবা-মাই কিন্তু লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে। সকল ছেলেদের দায়িত্ব তার বাবা-মায়ের দেখভাল করা, সেই দেখভালটা কীভাবে? বিয়ে করে বউকে দিয়ে সেবা যত্ন করা। মেয়ের বাবা-মা কোথায় কী করছে, কীভাবে আছে সেটা দেখা তো দূরে থাক, চিন্তা করাও মেয়েদের জন্য গুরুতর অপরাধ। মেয়েরা যা কিছু করবে, ভাববে, সব হতে হবে শ্বশুডরবাড়িকেন্দ্রিক।

আচ্ছা, কোথায় লেখা আছে এমন নিয়ম? নিয়ম আসলে আমরাই তৈরি করি। ছেলের বউয়ের জন্য এক নিয়ম, আর নিজের মেয়ের জন্য অন্য নিয়ম। শুধু কি তাই, আমাদের চেহারাও আসলে দুইটা। ঘরের বাইরে আমরা আধুনিক, আর ঘরের মধ্যে আমরা নির্যাতনকারী।
এই যে এতো এতো মেধাবী মেয়েগুলো অকালে ঝরে পড়ছে, এর কোন দায় কি আমাদের নেই?

কজন শ্বশুডর- শাশুড়ি ছেলের বউকে নিজের মেয়ে ভাবতে পারে, বলতে পারেন? হলফ করে বলতে পারি, শ্বশুডর- শাশুড়ি কখনও বাড়ির বউকে মেয়ের মতো দেখে না। যদি দেখতো তাহলে উঠতে বসতে এতো ভুল ধরা হতো না। আমাদের দেশে শ্বশুরবাড়ি হলো আদালতের মত। সকাল-সন্ধ্যা যেকোনো সময়ে সেখানে বিচার বসে যায়। শ্বশুডরবাড়ির সবাই সেখানে বিচারক আর আসামী একজন। মেয়েরা খুব অসহায় বোধ করে কখন জানেন, যখন তার স্বামীর সামনে তাকে যা নয় তাই বলা হয়, আর স্বামী নামক মানুষটি চুপ করে সব হজম করে। ছেলেরা কখনো এটা ভাবে না বাবা-মায়ের বাধ্য সন্তান হতে গিয়ে জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে কতটা দূরে ঠেলে দিচ্ছে। মনের মত শ্বশুরবাড়ি পাওয়া সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার।

দেখবেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শ্বশুর ভালো তো শাশুড়ি ভালো নয়, শাশুড়ি ভালো তো শ্বশুর ভালো নয়। আবার এদের দুজনেই যদি ভালো হয় দেখবেন দেবর-ননদ ভালো নয়। এমন অনেককে দেখেছি যে শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ সবাই ভালো, কিন্তু স্বামী নামক আপন মানুষটিই ভালো না। মোটকথা, একজন, দুজন বা পরিবারের সবাই মিলে একজনের পিছনে লেগে থাকে। এই রকম দিনের পর দিন একজনের উপর অত্যাচার চলতে থাকলে ডাক্তার, পুলিশ কিংবা সংবাদিক নয়, সবার জন্যই বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

তাই বলে মৃত্যটাকেও এতো সহজে বেছে নেওয়াটা কি বুদ্ধিমানের কাজ ? এই যে সমাজ সমাজ করে আমরা সংসার ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে ভয় পাই, অথচ জীবন দিয়ে আমারা প্রমাণ করি সমাজ আমাদের কাছে কত বড় একটা জেলখানা। একটা জিনিস আমার মাথায় ঢুকে না, জীবন দিয়ে কেন আমরা নিজেকে ঠকাই, নিজের বাবা মাকে ঠকাই? জীবনে হঠাৎ করে আসা মানুষগুলোর জন্য আমরা জীবন দেই আর যারা কোলে-পিঠে করে মানুষ করা মানুষগুলোর কোন মূল্য নেই আমাদের জীবনে। তাদের কথাও না হয় বাদ দিলাম, কারণ তারাও অনেক কঠিন মুহূর্তে বলে ধৈর্য ধরো, ধৈর্য ধরো।

চোখ বন্ধ করে শুধু নিজের কথা ভাবুন, নিজেকে ভালোবাসুন। একটিবারের জন্য হলেও নিজের জন্য বাঁচুন। ভেবে দেখেছেন কখনো- আমরা শুধু অন্যের জন্য বাঁচতে চাই, নিজের জন্য বাঁচি কজন!

লাভলী ইয়াসমীন

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.