প্রতিযোগী বা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, আসুন বন্ধু ভাবি

আনন্দময়ী মজুমদার:

আমার স্মৃতিতে একটি মেয়েও প্রায় নেই যাকে আমার দুর্বল মনে হয়েছে। তবে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় থাকতে থাকতে আমরা তো এমন সংস্কৃতিকেই মেনে নিয়েছি যেখানে নারীর অবমাননা স্বীকৃত। যেখানে মেয়েদের যেটুকু প্রাপ্য সেটুকু পেতে কোটার কথা তুলতে হয়, বিশেষ আইন লাগে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস নিয়ে একজন শিল্পীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। মানুষের যত রকম ভালোবাসা আছে সবগুলোকে একত্র করলে তাঁর গান ও গলা পাওয়া যায়। তিনি নারী দিবস নিয়ে একটি গান রচনা করেছেন। নারীদের পক্ষে কে দাঁড়াচ্ছে, কে পাশে থাকছে তাদের জন্য, বিপদের দিনে, দুর্দিনে সেখানেই নারী ও পুরুষ উভয়ের পরিচয়।

আমার জীবনে আমি কিছু নারী এবং কিছু পুরুষ পেয়েছি যারা আমার পাশে অসম্ভব সংকটে স্বাভাবিকভাবেই পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমাকে বেশি কথা বলতে হয়নি। তারা আমাদের দুঃখ-দুর্দশা যেন নিজেদের মতো করে বুঝতে পেরেছেন। একদম শক্ত পায়ে দাঁড়ানো যাকে বলে। তারা জানিয়ে দিয়েছেন আমার এই সংকটে আমি একা নই। আমার পথ, পথ্য, নিরাময়, শান্তি, সাহস, আস্থা এসব তারা আগ বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই প্রতিদিন।

আমাদের জানা দরকার, আমাদের পাশে দুর্দিনে সত্যি কে থাকেন। এমন নয় যে তারা সকলে ভালো বক্তা বা তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ। বরং আমি তো দেখি যাদের দেখে বোঝা যায় না তারা বিশ্বস্ত, তারাই নিঃশব্দে হাত বাড়িয়ে দেন, ধরে থাকেন, আগলে রাখেন। এইসব সংকটের সময় লড়াইটা ব্যক্তিগত লড়াই হয়ে গেলে মুশকিল, কারণ যে কোনকিছু ব্যক্তিগত থেকে যখন সাধারণ হয়ে যায় তখন তার ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়।

মহামারির সময় আমরা দেখলাম ছোট ছোট অনেক অনলাইন জোট হচ্ছে যেখানে একটু কাছ থেকে সকলে সকলকে চেনে, যেখানে নিজের ব্যক্তিগত কথা বলতে তারা খুব বেশি দ্বিধা করে না। অন্যের সঙ্গে তথ্য আর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে নেবার মধ্যে একটা সান্ত্বনা আছে, আর সেটা খুব শক্তিশালী, কারণ তা স্ট্রেস রিলিফ দেয়। এমনকি একটু নিরীহভাবেই গজগজ করার পর অনেক সময় একটা ব্যাপারে ক্ষুব্ধ হবার পর সেই নেতিবাচক আবেগকে আমরা ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে যেতে পারি। আর শেয়ার করার ফলেই আমরা দেখতে পারি, আমরা আসলে সকলেই খুব এক। আমাদের চিন্তা, আমাদের চাপ, আমাদের দুঃখ-দুর্দশা সবকিছুর মধ্যে একটা মিল আছে। এই মিল আমাদের দুঃখ ও চাপকে প্রথমত কিছুটা লাঘব করেই।

মহামারির সময় কেউ কেউ কলম দিয়ে লিখে চাপকে লাঘব করছিলেন নিশ্চয়ই। নিজেকে সৃষ্টিশীলভাবে প্রকাশ করা, কিছু উপকারি কাজ করার মধ্যে অনেক স্ট্রেস রিলিফ আছে। আমার দেখা একজন ষাটোর্দ্ধ ভদ্রমহিলা এই সময় হাতে হাতে বাসন বানাতে শিখেছিলেন। তিনি অনেক অনেক হাড়িকুড়ি বাসনপত্র বানাতেন আর বিনামূল্যে দান করে দিতেন। এতে তিনি যে সকলের দারুণ পছন্দের আর সমীহের পাত্র হয়েছিলেন সেটা মনে হয়। এই সময় ডাক্তার নার্সরা যা করেছেন, তাতো বলাই বাহুল্য। অনেকে বাগানে সময় দিচ্ছিলেন বেশি করে। ব্যক্তিগতভাবে আমি আমার সবচেয়ে কাছের মানুষদের জন্য আমার সময়কে বরাদ্দ রেখেছিলাম।

আমরা এমন এক সময় পার করছি যখন আমরা অনেক কিছু নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত, বাইরের চাপ হজম করতে না পেরে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছি। অথচ ইন্টারনেট একটি প্রজ্ঞার আধার হতে পারে, যদি সঠিকভাবে তার ব্যবহার হয়।

সেই কারণে অবশ্য কী কাজে আসছে, আর কী বেবাক সময় নষ্ট, জীবনী শক্তির অপচয় তা বোঝা খুব জরুরি। মহামারীর মধ্যে আমাদের নিজেদের অপচয় রোধ শিখতে হয়েছে। নিজের মধ্যে আরেকটু গুটিয়ে আসতে হয়েছে, আমার মনে হয়েছে তাতে ক্ষতি নেই, লাভ ছাড়া। কারণ অন্তর্মুখী নির্জনতার মধ্যেই প্রজ্ঞা আর সুবুদ্ধি স্ফুরিত হয়। সুবুদ্ধি, সুবিবেচনা দিয়েই আমরা আসল মানুষগুলিকে খুঁজে পাই। শুধু আসল মানুষ নয়। টাকাপয়সা, মনোযোগ, সময়, অর্থাৎ সবধরনের রিসোর্স কোথায় খাটাবো, কেন খাটাবো, কোন কাজে কী সময় ব্যয় করবো, কোন জায়গা থেকে গুটিয়ে নেবো, আর কোন কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেবো, সেই সুবুদ্ধিগুলি একটা কঠিন সময়েই আমরা পাই। এবং প্রায়শ নির্জন ঘুম বা বিশ্রামের সময় পাই। মহামারী আমাদের বিশ্রামের মধ্যে শান্ত হয়ে চুপ করে থাকার মধ্যে যে শক্তি আছে, সেটাও যথেষ্ট শিখিয়েছে। ভার্জিনিয়া উলফ-এর একটি বই আছে, A Room of One’s Own। এক কথায়, নীড়। আমাদের নীড় দরকার। কিন্তু সেই নীড়ে আমরা কাকে স্থান দেবো, তও যেন মহামারীর সময় আমরা বেশি বেশি শিখেছি।

নীড় বলতে নেহাত ঘর বা বাড়ি বোঝায় কী? নীড় হতে পারে আমাদের অন্তরের অন্ত:স্থলের কাছের একটি জায়গা, যেখানে আমরা বিশ্রাম নিতে আসি। পুনরায় শক্তি সংগ্রহ করার জন্য আসি। কারও কারও জন্য তাদের পড়ার টেবিলের সামনে পিতামহ-পিতামহী-মাতামহ-মাতামহী-পিতামাতা, সন্তান ও নিজের ছবি রাখা থাকে, একটা মোমবাতি থাকে, একটু টুনি বাল্ব জ্বালা কর্নার থাকে, একটা বইয়ের শেলফে কিছু প্রিয় বই থাকে। এটাও তার একান্ত নীড় হতে পারে। এই রকম পবিত্রতা রচনা করা আর সব সাংসারিক বাইরের ব্যাপার থেকে আলাদা করে নেবার মধ্যে প্রকৃতি আমাদের জন্য শক্তিসঞ্চয় করে রাখতে শেখায়।

অনেক প্রাণী শীতঘুমে যায়। সেটা তাদের জীবেনর একটা স্বাভাবিক পর্যায়। মানুষকে মাঝে মাঝে সেই রকম বিশ্রামে যেতে হয়। এমন কি সপ্তাহে একদিন নিজের জন্য সময় আলাদা করে ছুটি নিতেও হয়তো শিখতে হতে পারে। কারণ বিশেষ করে নারীদের সংসারে ছুটি থাকে না বলে যারা নানাদিকে কাজ করে তারা সকলের জন্য সংগ্রাম করলেও নিজের কথাটা ভেবে দেখে না। আমি অলসতার কথা বলছি না এখানে। সকল নারী এক রকম নয়। নারী হবার জন্য কারও সুযোগ সবসময় কম, এমন হয়তো নয়। বিশেষ করে যারা সুবিধাবঞ্চিত, কিন্তু দিনের পর দিন মেহনত করে যাচ্ছে, সেই নারীদের কথাটা আমাদের মনে রাখা দরকার। যারা তাদের যুগ, সময় আর সংসারের কাছে সান্ত্বনা বা স্নেহের নীড় পায়নি, তাদের সঙ্গে থাকা দরকার। তাদের মর্যাদা আর স্বীকৃতি আর স্নেহ দেবার মধ্যেই আমাদের জীবনের পরিতৃপ্তি আর সার্থকতা রচনা হতে পারে।

চাপ লাঘবের আরেকটা কথা হলো, নারীরা যদি নারীদের প্রতিযোগী মনে করে, ঈর্ষা করে, তাহলে শক্তি মার খায়। একজনের খুশিতে অন্যজন চিয়ারলিডিং করা, লাফিয়ে ওঠা, দশজনকে ডেকে বলা, এটা করে দেখলে দেখা যাবে আমরা অনেক অনেক শক্তি ফিরে পাচ্ছি।

আর আমরা তো জানি, সব সময় মহীয়সী নারীরা খবরের কাগজের পাতায় থাকেন না, টিভি বা ফেসবুকের সেলিব্রিটি হন না, মহীয়সী নারীরা আমাদের আশেপাশে থাকেন, অনেক সময় থ্যাংকলেস হয়েই কাটিয়ে দেন, তারা আমাদের বন্ধু বা বোন, মা, বা বাসার বুয়া, বা অফিসের একজন কলিগের মতো কেউ।

ইন্ডি আরি বলে একজন নিও-সৌল শিল্পী আছেন, অনেকগুলি গ্র্যামি পুরস্কার পেয়েছেন তার গানের জন্য, তার একটি গান অনুবাদ করে গেয়েছিলাম: ‘আমি রোশনাই’ (I am Light)। সেই গানে তিনি বলছেন, তিনি বিমূর্ত এক আলোকিত সত্তা, তিনি রোশনাই। তিনি তাঁর অতীতের কর্মকাণ্ড না, তিনি তার মাথার ভিতর কণ্ঠস্বর না, তিনি তার ভিতর যত ভাঙাচোরা অভিজ্ঞতা, দুঃখ দুর্দশা, সেইসব না, তিনি তার চেহারা না, বয়েস না, জাত না, এমনকি তিনি তাঁর ফেলে আসা স্বপ্নও না, তিনি রোশনাই। এই গানটি এতো বিখ্যাত হয়েছিল তার কারণ আমরা নিশ্চয়ই জানি, আমাদের সকলের মধ্যে একটি সত্তা আছে, যে সত্তা বলতে চাইছে ‘মহাজগতের টুকরো আমি/আমি রোশনাই’।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.