পিংক রঙ যখন জেন্ডারের প্রতীক

নীলিমা সুলতানা:

পিংক বা গোলাপী রঙ শুনলে বা পড়লে এমনকি দেখলেও আমাদের মাথায় প্রথমত আসে এই রঙটি মেয়েলি বা মেয়েদের। আর কোনো রঙ নিয়ে এমন নারীত্ব বা পুরুষত্ব বিচার করা হয় না সাধারণত। যদিও এ দেশের মেয়েরা বিয়েতে সাধারণত লাল শাড়ি পরে তবু লাল এককভাবে এদেশেও নারীদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। লাল রঙের পাঞ্জাবি পরা কোন পুরুষকে দেখলে কেউ আঁতকে ওঠেন না। যদিও মেয়েদের ব্যবহার্য জিনিসে উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার বেশি তবে এমন নয় যে অন্য কোন রঙ শুধু নারী বা পুরুষদের একচেটিয়া বলে ধরা হয়। কিন্তু গোলাপী রঙের বিষয়টা ভিন্ন। গোলাপী শার্ট, গোলাপী প্যান্ট পরতে দেখেছেন ছেলেদের? দেখে থাকলেও সংখ্যাটা কমই হবে। এমনকি একেবারে ছোট ছেলে বাচ্চাদের খেলনা বা পোশাকেও সাধারণত সাধারণত গোলাপী রঙটা থাকে না। কারণ শুধু বাংলাদেশেই নয় বিশ্বব্যাপীই গোলাপী রঙটি নারীত্বের বা নারীদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। খুব কম পুরুষই জেনে শুনে এই রঙের পোশাক, মোবাইল কাভার কিংবা সাইকেল ব্যবহারের ঝুঁকি নেবেন, কারণ গোলাপী মানেই যে মেয়েলি এই ধারণাটা যে গেঁথে গেছে আমাদের মাথায়।

অন্যদিকে দেখতে গেলে ছোট মেয়ে শিশুদের খেলনা থেকে শুরু করে জামা কাপড় কিংবা কিশোরীদের ব্যবহৃত সাইকেল অথবা নারীদের জন্য নির্দিষ্ট কোন স্থান বোঝাতে গোলাপী রঙের ব্যবহার ব্যাপক। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত এই রঙের বৈষম্য আন্তর্জাতিকভাবেই আমরা বহন করে চলেছি। কিন্তু কীভাবে এই রঙটি বিশেষ করে গোলাপী রঙই একটি জেন্ডার এর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে গেল? সেই ঘটনা কিন্তু খুব বেশিদিনের পুরনো না।

রংধনুর সাত রঙে কিন্তু গোলাপী নেই। দৃশ্যমান রঙের মধ্যে বা যে সমস্ত রঙ আমাদের চোখে ধরা পড়ে তার মধ্যে মৌলিক কোন রঙ নয় এটি। লাল আর সাদা রঙের মিশ্রনে তৈরি হয় গোলাপী রঙটি। মিশ্রনের অনুপাতের উপর নির্ভর করে গোলাপীর বিভিন্ন শেড। একটা কথা শোনা যায় মাঝেমধ্যে, যদিও সেটা মূলত ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় – ছেলেদের জন্য নীল রঙ আর মেয়েদের জন্য গোলাপী। শুনলে অবাক লাগতে পারে শুরুতে ব্যাপারটা ছিল ঠিক তার উল্টোটা। ক্যামিকেল ডাই আবিস্কার হবার আগে পর্যন্ত অবশ্য শিশুদের জন্য সাদা রঙের পোশাকই ব্যবহার করা হতো বেশি কারণ তা সহজে ধোয়া যায়। বাচ্চাদের পোশাক বা সামগ্রীতে রঙের ব্যবহার শুরু হয় মূলত এই ক্যামিকেল ডাই আবিস্কারের পরপর। উনিশ শতকে বা বিশ শতকের শুরুতেও যখন ছেলে আর মেয়ে শিশুদের জন্য আলাদা দুটি রঙ বেছে নেওয়া হয়েছিল তখন নীল ছিল মেয়ে শিশুদের জন্য কারণ একে ভাবা হয়েছিল সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে আর গোলাপী ছেলে শিশুদের জন্য কারণ একে ভাবা হয়েছিল শক্তির প্রতীক হিসেবে। ১৯১৮ সালের Earnshaw’s Infants’ Department এর বাণিজ্য সাময়িকীতে দাবি করা হয়েছিল নীল রং মেয়ে শিশুদের জন্য আর গোলাপী ছেলেদের জন্য। ১৯২৭ সালে টাইম ম্যাগাজিনের একটা ইস্যুতেও বলা হয়েছে ইউএসএ এর বিভিন্ন বড় শহরের বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে গোলাপী রঙটা ছেলে শিশুদের নানা উপকরণ সামগ্রীর জন্য চিহ্নিত ছিল।

বর্তমানে সংস্কৃতির অনেকটাই আর্ন্তজাতিকীকরণ হয়ে গিয়েছে বিশ্বায়নের এই যুগে এবং বললে ভুল হবে না ইউএসএ এর ফ্যাশন বা ট্রেন্ডই সারা বিশ্ব অনুসরণ করছে সজ্ঞানে বা অবচেতনে। সে জিন্স প্যান্টই হোক বা হ্যাম বার্গার শুরুটা যেখানেই হোক আমেরিকা থেকেই তা ছড়িয়ে গেছে বিশ্বজুড়ে। ১৯৪০ এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউএসএ তে যখন বেবি বুম হলো বা হঠাৎ করে জন্ম হার বেড়ে গেল তখন মূলত মেয়েদের জন্য গোলাপী আর ছেলেদের জন্য নীল রঙ এই ট্রেন্ডটা চালু হয়, যা আমরা এখনও বহন করে চলেছি। তখন রঙ নিয়ে ভাবনাটা বদলে গেল, উল্টে গেল বলা যায়। নীল হয়ে উঠলো পড়ালেখা এবং গুরুত্বের প্রতীক, আর গোলাপী শৈশব এবং কোমলতার।

১৯৫০ এর দশক থেকেই গোলাপী রঙকে নারীত্বের সাথে একাত্ম করে দেখার ভাবনা চালু হয়ে গেল যদিও তা এখনকার মতো তা এতটা ব্যাপকতা পায়নি। তবে ১৯৬০ বা ৭০ এর দশকে যখন নারীবাদী চিন্তাভাবনা বা নারীমুক্তির আন্দোলন শুরু হলো তখন এই রঙের লিঙ্গ বৈষম্য প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয়েছিল বেশ জোরেশোরে শুরু হয়। সেই সময়ে জেন্ডার স্পেসিফিক রঙের ব্যবহারের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি হলো এবং এই প্রথাগত চিন্তার বাইরে যাবার চেষ্টাও করা হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিরোধ খুব বেশি সফল হয় নি। ১৯৮০ এর দশকে যখন জন্মের আগেই শিশুর লিঙ্গ পরিচয় জানার প্রযুক্তি বের হলো তখন নতুন করে মেয়েদের জন্য গোলাপী আর ছেলেদের জন্য নীল রঙ এই ট্রেন্ডটা ফিরে এলো। জন্মের আগেই অনাগত সন্তানের জন্য কাপড় বা খেলনা কেনার জন্য জেন্ডার স্পেসিফিক রঙের ব্যবহার হতে থাকল আবারও।

একটি সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত স্নায়ুবিজ্ঞানীদের করা বৃটিশ ও চাইনিজ জনগোষ্ঠীর নারী ও পুরুষদের উপর করা এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল পুরুষেরা সাধারণত সবুজাভ-হলুদ বর্ণালীর রঙ বেশি পছন্দ করেন এবং নারীরা লালচে-বেগুনী বর্ণালীর রঙ। তবে এই গবেষণা করা হয়েছে মূলত বয়ঃপ্রাপ্ত নারী-পুরুষদের উপর এবং নারী ও পুরুষ উভয়েই নীল রঙটি পছন্দ করেন বলে জানালেও গোলাপী রঙ এর ব্যাপারে তাদের মনোভাব এই গবেষণায় যাচাইই করা হয়নি।

অবশ্য এমন একটি গবেষণায় কিছু প্রমাণ হয় না তবু ভাবতে অবাক লাগে তারপরও গোলাপীকে নারীত্বের প্রতীক বা মেয়েদের প্রিয় রঙ ভাবা হচ্ছে কেন? ১৯৯১ সাল থেকেই গোলাপী রিবন স্তন ক্যানসার নিয়ে সচেতনতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০০৮ সালে বিভিন্ন নারী সংগঠন এবং স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস আন্দোলন গোলাপীকে নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস উপলক্ষে হোয়াইট হাউসকেও গোলাপী রঙে সাজানো হয়েছিল ২০১৭ সালে। স্তন ক্যানসার নিয়ে কাজ করা দাতব্য সংস্থাগুলোর মাধ্যমে এই প্রতীকি গোলাপী রঙ ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। গোলাপী রঙকে নানা দেশে এলজিবিটিকিউ জনগোষ্ঠীদের নানা সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠানও তাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহারও করে থাকে। তবে মূলত গোলাপী এখন নারীদের প্রতীক, নারীত্বের প্রতীক। মেয়ে শিশুদের খেলনা থেকে শুরু করে কসমেটিকস, নারীদের পোশাকে এমনকি মেয়েদের ওয়াশরুমকে আলাদা করে বোঝাতে গোলাপী রঙের ব্যবহার দেখা যায় এখন।

জানি না রঙের এই জেন্ডার স্পেসিফিক ভাবনা আমাদের মন থেকে কখনো মুছে যাবে কিনা, কিংবা গেলে সেটা কত বছর বা কত যুগ পরে হবে, তবে শেষ কথা একটাই রঙের কি কোন লিঙ্গ পরিচয় আদৌ হয়?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.