হিন্দু নারী ঠিকানাহীন ভাসমান মানব সত্তা

ভানুলাল দাস:

মুসলিম মেয়ে পিতার সম্পত্তির অধিকার পায়, খ্রিস্টান মেয়ে পায় এবং কেউ কেউ এই সম্পত্তি না নিয়ে ভাইকে দিয়ে দেয়। অধিকার’ এক জিনিস ‘দেওয়া’ বা ‘না নেওয়া’ আরেক জিনিস। হিন্দু কোনো ছেলেকে কি অন্য ছেলে, বোন বা কাকা বলতে পারবে, ‘তুমি বাপের সম্পত্তি পাবে না’?
না, এমন বলতে পারবে না। কারণ হিন্দু ধর্মীয় আইনে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার (উত্তর +অধিকার) পুত্র পায়। উত্তরাধিকার একটি অধিকার। এই উত্তর ‘অধিকার’ পাওয়া ছেলে বা মেয়ে নির্বিশেষে সকল সন্তানের অধিকার হওয়া উচিত। জৈবিকভাবে কন্যা ও পুত্র উভয়ে পিতার সমসংখ্যক ক্রমোজম শরীরে বহন করে। একটি কমও না বেশিও না।

পিতা বা মাতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার (Heridity) মানুষের অন্যতম সার্বজনীন মানবাধিকার। কিন্তু হিন্দুর প্রথাসিদ্ধ দায়ভাগ আইনে সন্তান শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত।
এই বৈষম্য বিষয়ে কিছু সনাতন হিন্দু পুরুষ ও নারীর যুক্তিতর্ক শুনে আমি হতভম্ব হয়ে যাই। হাসবো না কাঁদবো, বুঝতে পারি না।

তারা বলেন, ‘মেয়ের বিয়েতে পিতাকে অত্যাধিক যৌতুক দিতে হয় বিধায় পিতার সম্পত্তির অধিকার হিন্দু মেয়েরা পায় না’।
তা হলে ভারতে ১৯৫৬ সনে আইন করে নারীর সম্পত্তির অধিকার দেয়া হয়েছিল কি এই কারণে যে, সেখানে তখন কনের বিয়েতে তার বাপ-মা যৌতুক দেয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন? এ প্রশ্নের জবাবে তারা বোবা সেজে থাকে।

ভানুলাল দাস

ধর্মীয় অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, দত্তক গ্রহণ, পোষ্যদের ভরনপোষণের (মা, স্ত্রী, অবিবাহিতা ভগ্নি ও সন্তান) নিয়মাবলি হিন্দুর বেলায় কিছুটা ধর্মীয় ও প্রথাসিদ্ধ বিধান।
এই প্রথাসিদ্ধ বিধান মতে, বোনের বিবাহ হয়ে গেলে তার দায়ভার আর ভাইয়ের থাকে না। বিধবা হয়ে বা স্বামী পরিত্যক্ত হয়ে বোন ফেরত এলে ভাই দয়া করে স্থান দিলে ভালো, না হলে বোনকে বাস্তবিক অর্থে পথে দাঁড়াতে হয়। পিতার বিশাল সহায়-সম্পত্তি বাড়িঘর থাকলেও কন্যার কোন উপকারে আসে না। দয়ার পাত্রে পরিণত হয় কন্যা। যেন জলে ভাসা শ্যাঁওলা।

শুধু মেয়ে হওয়ার জন্য নারীকে ঠিকানাহীন হতে হবে কেন? বাবা, স্বামী, পুত্র কারও স্থাবর সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর স্থায়ী অধিকার বা মালিকানা নাই। বিয়ের আগে নারীর ঠিকানা পিতার ঠিকানা, বিয়ের পরে তার ঠিকানা স্বামীর ঠিকানা এবং বার্ধক্যে নারীর ঠিকানা পুত্রের ঠিকানা। বস্তুত হিন্দু নারী ঠিকানাহীন এক পরগাছা। হিন্দু নারীর কোন স্থায়ী ঠিকানা নাই। বিয়ের আগে বাপের বাড়ি, বিয়ের পরে স্বামীর বাড়ি, বুড়োকালে পুত্রের বাড়ি, এই ঠিকানাগুলো হিন্দু নারীর অস্থায়ী ঠিকানা। কারণ আইন অনুযায়ী কারও স্থায়ী স্থাবর সম্পত্তি না থাকলে তার কোন স্থায়ী ঠিকানাও থাকে না। যার স্থায়ী ঠিকানা নাই, সে প্রকারান্তরে ঠিকানাহীন। ভাসমান মানুষ। আক্ষরিক অর্থে হিন্দু নারী ঠিকানাহীন ভাসমান এক মানব সত্তা।

নারীকে এভাবে ঠিকানাহীন রেখে সভাসমিতি ও টক শোতে প্রামাণিক, বিশ্বাস, পাল, দাশগুপ্ত বাবুরা জোর গলায় বলে বেড়াচ্ছেন, সনাতন হিন্দুরা নারীকে দেবীর সম্মান দেয়।
নারীর প্রতি এর চেয়ে নির্মম পরিহাস আর হতে পারে না!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.