শরীরের পাপ পূণ্য

সুদর্শনা সেন:

শরীর আজ আছে, কাল নেই! আত্মা অবিনশ্বর। এমনই শুনে এসেছি ছোট থেকে। সে কারণেই কি শরীরের যত্ন? জানি না, কারণ আত্মার তৃপ্তির প্রতি যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি আত্মার শান্তি কামনাও তো করতে শিখেছি। আদতে শরীরকে দেখতে পাই, আত্মা অদৃশ্য, কিন্তু বর্তমান। শরীর বস্তু, তাই তাকে দেখি। এই বস্তু শরীর দুই ধরনের: পুরুষ শরীর ও নারী শরীর। আত্মার কিন্তু নারী-পুরুষের ভাগাভাগি নেই। আবার শরীরের এই দু ধরনের ক্ষেত্রে শরীরকে বস্তু হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও আলাদা। অর্থাৎ, নারী শরীর দেখার, পুরুষ শরীর দেখানোর। পুরুষ তার শরীর সৌষ্ঠব প্রদর্শন করেন, তার পৌরুষ প্রকাশিত হয় পেশি বহুলতায়। অন্যদিকে নারীর শরীরের কোমলতা, স্নিগ্ধতা মুগ্ধতা আনে, আকর্ষণ করে পুরুষকে। নারী তার শরীরকে আবৃত রাখেন। শরীরকে ঘিরে লজ্জায় সে আনত। যে নারী এই লজ্জা পাওয়ার পরিবর্তে, শরীর প্রকাশ করেন, তিনি ‘নির্লজ্জ’ ‘বেহায়া’ মেয়ে মানুষ। পুরুষ কিন্তু শরীর প্রদর্শনে কখনোই ‘নির্লজ্জ’ বা ‘বেহায়া’ নন।

ছোট থেকেই মেয়েরা শেখেন শরীরকে আবৃত রাখতে। লোকসমক্ষে তো বটেই, নিভৃতেও। সে কারণেই কি অমৃতা গিল যখন নিবারণ হয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন তখন আমরা শঙ্কিত হই! এই মেয়ে কী বেপরোয়া, লাগামহীন! নারীর শরীরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যা পুরুষের শরীর থেকে আলাদা, তা হলো স্তন ও যোনি। তাই আংশিক আবরণে বক্ষদেশ ও নিম্নাঙ্গ ঢেকে রাখাই সমীচীন। কী হয় যদি পুরুষের মতোই শরীর প্রদর্শনে ব্রতী হন মেয়েরা? শুধুমাত্র আবরণ নয়, মেয়েরা নিজের শরীর নিয়েও লজ্জা পান। সমাজ শেখায় নারী শরীর লজ্জার ও পাপের উৎস। সুতরাং তা আবৃত রাখো। এই শরীরকে ঘিরে দায়, দায়িত্ব সবই নারীর।

নারী শরীরকে ঢেকে রাখলেও পুরুষের কল্পনায়, স্বপ্নে নারী হয়ে ওঠেন মোহময়ী। অথচ নারী তার নিজের শরীর যা অন্যের কাঙ্ক্ষিত তাকে ঘিরে কোনো সুখকল্পনা করতে পারে না। শরীর সম্বন্ধে তিনি উদাসীন। সেটাই সামাজিকভাবে কাঙ্ক্ষিত। তার ঔদাসীন্যেই শান্তি বজায় থাকে।
এই সময়ই নৈতিকতার প্রশ্ন তোলা হয়। উচিত-অনুচিতের প্রশ্ন। সামাজিকভাবে নারীকে বিরত করা হয় শরীর দেখানোয়। শরীর বস্তু, দেখার বিষয় হলেও তা দেখা-না-দেখার আড়ালে অভিপ্সু বিষয়- লোভের হয়ে ওঠে। একদিকে নারী সর্বাঙ্গীনভাবে সামাজিকভাবে শিক্ষিত রীতিকে মান্যতা দিয়ে শরীরকে ঢেকে রাখেন, কারণ সেটিই করা উচিত বলে তাকে শেখানো হয় জন্মাবধি, অন্যদিকে পুরুষ উল্লসিত হন সেই আবরণ খোলায়।

নারীর শরীর পবিত্র, শুদ্ধ ও তার কুমারীত্ব বজায় রাখার দায়িত্ব মেয়েদের। পুরুষের এসব দায় নেই। সে শরীরের চাহিদা প্রকাশে নিঃসঙ্কোচ। তার কারণ কি শরীরের আকাঙ্ক্ষা পূরণের ফল যে সন্তান, তাকে বহন করার কোনো দায়িত্ব, তার পিতৃপরিচয় প্রদানের দায় নেই? সে তার আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থেই সম্পন্ন? কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে তা নয়। তাকেই তার শরীরী আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ না করে অপেক্ষা করতে হয় কোনো পুরুষের, নিজের শরীরকে সুরক্ষিত রেখে। আত্মার এসব দায় নিতে হয় না। পুরুষের মতো সেও মুক্ত।

মানবজাতির জৈবিক যোগে শরীরের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও মাতৃত্ব সেই বাস্তবতাকে গৌণ করে দেয়। রাষ্ট্র, সমাজ প্রত্যেকেই মাতৃত্বকে গুরুত্ব দেন বেশি নারীর থেকে। নারী স্বল্পশিক্ষিত হতে পারেন, নারীর স্বাস্থ্য গড় স্বাস্থ্য থেকে খারাপ, রক্তাল্পতা ইত্যাদিতে ভুগতে পারে। কিন্তু মাতৃত্ব এ সবকিছু অতিক্রম করে নারীর জীবনকে উৎসর্গিত করে এক মহৎ কাজে – ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্মে। যে শরীর ছিল কাঙ্ক্ষিত সেই শরীর জন্ম দিলে হয়ে ওঠে দেহহীন এক অস্তিত্ব: নিজের কাছে, অন্যের কাছে নয়। সমাজ এইভাবেই নারীকে তৈরি করে। আশা, আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ, অনুভূতির এক অদ্ভুত মিশেল।

তাই ‘নারী’ মা হন, সেই ভূমিকাতেই তার সবচেয়ে তৃপ্তি কারন মায়ের কোনো শরীর থাকে না। এই ভূমিকায় তিনি সম্পূর্ণভাবে যৌনতাহীন। মা হওয়ার চেষ্টা, আনন্দ, তৃপ্তি কি তাকে তাই বেশি আচ্ছন্ন করে রাখে?
নারীর সযত্নে লালিত, সামাজিকভাবে পুষ্ট শরীরকে ঘিরে ব্যক্তিগত পরিসর, একান্তের, নিভৃতের গণ্ডি ভাঙতে আনন্দও কি তাই? আবার এই গণ্ডিভেদের থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাই কি নারীত্বের মূল মন্ত্র? এ কারণেই কি ধর্ষণ পুরুষের কাছে একটি অস্ত্র ও নারীর কাছে নারীত্বের চরম অবমাননা?

সহকারী অধ্যাপক, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.