‘অদ্ভুত আঁধার এক’

বাসান্তি সাহা:

গত দুদিনে বাজেটের আলোচনা ছাপিয়ে যে দুটি খবর আমাদের আনন্দিত ও শংকিত করেছে তা হচ্ছে-রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত হয়েছেন। আর একটি – ঢাকা ইউনিভার্সিটি এলাকায় নির্যাতিত তরুণীর ‘ছেঁড়া জামা’। দুটিই নারীর বিপরীতমুখী অবস্থানের চিত্র।

আমি আমার বার বছরের মেয়েটার দিকে তাকাই। শাড়ি পড়ে গীতবিতান কাঁধে নিয়ে সুরের ধারায় যায়। মায়ের মন ভাবে -হঠাৎ যদি ঝট করে হয়ে যেতো আঠার বা বিশ বছরের, তাহলে কি একটু আত্মরক্ষাটা বুঝতো! রাস্তায় হাঁটতে গেলে মেয়েকে বলি আমার সামনে সামনে হাঁটবে। কোনটা থেকে বাঁচাবো? রাস্তার কুকুর? সাপওয়ালী নাকি অনাকাঙ্খিত স্পর্শ থেকে ? না, তাও পারি না। আমার ডানার নিচে রেখে দিয়েও পারি না। তাই বেশিরভাগ সময় শপিংয়ে বা অন্যকাজে গেলে আমি তাকে সাথে নেই না। বাড়িতে থাক। নিরাপদ থাক। নিজেও অনেকদিন ছেড়েছি ভীড় বাজারে যাওয়া হেনস্থা হওয়ার ভয়ে।

নিজে নারী বুঝতে পারা থেকে আজ পরিণত বয়স পর্যন্ত নিজেকে ও চারপাশকে যেভাবে চিনেছি –সেখানে এমন অবমাননার অভিজ্ঞতা নেই তা নয়। তাই বলে নিজের চলার গণ্ডিটাকে ছোট করে ফেলতে হয়নি। কিন্তু আজ দিন উল্টোদিকে গড়াতে শুরু করেছে। মাসছয়েক আগে একদিন সন্ধ্যায় খোলাচুলে ফিরছিলাম। মাথার পেছনে কোথা থেকে উড়ে এলো ইটের টুকুরো। না কাউকে দেখিনি কে মেরেছে। কয়েকদিন আগে ছেলের বয়সী একজন লিচু খেয়ে শক্ত বিচিটা ছুঁড়ে মারলো আমার দিকে টার্গেট করেই—তাই মেয়েকে নিয়ে বের হতে ভীষণ ভয় করে আজকাল। লঞ্চঘাট, বাসস্টেশন, বাজার চিরকালই নারীদের হেনস্থার জায়গা, কিন্তু আজ প্রকাশ্য রাস্তা, ঘর, স্কুল কোথাও নিরাপদ নয়।

এইতো দশ বছর আগেও রাত বিরাতে ফিরেছি একা। ভয় ছিল, তবু এতোটা অনিরাপদ হয়ে ওঠেনি রাস্তাঘাট। ছোটবেলায় মা-পিসি-মাসি আর দিদিদের মুখে তাদের হেনস্থা হওয়ার গল্প শুনতে শুনতে আমরা বড় হয়েছি। বুঝতেও শিখেছি কীভাবে নিজেই নিজের ঢাল হয়ে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। আজ সেই গল্পও নেই। পড়াশোনার চাপে আর আদরে আড়াল করে রেখেছি সবকিছু থেকে, তবু–মেয়ে যখন চিৎকার করে বলে, তোমার সামনেই তো–হতবাক, লজ্জিত আমি ভাষাহীন চোখে তাকিয়ে থাকি।

গত কিছুদিন ধরে একটা ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে পোশাকের কারণে নারীকে হেনস্থা করা। যেনো নারী কেবল একটা শরীর, তাকে আপাদমস্তক ঢেকে রাখো। কোথাও যেনো আলোবাতাস না ঢুকতে পারে। কিন্তু পোশাকও তো বাঁচাতে পারেনি নুসরাত আর তনুর মতো আরও অনেককে!

নারীর জন্য ঘরের বন্ধ দরজা আর খোলা আকাশ সবই সমান শংকার। তা কেবল পোশাকের জন্য নয়। তার হয়তো অনেক রাজনৈতিক, সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে। আমি সেই আলোচনায় যাবো না। কিন্তু আজ যে আগুন পুকুর দিয়ে নেভানো যাবে, একদিন দেখা যাবে সেটা সমুদ্রেও কুলোবে না। হায়েনার রক্তবীজ চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলবে। মহার্ঘ উন্নয়নের বৈভব কোথাও নারীকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না। নারী তখন শকুন আর শেয়ালের খাদ্য হয়ে উঠবে।

(নামটি জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকে নেয়া)
বাসান্তি সাহা
উন্নয়ন কর্মী।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.