৮ ই মার্চ নিয়ে আমার ভাবনা

ফাহমিদা খানম:

৮ই মার্চ এলেই নানান পরিকল্পনা আর প্রোপাগান্ডার বুলি শোনানো হয়, তারপর আর সেসবের বাস্তবায়ন চোখে দেখি না। পরিবর্তনের জোয়ার যতটুকু চোখে দেখি তা নারীদের নিজের অর্জন, কারণ পুরুষেরা বেশিরভাগই হাজার বছরের সংস্কার এখনও পুষে রেখেছেন। তারা একজন নারীর মাঝে অনেক গুণাবলীর আশা করেন বিপরীতে তারা কী করেন সে প্রশ্ন তাদের মাথায় আসেও না ।

সংসারে একটা মেয়েশিশু জন্মালে এখন আগের মতো কেউ অখুশি হয় না, আবার অনেক সংসার এখনও উত্তরাধিকার ব্যাপারটা মনের ভেতরে সযত্নে লালন করেন কী শিক্ষিত আর অশিক্ষিত ! মেয়েদের ব্যাপারে সচেতনতা কিছুটা বেড়েছে তবে ঝামেলা হয় বেশিরভাগ পরিবারে বউ আর কন্যাকে একই চোখে দেখা হয় না এখন পর্যন্ত, যারা দেখেন সেখানে সমস্যাও নাই। নতুন পরিবেশে গেলে কিছুটা সময় দিতেই হয়, কিন্তু শ্বশুরবাড়ি নামক প্রতিষ্ঠান এই ব্যাপারে এখনো কৃপণ, তারা আকাশকুসুম আশা করেই বসেই থাকে। একবারের জন্যেও ভাবে না একেক পরিবার আলাদা। খাপ খাইয়ে নেবার জন্যে সময় দেওয়া দূরে থাক, বরং পদে পদে তাদের ভুল ধরে। এসব নারী বিয়ের পর কঠিন বাস্তবতায় পড়ে। বাবা মায়ের রাজকন্যাদের স্রেফ দমের পুতুল বানানোর চেষ্টা চলে। সেখানে তার মতামত অথবা স্বপ্ন/ শখ আহ্লাদ চাপা পড়ে যায়, আর তারা অনুভব করে সেসব কতটা অপাংক্তেয় ! যে মেয়েরা বাসায় ছোট কাজের জন্যে প্রশংসা পেতো, বিপরীতে প্রশংসা দূরে থাক, বরং সামান্য এদিক/ওদিক হলে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। শিক্ষিতা স্বনির্ভর নারীরাও এই দলে আছেন। মুখে কন্যাসম বললেও খুব কম সংসারই কন্যার মতো আচরণ করেন।

আজকাল অনেকেই বলেন এই যুগের নারীরা নাকি সমঝোতা করে চলতে শিখে না, তাই ডিভোর্সের হার বেড়েছে। জানতে ইচ্ছে করে যেসব মায়েরা সমঝোতা আর আপোষ করে চলেছেন, দিনশেষে তাদের প্রাপ্তি কী? আমার জানা মতে, অনেক নারীকে সামাজিকতা আর লোকলজ্জার ভয়ে নীরবে নিজেকে বঞ্চিত করেছেন মাত্র, তাই মায়েরা ঠকে-ঠেকে মেয়েদের শক্ত করে গড়ে তোলে আর ছেলে/মেয়ের মধ্যে বিভেদ করে না। মেয়েদের বিপদে পাশে দাঁড়ায় বলেই হয়তো চিত্রটা বদলে যাচ্ছে, তবে কিছু পরিবার এখনও প্রাচীনত্ব ধরে রেখেছে বলেই সংবাদের শিরোনাম হতে হয় নারীদের।

আমরা চাই না আমাদের মেয়েরা অন্যায়ের সাথে আপোষ করে বাঁচুক, তবে সারা দুনিয়া তার বিপরীতে থাকলেও স্বামী যদি শক্ত হাতে তাকে ধরে না থাকে, তবে সে কাগুজে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায় একা নারীর কেনো হবে? কীসের এতো দায়বদ্ধতা নারীর ? বেশিরভাগ পুরুষই নিজের স্ত্রীর পাশে থাকে না তাদের কাছে পরিবারের কথা সত্যিকার মনে হলে আদতে সে স্বামী হবার উপযুক্তই না। সবার পরিবার ভালো হলে নারী নির্যাতন করে কারা? এলিয়েন ? কাজের প্রয়োজনে দিনের লম্বা সময় বাইরে থাকা পুরুষেরা জানে না তার নিজের স্ত্রী বাসায় কতভাবে অপদস্থ আর নাজেহাল হয়। এসব ব্যাপারে পুরুষদের বাহবা দিতেই হয়, কারণ তাদের একপক্ষীয় দৃষ্টিভঙ্গি হাজার বছর ধরে একই আছে বৈকি !

পরিচিতা এক মেয়ে বিয়ে না করার পণ নিয়েছে। ভাবলাম হয়তো প্রেমঘটিত ব্যাপার। কিন্তু মেয়েটা জানালো, আজীবন মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার করা বাবার আচরণ দেখে সে বিয়ে করতেই ভয় পায়, অথচ আমরা পরিবারটাকে আদর্শ পরিবারই ভাবতাম। একজন ভালো বাবা ভালো স্বামী নাও হতে পারেন এটা ভাবার জন্যে যে বোধ ও বিবেক থাকার কথা তা সত্যিকার অর্থে আমাদের মধ্যে নাই। আমরা ধরেই নেই মা –বাবা হলেই তারা সব ভুলের ঊর্ধ্বে। মনে রাখুন তারাও রক্তমাংসের মানুষ আর তাদেরও ভুল হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন নারীর সব সিদ্ধান্ত নেয় তার বাবা, ভাই, স্বামী। দিন বদেলেছে, ছোটবেলা থেকেই নারীকে সংসারে মূল্যায়ন করলে সে বুঝে যায় সেও সংসারে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বৈষম্য কেবল নারীর সাথেই ঘটে সবসময়। হয়তো ভালবেসে কাউকে গোপনে বিয়ে করলো, পুরুষটি যখন সব অস্বীকার করে বসে নারীকে প্রমাণ করতে হয়। আইনি সেই লড়াইয়ে সবাই মুখরোচক গল্প শুনতে যতটা আগ্রহী হয়, সেই নারীর পাশে দাঁড়ানোর সময় কেউ থাকে না। কেউই ভাবে না তার মনের গহীনে কতটা ঝড় বয়ে যায়, এসব কারণে অনেক নারী চুপচাপ অন্যায় সয়ে যায় বলেই অন্যায়কারী লজ্জিত বোধ করে না। এই বোধই জন্মায় না তাদের।

যতদিন যাচ্ছে অনুভব করছি শিক্ষিত/অশিক্ষিত বলে কিছু নাই। কন্যা সন্তানের মা –বাবারা এখনো অসহায় আর জিম্মী হয়েই আছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে । নারীদের ব্যাপারে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি না বদলালে আমরা পিছনেই পড়ে থাকবো । বিয়েতে কন্যাকে একঢাল জিনিস না দিয়ে বরং তাদেরকে স্বনির্ভর করে তুলতে হবে । শিক্ষিত সমাজেও নারী নির্যাতনের চিত্রটা ভয়াবহ হচ্ছে কারণ মধ্যবিত্ত সমাজে চক্ষুলজ্জায় অনেকেই মুখ ফুটে প্রকাশ করতে পারে না আবার অনেক সময় পরিবার পাশে থাকে না । অর্থনৈতিক নির্ভরতা থাকার পরেও এ-ই দেশে নারীর অনেক প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে যেতে হয় কারণ আমাদের মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে বিয়ের পর সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব সে একাই সামলাবে। বিয়ে হয় দু’জন মানুষের মধ্যে সেখানে পুরো সংসারের দায়িত্ব নেবার মতো ম্যাচুরিটি কতটা থাকে একজন মেয়ের? সময় দিতেও আপত্তি।

কোথায় নিরাপদ আমাদের কন্যারা? ঘরে–বাইরে কোথাও না। রাস্তায় চলাচল করা প্রতিটি নারী জানে কতো নোংরা হাত প্রতিদিন তাদের ছোঁয় ! একেবারে নিন্মস্তর থেকে চাকুরী করা নারী প্রতিদিন অসংখ্য পরিস্থিতির সাথে মোকাবেলা করে যাচ্ছে আর সামান্য ভুল হলেই তার দিকেই আংগুল তুলে তাকে বিবস্র করতে উস্তাদ সবাই।

সাধারণ নারীদের চাওয়া কমই থাকে, অনেকেই বলবেন এই যুগের নারীদের চাওয়া অনেক । পুরুষদের চাওয়া কি কম ? নারী হলেই কি তার শখ আহ্লাদ থাকবে না ? তাদেরকে সম্মান করুন ,সময় দিন তাদের কাজের প্রশংসা করুন দেখবেন এতেই তারা কৃতজ্ঞ । একজন শিক্ষিতা নারীর কাছে আত্মসম্মান বড়ো দামী জিনিস তাকে ছোট করার অধিকার কারোই নাই হোক সে ভাই/ বাবা অথবা স্বামী।

আজকাল নারী শুধু সংসার নিয়েই পড়ে থাকে না, আগে শুধু সংসারের কাজ ছিলো এখন তার সাথে বাচ্চাদের স্কুল, কলেজ কোচিং, বাজারের দায়িত্ব পালন করে। গত কয়েক বছরে ঘরে ঘরে প্রচুর নতুন উদ্যেত্তা ঘরে বসেই অনলাইনে ব্যবসা করছে । এখন বিয়ের পর যদি আপনারা ধরে নেন এই টাকায় আপনাদের অধিকার আছে তাহলে বোকার স্বর্গে বাস করছেন মাত্র! আজকের সে তার মা বাবার জন্যে এতটা পথ এসেছে, তাদের জন্য করাটা তার দায়িত্ব আর আপনাদের চাওয়াটা হ্যাংলামি। তবে বেশিরভাগ নারীই সংসারের বিপদে নিজের সবটা নিয়ে পাশে দাঁড়ায়।

অনেক নারী বলেন, সংসারে কিছু হলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার কথা বলে স্বামীরা। হ্যাঁ, এই ব্যাপারে শিক্ষিত/অশিক্ষিত সবাই একই কাতারে। একজন নিজের পরিবার ,নিজের জগত ছেড়ে যার সাথে সংসার করতে আসে সেই মানুষ এই কথা বললেও সংসার ছেড়ে যাবার উপায় আসলে নারীদের থাকে না, কারণ ততদিনে ডালপালা বড় হয়ে, ঝুরি বাড়ে আর শিকড় অনেক গভীরে চলে যায়। এই একটা কথার ক্ষত বুকের ভেতরে ধাক্কা দিয়ে জানান দেয় তার খুঁটি কতটা নড়বড়ে ! বিয়ের পর বাবার বাড়িতে মেহমান আর নিজের সংসার বলে আসলেই নারীদের কিছু হয় না । সামান্য কিছু হলেই তাকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় আমার সংসারে এটা চলবে না। আমার থেকে আমাদের হলেও কিছু হলে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়, নারীর আসলে কোনো খুঁটিই নাই। অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে সংসারের ঘানি আর কতকাল এভাবে টানবে নারী?

আসুন আমরা প্রথা ভাংগার খেলায় মেতে উঠি। নারীরা নারীদের প্রধান শত্রু এই ভাবনাকে গুঁড়িয়ে দেই। আমাদের মায়েদের হাতে সন্তানদের সঠিকভাবে শিক্ষা দেবার যে ক্ষমতা আছে সেটা কাজে লাগাই, কারণ পরিবারের চেয়ে বড় শিক্ষালয় কোথাও নাই। সুকোমলবোধ, মানবিকতা ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের ভেতরে ঢুকিয়ে দেই। তাদেরকে যার যা প্রাপ্যতা সেই বোধ শেখাই, ছেলে সন্তান বিয়ের পর হাতছাড়া হবে এই ভয়ে বউদের সাথে অন্যায় না করি, অথবা আমাদের ছেলে সন্তানেরা অন্যায় করলে স্পষ্ট করে সেটাকে অন্যায় বলি, দেখবেন পরিবারে নারীদের দীর্ঘশ্বাস কমে যাবে। পরিবার বদলালে সমাজ বদলে যাবে ।

শুধু একটা কথা মাথায় রাখি আমার পথেই একদিন হাঁটবে পরবর্তী প্রজন্ম তাই পা ফেলতে হবে চিন্তাভাবনা করেই। নারীকে সম্মান আর মূল্যায়ন করতে শিখুন কারণ তারা মায়ের জাতি। ভাবুন আপনি আজকে এতটা পথ আসতে মায়ের কতটা কষ্ট করতে হয়েছে। নারীরা মাঝেমধ্যে সংসার ছেড়ে বাহিরে থাকবেন তাহলে সংসারে আপনাদের গুরুত্ব বুঝতে শিখবে সবাই। নিজেকে বঞ্চিত করে, উজাড় করে সবার জন্য ঢেলে দিবেন না বরং কিছু ব্যাপারে শক্ত হতে শিখুন।

নারীরা নারীদের শত্রু এই ভাবনার বিপরীতে গিয়ে আমরা ভারসাম্য করতে শিখি। অন্যের কন্যার দিকে হাত তোলার আগে নিজের কন্যাকে সেখানে কল্পনা করি। তুলনা করার নোংরা চর্চ্চাটা একেবারে বন্ধ করে দেই। মা শব্দকে ক্ষুদ্র গন্ডিতে বেঁধে না রেখে নিজেদের জগত উন্নত করি তাহলে চারপাশ বদলে যাবে।

ঘটা করে একদিন নারী দিবস পালন করার চাইতে সবদিন তাদেরকে ঘিরে থাকুক আমাদের জগত। দিনশেষে সে মমতাময়ী মা, বোন অথবা স্ত্রী। যাদের ঘিরে পুরুষের জগত তারা নারীকে সম্মান করলে দিবসের প্রয়োজন পড়তো কি?
যেদিন কোথাও নারী নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হবে না পত্রিকায় সেদিনই হবে সত্যিকার নারী দিবস।
চাবিকাঠি আমাদের সকলের হাতে।

৮/৩/২০২২

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.