‘হৃদয়ের যত সঞ্চয়’

আয়েশা অনু:

পঞ্চবটী মহাশ্মশান! শীতের শেষভাগ।
মন্দিরের শান্ত, নির্জন উঠোন পেরিয়ে শ্মশানে ঢুকলাম। চিতায় জ্বলছে খুব প্রিয় কোনো মানুষ। জ্বলন্ত আগুনের যে আলাদা শব্দ থাকে, সেখানে খেয়াল করলাম। আমি যখন ঢুকেছি ততক্ষণে তার শরীরটা পুড়ে ছোট হয়ে এসেছে। চূড়ার কাঠ পুড়ে ভেঙে শরীরসহ খানিক নিচে নেমে এসেছে। কারও খুব ভালোবাসার অথবা ঘৃণার, কাছের অথবা দূরের ছিল যে মানুষ।

চিতাঘরের পাশের বারান্দায় কিছু মানুষ মুখ ভারি করে বসে অপেক্ষায়। কীসের অপেক্ষায় জানি না। দহন শেষের হয়তো। মন্দিরের অপেক্ষা কক্ষে দুজন যুবক বসা। তাদের চোখ শুকনো, কিন্তু চাহনিতে কান্নার ছায়া। এই চোখ আমি চিনি, এই চাহনি। খুব কষ্টের মুহূর্ত যেমন হয়, ব্যথা যখন গলা পর্যন্ত উঠে আসে, যন্ত্রণা অসহ্য বোধ হয়, তবু সহ্য করতেই হয়। যে চলে যায় তার যন্ত্রণা মৃত্যুতেই শেষ হয়, শেষ হয় না এই মানুষগুলোর, যারা বেঁচে থাকে তাদের। এদের বেঁচে থাকতেই হয়, সহ্য করতেই হয় জীবনের নিয়মে, মেনে নিতেই হয় জীবনের ব্র‍্যাকেটে মোড়ানো রোগ, শোক, বিয়োগ।

শোকার্ত মানুষ দেখতে আমার ভালো লাগে, কান্নায় ভেঙে পড়া মানুষও। এদের সামনে দাঁড়ালে অন্য সবকিছু ক্ষুদ্র মনে হয়, সব যন্ত্রণা সহনীয় মনে হয়। নিজেকে বোঝানো সহজ হয় যে এটাই সত্যিকারের কষ্ট, এই মাতম, এই বিলাপ, এদের বুকে জ্বলতে থাকা এই আগুনই সবচেয়ে বড় সত্য। এই সমস্যাগুলোই সত্যিকারের সমস্যা, বাকি সব কষ্টবিলাস।

শীতার্ত শ্মশান। চিতার সামনে উষ্ণতার কুণ্ডলী। এতো আগুন! এই চিতাও নিভে যাবে, ভষ্ম শরীর কাঠকয়লার সাথে চলে যাবে পদ্মায়, আবার শীতল হবে চিতার বাঁধানো বেদী। ঠাণ্ডা, পরিচ্ছন্ন, শূন্য চিতায় জলের ঘড়া রাখা হবে। ঘড়ায় জড়ানো থাকবে একটা গাঁদা ফুলের মালা। সেই জলে কি তৃষ্ণা মিটবে অতৃপ্ত কারও? জানি না।

মালা কেন? এটা কি শেষ কোনো বার্তা চলে যাওয়া মানুষের কাছে? নাকি বলতে চাওয়া যে, তুমি চলে গেছো, কিন্তু ভালোবাসা বেঁচে থাকবে তোমার জন্য। জানি না। কয়দিন ঠাঁই পাবে সেই মালা জড়ানো ঘড়া সেখানে? পরেরবার চিতা জ্বলে ওঠার আগ পর্যন্ত? চোখ বুঁজে বারান্দার দেয়ালে হেলান দিয়ে থাকা ব্যক্তিটি কী ভাবছেন ওভাবে বসে? তুমি কোনোদিন আমার হওনি, কিন্তু আমি চিরদিন তোমার থাকবো অথবা আবারও দেখা হবে আকাশের ঠিকানায়, এমন পরাবাস্তব আবেগসর্বস্ব নিবেদন কোনো? জানি না। পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তরই হলো ‘জানি না’।

নশ্বর জীবন! কত মায়া, স্বপ্ন, তৃষ্ণা, প্রতিশ্রুতি, রিপু… চিতায় গিয়ে শেষ হলো সব। এতোসব ফেলে যেতে আরও কি কেউ কাঁদছে কোথাও, এক জীবনের সমস্ত স্মৃতি আর সঞ্চয়কে মুছে ফেলে, জীবনের বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে শরীরহীন কেউ?

মৃতদের কান্নার কোনো শব্দ থাকে না, থাকতে নেই …

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.