সাংস্কৃতিক পরিসরে নারীর যাত্রা এবং ‘ভদ্র’ সমাজের ‘শ্লীল/অশ্লীলতা’র বোধ

ঈশিতা বিনতে শিরীন নজরুল:

ঊনিশ শতকে যখন বাংলা থিয়েটারের শুরু, শিক্ষা-সাহিত্য-চিন্তাধারা-রীতিনীতির পরিবর্তন, প্রাচীন-নবীনের দ্বন্দ্ব, স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি নানা কর্মোদ্যোগের মধ্য দিয়ে ঊনিশ শতক তখন নবজাগরণের নতুন ইতিহাস লিখছে।

১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দ। থিয়েটারে তখন শেক্সপিয়ার, দীনবন্ধু মিত্র, মধুসূদন দত্তের লেখা নাটকের যুগ। রমরম করে চলছে গোপাল উড়ের যাত্রা। সেই যুগে ‘ঘরের‘ মেয়েরা এইসব পেশাদারি নাটক-যাত্রায় অংশগ্রহণ করতেন না। পুরুষরাই তখন নাটকের নারী চরিত্রে অভিনয় করতেন। তারপর ধীরে ধীরে নারী চরিত্রের জন্য নারীদেরকেই প্রয়োজন বলে মনে করার ধারণা এলো সামনে।

মেয়ে পাবেন কোথায় অভিনয় করার জন্য? চারদিকে যে শুধু ‘ভদ্রবাড়ির‘ মেয়ে গো!! ‘ভদ্রবাড়ির‘ মেয়েরা আবার মুখে রঙচঙ মেখে সবার সামনে আসবে নাকি? যে কিনা এমন ভাবছেন তারও যে তবে সমাজ ছাড়া হবার ভয় থাকে! সবার সামনে স্টেজে অভিনয় করে ‘পতিতা‘ হতে চায় আর কয়জন?

তখন একটি নিষ্পত্তি হলো এভাবে যে, ‘পতিতা‘দেরকেই নারী চরিত্রের জন্য নেয়া হোক তবে। তাই নাটক বা যাত্রায় শুধু ‘পতিতা‘দেরই ডাক পড়তে শুরু হলো নারী চরিত্রে অভিনয় করার জন্য। নটি বিনোদীনি দাসী ছিলেন সেসময়ের উজ্জ্বল নক্ষত্র। যারা পতিতালয়ে যেতে পারছেন না, তারাও নাকি থিয়েটারে গিয়ে বিনোদিনীকে দেখতেন বলে অনেকেই মনে করতেন। সমাজের বড় একটি অংশ বলতে থাকলেন, মাগো, ছ্যা ছ্যা, কী অশ্লীল, বেশ্যা করছে নাটক!! থিয়েটারকেই পতিতাপল্লীর সমার্থক হিসেবে অনেকেই প্রচার করতে থাকলেন। তবে গিরীশচন্দ্র ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে ধীরে ধীরে থিয়েটার ও অভিনয়ের মাধুর্য্য আর স্বাদ বুঝতে শুরু করেছিল বাঙালি সমাজ! তবে এই স্বাদ নেবার অধিকার ছিল শুধুমাত্র পুরুষের।

এমন একটা সময়েই তৈরি হয়েছিল জোড়াসাঁকো নাট্যশালা। এর আসল পরিচয় অবশ্য ‘শখের থিয়েটার’। তৎকালীন কলকাতায় অনেক ধনী বাড়িতেই এমন থিয়েটার হতো। এগুলির উদ্দেশ্য ছিল মূলত বিনোদন। কিন্তু জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির শখের থিয়েটার একটু অন্য ধারার ছিল। জোড়াসাঁকো নাট্যশালা জ্যোতিরিন্দ্রনাথেরই মস্তিষ্কপ্রসূত। গোপাল উড়ের যাত্রা দেখার পর, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ইটিং ক্লাবে বসে লুচি-কচুরি খেতে খেতে কিশোর জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মাথায় নাট্যশালার ভাবনা আসে। যেমন ভাবা তেমনি কাজ, মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটক দিয়েই নাট্যশালার উদ্বোধন করা হয়। অহল্যাবাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বিপুল প্রশংসা পান। ব্যস, এবার মহোৎসাহে নতুন নতুন নাটক অভিনয়ের পালা। বলাই বাহুল্য যে, তখনকার দিনের রেওয়াজ অনুযায়ী ঠাকুরবাড়িতেও মেয়েদের ভূমিকাতেও ছেলেরাই অভিনয় করেছিলেন।

এরপর বাংলার নাট্যাকাশে উদিত হলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর লেখা ‘কিঞ্চিৎ জলযোগ’ অভিনীত হল বাড়িতে। পরবর্তী নাটক ‘সরোজিনী’। এরপর ১৮৭৭ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অলীকবাবু’ বা ‘এমন কর্ম আর করিব না’ প্রহসন অভিনয়ের মাধ্যমে ঠাকুরবাড়ির থিয়েটার আবার শুরু হয়। এই অভিনয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- বাড়ির মেয়েরাও নাটকে অংশ নিলেন। সমাজের একটি বড় অংশ আলোচনা করতে থাকলো যে, ‘ব্রাহ্ম সমাজের নষ্টামো যতসব! আমাদের মেয়েগুলোকেও নষ্ট করার চিন্তা!! খবরদার ব্রাহ্মদের ছায়া মারাবি না কিন্তু!‘‘ ব্রাক্ষ্ম মেয়েদের চরিত্রকে সমাজে কীভাবে ভাবা হতো সেটা শরৎবাবুর মতো চমৎকার করে আর কেইবা লিখে গিয়েছেন! সেই মেয়েরা এক কথায় ‘অশ্লীল‘, কারণ তারা পড়াশোনা করে, সাহিত্য নিয়ে পুরুষদের সাথে আলাপ করে, গান-বাজনা করে ইত্যাদি ইত্যাদি!!

লেখালেখি তখনও শুধুমাত্র পুরুষেরই পরিসরের বিষয়। ‘মেয়েছেলে‘রা আবার সাহিত্যের কী বুঝবে- কালীন সময়ে কিন্তু নাটক লেখার আসরে নেমেছিলেন ঠাকুরবাড়ির মেয়েরাও। এবার নাটকে এলো নতুন বিষয় – প্রকৃতি। ঘরোয়া আড্ডায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তুললেন আগেকার দিনের বসন্ত উৎসবের প্রসঙ্গ। এরপরেই তাঁর অনুরোধে স্বর্ণকুমারী দেবী লিখে দিলেন ‘বসন্ত উৎসব’ গীতিনাট্যটি। ঋতুকে আবাহন করার উৎসব শুরু হলো এই নাটকটি দিয়ে। অভিনয়ে পরিবারের সদস্যরাই। বাড়িরই সদস্যদের সামনে ঘরোয়া মঞ্চে অভিনীত হলো ‘বসন্ত উৎসব’। গবেষিকা চিত্রা দেব তাঁর ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’ গ্রন্থে বলেছেন, এই দুটি গীতিনাট্যতেই অভিনয় ও গান করেছিলেন নতুন বৌঠান কাদম্বরীদেবী।

বাল্মীকি প্রতিভার প্রথম অভিনয়ে রবীন্দ্রনাথ সাজলেন বাল্মীকি ঋষি, হেমেন্দ্রকন্যা প্রতিভা সাজলেন সরস্বতী। এবার আর দর্শকের আসনে কেবল বাড়ির লোকেরা নন, বরং হাজির হয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, টি. এন. পালিত, রাজা সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর প্রমুখের মতো মান্যগণ্য ব্যক্তিরা। প্রতিভাদেবীর গান আর অভিনয়ে দর্শক মুগ্ধ। কলকাতার সংবাদপত্রগুলি তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তার পরেরবার অভিনয়ে তুমুল বৃষ্টিতে স্টেজ ভেঙে হারমোনিয়াম ভিজে একাকার। কিন্তু বাল্মীকি প্রতিভার চতুর্থ অভিনয়ে দর্শক আরো নামজাদা, খোদ লাটসাহেব পত্নী লেডি ল্যান্সডাউন। এরপর রবীন্দ্রনাথ অ্যান্ড টিম করলেন ‘কালমৃগয়া’। এরপর স্বর্ণকুমারী দেবীর সখী সমিতির অভিনয়ের জন্য লেখা হলো ‘মায়ার খেলা’। এর অভিনয় হয়েছিল বেথুন কলেজে। অভিনয়ে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সঙ্গে ছিলেন সখী সমিতির ‘সম্ভ্রান্তবংশীয়া‘ মেয়েরা।

এভাবেই কিন্তু ধীরে ধীরে মঞ্চে কিংবা থিয়েটারে নারীদের বিচরণ হতে থাকে ধীরে ধীরে।

কিন্তু মেয়েদের অভিনয় কিংবা গান-নাচ জানা মানেই তাদের পতিতা বলেই ধরে নেবার প্রবৃত্তি ১০০ বছর পরেও গেল না বাঙালির মনন থেকে!! বাঙালি অত্যন্ত সাংস্কৃতিক একটি জাতি যাদের কিনা বেশিরভাগ ধারণাই নেয়া অন্য সংস্কৃতির কাছ থেকে। এমনকি তাদের শব্দকোষেও রয়ে গিয়েছে ফরাসি, ইংরেজিসহ আরও অনেক শব্দ! এ কথা এজন্য বলা যে, কেউ কেউ নাচ-গান চর্চাকে সমর্থন করছেন, তারা আবার পাশাপাশি বলছেন যে, তাদের সংস্কৃতির অপমান হয় না এমন নাচ-গান চলুক!! শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কিংবা নৃত্য কিংবা পুরোপুরি শাড়িতে আবৃত থেকে যদি কিছু করা যায় ক্ষতি কী? পশ্চিমাদের মতো ‘খেমটা‘ না হলেই চলবে আরকি। বাংলাদেশের মঞ্চে বোধকরি ফিউশন নাচ, ব্যালে কিংবা সালসা নাচ ততক্ষণই ‘শ্লীল‘ লাগে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে পশ্চিমা পোশাক পরছে। কিন্তু এ ধরনের নাচ যে শাড়ি পরে পারফর্ম করা সম্ভব নয়, অথবা নিতান্তই কষ্টকর সেটা বোঝার মতো মনন কি তৈরি হতে বাংলাদেশিদের অনেক দেরি এখনও?

তার চেয়েও বড় কথা, নাচের সাথে পোশাকের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। প্রতিটি নাচের আলাদা পোশাক থাকে তাদের ট্রাডিশনকে বোঝানোর জন্য। মনিপুরী নাচ যদি শাড়ি পরে পরিবেশন করা হয়, সেটি কতটা যৌক্তিক? আমরা সারাদিন হিন্দি সিনেমা দেখি, সিরিয়াল দেখি বা বলিউডের নাচ দেখতে পারি, শুধু সেই নাচ পাবলিক পরিসরে কোন মেয়ে নাচলে পরেই তাকে ‘পতিতা‘ কিংবা ‘অশ্লীল‘ হিসেবে রিপ্রেজেন্ট করার মানসিকতা কতোটা যৌক্তিক? তারমানে কিন্তু এটি স্পষ্ট যে, এখনও এই ১৫০ বছর পরেও মানুষ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণকে মেনে নিতে পারেনি! সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথে সম্পৃক্ত নারীদের এখনও তারা ‘রক্ষিতা‘ কিংবা ‘পতিতা‘ হিসেবেই গ্রহণ করছে মনে মনে! তাই যখনই পারছে শব্দবাণের মধ্য দিয়ে সেই নারীকে ধর্ষণ করে যাচ্ছে!! এখানে ধর্ষক কেবল পুরুষই নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক মননের শেকল দিয়ে বাঁধা পরা নারীরাও সমান পারদর্শিতার সাথে অংশগ্রহণ করে। তাই তো নিজের মেয়ে নাচ-গান শিখতে চাইলে এখনও বলে, ‘‘নাচ-গান শিখে কী করবি? ‘নর্তকী’ হবি বাইজি বাড়ির?‘‘

দশর্কের চোখ ও তাদের বোঝাপরা আসলে তার নিজের পারিপার্শ্বিক পরিবেশে বেড়ে ওঠারই বহি:প্রকাশ। একদিনে এই চোখের দৃষ্টির পরিবর্তন হবে, এটা ভাবাই নির্বুদ্ধিতা। অপেক্ষার প্রহর শেষ কি আদৌ হবে কখনও?

তথ্যসূত্র-

১) ঘরোয়া- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

২) ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল- চিত্রা দেব

 

লেখক: গবেষক, জার্মানি

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.