‘দুষ্টু স্বামীর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো’

ফারদিন ফেরদৌস:

১৯৯৩ সাল।
আমাদের বালকবেলা।
স্থানীয় মুভি হলে গিয়ে বেশ কয়েকবার ছবিটি দেখেছিলাম। কেয়ামত থেকে কেয়ামত। প্রথম মুভিতেই কী মিষ্টি অভিনয় মৌসুমীর। এখনও চোখে লেগে আছে। হৃদয়ে দাগ কেটে আছে। যেমন সহজ সরল মুখশ্রী, তেমনি কারুণ্যে ভরা কোমল কণ্ঠস্বর। যেন আমাদের পাশের বাড়ির ফড়িং ও প্রজাপতির মতো মেয়েটি।

এরপর স্বনামধন্য এই অভিনেত্রী অভিনয় করে গেছেন বিপুলসংখ্যক মুভিতে। আরিফা পারভিন জামান মৌসুমী মেঘলা আকাশ, দেবদাস ও তারকাঁটা মুভির জন্য তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। ছয়বার বাচসাস এবং তিনবার মেরিল প্রথম আলো পুরস্কারও পেয়েছেন।

ছেলে ফারদিন এহসান স্বাধীন ও মেয়ে ফাইজাকে নিয়ে মৌসুমীর সংসার। অভিনয়ের বাইরেও পরিচালক, প্রযোজক, কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবেও তাঁর ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। আমাদের কট্টর পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বাস্তবতায় এমন এক গুণী নারীর প্রশংসা না করা, শ্রদ্ধা না করা, কদর না করা -মানুষ হিসেবে অতি অবশ্যই বিরাট দীনতা।

সালাউদ্দিন লাভলু পরিচালিত ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সম্পূর্ণ পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারের বেড়াজাল নিয়ে নির্মিত মুভি ‘মোল্লা বাড়ির বউ’-এ মৌসুমীর দুর্দান্ত অভিনয় শিল্প সমঝদারদের কাছে এখনও বিস্ময়।

এমন একজন প্রগ্রেসিভ, ইন্টেলেকচুয়াল ও ট্যালেন্টেড নারীকে নিয়ে যা নয় তাই বলে বেড়াচ্ছে নিন্দুকেরা। একশ্রেণীর নেটিজেনরা স্রষ্টার আদেশ-নির্দেশের অপেক্ষা না করে পারলে এখনই মৌসুমী ঠেলে নরকের লাকড়ি বানিয়ে দিচ্ছে। এর একমাত্র ও মূল কারণ তাঁর সন্তানের বাবা ব্যক্তিত্বহীন মিস্টার ওমর সানি। এই ভদ্রলোকের কোনো সিনেমা জীবনে দেখিনি। দেখার রুচিও হয়নি। যেমন আরেক অভিনেতা জায়েদের অ্যাক্টিং জীবনে দেখিনি।

এইসময় নিজের সন্তানের মাকে নিয়ে যে সিনটি ক্রিয়েট করেছেন ওমর সানি, তা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে বাধ্য। অযথা অকারণে বিনা উস্কানিতে খল অভিনেতা ডিপজলের বাড়িতে গিয়ে তার পুত্রের বিয়ের অনুষ্ঠানে সুন্দর মুহূর্তকে নষ্ট করে দিয়ে গণ্যমান্যের উপস্থিতিতে চড় দিয়ে বসলেন অভিনেতা জায়েদ খানের গালে। এরপর যা হওয়ার তাই হয়েছে। জায়েদ খানের একশো একটা খারাপ গুণ থাকতে পারে। শিল্পী সমিতির নির্বাচন নিয়ে উদ্ভট ও বাজে পরিস্থিতির রূপকার হতে পারেন, তাকে আমি দুই চোখে না দেখতে পারি -কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই চড় খাওয়া তার প্রাপ্য হতে পারে না। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে কেউই গোঁয়ারের মতো আইন হাতে তুলে নিতে পারে না। আর ওই অযাচিত থাপ্পড়ের ঘটনা না ঘটলে পিস্তলের গল্পও আসতো না।

যে তার বউকে নিজের হৃদয়মন্দিরে ধরে রাখতে পারে না, সন্তানের মাকে যথোপযুক্ত সম্মান দিতে জানে না -এমন অথর্ব স্বামী ওমর সানি জায়েদকে চপেটাঘাত করতে ঠুনকো এক অজুহাত দাঁড় করিয়েছে। মৌসুমীকে নাকি ডিস্টার্ব করে জায়েদ খান! কী হাস্যকর অভিযোগ! সপ্তম শ্রেণির ছেলেরাও এমন করে বলবে না। বুড়ো বয়সে এসে দাদা হয়ে যাওয়ার পর নাতনির দাদীর বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থেকেই থাকে, সেটা ঘরেই নিষ্পত্তি করা যেত। মৌসুমী যদি সংসার না করতে চান, বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া যেত। তা না করে ওমর সানি কিনা নিজেদের পারিবারিক টানাপোড়েনকে হুজুগে মিডিয়ার খপ্পর পর্যন্ত টেনে আনলেন। দাম্পত্য কলহে নিজের ছেলেকেও সাক্ষী গোপাল বানিয়ে ছাড়লেন। মৌসুমীর সাথে ঘরের ভিতর কী হচ্ছে না হচ্ছে -তা নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে ফেসবুক লাইভ করে বসলেন। এমনকি নিতান্ত বাধ্য হয়ে মৌসুমীকেও বিবৃতিতে টেনে আনলেন।
ন্যূনতম ইথিক্স ও এটিকেট জানা থাকলে, সন্তানদের মঙ্গল চাইলে, নারীর প্রতি সম্মানবোধ থাকলে ওমর সানি এসব কাণ্ড করতে পারতেন না |

এখন মৌসুমী শান্ত মাথায় বলে দিয়েছেন, জায়েদ তাঁকে কোনো প্রকার ডিস্টার্ব তো দূরের কথা ন্যূনতম অসম্মানও করেনি এবং জায়েদের সুরও একই -আসলে এমন কিছু হয়ইনি। তাহলে ওমর সানির মতো মাওলানা সাহেবের কথায় মৌসুমীর জাত উদ্ধার করা কি আমাদের সাধু সমাজের সাজে?

কারও দাম্পত্য জীবন আমাদের ট্রলের বিষয় হতে পারে?

তর্কের খাতিরে ধরে নিই মৌসুমীর সাথে যদি জায়েদের অন্তর্জালীয় যোগাযোগ থেকেও থাকে সেটা নিয়ে আমরা মন্তব্য করার কেউ না | তারা দু’জনেই প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রাপ্তমনস্ক মানুষ -কী করবেন না করবেন তারা খুব ভালোই বোঝেন। এমনকি সানিকে রেখে যদি মৌসুমী অন্যকোনো ঘাটে পাড়িও জমায়, তাতেই বা আমাদের কী?

মৌসুমীর মতো মেধাবী অভিনেত্রীকে ওমর সানির মতো একজন ভাঁড় অভিনেতা যেভাবে উগ্র নেটিজেনদের কাছে ছোট করছে, গালি খাওয়াচ্ছে তাতে সসম্মানে ওমরকে যদি মৌসুমী বাই বলে দেন কারো কিছু বলবার থাকবে না। গুড পার্সোনালিটি দিয়ে স্ত্রীকে ধরে রাখবার মুরোদ পুরুষের থাকতে হয়।

অপরদিকে এই ঘটনার অনাহুত আগুনে বাংলাদেশের মিডিয়া যেভাবে ঘি ঢালছে -তা বিস্ময়কর ও অনভিপ্রেত। মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে বাংলাদেশে আর কোনো সমস্যা নেই। আর কোনো ইস্যু নেই। নিউজফিডের দিকে তাকানো যায় না। মৌসুমী-জায়েদ-সানি: সানি-জায়েদ-মৌসুমী। থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়। সংবাদের এতোটা দৈন্যতা এর আগে কখনও দেখিনি। মনে হচ্ছে সবাই যূথবদ্ধ হয়ে মৌসুমীকে হেনস্থা করতে ওঠে পড়ে লেগেছে | কেন? তিনি নারী বলে?

দোষ যদি থেকে থাকে, দায় যদি থেকে থাকে -সেটা সবার আগে স্টুপিড জায়েদ ও বোধবুদ্ধিরহিত সানির। তাদেরকে পাকড়াও করা হোক আইন দিয়ে, খবর দিয়ে, নিন্দা দিয়ে | ভিকটিম মৌসুমী বা তাঁর সন্তানদেরকে কেন ভিলেন হিসেবে সাব্যস্ত করা হবে?

আমাদের কথা জলের মতো স্পষ্ট |
এই সামান্য তিলের মতো ঘটনাকে বিরাটকায় তাল বানানোর কোনো মানে নেই| এতে দেশ, জাতি ও মানুষের ন্যূনতম মঙ্গল বা উপকার নিহিত নেই।

দয়া করে এখন সব পক্ষ থামলে ভালো লাগে। আমার পছন্দের অভিনেত্রী মৌসুমীর জন্য একটাই উপদেশ, দুষ্টু সোয়ামীর চেয়ে খা খা শূন্য গোয়াল ঢের ভালো।

-ফারদিন ফেরদৌস | ১৩ জুন ২০২২
লেখক: সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.