আপনার সঙ্গী/সঙ্গিনী কি ইমোশোনালি ইমম্যাচিওর?

ইসাবেল রোজ:

কখনও এমন মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন কি যাদের সাথে আপনি কোন সংগত কারণে রাগ করলেও লাভ হয়নি? উল্টো তারাই রাগ করে আপনাকেই দোষী বানিয়ে দিয়েছে?

আমার এক বন্ধু ছিলো। তার সাথে কখনও কোন বিষয়ে রাগ করা যেতো না। রাগ করলেই সে উল্টো রাগ করে বসে থাকতো। প্রথমদিকে আমি ভাবতাম ঠিক আছে। আমার হয়তো ভুল হচ্ছে কোথাও। তারপর চিন্তা করে দেখলাম, এটা তো হতে পারে না। ক্রমাম্বয়ে শুধু একজনই ভুল করছে এবং সব দোষ একজনেরই হচ্ছে, অপরজন কখনই কোন ভুল করছে না, তাই রাগ করার অধিকার শুধু একজনেরই থাকছে।

এটা আবার কেমন কথা?
আসলে এমন হতে পারে যখন একজন মানুষ ‘ইমোশোনালি ইমম্যাচিওর’ বা আবেগিকভাবে অপরিপক্ক হয়।

বিষয়টি আরেকটু বিশ্লেষণ করে বলি, ধরুন আপনি কোথাও বেড়াতে গেছেন। আপনি কি নিশ্চিন্তে বেড়াতে পারেন? নাকি মনে মনে আতংকে থাকেন কখন কোন ঝামেলা বেঁধে যেতে পারে? আপনার সাথে ঝামেলা না হলেও অন্য কারও সাথে বিশাল তর্ক, ঝামেলা লেগে যাওয়ার আশকায় থাকতে হয়!
অথবা আপনি আপনার সঙ্গীর সাথে একটা পার্কে অথবা কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা। আপনার হয়তো শরীর ভালো লাগছে না, অথবা যেতে ইচ্ছে করছে না। আপনি ‘প্রথমে যেতে রাজী হয়েছিলেন কেন?’ ‘কেন এখন যেতে চাইছেন না?’এই নিয়ে তুমুল ঝগড়া। অনেকটা শিশুরা যেমন পার্কে গিয়ে দোলনায় চড়বে বলে প্ল্যান করে রাখে। মা যদি কোন কারণে না নিয়ে যেতে পারে সেই শিশু কান্না, চিৎকার শুরু করে দেয়, ঠিক সেরকম অবস্থা।

অথবা আপনার পার্টনার মিথ্যে বলেছে, সেটা যদি আপনি চ্যালেঞ্জ করে বসেন। সেখানে এমনভাবে সিনক্রিয়েট শুরু করবে যেন তার মিথ্যে বলাটা কিছু না। আপনার ধরিয়ে দেয়াটাই অপরাধ।
এধরনের আচরণ যেকোনো একবার ঘটলে চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু এধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকলে তাদের আচরণ সম্পর্কে একটু জেনে নেয়া ভালো।

‘ইমোশোনালি ইমম্যাচিওর’ বা ,’আবেগীয় অপরিপক্কতা’ শব্দটি শুনতে কিন্তু তেমন ভয়ংকর বা সতর্ক হওয়ার মতো কিছু মনে হয় না। সাধারণত আমরা কেউ অপরিপক্ক আচরণ করলে বলে থাকি “বাচ্চাদের মতো আচরণ করো না”, কিন্তু বাচ্চারা আর যাই হোক, ভয়ংকর না।
কয়েক ধরনের ‘ইমোশোনালি ইমম্যাচিওর’ বা ‘আবেগীয় অপরিপক্কতাকে’ মেন্টাল ডিজঅর্ডারের মধ্যে ধরা হয় না। যেমন -‘পিটার প্যান সিন্ড্রোম’, প্রিন্সেস সিন্ড্রোম অথবা এম্পারার সিন্ড্রোম। এ ধরনের সিন্ড্রোম আমরা লক্ষ্য করে থাকি যখন কোন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বা নারী শিশুসুলভ আচরণ করে। অথবা শিশুসুলভ কার্যক্রমকে উপভোগ করে, তখন তাদের পিটার প্যান, প্রিন্সেস ইত্যাদি সিন্ড্রোম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

এখন আসি ‘ইমোশোনাল ইমম্যাচিউরিটি’ কাকে বলে? কীভাবে বুঝবেন আপনার সঙ্গী/সঙ্গিনী ইমোশোনালি ইমম্যাচিওর?
গবেষক ড. গিবসন এর মতে, যারা বাস্তব পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে প্রতিনিয়ত ব্যর্থ হয়, তারাই ‘ইমোশোনাল ইমম্যাচিওর’। তাদের আবেগীয় (ইমোশোনাল) বয়স একটা পর্যায়ে এসে থেমে যায়। শারীরিক বয়স বাড়লেও তারা তাদের বয়সানুযায়ী আচরণ করতে ব্যর্থ হয়।
তিনি আরও বলেছেন “ইমোশোনাল বয়স বৃদ্ধি না পেলেও তাদের অন্যের প্রতি সংবেদনশীলতার মাত্রা শূন্য।”

গিবসন তাঁর ’রিকভারি অফ ইমোশোনালি ইমম্যাচিওর প্যারেন্টস ’বইয়ে এধরনের মানুষদের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন –

→দায়িত্বহীনতা
→মিথ্যা বলা
→বারবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা
→যেকোনো পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হওয়া
→সহমর্মিতা না থাকা
→সব জায়গায় একটা নেগেটিভ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা
→নিজেকে ছাড়া আর কাউকে প্রাধান্য না দেয়া
→সবকিছুতে নিজের স্বার্থ আগে দেখা
→সঙ্গীর প্রতি অসংবেদনশীল আচরণ করা
→নিজের পারসেপশন ঠিক এবং বাকি সবাই ভুল প্রমাণ করতে চাওয়া
→অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে না পারা
→সঙ্গীকে চাপের মুখে রাখা
→নার্সিসিস্ট বা আত্মমগ্ন আচরণ। তারা মনে করে পৃথিবীর সবকিছু তাকে ঘিরেই ব্যস্ত থাকবে।

এসমস্ত গুণাবলি (!) যদি আপনার সঙ্গীর মধ্যে খুঁজে পান, তাহলে একজন থেরাপিস্টের শরণাপন্ন হোন।
শুধু সঙ্গী নয়, আমরা ‘ইমোশোনালি ইমম্যাচিওর’ ব্যক্তি কর্মক্ষেত্রে, বন্ধুদের আড্ডা, রাজনীতির ময়দানে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখে থাকি।
‘ডায়োগনাস্টিক এন্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেন্যুয়াল অফ মেন্টাল ডিজ অর্ডার’ (DSMD5) অনুযায়ী ১২ রকমের (পার্সোনাল ডিজ অর্ডার) ব্যক্তিত্বের ব্যাধি রয়েছে।
যেগুলো অন্যের সমস্যার সৃষ্টি করে তাদের ক্লাস্টার বি (Cluster B)পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার বা ব্যক্তিত্বের ব্যাধি বলা হয়। (যেমন বর্ডার লাইন পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার বা) সোশিওপ্যাথ, সাইকোপ্যাথ এই টার্মগুলো DSMD আলাদা করে চিহ্নিত না করে ‘(এন্টি সোশ্যাল বিহেভিয়ার)’ সমাজবিরোধী আচরণের ক্যাটাগরিতে ফেলেছে।

‘ইমোশোনালি ইমম্যাচিওর’ ব্যক্তি তার সঙ্গীর জীবন এতোটাই বিষময় করে তুলতে পারে যে ভিক্টিমের গভীর বিষণ্নতা থেকে আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে।
আসলে ‘ইমোশোনালি ইমম্যাচিওর’ শব্দটা যতটা নিষ্পাপ শোনায়, এর ‘ইফেক্ট’ ততটাই ভয়ংকর। এধরনের মানুষের সংখ্যা আমেরিকায় গোটা পপ্যুলেশনের ২০%। কিছু কিছু গবেষক এর মতে, আমাদের প্রতিনিয়ত অন্তত:পক্ষে একজন সাইকোপ্যাথের সাথে কোথাও না কোথাও দেখা হয়। ‘ইমোশোনালি ইমম্যাচিওরিটি’ বয়সের সাথে ঠিক হয়ে যাবে, এটা ভাবলে ভুল হবে। বরং ক্ষেত্রভেদে এটা আরও বৃদ্ধি পায়।

এধরনের মানুষের সাথে সম্পর্ক ধীরে ধীরে ‘গ্যাস লাইটিং’ এবং ‘এবিউজিভ রিলেশনে’ পরিণত হয়। কারণ আবেগীয়ভাবে অপরিপক্কতার কারণে ব্যক্তি যেহেতু অসংবেদনশীল হয়ে পড়ে, সে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য যেকোনো কিছু করতে পারে। এধরনের মানুষের সান্নিধ্যে এলে অথবা এধরনের কেউ আপনার সঙ্গী বা সঙ্গিনী হলে একটু সতর্কতার সাথে চলা বাঞ্ছনীয়।

প্রথমে তার আচরণগুলো একটু পর্যবেক্ষণ করে দেখতে চেষ্টা করুন।
একটি টাইম ফ্রেম চিন্তা করুন। যেমন গত তিনমাসে কতবার রাগারাগী হয়েছে? এবং কার ঘাড়ে শেষ পর্যন্ত সব দোষ এসে পড়েছে? একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে কিনা, রাগে অন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে কিনা। মানসিকভাবে অপরিপক্কতার কারণে শিশুসুলভ কিছু আচরণ বেরিয়ে পড়ে।

শিশুদের যেমন আমরা দেখি কোন কারণে জেদ করে স্থান, কাল, কিছু বিবেচনা না করে, হুট করে রাস্তায় বসে পড়ে। অথবা বিকট চিৎকার করে সিনক্রিয়েট করে ফেলে।
এধরনের সিনক্রিয়েট হয়েছে কি? হয়ে থাকলে প্রায়ই কি এমন হয়? মোবাইল ভাঙা, জিনিষপত্র ভাঙার মতো ধ্বংসাত্মক আচরণ করছে কি? আপনার আবেগের প্রতি সে কি শ্রদ্ধাশীল? আপনার প্রতি কতটা সংবেদনশীল?

এইসব প্রশ্নের উত্তর যদি বেশিরভাগ নেতিবাচক হয়, তাহলে ধরে নিতে পারেন আপনার পার্টনার/বন্ধু/বান্ধবী আবেগীয়ভাবে অপরিপক্কতাজনিত সমস্যায় থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পরামর্শ নিতে চেষ্টা করুন।
সাথে সাথে বিষয়গুলো যদি আপনার আওতার বাইরে চলে যায়, আপনি নিজেই ‘ইমোশোনালি ড্রেইন্ড’ হয়ে পড়েন, তাহলে কয়েকটি বিষয় মনে রাখবেন:

১) এধরনের মানুষদের কখনও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেবেন না। কারণ এরা নিজেদের দোষ স্বীকার তো করবেই না, উল্টো আপনাকে দোষী সাব্যস্ত করতে এরা যেকোন দূরত্ব অতিক্রম করতে প্রস্তুত থাকবে। তাই কখনও তাদের চ্যালেঞ্জ করতে যাবেন না।
২) দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। আপনার যদি মনে হয় কোন দ্বন্দ্ব শুরু হতে যাচ্ছে, সেখানেই নিজেকে থামিয়ে দেন।
৩) এধরনের মানুষের আত্মমগ্নতা এতোই বেশি থাকে যে এরা সঙ্গীর কথা পাত্তা দিতে চায় না। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় এরা সঙ্গীকে বুলি করে এবং এদের সঙ্গীদের আত্মবিশ্বাস শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
৪) ছেলেমানুষী আচরণে মজা পাওয়া মানে তাদের উৎসাহ দেয়া। তাদের অপরিপক্ক আচরণকে উৎসাহিত করবেন না। হয়তো সে আপনার কোন ক্ষতি করছে না। হাসি-তামাশার নামে বন্ধুদের কারও ক্ষতি বা পার্সোনাল বিষয় নিয়ে মজা করছে। এধরনের আচরণ করতে দেখলে উৎসাহিত করবেন না।
৫) যদি আপনার রিলেশনশিপ আপনাকে মানসিক শান্তির পরিবর্তে মানসিক চাপে রাখে তখনই বুঝবেন আপনি ভুল সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। যদি সম্ভব হয় বেরিয়ে আসুন, আর যদি সম্ভব না হয় নিজেকে স্থির, ঠাণ্ডা রেখে বুঝে চলুন।
৬) খেয়াল রাখবেন আপনার সম্পর্কটি কোন দিকে যাচ্ছে? টক্সিক বা বিষাক্ত হয়ে উঠছে? আপনি বিষন্ন হয়ে পড়ছেন? আপনি আতংকিত থাকছেন? যেকোনো জায়গায় নেগেটিভ কিছু ঘটার আশংকায় কাটছে? নাকি আপনি নিশ্চিন্তে আছেন? নিজেকে দিশেহারা মনে হচ্ছে নাকি আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে? এই বিষয়গুলো তখন বিবেচনা করতে পারবেন, আপনি নিজে যখন মানসিকভাবে সুস্থ থাকবেন।

সর্বোপরি নিজের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হোন। নিজেকে জানতে ও বুঝতে শিখুন। যখন নিজেকে বুঝতে ও জানতে পারবেন, তখনই নিজের চাওয়া-পাওয়া সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা জন্মাবে। নিজের সিদ্ধান্ত না নিতে পারাও এক ধরনের অপরিপক্কতা। তাই সবার আগে নিজেকে জানুন। শারীরিক স্বাস্থ্যের সাথে সাথে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.