পরিবার হয়ে উঠুক বৈষম্যহীন সুস্থ সম্পর্কের আঁতুর ঘর

শাশ্বতী বিশ্বাংগ্রী বহ্নি:

মানুষের সৌন্দর্য ও চরিত্র দুটোই খুব স্পর্শকাতর বিষয়।

মানুষের সৌন্দর্য বলতে চলতি সমাজে এখনও বহুলাংশে বাহ্যিক সৌন্দর্যকেই বোঝায়… কিন্তু মানুষের আচার-আচরণ, ব্যবহার, নৈতিকতা, মানবিকতা, উন্নত মানসিকতাও যে তার সৌন্দর্য হতে পারে… এমন ধারণা এখনও আমাদের মধ্যে তৈরিই হয়নি!!

চরিত্র ভালো বলতে এখনও অধিকাংশ মানুষ বুঝে প্রেম না করা… সে ছেলে হোক বা মেয়ে হোক! (আমি সমাজের একটা নির্দিষ্ট অংশের কথা উল্লেখ করেছি) প্রেম করলেও করলো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মা-বাবার পছন্দের পাত্র/পাত্রীকে বিয়ে করলে অবশ্যই সে চরিত্রবান! অথচ মানুষটা ভালোবেসে বিয়ে করলেও কতটা সৎ, উদার, মানবিক…. নাহ, এসব ভাববার কোন অবকাশ নেই!

অর্থ-সম্পদ তো এখন রীতিমতো চরিত্র ও জ্ঞানের পরিমাপক!! যার যত টাকা পয়সা, সে তত বেশি জ্ঞানী ও চরিত্রবান! মাঝে মাঝে মনে হয় এ কোন রাজ্যে আছি… এ কোন সমাজ?!

সমাজের কথায় যেনো মাথায় বাজ পড়লো!!! আসলে কি সমাজের কোন নির্দিষ্ট গঠন আছে? না কি আমরা সমাজের নামে নিজেদের সুবিধা আদায়ের, নিজেদের ভালো থাকা নিশ্চিত করার অনৈতিক উপায়গুলোকে সমাজের রীতি বলে চালিয়ে দেই? আসলে, আমরা যখন যে নিয়ম আমাদের স্বার্থ উদ্ধারে কাজে লাগবে বলে মনে করি তা-ই সমাজের নিয়ম বলে চালিয়ে দিতে চেষ্টা করি…।

এই সমাজে থাকে আমাদের আত্মীয়রা। আচ্ছা, আত্মীয় মানে কি শুধু বেলা-অবেলায় হঠাৎ এসে চা খেতে খেতে আষাঢ়ে গল্প করা? নাকি বিশেষ অনুষ্ঠানে কেবল এসে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা? শুধুই দুর্বল জায়গায় খোঁচা দিয়ে অপমান করা? কারোর খারাপ সময় যাচ্ছে বলে তার কাছ থেকে দূরে সরে থাকা? আত্মীয় আর অনাত্মীয়ের বিভেদটা আমি নিজের জীবন দিয়ে শিখেছি… সত্যিকারের আত্মীয় কতটা কি করতে পারে তা খুব বুঝতে শিখেছি…।

আত্মীয়তার সূত্রপাত হয় মা থেকে…. একজন মায়ের সন্তানরা পরস্পর পরস্পরের ভাই-বোন। আবার তাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয় একে অপরের রক্তের আত্মীয়। সন্তান জন্ম দিয়ে বায়োলজিক্যালি মা হওয়া খুবই সহজ। কিন্তু একজন সার্থক মা হয়ে ওঠার পথটা কিন্তু কণ্টকময়!! যে মায়েরা এই কণ্টকময় পথকে ঝামেলা মনে করে গা এড়িয়ে চলতে চান, তাঁরা আসলে সঠিক মাতৃত্ব অনুধাবনই করেননি! সমাজের দোহাই দিয়ে মা কুন্তি তাঁর সন্তান কর্ণকে অস্বীকার করেছিলেন। আবার সে-ই কুন্তিকে পঞ্চসতীর একজন ধরা হয়!!! ঠিকই বিপদে সেই কর্ণের কাছে মাতৃত্বের দাবি নিয়ে দাঁড়াতে এতোটুকু কুণ্ঠাবোধ করেননি কুন্তি!!!

হায়! হিপোক্রেসি!! হায়!! মাতৃত্ব!! আর এভাবেই সমাজে বহু মা সন্তানদের তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে বারবার শুধুমাত্র সমাজের দোহাই দিয়ে…।

সন্তানকে কেবল খাওয়া আর পোশাক ঠিকঠাক দিলেই সন্তান পালন হয়ে যায় না। সন্তানকে সঠিক মূল্যবোধ শেখানোটা যে কতটা জরুরি… তা আজকাল চারপাশের অবক্ষয়ের চিত্র দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। তবে এখানে বলে রাখা ভালো, শিশু সন্তানের মূল্যবোধ গঠনে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সমাজের তথাকথিত নিয়মের বেড়াজাল বড় অন্তরায়! সকল মা-বাবার প্রতি আহবান, সন্তানকে পড়া মুখস্থ করা বা টাকা কামানোর মেশিন না বানিয়ে মানুষ বানান। একই মায়ের একের অধিক সন্তান থাকলে তাদের মধ্যে বৈষম্য করা, অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করা, অপ্রাসঙ্গিক তুলনা করার মত নির্মম ঘটনাগুলো আমাদের মা-বাবারা নিরবে ঘটিয়ে যাচ্ছেন বছরের পর বছর…. আর এর খেশারত দিতে থাকে ভুক্তভোগী সন্তান। নিরেট ভালোবাসার ভাই-বোনের পরিবার যেন অলীক বস্তু হয়ে উঠছে দিন দিন!!

কোনভাবেই আজকের এই হানাহানির অস্থির সমাজের জন্য মা-বাবারা নিজেদের দায় এড়াতে পারেন না! মা-বাবা যৌথ উদ্যোগে সন্তানদের ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের, বোনের প্রতি বোনের, ভাইয়ের প্রতি বোনের কিংবা বোনের প্রতি ভাইয়ের দায়িত্ব-কর্তব্য শেখান। পরিবারগুলো সত্যিকারের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠুক!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.