একটি সরল স্বীকারোক্তি

সুপ্রীতি ধর:

ময়মনসিংহে অর্কপ্রিয়া ধর সৃজার আত্মহত্যা বা শোচনীয় মৃত্যুকে ঘিরে সারাদিন ধরে টক্সিক প্যারেন্টিং, নিড বেইজড প্যারেন্টিং নিয়ে অনেকেই অনেক কিছু বলছে। আমি তার বাবা বা মাকে চিনি না। তারা কেমন বাবা-মা, ভালো না খারাপ, তেতো নাকি মিষ্টি, কঠোর নাকি নমনীয়, কিছুই জানি না। মেয়েটা তো চলে গেল। যাবার আগে সবাইকে দোষারোপ করে গেলো। ওর পুরো নোটটা পড়তে গিয়ে বার বার হোঁচট খেয়েছি। একেক সময় ওকে একেকভাবে আবিষ্কার করছিলাম পড়তে গিয়ে। কখনও তাকে উদ্ধত মনে হয়েছে, কখনও অভিমানী।

ওর ভাষায়, বাবা-মা ওর প্রতি কোনদিন ‘সুবিচার’ করেনি। হবে হয়তো, কে জানে! ওর বয়স হয়েছিল ১৬, এই বয়সটা মারাত্মক। সুবিচার-অবিচার বোঝারও ঊর্ধ্বে থাকে এই বয়সের ওজন। খুব সাবধানে বিষয়টিকে হ্যান্ডেল করতে হয়। কিন্তু আমরা বাবা-মায়েদের অধিকাংশই জানি না বিষয়টা। জানলেও জীবনের প্রয়োজনে যখন সবাই ছুটছি রুদ্ধশ্বাসে, তখন কিছু করার আগেই অঘটনগুলো ঘটে যায় আমাদের জীবনে। তাছাড়া একটি সন্তান, সে তো শুধু বাবা-মায়েরই সন্তান নয়, সে রাষ্ট্রের সন্তান, সমাজের সন্তান। কাজেই দায়িত্বও কেবল একা বাবা-মায়ের না। সবার। কিন্তু সবাই কি সেই দায়িত্ব পালন করে থাকে? করে না। করার সিস্টেমও নেই। তবে দায়িত্বের নামে অ-দায়িত্ব পালনের লোকের অভাব হয় না চারপাশে। পুরো সিস্টেমে যখন পচন ধরে, তখন একক মানুষ কি তার বাইরে যেতে পারে?

আজকাল প্যারেন্টিং নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। আমাদের ছোটবেলায় জানতামও না এসব। তবে মনে আছে, মা যখন শাসন করতো, মারতো, তখন মনে হতো, কেন আমি এই মায়ের পেটে জন্ম নিলাম! অথচ বড় হতে হতে সেইসব ছোটবেলার ক্ষতগুলো কখন সব শুষে নিয়েছে মায়ের প্রতি ভালবাসা। আজ যখন মা নেই তখন কেবলই তাকে হাতড়ে ফিরি, বিষণ্নতায় কাছে পেতে চাই, অসুস্থতায় মায়ের হাতটা কপালের ওপর কল্পনা করি। প্রতিটা ক্ষণ মাকে খুঁজে ফিরি জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়েও। আমরাই হয়তো শেষ প্রজন্ম, যারা এভাবে মাকে অথবা বাবাকে অথবা ভাইবোনকে অনুভব করবে!

আমি জানি ভুল প্যারেন্টিং মানুষকে কত ভুল পথে নিয়ে যায়, পুরোটা জীবন তাদের সেই ট্রমা বহন করতে হয়। এই যেমন আমার ক্ষেত্রে কোন ধরনের প্যারেন্টিং ছিল না বললেই চলে। একাত্তর-পরবর্তি শিশু আমি, বাবাকে সদ্য হারানো, পুরো পরিবার বিধ্বস্ত, কে কাকে দেখে রাখে সেখানে? আমার অবস্থাটা এমন ছিল যে কোলেও রাখা যাচ্ছিল না, ফেলেও দেয়া যাচ্ছিল না। শুধু শাসন আর শাসন, এটা করো না, ওটা করো না। আত্মবিশ্বাস একেবারে শূন্যের কোটায়। পুরোপুরি একটা পিতৃতান্ত্রিক পরিবেশে মেয়ে হিসেবে আমার কোন কথাই কেউ কোনদিন গ্রাহ্য করেনি। চোখের সামনে ভাইয়ের প্রশংসায় ভেসে গেছে সবাই। আবার এও শুনেছি, বড় ভাইকে কঠোরভাবে শাসন করতো আমার বাবা। এই শাসন দেখে ছোটভাই ভয়ে ভয়ে সুবোধ বালক হয়ে থাকতো। ফলাফল, সেই সুবোধ বালক ভালো করেছে জীবনে, আর অতিরিক্ত শাসনের কারণেই কিনা জানি না, বড় ভাইয়ের জীবনটা কোনদিন সহজ ছিল না, এলোমেলোই কেটে গেল!

আমার ক্ষেত্রে এরপর শুরু হয়েছিল অন্যরকম পক্ষপাতিত্ব, বৈষম্য, যৌন হয়রানি। এসবকিছুকেই ঠেলে বেরিয়ে আসতে গিয়েও বার বার ভুলপথে পা বাড়িয়েছি, একটা সিদ্ধান্তও নিতে পারিনি ঠিকমতোন। কারণ আমার ‘হোমওয়ার্ক’টাই ঠিকমতোন করা হয়নি জীবনে। ছাত্রী ভালো হলেও জীবনের পাঠশালায় পড়াশোনাটা আমার হয়েই উঠেনি বলা চলে।
পরবর্তিতে যখন দুই সন্তানের ভার একা আমার কাঁধে এসে পড়লো, ‘আজ আছে তো কাল নেই, সকালে আছে তো বিকেলে নেই’ এমন গৃহকর্মিদের ওপর পুরাই নির্ভরশীল আমি বাসা ভাড়া, সংসারের খরচ, বাচ্চাদের পড়াশোনা, সব সামাল দিতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেছি। এভাবেই চলেছে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। এখন এতোগুলো বছর পর আমি জেনেছি, বা জানতে পারছি যে সবই আমার ভুল ছিল, আমি ভুল মা, খারাপ মা, টক্সিক প্যারেন্টিং করেছি আমি।

আমি স্বীকারও করি যে আসলেই করেছি, না জেনেই করেছি, কোনটা ভুল, কোনটা সঠিক, তা জানার মতোন সময়ই আমি পাইনি। উদয়াস্ত পরিশ্রম যাকে বলে, আমি তাই করেছি, করতে হয়েছে। যে সময়টাতে মেয়েরা একটু গুছিয়ে সংসার করে, আয়নায় সুন্দর দেখতে পায় নিজেকে, তখন আমি নিজেকে আবিষ্কার করেছি এক বিপর্যস্ত, ছিন্নভিন্ন, ক্লান্ত পথিক হিসেবে।

তারপরও চেষ্টা করে গেছি। শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি কার মানসিক সমস্যা হচ্ছে, দৌড়ে গেছি চিকিৎসকের কাছে। কিন্তু সন্তানদ্বয়ের একজনের ছিল গেমিং এডিকশন ছাড়াও আরও অন্যান্য এডিকশন। তা কাটিয়ে পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনতে দিনের পর দিন কীই না করেছি! পিছনে পিছনে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হাঁপিয়ে গেছি। নিজে না পেরে বন্ধুদের শরণাপন্ন হয়েছি, কেউ কিছু করতে পারেনি। আজ যখন ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে রিগ্রেটিং মাদারহুড নিয়ে কথা বলি, তখন সবাই দলেবলে হামলে পড়ে আমার ওপর। বলে যে, সন্তান পৃথিবীতে এনেছো তোমার সিদ্ধান্তে, কাজেই তার দায়িত্বও তোমার, ঠিক, অস্বীকার করছি না। কিন্তু এখানে তো আরও একজনের দায়িত্বও ছিল, সে কি পালন করেছিল? করেনি। আবারও বলছি সন্তান লালনপালনের দায়িত্ব পুরো পরিবারের, সমাজের, রাষ্ট্রের। কেউ কি সেই দায়িত্বটুকু পালন করেছে? আমার সহভাগী হয়েছে? করেনি তো! তাহলে পুরো দোষ কেন আজ আমার একার ওপরে? কেন আজ আমি ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছি? কেনইবা আজ আমার সন্তান ক্লিনিক্যালি ডিপ্রেসড?

আরেকটা প্রশ্ন আমার, আজ পর্যন্ত ঠিক কতসংখ্যক বাবা-মা সন্তানের যন্ত্রণায় অতীষ্ট হয়ে আত্মহত্যা করেছে? মরণের আগে চিরকুট লিখে গেছে সন্তানের বিরুদ্ধে কজন? আমার ঠিক মনে পড়ছে না কারও কথা এই মুহূর্তে। কেন তারা সন্তানের টক্সিক আচরণ নিয়ে কথা বলেন না? সন্তানের ভালোমন্দ সব দায়ভার নিজের কাঁধে কেন তুলে নিয়ে বাদবাকি জীবন ঘানি টেনে চলেন? কেন জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত চান সন্তান যেন ভালো থাকে যখন সন্তান তাদের একদমই অস্বীকার করে বিন্দাস থাকে?

আমার মাকে খুব মনে পড়ছে আজ কেন জানি। কতভাবে কৃতজ্ঞ যে আমি আমার মায়ের কাছে, মায়ের লড়াইয়ের কাছে। মা না থাকলে আমি এক পা-ও বাড়াতে পারতাম না কোনদিন। সেই মাকে কোনদিন অস্বীকার করবো, সেকথা ভাবতেও ভয় হয়। এমন দিন যেন কোনদিন না আসে জীবনে! অথচ কী নির্বিকারভাবে মা-বাবাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয় একেকজন! আমি তাকিয়ে থাকি ওদের দিকে, কেবলই করুণা হয়। একটামাত্র জীবন, অথচ সেই জীবনে নেই তাদের কোনরকম ভালবাসার ছোঁয়া, যেটুকুও আছে তা মিথ্যে অহমিকা ছাড়া কিছুই না।

সবার যেন শুভবুদ্ধির উদয় হয়, এটুকুই চাওয়া।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.