একজন নারীকবির হত্যাকাণ্ড

আবদুল্লাহ আল মাসুদ:

আসমা বিনতে মারওয়ান সপ্তম শতাব্দীর একজন প্রতিভাবান কবি ছিলেন। সে‌ সময়কার নারী কবিদের মধ্যে তিনি ছিলেন বিখ্যাত এবং জনপ্রিয়। তার জন্ম হয়েছিল বর্তমান সৌদি আরবের মদিনা শহরে। ইসলামের নবী মোহাম্মদ মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন ৬২২ খ্রিস্টাব্দে। এর দুই বছর পরেই ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে মক্কার পৌত্তলিকদের সাথে মোহাম্মদের নতুন ধর্ম ইসলামের অনুসারীদের ভয়ঙ্কর সংঘর্ষ বাঁধে।

যদিও এই যুদ্ধে মুসলিমরা বিজয়ী হয়, কিন্তু মদিনায় এসেই রাজত্ব করা এবং মদিনার অধিবাসীদের নিয়ে মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ব্যাপারটা মদিনার অনেক কবি-সাহিত্যিকেরাই মেনে নিতে পারেননি। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন কবি কা’ব বিন আশারাফ, কবি আবু রাফে ও কবি আবু আফাক। ইসলামিক সূত্রের ভাষ্যমতে, আসমা বিনতে মারওয়ান প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু পরে তিনি মোনাফেক (উপরে মুসলমান, গোপনে কাফের) হয়ে যান। মক্কা থেকে মদিনায় আশ্রিত হয়েই মদিনাবাসীদের মোহাম্মদের নবীগিরি বা দাদাগিরি যারা মেনে নিতে পারেননি তাদের অনেকেই ভয়ে মুখ খুলতেন না। মোহাম্মদের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই সেটি কটুক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো, আর মোহাম্মদের নিয়ে কটুক্তি করলে তার একমাত্র শাস্তি হচ্ছে শিরোশ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা। কখনও কখনও গুপ্তঘাতক পাঠিয়েও তার সমালোচকদের হত্যা করেছেন ইসলামের নবী মোহাম্মদ।

৬২৪ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত যুদ্ধটি ইতিহাসে বদর যুদ্ধ নামে খ্যাত। এই যুদ্ধটি ছিল মুসলমান এবং অমুসলমানদের (কাফের) মধ্যে ভাগ্য নির্ণায়ক। এই যুদ্ধে জয়লাভ করাটা ইসলামের নবী মোহাম্মদ এবং তার অনুসারী সাহাবীদের মধ্যে বিপুল আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছিল। এই আত্মবিশ্বাসের উপর ভর করেই এরপর অনেকগুলো যুদ্ধ করেছেন মোহাম্মদ। বদর যুদ্ধের সেই বিজয় এবং এখান থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণা আজও ইসলামে বিশ্বাসী মুসলিমদের মধ্যে উদ্দীপক ও উত্তেজক হিসেবে কাজ করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আল বদর নামে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষের যোদ্ধা হিসেবে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল, যারা যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত। এই আলবদর নামটিও ইসলামের সেই বদরের যুদ্ধের অনুপ্রেরণা এবং বদর যুদ্ধের নাম অনুযায়ী করা হয়েছিল। ইসলামের সেই বদর যুদ্ধের পর মদিনার একজন অশীতিপর বৃদ্ধ কবি আবু আফাক মোহাম্মদের যুদ্ধবাজ নীতির সমালোচনা করে কবিতা লিখেছিলেন। আবু আফাক ছিলেন ইহুদি, সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই তিনি মোহাম্মদের চোখে ঘৃণিত। তার উপর যদি তিনি আবার কবি হন আর কবিতা লেখেন মোহাম্মদের বিরুদ্ধে, তবে তো কথাই নেই। মোহাম্মদকে ব্যঙ্গ করে কবিতা লেখার অপরাধে ১২০ বছর বয়সী কবি আবু আফাককে রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করে মোহাম্মদের সাহাবি সালেম ইবনে উমায়ের। কোরআনের সূরা আশ শুয়ারায় বলা হয়েছেঃ “কবিদের অনুসরণ করে বিভ্রান্ত লোকেরা। তোমরা কি দেখ না তারা প্রতিটা উপত্যকায় উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়ায়? আর তারা এমন কথা বলে যা তারা করে না (সূরা আশ শুয়ারা, ২৬:২২৪-২২৫-২২৬)।

আবু আফাকের হত্যাকাণ্ডের পরে মদিনার নারী কবি আসমা বিনতে মারওয়ান বিক্ষুব্ধ হন। তিনি মোহাম্মদকে “বহিরাগত” বলেন এবং মদিনার “নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের খুনি” হিসেবে মোহাম্মদকে আখ্যায়িত করেন। এমনকি তিনি “কোন সাহসী লোক কি নেই তাঁকে মারবে?” এমন কথাও লিখেছেন কবিতায়। আসমার কবিতার জবাবে মোহাম্মদের সভাকবি ও সাহাবি হাসসান বিন সাবেতও কবিতা লেখেন। সেখানে তিনি আসমা ও তাঁর গোত্র নিয়ে বিদ্রুপ করেন। কলমের জবাব কলম দিয়ে হবে বা কটুক্তির জবাব কটুক্তি দিয়ে হবে নিজের ক্ষেত্রে এটি মোহাম্মদের নীতি ছিল না। আসমা নবীকে ব্যঙ্গ করে কবিতা লিখেছে এটা জানার পর ইসলামের নবী মোহাম্মদ তাঁর সাহাবীদের সামনে বললেন, “কে আমাকে মারওয়ানের মেয়ের হাত থেকে রেহাই দেবে?” মোহাম্মদের সাহাবী উমাইর বিন আদী আসমাকে হত্যার দায়িত্ব নিলেন। উল্লেখ্য, সাহাবী উমাইর ছিলেন একজন অন্ধ। আসমা ছিলেন তার দাসী, যার গর্ভে তাঁর পাঁচটি সন্তান হয়েছিল। দুটি সন্তান ছিল দুগ্ধপোষ্য। উমাইর যখন আসমাকে হত্যা করার জন্য গেলেন তখন আসমা তার দুই সন্তানকে দুধপান করাচ্ছিলেন। দুধপান করানো অবস্থায়ই আসমা ঘুমিয়ে পড়লেন। উমাইর শিশু দুটোকে খুব সাবধানতার সাথে মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে ফেললেন। এরপর আসমার পেটের মধ্যে সজোরে ঢুকিয়ে দিলেন ধারালো তরবারি। কবি আসমা বিনতে মারওয়ান তাৎক্ষণিক মারা গেলেন। পরদিন সকালে আসমার আত্মীয়-স্বজন মদিনার শাসক মোহাম্মদের কাছে হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে গেলেন। মোহাম্মদ কোন বিচার তো করলেনই না, বরং তিনি এই হত্যাকাণ্ড যে সঠিক, এটি যে শাস্তির যোগ্য না সেটি বরং লোকেদের জানিয়ে দিলেন। একজন অন্ধ হয়ে যেভাবে রাতের অন্ধকারে নির্বিঘ্নে নবীর সমালোচককে উমায়ের হত্যা করেছে তা দেখে মোহাম্মদের বিশিষ্ট সাহাবি ওমর ইবনুল খাত্তাব বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, একজন অন্ধ হয়েও তুমি এমন (দুঃসাহসী) কাজ করতে পারলে? মোহাম্মদ তখন ওমরকে বলেছিলেন, “তাকে অন্ধ বলো না, সে-ই তো বরং চক্ষুষ্মান”। যে অন্ধ লোক নিজের পীরের বিরুদ্ধে কবিতা লেখার অপরাধে রাতের অন্ধকারে দুগ্ধপোষ্য শিশুদের ঘুমন্ত মাকে হত্যা করতে পারে সে চক্ষুষ্মান বটে!

বাংলাদেশের জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক এবং অ্যাক্টিভিস্ট অভিজিৎ রায়কে হত্যাকাণ্ডের বিচারে যখন কয়েকজন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন বাংলাদেশের আদালত তখন বাংলাদেশের হুজুররা ক্রোধে ফেটে পড়েছিলেন। এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী নামের এক হুজুর তো হাজারও মুসলিম জনতার সামনে হুংকার দিয়েছিলেন, অভিজিৎ রায়ের খুনিদের ফাঁসি দিলে সারাদেশব্যাপী আগুন জ্বলবে! আসলে এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী ইসলামের নবী মোহাম্মদের আদর্শের উপরেই আছেন। নবীর কটুক্তিকারীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড যা ইসলামের নবী মোহাম্মদ নিজেই চালু করেছিলেন। তিনি তাঁকে নিয়ে কটুক্তি করে কবিতা লেখার অপরাধে মদিনার বিশিষ্ট কবি কাব বিন আশরাফ, আবু রাফে, আবু আফাক, আসমা বিনতে মারওয়ান সহ আরো অনেককেই হত্যা করেছিলেন। তাঁকে ব্যঙ্গ করে কেউ কবিতা লিখলে তিনি সহ্য করতে পারতেন না, যেকোনো মূল্যে কবিকে খুন করে ফেলতেন। প্রাণ বাঁচাতে কয়েকজন কবি তখন দেশ ছেড়েও পালিয়েছিলেন।

এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আসুন আমরা মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট, সিমোন দ্য বোভোয়ার ও বেগম রোকেয়ার পাশাপাশি স্মরণ করি কবি আসমা বিনতে মারওয়ানকেও। মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট, সিমোন দ্য বোভোয়ার, বেগম রোকেয়া এরা কেউই কবিতা লেখার জন্য বা নারীর পক্ষে কথা বলার কারণে খুন হননি। তবে তাঁরা সমালোচনার শিকার হয়েছেন, কেউ কেউ নিগৃহীত হয়েছেন এ কথা সত্য। কিন্তু আসমা বিনতে মারওয়ান মধ্যযুগের সেই কবি যিনি ইসলামের নবী মোহাম্মদের পাঠানো ঘাতকের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছিলেন। তারচেয়েও বড় কথা, তিনি পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন এবং তার দুটি দুগ্ধপোষ্য শিশুও ছিল।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.