২০২২ এ এসেও পোশাকের স্বাধীনতা দরকার আমাদের!

ফারজানা নীলা:

ঘটনা -১: বাসে এক মেয়ের শরীরে হাত দিয়েছে এক মধ্যবয়স্ক লোক। মেয়ে প্রতিবাদ করে থাপ্পড় মেরে বাস থেকে নামিয়ে দিয়েছে লোকটাকে। অবশেষে লোকটা ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়।
এই অন্যায়ের প্রতিবাদ মেয়ে একাই করেছে। বাসভর্তি লোক ছিল, কিন্তু কেউ টুঁ শব্দটিও করেনি।

ঘটনা ২: টিশার্ট পরা এক তরুণীকে বোরকা ও হিজাব পরা আরেক নারী অকথ্য ভাষায় অপমান করেছে এই বলে যে কেন তিনি টিশার্ট পরে বাসে উঠেছেন! মেয়েটি অপমানে নির্বাক, আর বাসভর্তি মানুষ এই তামাশা শুধু উপভোগই করে গেছে, কেউ টুঁ শব্দ করেনি।

এই দুটি ঘটনা দিয়ে আসলে কি বোঝা যায় না আমরা পেছনে হাঁটছি?

সামনে এগুনোর কথা, যুগের সাথে তাল মেলানোর কথা; সেখানে ঘটা করে অনেকটা উৎসব করে বর্বর থেকে বর্বরতর হচ্ছি। পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে কথা উঠলে ধর্মীয় পোশাক পরিহিতারা কটাক্ষ করে বলেন, এগুলো পরা আমাদের অধিকার- ইচ্ছে -চয়েজ! এগুলা কেউ চাপিয়ে দেয়নি। স্বেচ্ছায় পরার অধিকার তারা রাখে।

বেশ। কে কী পরবে সেটা অন্য কেউ নির্ধারণ করতে পারে না। এই নীতিতে কেউ বোরকা হিজাব পরলে তাকে কেউ কিছু বলতে পারে না। তবে কেউ ধর্মীয় পোশাক না পরলে হ্যারেজ করার অধিকার যেন জন্মগতভাবেই সবাই পেয়ে যায়। এই হ্যারেজ করতে চাওয়া এবং করা শুধু কি পুরুষদের দ্বারাই হয়? না, নারীও এইসব হয়রানিতে সমানভাবে অংশগ্রহণ করে।
প্রকাশ্যে যে নারীটি ওই টিশার্ট পরিহিতাকে অপমান করেছে তার মনন – চিন্তা – মস্তিষ্ক সবই পুরুষতান্ত্রিক । সে আর দশটা পুরুষের মতই ভাবছে “মেয়েদের এই ধরনের পোশাকের জন্যই সমাজ বিপথগামী হয়”।
ছেলেরা বিপথে যায়।

কেমন বিপথ?
নারীকে উত্যক্ত করা, কাম জাগা, ধর্ষণ করতে চাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। শতকরা ৯০% পুরুষ যা ভাবে, পুরুষদের আসলে মেয়েরাই উসকায় দেয়, মেয়েরাই ইচ্ছে করে এমন পোশাক পরে যাতে ছেলেরা উত্তেজিত হয়; ঠিক ঠিক এমন চিন্তাই করে বাংলাদেশের বহু নারী।
ধর্ষণের জন্য পোশাক দায়ী, এটি কি খালি পুরুষের একচেটিয়া ভাবনা? না। এটা নারীদেরও ভাবনা। ধর্ষণের শিকার, অপমানিত, ইভটিজিং এর শিকার নারীকে নারীরাই বলে, নিশ্চই মেয়ের কোনো দোষ। নইলে তাকে ছেলেরা ডিস্টার্ব করবে কেন?
মেয়েদের বানানো হয়েছে ছেলেদের সেবা করার জন্য, ছেলেদের নিচে থাকার জন্য, ছেলেমেয়ে সমান নয়, মেয়েদের উচিত নিজেদের ঢেকে-ঢুকে রাখা। মেয়েরা মিষ্টির মতো, খোলা থাকলে মাছি আসবে, অন্যরা খেয়ে নেবে, নষ্ট হয়ে যাবে। এগুলো মানে তো বটেই, বিশ্বাসও করে অধিকাংশ নারী।

যদি কোনো জরিপ চালানো হয় তবে এই মতবাদে বিশ্বাসীর মধ্যে নারী পুরুষ উভয় বিদ্যমান পাওয়া যাবে।
এতো এতো আন্দোলন, লেখালেখি, অনলাইন, অফলাইন কার্যকলাপ সবই ব্যর্থ হচ্ছে মনে হয়। এই বিশ্রী বিশ্বাসে চিড় ধরাতে পারিনি আমরা।
তাই পুরুষ যখন পাবলিক বাসে পাবলিক প্লেসে মেয়েদের গায়ে হাত দেয়, তখন সবাই বোবা হয়ে যায়। ক্ষমশীল হয়ে যায়। দিলদরিয়া দরদী হয়ে যায়। “আচ্ছা মাফ চাইলে মাফ করে দেন” বলে মহান সাজে। এদের হাতে বিচারকার্য তুলে দিলে এরা সকল ধর্ষককেও ক্ষমা করে দিবে।

ওই বাসে বসা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা বাসযাত্রীদের মধ্যে অনেকেই মনে মনে এটাও ভেবেছে যে “পর্দা করে নাই বলেই এমন করছে”। ঠিক ওই টিশার্ট পরিহিতার বাসযাত্রীরাও এমন মনে করছে। ওদের সকলের হয়ে একজন নারী গলা ফাটালো। আর বাকিরা নীরব উল্লাসে মেতে উঠেছে।

এখন যদি ঘটনা উল্টো হতো, হিজাবের জন্য যদি কাউকে হেনস্থা করা হতো, তখন কিন্তু ঠিকই সবাই মিলে গণধোলাই দিতো। ফেসবুক ছেয়ে যেতো প্রতিবাদমুখর পোস্টে। #হিজাব ইস মাই চয়েজ বলে স্লোগান বের হতো।

এক সেলিব্রেটি নারী দিবসের বিজ্ঞাপনে কেন শুধু শাড়ি কামিজ স্লিভলেস ড্রেসের মেয়েদের দেখানো হলো, হিজাব পরিহিতা কেন দেখানো হলো না নিয়ে খুব হতাশামূলক পোস্ট প্রসব করেছিলেন। কই এখন তো তিনি এই হিজাবধারীর অন্যায় আক্রমণের প্রতিবাদ করছেন না!

করবেন না। হয়তো তিনিও অন্যদের মতো যতোই নিজেদের হিজাবপরা আধুনিক ভাবুক না কেন, গভীরে নিভৃতে নিজেদের “ঢেকেঢুকে রাখার মতো খাদ্যবস্তুই” মনে করে। নিজেদের খাদ্যবস্তু , পুরুষের কামনার বস্তু মনে করে এরা যেভাবে চলে অন্যদের সেভাবে চলাতে বাধ্য করতে চায়।
কেন বাধ্য করতে চায়? তার ধর্ম অমান্য করতে তো তাকে কেউ বাধ্য করছে না তাহলে সে কেন বাধ্য করবে? কারণ জোর করে চাপিয়ে দেওয়া এদের মজ্জাগত। কেউ প্রকাশ করে, কেউ করে না।
অথবা এরা হিংসা করে। কাপড়ের উপর কাপড় পেচানোর ধকল থেকে এরা মুক্তি পায় না। স্বাধীন আরামদায়ক পোশাকের স্বাদ নিতে পারে না। যারা পারে তাদের দেখে এদের সহ্য হবে কেন? সবচেয়ে পীড়াদায়ক হচ্ছে মেয়েদের শুধু পুরুষদের অপকর্মের বিরুদ্ধে না, নারীদের পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার সাথেও লড়তে হয়।

ঘরে লড়তে হয়, বাইরে লড়তে হয়। লড়তে লড়তে ক্লান্তি নেমে আসে। মনে হয়, থাক, আর পারা যাবে না। মুখ দাঁত চেপে সহ্য করে যাই। নিজের স্বজাতি নারীরাই যেখানে শত্রু! কিন্তু এই ক্লান্তি নামা সাময়িক। কী মনে হয় একজনকে হেনস্থা করেছেন বলে বাকি সবাই আপনাদের মত নিজেদের খাদ্যবস্তু ভেবে বসে থাকবে?

থাকবে না।

যার যা ইচ্ছে সে সেটাই পরবে। আপনি যদি বোরকা হিজাব পরাকে চয়েজ মনে করতে পারেন, তবে মনে এটাও করতে হবে যে যারা পরতে চায় না , স্বাভাবিক পোশাক পরতে চায় সেটাও তার চয়েজ। চাপিয়ে দেওয়াকে আপনারা চয়েজ মানতে পারেন, আর অন্যদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন? কী দুমখো কথা আপনাদের!

এখন অনেকেই তর্ক জুড়ে দিবেন, কেন আমি হিজাবপরিহিতাদের খাদ্যবস্তুর সাথে তুলনা করেছি!! একজনের খারাপ ব্যবহার দিয়ে অন্যদের বিচার করা ঠিক না ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ এই একজনের খারাপ ব্যবহারের প্রতিবাদ আপনারা কেউ করেন নাই প্রকাশ্যে। ইনিয়েবিনিয়ে হয়তো করেছেন, কিন্তু মনে মনে ঠিকই বাহবা দিয়েছেন ওই নারীকে।

আপনার পোশাক আপনার। কেন কী কারণে কী পরছেন সেটাও আপনি ঠিক করেন। অন্যদেরও তাই করতে দিন। অনধিকার চর্চা করার মতো অসভ্য অভদ্র ইতর বিশিষ্ট প্রাণি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করবেন না। না হলে ঐ যে মেয়েটা গায়ে হাত দেওয়া পুরুষকে লাথি মেরে বাস থেকে নামিয়ে দিয়েছে, তেমন প্রতিবাদ আপনাদের সাথেও করা হবে।
দেয়ালে পিঠ ঠেকলে সামনেই এগুতে হয়। তাতে কার গায়ে চড় পড়লো, না লাথি পড়লো তা দেখার সময় নেই।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.