নারীর জ্ঞান: প্রাকৃতিক গর্ভনাশকের ইতিহাস (১ম পর্ব)

নুসরাত জাহান:

চিরল সবুজ পাতার রাধাচূড়া গাছগুলো লাল হলুদে মাখামাখি হয়ে যখন ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়, সেই উজ্জ্বলতা থেকে চোখ ফেরানো সহজ নয়। তবে দৃষ্টি হরণকারী সৌন্দর্যই কেবল নয়, আরও গুণ রয়েছে এ গাছের। রাধাচূড়া গর্ভনাশকও।

ডাচ বণিকদের হাতে নির্যাতিত ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা, বিশেষত গিনিয়া এবং এঙ্গোলার কালো দাসগণ এই রাধাচূড়ার বীজ ব্যবহার করতেন গর্ভপাতনের কাজে। যেন অনাগত সন্তানকেও তাদের মতো দাসত্বের ভাগ্য বরণ করতে না হয়।

আঠারো শতকের শুরুতে ফলিত উদ্ভিদবিদ্যার বেশ রমরমা বাজার গড়ে উঠেছিলো। এ খাতের অগ্রগতির সাথে সাথে ঔষধির এক নতুন দুয়ার খুলে যায় পৃথিবীর সামনে। তবে রাধাচূড়ার ব্যবহারে দক্ষ দাস নারীদের নিজস্ব জ্ঞানভাণ্ডার সেই বিশাল সাম্রাজ্যের আলো থেকে সবসময়ই আড়ালে ছিলো।

হাইতিতেও কালো দাস নারীগণ একইভাবে ব্যবহার করতেন রাধাচূড়া। নিজস্ব পন্থায় তাদের এই প্রয়োগ কোনোরকম স্বাস্থ্যহানী ঘটাতো না। অবশ্য সাদা প্রভুরা নারীদের এই চর্চাকে লিপিবদ্ধ করেছে ‘বর্বর নিগ্রোদের সন্তানহত্যা বা ভ্রূণহত্যার জঘন্য পাপকাজ’ হিসেবে।
সুরিনামে দাসপ্রথা বরণে বাধ্য নারীদের মধ্যে ভেষজ গর্ভনাশকের ব্যবহার ছিলো একরকম প্রতিবাদের ভাষা। নিজের শরীর এবং প্রজনন প্রক্রিয়ার ওপর নিজের অধিকার দাবি করা। যার কোনোটাই সেই আঠারো শতকে নৈতিকভাবে তাদের ছিলো না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইউরোপের চিকিৎসাবিদ সমাজে রাধাচূড়া ফুলের গার্ভনাশক গুণটি সম্পূর্ণ অনুচ্চারিত ছিলো। যদিও ফুলটির রূপে মুগ্ধ হয়ে ইউরোপীয় বণিকেরা ঝাঁকে ঝাঁকে এই বিষাক্ত বীজ বয়ে এনেছিলো তাদের নিজ মাটিতে। সেদেশে রাধাচূড়া কেবল তার রূপ দিয়ে রাজকীয় বাগান সজ্জার কাজ করতো।

বৈজ্ঞানিক বিপ্লব এবং উপনিবেশবাদের জোরে যখন অসংখ্য ঔষধি বৃক্ষের আবিষ্কার হচ্ছিলো, ইউরোপ সর্বশক্তি দিয়ে প্রাকৃতিক গর্ভনাশক সংক্রান্ত জ্ঞান ও স্মৃতি বিলোপের কাজে নিয়োজিত হয়। একরকম সাংস্কৃতিক ভাবেই এই চর্চাকে লুপ্ত করে তারা। যে গতিতে বিশ্বব্যাপী অভিযান এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জ্ঞানের বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছিলো ইউরোপ তার তলে একইভাবে অন্ধকারে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছিলো ভেষজ গর্ভনাশক সংক্রান্ত জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য। আঠারো এবং উনিশ শতকেই ইউরোপীয় নারীদের মধ্যেও প্রাকৃতিক গর্ভনাশকের জ্ঞান লোপ পেতে থাকে।

গর্ভনাশকের বিপুল সমৃদ্ধ জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যে রাধাচূড়া ফুলের গল্পটি তাই একফোঁটা জলের মতো। প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা বিদ্যার নাগালের বাইরে যে জ্ঞান নারী থেকে পরবর্তী নারীতে প্রবাহিত হতো, একসময় তা চিরকালের মতো আবদ্ধ হয়ে গেলো বিপদজনক এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন নীতির কারাগারে। কিন্তু শত শত বছরের সংস্কার এবং ধর্মের অবদমনের পরেও, অল্পবিস্তর গর্ভনাশক তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। প্রমাণ করে, নারীর প্রজনন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এ নিয়ে ধোঁয়া ওঠা তর্কের চেয়েও ঢের পুরাতন।

প্রাকৃতিক গর্ভনাশকের জ্ঞানচর্চার ইতিহাস গর্ভপাত সম্পর্কে সাম্প্রতিক বিতর্ককে আরও উজ্জীবিত করেছে। এটা শুধু এমন এক ইতিহাসই নয় যাকে সবসময় ঘোলা জলে ডুবিয়ে মারার চেষ্টা করা হয়েছে। বরং প্রতিবার নিত্যনতুন সব উপায় উদ্ভাবন করে প্রজনন স্বাধীনতাকে দমিয়ে রাখা আইন ব্যবস্থার ইতিহাসও বটে।

প্রাকৃতিক গর্ভনাশক অন্তত এই শব্দটির মতোই পুরাতন। ১০৮৫ খ্রিস্টাব্দে কন্সটানটাইন দ্যা আফ্রিকান – আইরিশ, রু, উইলো এবং গন্ধযুক্ত ফেরুলা ফুলকে অন্তর্ভুক্ত করেন রজঃস্রাব আরম্ভে কার্যকরি ভেষজ হিসেবে। এমনকি তারও আগে, ৮৬৫-৯২৫ এর মাঝামাঝি সময়ে মুহম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল রাজির লেখায় পাওয়া যায়- দারুচিনি, রু এবং ওয়াল ফুলও একই চিকিৎসায় কার্যকরি।

রোমান যুগে প্রাকৃতিক গর্ভনাশক গুলোর মিশ্রণ তৈরি করা হতো। সেগুলো পাওয়া যেতো ধাত্রী অথবা বিজ্ঞ নারীদের কাছে। গুটিকয়েক
আইন দ্বারা শুধু এদের ব্যবহারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হতো সেসময়। কারণ গর্ভধারণের সময় সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান সেযুগে ছিলো না। যতক্ষণ নারী নিজে নিজেকে গর্ভবতী বলে ঘোষণা না করছেন ততক্ষণ তাকে গর্ভবতী বলে বিবেচনা করা হতো না। এই নির্ণয়ের ভারও নারীর ওপরই ছেড়ে দেয়া হতো। বেশিরভাগ সময়ই নারীরা বিষয়টি টের পেতেন গর্ভের সন্তানের নড়াচড়া থেকে, যাতে গর্ভধারণের পর ১৪ থেকে ২০ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যেতো।

এটাও বলে রাখা ভালো, উনিশ শতক পর্যন্ত এই নড়াচড়া টের পাওয়ার আগে গর্ভনাশকের ব্যবহারকে ভ্রূণহত্যা বলে বিবেচনা করা হতো না। গর্ভের প্রথম তিনমাস সময়ের মধ্যে গর্ভপাতের জন্য এসব ভেষজ উপাদান ব্যবহারে নারীদের কোন বাধা ছিলো না। কেবল দৃশ্যমান বা স্বঘোষিত গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ কার্যকর হতো। এবং সেটাও অনেকটা চৌর্যবৃত্তির সমতুল্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো যা মূলত পিতার অধিকার সংরক্ষণ করতো। আইনিভাবেই তখন ভ্রূণকে ব্যক্তি মানুষ হিসেবে গণ্য করা হতো না। প্রাণ এবং গর্ভে কোন সময় থেকে প্রাণের সঞ্চার হচ্ছে সে বিষয়ে আইনের ধারণা বেশ অস্পষ্ট ছিলো সে সময়।

রোমান শাসনের সময়েই গর্ভধারণ এবং গর্ভপাত বিষয়ক মধ্যযুগীয় আইনের প্রথম সূত্রপাত ঘটে। ক্যাথলিক মতবাদ অনুসারে, প্রাণের সূচনা হয় আত্মার আবির্ভাব থেকে। অবশ্য সেটাও প্রথম নড়াচড়া টের পাওয়ার সময়কেই ইঙ্গিত করতো। কিন্তু তারপরও গর্ভনাশক এবং গর্ভনিরোধী উপাদানের প্রতি চার্চের একরকম কুদৃষ্টি সবসময়ই ছিলো। স্বীকারোক্তি প্রদানের সময় পাদ্রীরা নারীদের জিজ্ঞাসা করা শুরু করলো, সন্তান ধারণ হতে বিরত থাকতে তুমি কি ভেষজ বা অন্য কোনো পাপদ্রব্য পান করেছো? তবে এর উত্তরে হ্যাঁ বললেও এর জন্য নারীদেরকে কিংবা তাদের স্বাধীনতাকে খুব একটা বিপদে পড়তে হতো না। পাদ্রির উপদেশ মতো তারা নিজেদের শুধরে নিতে পারতেন সহজেই।

যদিও মধ্যযুগেই নারীর গর্ভধারণের বিষয়ে কঠোর হস্তক্ষেপ করার একটা ধারণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিলো। চার্চের নমনীয় অবস্থান বদলাতে শুরু করে যখন থমাস একুইনাস লিখলেন- “যৌনসঙ্গম হতে হবে কেবলমাত্র বংশবৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই।” একুইনাস তর্ক জুড়ে দিলেন, প্রজননের প্রাকৃতিক বিধান অনৈতিক। কারণ তা বাইবেলের বিধানের নীতিগত শুদ্ধতাকে লঙ্ঘন করে। ভ্রূণ গঠনের পরে এবং আগেও গর্ভনাশকের ব্যবহার করার অর্থ ঈশ্বর প্রদত্ত বংশবৃদ্ধি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা। এরপরও এখানে বলে রাখা ভালো যে, গর্ভনাশক নিয়ে এহেন কঠোর অবস্থানের পরও একুইনাস প্রাণ বিষয়ক কোনো নতুন সংজ্ঞা প্রদান করেননি। তার চিন্তাও দাঁড়িয়ে ছিলো সেই প্রাচীন জ্ঞানের ওপরই যে, নড়চড়া টের পাওয়ার সময় থেকেই গর্ভে প্রাণের সঞ্চার ঘটে।
একুইনাসের লেখাগুলো – গর্ভে এত দেরীতে আত্মার আবির্ভাব বা গর্ভনাশকের বিষয়ে চার্চকে ভীষণ রকমের অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। কিন্তু আইন তাদের পাশে ছিলো না। বরং ধাত্রীদের প্রস্তুতকৃত ঔষধি পানীয় নিয়ন্ত্রণ করতে চার্চের পদক্ষেপ গুলো অনেকটা নখদন্তহীন বাঘে পরিণত হয়। ইউরোপীয় বিচারের ইতিহাস সেসময় ভরে গিয়েছিলো গর্ভনাশের দায়ে অভিযুক্ত নারীদের স্বীকারোক্তিতে। যারা শেষ পর্যন্ত নির্দোষই প্রমাণিত হতেন। কারণ তারা কোনোভাবেই স্বীকার করতেন না নড়াচড়া টের পেয়েছেন।

আর তাই, ভেষজ গর্ভনাশক ঔষধি গুলোর কথা লিপিবদ্ধ হতে থাকে, “বুকস অফ সিক্রেটস” এ। ছদ্ম বিজ্ঞানের যেসব বই রহস্যময় সৃষ্টি ‘নারী’র অর্থোদ্ধার করার চেষ্টা চালাতো। ওইসময় গর্ভনাশক মিশ্রণগুলো প্রস্তুতকৃত অবস্থায়ই পাওয়া যেতো। বিশেষত ধাত্রীগণ সেসবের ব্যবহার ও মাত্রা সম্পর্কে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ছিলেন।
যখন ক্যাথলিক চার্চ বুঝতে পারলো তারা এসব গর্ভনাশক নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, এমনকি যেসব নারী তা ব্যবহার করেছে তাদেরকে খুঁজে বের করে শাস্তিও দিতে পারবে না, তখন তারা এই জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে অনুসন্ধান চালাতে লাগলো। শত শত বছর ধরে ইউরোপের ডাইনী পুড়িয়ে মারার শপথের লক্ষ্যবস্তু হতে লাগলেন দক্ষ ধাত্রীগণ। হাজার হলেও খোদ বাইবেলেই পরিষ্কার ভাষায় ডাইনীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার কথা বলা হয়েছে : “ডাইনীদের জীবিত রাখা তোমাদের উচিত নয়”।

ডাইনী নিধনের এই যজ্ঞে, তিনটি আলাদা এবং স্বতন্ত্র বিষয় দূর্ভাগ্যজনকভাবে মিলেমিশে এক হয়ে যায় – ডাকিনীবিদ্যা, ধাত্রীবিদ্যা এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ। সব ধাত্রীই ডাইনী ছিলেন না, আবার সব ডাইনী ধাত্রীও ছিলেন না। কিন্তু ধাত্রীবিদ্যা আর ডাকিনীবিদ্যার মধ্যে পার্থক্য করা প্রচলিত আইনে সম্ভব ছিল না। ব্যাভিচার থেকে পাশবিকতা এবং সন্তানকে শয়তানের কাছে উৎসর্গ করা সবকিছুই “Sevenfold Witchcraft” এর অন্তর্ভুক্ত ছিলো। কিন্তু এর দৃষ্টি প্রসারিত ছিলো প্রজনন, জন্মবিরতিকরণ এবং ভেষজ গর্ভনাশকের বিদ্যায় দক্ষ ধাত্রীদের দিকেও। “পুরুষকে বীর্যহীন করে, নারীর প্রজনন শক্তি নষ্ট করে অথবা গর্ভনাশক প্রস্তুত করে প্রাকৃতিক উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা”, ডাকিনীবিদ্যার অন্তর্ভুক্ত করা হয়…..

(চলবে)

অনুবাদ: নুসরাত জাহান
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Stassa Edward এর History of Abortifacients থেকে ভাষান্তরিত ও আংশিক পরিবর্তিত।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.