মায়ের কাজে ফেরা: জীবন থেকে নেয়া

সাবরিনা স সেঁজুতি:

কর্মজীবী নারীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বোধ করি মা হবার পর কাজে ফিরে যাবার সাহস বা কারেজ। অনেক ক্ষেত্রেই পারিবারিক সহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও নারীদের কাজ ছেড়ে পুরোপুরি বাচ্চা লালন-পালনে মনোনিবেশ করতে হয়, কারণ বাচ্চা মা ছাড়া সারাদিন কান্নাকাটি করে বা সকালবেলা মাকে ছাড়তে চায় না। মায়ের সাথে সন্তানের যে বায়োলজিক্যাল সম্পর্ক গর্ভাবস্থায় গড়ে ওঠে, সেটা যতোটুকু ভালোবাসার, সমপরিমাণ অভ্যস্ততারও বটে। এক্ষেত্রে দুইপক্ষের, মা এবং সন্তান, দুইজনেরই সমান প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, যাতে মা এবং সন্তান স্বাধীন এবং আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। কেউ কারও উপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে।

আপনি হয়তো ভাবছেন, মা আবার কীভাবে সন্তানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আপনি যদি মা হয়ে থাকেন, ভেবে দেখুন সন্তান ছাড়া প্রতিটি মুহূর্ত কতোটা অসহায় লাগে। প্রথম যেদিন সন্তান স্কুলে যায়, আপনার কেমন লেগেছিল? প্রথম যেদিন সন্তান পাশের ঘরে নিজের বিছানায় ঘুমালো, সারারাত আপনার কি ঘুম হয়েছিল? সেটাই হলো অভ্যস্ততা এবং নির্ভরশীলতা। যদিও আপনি বায়োলজিক্যালি সন্তানের উপর নির্ভরশীল নন, কিন্তু ইমোশোনালি আপনার নির্ভরশীলতা সন্তানের আপনার প্রতি যে নির্ভরশীলতা তার চেয়েও বেশি।

আমার মনে আছে, আমি আমার মেয়ের জন্মের ছয় মাসের মাথায় কাজে ফিরে গিয়েছিলাম। তার তিন বছর বয়সে পিএইচডি শুরু করেছিলাম। উভয়ক্ষেত্রেই আমি দিনে কমপক্ষে আট ঘন্টা কাজ করতাম, অর্থাৎ মেয়েকে ছাড়া থাকতাম। আমার জন্য শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। কেননা, আমি মেয়েকে মা ছাড়া থাকার প্রশিক্ষণ দিলেও নিজে মেয়ে ছাড়া থাকার প্রশিক্ষণ পাইনি। মেয়েকে মা ছাড়া থাকার প্রশিক্ষণ হিসেবে প্রথমেই যেটা করেছিলাম, তাকে বেবিকটে/আলাদা বিছানায় ঘুমানোর অভ্যাস করিয়েছিলাম। খাওয়ানো ছাড়া অপ্রয়োজনে তাকে কোলে নিতাম না। সলিড খাওয়া যখন শুরু করেছে তখন খাবার সময়েও কোলে নেবার প্রয়োজন হতো না। শিশুর খাওয়া আর ঘুমটা যদি মা ছাড়া বা মাকে দূরে রেখে একবার সম্ভব হয়, আপনার অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

আমার বন্ধু বান্ধব, কলিগ এমনকি আমার ইউনিভার্সিটির নারী-শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে যাদের বাচ্চা ছোট, তারা প্রায়ই আমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করে, “সাবরিনা, আপনার মেয়ে আপনাকে কাজ করতে দেয়? কান্না কাটি করে না? বিরক্ত করে না?” সত্যি বলতে কি আমার মেয়ে কখনই কান্নাকাটি করেনি এবং আমি যখন ঘরে বসেও কাজ করি, সাধারণত সে আমাকে বিরক্ত করে না। তার যদি আমার পাশে খুব থাকতে ইচ্ছে করে, সে পাশে বসে নিজের মতো খেলে। তাকে পাশে নিয়ে আমিও কাজ করে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাকে ঘরে রেখে কাজে গেলেও আমি কখনো তাকে কান্নাকাটি করতে দেখিনি। তার কারণ, তার জৈবিক চাহিদা অর্থাৎ খাওয়া এবং ঘুমের জন্য সে আমার উপর ১০০ ভাগ নির্ভরশীল নয়। সে আমার গায়ের গন্ধ এবং তাপমাত্রা আজো ভালোবাসে কিন্তু সেটা ছাড়াও সে ঘুমাতে পারে। ঠিক তেমনি আমি খাইয়ে দিলে সে হয়তো খুশি হয় কিন্তু নিজে খেলেও পেটে ক্ষুধা রেখে খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ে না।

আমি অফিসে থাকাকালীন সময়ে সে যার কাছে থাকতো, তার কাছে আমার একটাই অনুরোধ ছিলো, মেয়ে যাতে আত্মনির্ভরশীল হয়ে বড় হয়। ঠিক যে বয়সে যেটা শেখা উচিত যেন শিখে ফেলে। যেমন সঠিক বয়সে সলিড খাওয়া শুরু করা, প্যেসিফারার ছাড়া, নিজ হাতে খাওয়া শেখা, পটি ট্রেনিং এবং কাপড় চেঞ্জ করা। এসকল বেসিক কাজগুলো শেখার ব্যাপারে তাকে যারা দেখাশুনা করতো তাদের পাশাপাশি পরিবারের সবাই মিলে চেষ্টা করেছি। তাকে আত্মনির্ভর্শীল ভাবে গড়ে তুলতে যেয়ে, আমাদের মা-মেয়ের সম্পর্কে যাতে চিড় না ধরে সেটাও সচেতন ভাবে খেয়াল রাখতে হয়েছে এবং হচ্ছে। তাই রুটিন করে তার সাথে কোয়ালিটি সময় ব্যয় করাও আমাদের সাপ্তাহিক কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এক সাথে হেড়ে গলায় গান করা, নাচা, শপিং-এ যাওয়া, ভিডিও গেম খেলা আরো অনেক কিছু।

তিন বছর বয়সে তাকে নিয়ে চলে এসেছিলাম অস্ট্রেলিয়াতে। নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি এবং নতুন ভাষা। তার প্রতি আলাদাভাবে নজর দিতে হয়েছে যাতে সে কালচার শকে না পড়ে যায়। ঘরে-বাইরে সমান তালে যেন সে চলতে পারে। প্রথমেই তাকে যেটা শিখতে সাহায্য করেছি, সেটা হলো ভাষা। তারপর সাহায্য করেছি এই দেশের সংস্কৃতি শিখতে। অনেকেই হয়তো ভাবেন, বাচ্চাকে নিজের সংস্কৃতিতে বড় করবো বিশেষ করে যারা দেশের বাইরে সেটেল হয়েছেন। কিন্তু এটাও ভেবে দেখা জরুরি যে তাকে কি আসলেই বিদেশে বসে পূর্ণ দেশি সংস্কৃতি দেয়া সম্ভব? নাকি তাকে আপনি অন্য একটি বা একাধিক সংস্কৃতি শেখা থেকে বঞ্চিত করছেন। পৃথিবী এখন এগিয়ে যাচ্ছে মাল্টিকালচারের পথে। অন্য সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এবং সম্মান প্রদর্শন করা একজন সচেতন নাগরিকের বাঞ্চনীয় বৈশিষ্ট্য।

তাছাড়া আপনার আমার যেমন একটি সোশ্যাল/সামাজিক জীবন আছে। শিশু যতো ছোটই হোক না কেন তারও একটা সোশ্যাল/সামাজিক জীবন থাকা প্রয়োজন, যা তার মানসিক এবং ইমোশনাল ডেভেলপমেন্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে যে দেশে তার বসবাস সেই দেশের সংস্কৃতি জানা তার সোশ্যাল/সামাজিক জীবনের জন্য ফলপ্রসূ। সেসকল কথা মাথায় রেখে আমরা যেটা করেছি, মেয়েকে খেলার ক্লাস, থিয়েটার, গানের ক্লাস এধরনের গ্রুপ এক্টিভিটিতে সংযুক্ত করেছি যাতে সে নিজের বয়সী মানুষের সাথে মিশতে শেখে। নিজের বয়সীদের সাথে মিশতে শেখাটা একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইফ স্কিল/জীবন দক্ষতা যেটা নিয়ে খুব কম সংখ্যক অভিভাবক চিন্তা করেন। অনেককে এরকমও বলতে শুনেছি, আরে আমার তো ২/৩ টা বাচ্চা, তারা নিজেদের মধ্যেই থাকে। তারা হয়তো ভেবে দেখেন না, জীবন শুধু ভাই, বোন, বাবা, মা-র মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের বাইরের মানুষের সাথে মেশা, তাদের প্রতি সম্মান দেখানো এসকল সোশ্যাল স্কিল/সামাজিক দক্ষতা ছোট বেলা থেকেই শেখা শুরু করতে হয়।

আমার মূল বক্তব্য হলো, শিশুকে আপনি যদি জন্মের পর থেকেই আত্মনির্ভরশীল হবার জন্য প্রশিক্ষণ দিতে শুরু না করেন, সেটা আপনার কর্মজীবনকে যতো না ভোগাবে, তার থেকে অনেক বেশি ক্ষতির কারণ হবে শিশুর নিজের জন্য। তাই সঠিক সময়ে শিশুর জন্য সঠিক পরিকল্পনা মা-বাবা হবার অন্যতম পূর্বশর্ত। সন্তান পেট থেকে কিছুই শিখে আসে না, তাকে পরিবার, সমাজ যা শেখায় সে সেটাই শিখে। আপনি তাকে যেভাবে বড় করতে চান, সে সেভাবেই বড় হবে যদি পরিকল্পনা ঠিক থাকে।

সাবরিনা স সেঁজুতি
লেখক বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির সেশনাল শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.