নবজীবন

ফাহমিদা খানম:

এই বয়সে এসে দ্বিতীয় বিয়ে করাটা দেশে থাকলে অকল্পনীয় হাস্যকর হতো, কিন্তু আমার বিবাহ দিচ্ছে আমার কন্যারাই।
হলুদ বাটো, মেন্দী বাটো গানের সাথে কন্যাদের নাচ দেখতে লজ্জা লাগছে, আবার ভালোও লাগছে। এটাকেই হয়তো মিশ্র অনুভূতি বলে। দুই কন্যা সন্তানের জননী ৪৫ বছর বয়সে দ্বিতীয়বারের মতোন বিয়ের পিঁড়িতে বসা বিব্রতকরই বটে! তবে বিয়েটা হচ্ছে দুই পরিবারের কন্যাদের ইচ্ছাতেই, তাই তাদের বন্ধুদের সংখ্যাটা পাল্লায় ভারী। তাদের আনন্দ দেখে মনে হলো আজকালকার বাচ্চারা অনেক পরিণত কিছু ব্যাপারে, আমরা এতো সাহসী ছিলাম না।

কলেজে পড়ার সময় পাশের গ্রাম থেকে বিয়ের প্রস্তাব এলে মা-বাবা শুধু ঘটকের কথা শুনেই রাজি হয়ে যান। ছেলে লন্ডনে ভালো চাকুরি করে, আর বিয়ের পরেই বউ বিদেশ নিয়ে যাবে, এটুকুতেই তারা খুশি ছিলেন। পাত্রের ছবি দেখে আমাদের বাড়ি থেকে হ্যাঁ বলার পরে জানানো হয় অফিস থেকে ছুটি পেলেই দেশে এসে ধুমধামে বিয়ে হবে।আমাদের পরিবারের কেউই কখনো বিদেশ যায়নি, সেখানে আমি যাচ্ছি শুনে সবাই বলতো আমার কপাল! দাদী/নানী স্থানীয়রা বলেছিল—

”শানুর যে গায়ের রঙ, কপাল তো ভালা হইবই”
দেশে সুন্দরের মাপকাঠি হলো গায়ের রঙ আর সেটা আমার ছিলো বটে!
কথাবার্তা নাই, হুট করে একদিন ছেলেপক্ষ ছেলেকে নিয়ে দেখতে আসে। শুনি মায়ের অসুখ শুনে হঠাৎ করেই এসেছে, আর পাত্রী দেখতে এসে বিয়ে পড়ানোর জন্যে চাপ দেয়। বিয়ের আসরেই বুঝলাম পাত্রের সাথে বয়সের পার্থক্য অনেক, ভাগ্য বলে মেনে নিলাম। আক্ষেপ রইলো হলুদ হলো না, গান হলো না , সানাই বাজলো না। মায়ের অসুখের দোহাই দিয়ে আমাকে সেদিনই শ্বশুরবাড়ি নিয়ে আসা হলো।

তিন মাস দেশেই ছিলো, অনির্বার এক ভালবাসায় জড়িয়ে গেলাম। বয়স কম, আবেগ ছিলো বেশি তাই তার যাবার সময়ে কাঁদিয়ে ভাসিয়ে দিলাম, সেও কথা দিলো যত দ্রুত সম্ভব নিয়ে যাবে আমাকে। উনি যাবার পরেই আবিষ্কার করলাম আমি মা হতে চলেছি, আর সামনে আমার ইন্টার পরীক্ষাও। পরীক্ষার পর উনার এক বন্ধুর সাথে স্বপ্নের বিদেশ রওয়ানা দিলাম, আর সেখানে গিয়ে কঠিন কিছু সত্যির মুখোমুখিও হলাম। শিক্ষা আর চাকুরীর কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিলো। রেস্টুরেন্টে কাজ করতো আর আমি যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আমাকেও কাজ করার জন্যে চাপ দিতে শুরু করলো। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ, পেটে প্রথম সন্তান, আমি দিশেহারা হয়ে যাচ্ছিলাম।

এক পরিবারে সপ্তাহে দুদিন ক্লিনিং এর কাজ দেয়।

কঠিন অবস্থার মধ্যেও বাড়ি থেকে ক্রমাগত ফোন করে অভিযোগ আসতো, বৌ নেবার পর আগের মতো টাকা পয়সা পাঠায় না, সংসার আর ভাইবোনের দায়িত্ব ফেলে সে বউ নিয়ে মৌজে আছে। সে আমার সাথে এসব কথা কখনই শেয়ার করতো না, তবে কথাগুলো আমার বাবার বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ায় শুনে আমি হতভম্ভ হয়ে যাই।

বিদেশের মাটিতে প্রতিটি সময়ের দাম অনেক। আয় করলেও টাকা আমার স্বামী নিয়ে নিতো, আর আমাকে স্বপ্ন দেখাতো এই শহরে একদিন আমাদের নিজেদের একটা রেস্টুরেন্ট হবে। মেয়ের জন্মের পর কিছুদিন বাসায় থাকলেও আবার কাজে ফিরে যাই, বিয়ের আগে যে মেয়েরা সামান্য মাছ কাটা পর্যন্ত এড়িয়ে চলে, বিয়ের পর সে দিব্যি অন্যের বাথরুম পর্যন্ত পরিষ্কার করে, আর এটাই জীবন, এটাই বাস্তবতা।

বিয়ের আগে সে নিজে রান্নাবান্না করলেও আমি আসার পর সে সব কাজ আমার উপরে চাপিয়ে দিতো, হেল্প করা দূরে থাক, বরং তার মা, দাদী, খালা, চাচীরা কতো গুণের আধার সেসব শোনাতো। বাচ্চার জন্মের আধাঘন্টা পরে উঠে কীভাবে সংসারের হাল ধরতো, সেসব শুনতাম। শুনে বাইরে থেকে এসেই রাগে ঘরের কাজে লাগতাম, কখনও মাথায় আসেনি ওকে বলি, আমরা দুজনেই বাইরে কাজ করি, দুজনেই ক্লান্ত! ঐ যে বয়স কম ছিলো, তাই আবেগ কাজ করতো বেশিই।

দ্বিতীয় সন্তান মেয়ে হওয়ায় সে খুশি হয়নি, কারণ সে ছেলে সন্তান আশা করেছিল। বয়সের পার্থক্য নাকি আমার ভীরু মন জানি না, দুজনের মধ্যে দূরত্বটা ঘুচেনি। আমার প্রায়ই মনে হতো দেশে সাধারণ হয়েই আমি খুশি ছিলাম। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বলতে আমি ওর সব কথা ধমকের সুরে বলাকে ভয়ই করতাম। ওদের বাড়িতে টাকা দেবার পর বাকি টাকাটা কৃপণের মতো খরচ করতাম, এ ব্যাপারে দুজনের স্বপ্ন ছিলো এই শহরে একদিন আমাদের একটা রেস্টুরেন্ট হবে। পাঁচ বছর পর দুই বাচ্চা আর স্বামীসহ দেশে গেলাম। আমাদের নেওয়া জিনিস কারোই মন ভরাতে পারলো না। সবাই আরও দামী জিনিস আশা করেছে, অথচ আমরা সেখানে কেমন আছি জানার আগ্রহটা কারও মধ্যে দেখিনি।

কেবল মা আমাকে বললো—
“তুই এতো চুপচাপ হইয়া গেছিস ক্যান? আগে তো হাসির জন্যে বকা খাইতি”।
“বারে আমি এখন দুই মেয়ের মা হয়েছি না?”
“তুইও কি কাজ করিস ওখানে?”
“বিদেশের মাটিতে সবাইকে কাজ করেই খেতে হয় মা”।

এক মাস চোখের নিমিষে ফুরিয়ে গেলো, আবার যে কবে আসতে পারবো কে জানে!
আমার চাচা শ্বশুরের মেয়েটা দুই বাচ্চা নিয়ে বিধবা হয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছে, তাই সে বাড়ির সবার মন খারাপ। এখানে আসার পর খেয়াল করলাম ওর মধ্যে অনেক পরিবর্তন। ভাবলাম আপনজনদের ছেড়ে আসায় হয়তো মন খারাপ।

একদিন আমাদের স্বপ্ন সত্যি হলো, খুব ছোট করে একটা রেস্টুরেন্ট দিলাম। দুজনে অনেক সময় দিতাম, এর মধ্যেই বাড়ি থেকে খবর আসে শ্বশুর খুব অসুস্থ। আমার উপরে ব্যবসা দিয়ে সে দেশে আসে। আমি যেতে চাইলেও ব্যবসার অজুহাত দেখায়।
যাবার কিছুদিনের মধ্যেই শ্বশুর মারা যায়, আর সেও অনেকদিন দেশেই কাটায়। আমি একা হাতে হিমশিম খাই দেখে দুই কন্যা এসে হাল ধরে। আমি তাদের বলি—
“তোমার বাবা তার বাবাকে হারিয়েছেন, এখন নিজের কাছের মানুষদের কাছেই ভালো থাকবে। বিদেশ মানেই যন্ত্রের মতোন জীবন”।
ও ফিরে আসার কিছুদিন পরেই খবর পাই মা-বাবা এক্সিডেন্ট করে মারা গেছেন। ঈদের আগে বলে টিকিট পাই না, আর পরে যেতে চাইলেও সে সান্ত্বনা দিয়ে বলে –
“এখন গিয়ে আর কী হবে? আর তিনজনের আসা যাওয়ার খরচ কম তো নাহ”।
আমি ধাক্কা খাই, ওর বাবার মৃত্যুর পরে আমি একা হাতে সব সামলেছি আর এখন!

আট মাসের মাথায় সে আবার বাড়ি যেতে চাইলে আমিও যেতে চাই। আমাকে জানায় পৈর্তৃক সম্পত্তি নিয়ে নানান ঝামেলা আছে, এতোদিনে যা পাঠিয়েছে সব বাবা নিজের নামে করেছে, আর এখন মালিকানা দাবিদার সব ভাইবোন, তাই সেসব নিষ্পত্তি করতে যাচ্ছে। তবে এবার ফেরার পর তার মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন দেখলাম।
হুট করে রঙিন জামাকাপড় পরছে, ডায়েট করছে আর নিজের শরীরের প্রতি বেশ যত্নবান হয়েছে। মেয়েরা জিজ্ঞেস করলো –
“মা বাবার এমন পরিবর্তন?”
“বারে, রেস্টুরেন্টে বিদেশিরা আসে না! নিজেকে পরিপাটি রাখার দরকার আছে”।

এক মাস পর সেজো আপার জামাই ফোন দিলে ভয় পাই আবার কোন দুঃসংবাদ ! ফোনের এপাশে স্তব্ধ হয়ে শুনে যাওয়া ছাড়া কিছুই বলতে পারি না। তাকে চেপে ধরলে স্বীকার করে চাচাতো বোনের সাথে স্কুলজীবন থেকেই প্রেম, কিন্তু দুই পরিবারের কেউ রাজি না হওয়ায় অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যায় সেই বোনের, আর সেও বিদেশ চলে আসে। শ্বশুরের মৃত্যুর সময় আবার পুরনো প্রেম জেগে উঠে আর তারা গোপনে বিয়ে করলেও সেটা জানাজানি হয়ে যায়।
আমি আমার কমতি জানতে চাইলে সে নিরুত্তর থাকে। তারপর থেকে ওকে আমি সহ্য করতে পারি না। মেয়েরা চাপ দেবার পর সে জানায়, দ্বিতীয় বউকে ত্যাগ করতে সে পারবে না।

“তাহলে ব্যবসায় আমার যে হিস্যা আছে সেটা দিয়ে দাও, আমি মেয়েদের নিয়ে আলাদা হয়ে যাচ্ছি”।
আমি জানতে পারি ব্যবসায় আমার কোনো হিস্যা নাই, তবে আমি নমিনী বটে এই দেশের রীতি অনুয়ায়ী। স্তব্ধ হয়ে অনুভব করি আমি কতোটা বোকা! বিশ্বস্ততা শব্দটা কতো অচল ! এতোটাকাল আমি কাদের জন্যে নিজেকে উজাড় করেছিলাম ! ভরসা শব্দটা এতো হাল্কা!

মা-বাবা বেঁচে নাই, ভাইবোনদের অবস্থাও এতোটা ভালো না, আর দুই মেয়ে এখানে বড় হয়েছে, এখন দেশে গিয়ে সেই পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারবে কিনা জানি না। কেবলই অনুভব করি আমি ভয়ংকরভাবে ঠকে গেছি। বিশ্বস্ততা শেয়ারিং কেয়ারিং কেবল আমার দিক থেকেই একতরফা ছিলো। আমি অসুস্থ হয়ে গেলে দুই মেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে বাবাকে চাপ দিলে তার বাবা এসে জানায় –

“তোমরা এখানে তোমাদের মতো থাকো, আমি তো তোমাদের ফেলে দিচ্ছি না”
“অন্যায় করে কি তোমার অনুশোচনা হচ্ছে না বাবা?”
নাহ, সে তার কাজের জন্যে বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত হয়নি দেখে বড় মেয়ে জানায় –
“এই অন্যায়ের শাস্তি তুমি পাবেই। মা, আমি আর ছোটু স্ব-ইচ্ছায় তোমার সবকিছু ত্যাগ করলাম। আগামী সপ্তাহে আমরা আলাদা বাসায় চলে যাচ্ছি”।
“আমাকে ছাড়া কয়দিন চলতে পারো আমিও দেখবো। মেয়েমানুষের এতো তেজ ভালো না”।
“জীবনে কিছুই অপরিহার্য নাহ বাবা, তোমাকে ছাড়াই বাঁচতে শেখার জন্যেই আলাদা হচ্ছি আমরা”।
আলাদা হবার পর থেকেই মেয়ে ডিভোর্স দেবার জন্যে চাপ দিলেও সংসারটা ভাংগুক আমি চাইনি,
কত যত্ন আর কতদিনের সংসার!

“তুমি বড় বোকা মা, এখনও আশা করছো সব ঠিক হয়ে যাবে? পিছনের দিকে না তাকিয়ে সামনের দিকে তাকাও মা”।
লোকটা কাবিনের টাকা দিতে চাইলেও আমি নিলাম না, বিয়েতে গহনাবাবদ বেশিরভাগ উসুল দেখিয়ে অল্প নামেমাত্র টাকা বাকি ছিলো। সবচে বড় কথা যে মানুষ আমার রক্ত পানি করা টাকায় ব্যবসা করেও আমাকে সাথে রাখেনি, তার অল্প টাকায় আমার কী এসে যায় ! বিয়ের আগে থেকেই একের পর এক মিথ্যা কথা বলেছে, আমি তো সবকিছুই মেনে নিয়েছি। আমাকে ব্যবসার অংশীদার ব’লে এখন বলছে আমি নাকি শুধুই নমিনী! কতো মিথ্যার দায় নিবো আর! আমি তো রক্তমাংসের মানুষ।

দুই মেয়ে পড়ার পাশাপাশি কাজ করে, আমিও আবার কাজ নিয়েছি। আমরা সে এলাকা ছেড়ে দূরে বাসা নিয়েছি যাতে মুখোমুখি না হতে হয়। দ্বিতীয় দফা বিয়ের কথা শুনে ইচ্ছে করছিল বড়ো মেয়ের মুখে কষে থাপ্পড় দেই, আর বলি এক বিয়েতে আমার কতো উপকার হয়েছে !
একদিন এক বাংগালী মেয়ে বাসায় আসে, শুনি মেয়ের বান্ধবী। দুদিন পর সেই মেয়ে আর আমার মেয়েরা মিলে এক অদ্ভুত প্রস্তাব দিয়ে বসে। ভদ্রলোকের স্ত্রী কন্যার দশ বছর বয়সে মারা যাবার পর আর বিয়ে করেননি, সেই মেয়ের বিয়ে হয়েছে, কিন্তু বাবাকে একা ফেলে সে শান্তি পাচ্ছে না বলেই বাবাকে বিয়ে করিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চায়। সে তার বাবার জন্যে সঙ্গী খুঁজছে, আর আমার মেয়েরা তার মায়ের জন্যে সঙ্গী। মেয়ে তার বাবাকে নিয়ে আসে, পরিচয় করিয়ে দেবার পর আগের অনমনীয় জায়গা থেকে সরে আসি –

“লোকে কী বলবে ? আর এখন তোমাদের বিয়ে দেবার বয়স হয়েছে”।
“মা, আমাদের জগত ক্যারিয়ার নিয়ে আমরা এখন ব্যস্ত। বিয়ে হলে আরও ব্যস্ত হবো। তোমার সাদা কালো জীবনটা শেষ বয়সে অন্ততপক্ষে রঙিন হোক, আর ধর্মের বিধিনিষেধ তো নাই। মা দিনশেষে কেউ একজন তোমার কথা বলার সঙ্গী হোক”।
জানাশোনা দেখার পরেই বিয়েটা হচ্ছে দুই পক্ষের কন্যাদের পছন্দেই। আজকালকার বাচ্চারা এতো বুঝে! আমিতো ভাবতাম একা একা বড় হয় বলে কিছুই বুঝে না।
“আমি তোদেরকে ছেড়ে কী করে এতো দূর থাকবো?”
“একদিন নিজের পরিচিত সবাইকে ছেড়ে এই শহরে তোমার নতুন জীবন শুরু হয়েছিল। সেদিন পাশে কেউই ছিলো না মা। এবার আমরা সবাই আছি তোমাদের পাশে”।

প্রথম বিয়েতে যা যা হয়নি তিন মেয়ে এবার সব করেছে। অবাক হয়ে অনুভব করলাম সন্তানরা বড় হলে মা-বাবারা কেমন যেনো ছোট হয়ে যায়। সন্তানরা মা-বাবার জন্যে ভালোকিছুও ভাবে এটা দেখতে অভ্যস্ত না বলেই হয়তো মা-বাবারা ভুল করলেও সেটাই বাধ্য হয়ে মুখ বুঁজে মেনে নেই। আত্মীয়স্বজন সবাই বিমুখ হলেও দুই পক্ষের মেয়েরা সব আয়োজন করে। আমাকে বিয়ের পর তুলে দেয় আমার কন্যারা, আর বরণ করে উনার কন্যা আর তার স্বামী। এমনটা কখনও শুনিনি, দেখা দূরে থাক!

বিয়ের কয়েকদিন পর আমি কানাডায় চলে এলাম। আবারও নতুন একটা জীবন শুরু হলো। আমার মধ্যে সংকোচ থাকলেও অপরপক্ষের প্রতিটি কাজে মুগ্ধ হতাম। আমার পছন্দ–অপছন্দ তিনি সবই জানেন বলে অবাক হ’য়ে জানলাম, আমার দুই মেয়ের কাছ থেকেই নাকি জেনেছে। বাসায় থাকলে নিজ থেকেই ঘরের কাজে হেল্প করেন, প্রায় সকালের নাস্তা নিজেই তৈরি করে চমকে দেন, আবার আমি ফুল পছন্দ করি শুনে ফুল নয় আস্ত টবসহ ফুল যেদিন আনলেন সেদিন অনুভব করলাম মানুষটা সত্যিই কতো সরল!

যেকোনো কাজ করার আগেই আমাকে জিজ্ঞেস করে, সবচেয়ে ভালো লাগে আমার সম্মান করেন খুবই। পেছনের আক্ষেপ, আফসোস আজকাল মনেও পড়ে না। এমনকি আমি যখন জানাই এতোদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেছি, আর আমি আগের মতো পারবো না, তিনি সেটাও মেনে নেন বলে অবাকই হই। বিয়ে অব্দি আমি নিজের পছন্দের জীবন কাটাইনি, কেবলই সবার জন্য নিজেকে উজাড় করেছিলাম। দিনশেষে প্রাপ্তি বলতে কী সেটার হিসাব আজও মেলাতেই পারিনি, কেবলমাত্র মনের দীর্ঘশ্বাস ভেতরে ক্ষত বাড়িয়েছে মাত্র! স্যাক্রিফাইস শব্দটা কেবলমাত্র আমার একারই ছিলো।

ছুটির দিনে ঘুরে বেড়াই আর সংসারের জিনিস কিনে ঘর ভরাই। মেয়েরা ভিডিওকল দিয়ে সেসব দেখে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে –
“দুজন মানুষের এতোকিছু লাগে নাকি?”

আমিও উত্তর দেই –
“তোরা সবাই মিলে এলে তখন ঠিকই লাগে”।
দুজনের মেয়েরাই প্রাণভরে আমাদের জন্যে দোয়া করে, আর কী চাই!

উনার মেয়ের বাচ্চা হবার আগে এখানেই নিয়ে এলাম, নাতি হবার পর আমাদের দুজনের জীবন আরও রঙিন আর মধুময় হয়ে উঠলো। যে কয়মাস কাছে ছিলো জীবন্ত খেলনা নিয়ে আমাদের খুব মধুর সময় কেটেছে।
আমার মেয়েরা আর উনার মেয়েরা একসাথে প্ল্যান করে যখন আসে কী যে দ্রুত সময় চলে যায়! পুরো বাসার পরিবেশই অন্যরকম হয়ে যায়। সত্যি বলতে ঠকে আমার জীবনের যে শিক্ষা হয়েছিল, আজকাল সেসব মনে পড়লে হাসিই পায়।

বিয়ের তিন বছরের মাথায় খবর পেলাম একা ব্যবসা সামলাতে গিয়ে ভদ্রলোক আর দেশে যেতে পারেননি, আর আইনি জটিলতায় দ্বিতীয় বউ, বাচ্চাদের লন্ডনে আনতে পারেনি বলে সেই বউ তাকে ছেড়ে চলে গেছে। কন্যার কাছে আমার খবর নিতে এলে কন্যা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এসব খবর জেনে নেয়।
আমার শুধু মনে হয় কিছু শাস্তি দুনিয়ার মাটিতেই দেন আল্লাহপাক, কিন্তু মানুষের বোধগম্য হয় না।

(বাস্তব ঘটনা নিয়ে লিখা)

২৭/৫/২০২২

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.