শিক্ষা বা উপার্জন ক্ষমতা কি নারী নির্যাতন রোধ করেছে?

মুসাররাত নাজ:

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, শিক্ষা বা উপার্জন ক্ষমতা কি নারী নির্যাতন রোধ করেছে বা নারীকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে? একজন নারীকে আমি দেখবো আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে। সেখানে নারী হিসেবে তিনি কী কী সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন এবং নারী বলেই তিনি কী কী অসুবিধা সয়ে নিয়ে বঞ্চিত হচ্ছেন এটা দেখে বুঝতে হবে তার বর্তমান অবস্থা। আগে একটা সময় যেখানে হাতে গোণা মেয়ে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেতেন, এখন সেই অবস্থা বদলে গেছে। আমাদের দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে। সেই সাথে নারী শিক্ষাও বেড়েছে। ঘরে ঘরে শিক্ষিত মেয়ে। সেই সাথে শিক্ষিত শাশুড়ি। ২০২২ এ এসে ঘরে ঘরে শিক্ষিত নানি/দাদি শাশুড়িও পাচ্ছি।

একজন নারী ঘরে বাইরে কাজ করছে। উপার্জন করছে পুরুষের সাথে সমান তালে। সংসারের বা কর্মক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নারী। নারী স্পিকার। শিক্ষামন্ত্রী নারী। প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই ছোট বড় নানা পদে নারী তার আসন বজায় রেখে চলছে। সমাজের এই অবস্থায় নারী নির্যাতন কি কমেছে? কারা তাকে নির্যাতন করছে?
নারী কি তার যোগ্য সম্মান পান? নারী কি নির্যাতনের প্রতিবাদ করেন? করতে পারেন?
এই প্রশ্নগুলোর জবাব যদি খুঁজে বের করি তাহলে ব্যাপারটা বুঝতে অনেক সুবিধা হবে।

আমাদের দেশে শিক্ষিত পরিবারেও কি মেয়েদের শুনতে হয় না যে, ‘তুমি মেয়ে, এটা করতে পারবে না…তুমি মেয়ে তাই তোমার এটা মেনে নিতে হবে…তোমার এটাই করা উচিত, কারণ মেয়েরা এমনটাই করে!’—প্রায় প্রতিটি মেয়ের এই কথাগুলো শুনে বড় হতে হয়। এবং বড় হয়েও এসব বাক্যের আড়ালেই জীবনযাপন করতে হয়। এগুলো আরেকজন শিক্ষিত নারীই বলে থাকেন। এইসব যে বিনা কারণে বলা হয় বা ভুল বলা হয় তা না। তবে আমি বলতে চাইছি, আধুনিক পরিবেশ বা শিক্ষা এই কথাগুলোকে বদলে দিতে পারেনি। পরিবারের বড়রা তাই এসব বিপদাপদ থেকে রক্ষা করতে নানা বিধিনিষেধ ছোটদের দিয়ে থাকেন।

স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, চলার পথে নানা বাধাবিপত্তির কথা বাদ দিয়ে আমি সরাসরি চলে যেতে চাই একজন শিক্ষিত উপার্জনক্ষম নারীর সাংসারিক জীবনে। এবং এই ক্ষেত্রে গ্রামের অশিক্ষিত বা অভাবী পরিবারের নয়, একদম শহুরে আধুনিক নারীর কথাই আলোচনা করতে চাই। দেখা যায় একজন শিক্ষিত নারী যার সাথে এবং যে পরিবারে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন, সেখানে স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ, ননাস, জা, দেবর সবাই শিক্ষিত। এমন পরিবারে কি নারী নির্যাতিত হন না? নারীকে নির্যাতন করা হয় না?

আমাদের পরিবারগুলোতে বিয়ের পর একজন নারী এরেকজন নারী দ্বারাই বেশি নির্যাতিত হন। নানা মানসিক নির্যাতন চলে। সংসার শুরু করে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি, এমন নারী বিরল। আর যদি বলি, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন এখনও ৬০% নারী, ভুল বলা হবে না। একটা সময় এসব প্রকাশ পেতো। এখন লোক লজ্জার দোহাই দিয়ে নারী নিজেই এই শারীরিক নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেন না। তার শিক্ষা, পারিবারিক মর্যাদা এবং তার উপার্জনক্ষমতা তার নির্যাতনের কথা বাইরে প্রকাশ করতে তাকে বাধা দেয়।

উপার্জন করছেন এমন নারীকে পুরুষসঙ্গীও অনেক সময় সাপোর্ট না করে তার সাফল্যে হিংসা করে। তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তাকে নিজের আয়ত্বে রাখতে নানা নিয়ম-কানুনের দোহাই দেয়। এবং নানা মানসিক নির্যাতন করে। এতে কর্ম স্পৃহা কমে যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারী চাকরি বা ব্যবসা ছেড়ে ঘরে বসে থেকে ঘরে শান্তি আনার চেষ্টা করে।

নির্যাতিতা নারী রাতের বেলায় মার খেয়ে পর দিন সকালেই ব্রেকফাস্ট করতে করতে স্বামীর সাথে একটা ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে, যাতে লোকে দেখে তিনি কতটা ভালো আছেন। এই অন্যকে দেখাতে যেয়েও আমাদের দেশের অনেক নারী নির্যাতনের কথা চেপে যান।

ছবি পোস্ট করা বা তিক্ততা ভুলে যাওয়া দোষের নয়। কিন্তু যেটাকে নির্যাতন বলে তা শুধু লোকলজ্জার ভয়ে লুকিয়ে রেখে সুখী সুখী অভিনয় কেন!? এটা নারীরা করে শুধুমাত্র অন্যের কাছে ছোট হয়ে যাবার লজ্জায়? সামাজিকভাবে হেয় হবার ভয়ে? এর থেকে উপার্জনে অক্ষম একজন তো বেরিয়ে আসার কথা স্বপ্নেও ভাবেন না। কিন্তু উপার্জন করছেন, এমন নারীও বেরিয়ে আসতে পারছেন না। কেন লোকলজ্জা ভুলে সামাজিকভাবে ভদ্র সভ্য কিন্তু চার দেয়ালের মাঝে অত্যাচারী এমন পুরুষ বা তার পরিবারের আসল চেহারা সবার সামনে প্রকাশ করছে না?

একজন চাকরিজীবী বা ব্যাবসায়ী নারী তার অপমান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন সহজেই। চাইলেই পারেন। তবুও বেরিয়ে আসেন না। শুধুই কী সামাজিক কারণে? আমার মনে হয় বেশিরভাগ সামাজিক কারণেই তারা চুপ থাকেন। এমনিতেই বলা হয়, নারী উপার্জনক্ষম হলে সংসার টিকে না। মানে নিজের টাকায় নিজেকে দেখে শুনে রাখার ক্ষমতা হয়েছে বলে আমি যদি অন্যায় না মেনে নেই এটাও একপ্রকার দোষ!

এরপর আসে তার পারিবারিক চাপ। আমাদের দেশের বাবা-মা মেয়ে বিয়ে দেবার পর আর কিছুতেই মেয়েকে ঘরে ফেরত আসতে দিতে চান না। শুধু মানিয়ে নাও, মানিয়ে চলো উপদেশের মাধ্যমে দায়িত্ব শেষ করে দেন। এবং ধরেই নেন তাদের কন্যারই কোনো সমস্যার কারণে কন্যার সংসারে অশান্তি হচ্ছে। সমস্যাটা দেখার চেষ্টাও করেন না, পাছে বিবেক জাগ্রত হয়ে যায় আর কন্যাকে বাড়িতে ফেরত নিতে হয়!

এরপর আছে সন্তান। নারী সন্তান সন্তান করেও অত্যাচার অবহেলা অপমান সহ্য করেন। একা সন্তানের ভার নিতে ভয় পান।
আর তাছাড়া বাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে স্কুলে ভর্তি কোথাও একজন সিঙ্গেল মাদারকে অসুবিধা ছাড়া সুবিধা করে দিতে অন্তত আমি দেখিনি।

উপরোক্ত কারণগুলো মূল প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু হাতে গোনা হলেও কিছু নারী এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এসে স্বাধীন জীবনযাপন করছেন। বাকিরা তাহলে কেন পারছে না? এখানে কি সামাজিক কারণটাই মুখ্য? নাকি হাজার বছর ধরে চলে আসা শৃঙ্খলে নারী মানসিকভাবে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে বলে সে শুধু সহ্য করে যায়… মানিয়ে নিয়ে চলে… শুধু আগামী দিন হয়তো ভালো হবে সেই অপেক্ষায় থাকে।

আশা রাখি একজন শিক্ষিত উপার্জনক্ষম নারী দাসত্বের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে নিজেই নিজেকে সম্মান আর মর্যাদা উপহার দিবে। সংসার সুন্দর রাখতে অবশ্যই সহনশীল হবে। তবে অন্যায়কে প্রশ্র‍য় দিবে না। নিজের আত্মসম্মানের বিষয়ে ছাড় না দিয়ে ভবিষ্যৎ নারীদের জন্যে সুন্দর দিনের সূচনা করবে।

মুসাররাত নাজ
৪ঠা জুলাই, ২০২২

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.