পক্ষপাত ও বৈষম্যে ঘেরা নারী জীবন

কৃষ্ণা দাশ:

বেলি দি, সবসময় মিষ্টি আর হাসিখুশি! দেখলেই চোখে একধরনের শুভ্রতার আভাস এসে লাগে, চারিপাশে স্নিগ্ধ অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়। সেই স্কুলের সময় থেকে বেলিদি আমাদের খুব কাছের। আমার বান্ধবীর বড়দি, সেই সূত্রে আমার সাথেও বেশ সখ্যতা। পূজাপার্বণে বাড়ি এলে আমরা সব বন্ধুরা অবাক মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম। সময়ের স্রোতে একসময় আমরাও যার যার মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ি, তেমনভাবে খোঁজ খবর রাখা হয় না। নিউমার্কেট এলাকায় হঠাৎ একদিন বেলিদির সাথে দেখা, সেই হাসি, সেই মিষ্টতা অনেকটা ম্লান! তবু এক মুহূর্তেই চেনা যায়। কিন্তু একি, আমার একগাল হাসি নিমিষেই হাওয়া, যাকে সবসময় বড় লালটিপে দেখেছি, আজ তার কপালটা ফাঁকা, দেখেই কেমন যেন আঁৎকে উঠেছি। একটু সামলে নিয়ে দিদিকে বললাম, চলো কোথাও বসে একটু গল্প করি। দিদি মিষ্টি হেসে সম্মতি জানালো। জানলাম, আজ প্রায় তিন বছর দাদাবাবু মারা গিয়েছেন। এরপর থেকে স্বামীর জমানো টাকা দিয়েই নিজের এবং একমাত্র ছেলের কোনরকম ভরণপোষণ করে আসছেন। কিন্তু জমানো টাকায় আর কত? বাপের বাড়িতে ভাইরা যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত, কতদিন আর হাত পেতে চাওয়া যায়! পড়ালেখাও বেশিদূর না, তাই আজকাল অল্প কিছু ব্লাউজ-পেটিকোট নিয়ে ঘরে ঘরে ফেরি করছেন। আরও জানলাম, শ্বশুরবাড়িতে সম্পত্তির ভাগ চেয়েছেন, এলাকায় একটা শাড়ি কাপড়ের ছোটাখাটো দোকান খুলে বসবেন বলে, এ নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে অশান্তি। শ্বশুর বলেছেন, মৃত ছেলে সঙ্গে করে সম্পত্তিও নিয়ে গেছেন, কোন সম্পত্তি ভাগ হবে না।

ভাইদের থেকেও সাহায্য চেয়েছেন, ভাইয়েরা সোজা জানিয়েছেন, না খেতে পারলে এসে দু’চারদিন বেড়িয়ে খেয়ে যাবে, কিন্তু মোটা দাগে কোন টাকা দেয়া সম্ভব না, যা দেয়ার তোমার বিয়েতে দেয়া হয়ে গেছে।
বেলাদি কেঁদে আরও বললো, দু’বেলা খাওয়া হচ্ছে, কিন্তু ছেলের ভবিষ্যৎ যখন ভাবি, তখন চারপাশটা অন্ধকার লাগে। এখনও স্কুলে দেই নাই, স্কুলে দিলে কীভাবে খরচ সামলাবো, কীভাবে ওর ভবিষ্যৎ সুন্দর আর নিশ্চিত করবো! পড়ালেখা জানা থাকলে হয়তো কোন ভাল চাকরি পেয়ে কোনরকমে মা-ছেলে টিকে থাকার চেষ্টা করতাম। তুমি তো জানো মাধ্যমিকের পরপরই বাবা আমার বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। বাবা যদি আমাকে শিক্ষিত করতেন, তাহলে হয়তো এই দিন দেখতে হতো না। স্বামী মারা যারার পর শ্বশুর বাড়ির লোকেরা হাত ঝেড়ে নিয়েছেন। আজ আমি ভিক্ষা করতে পারছি না কেবল সম্মানের ভয়ে, বলেই দিদি অঝোরে কাঁদলেন। আমি নির্বাক শ্রোতা হয়ে শুধু দেখছি।

আরিফা, আমার ছুটা কাজের আপার মেয়ে। ওর পনেরো পেরিয়ে ষোলতে পড়া মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দিলো সৌদি ফেরত এক লোকের সাথে। এরচে ভালো সম্বন্ধ আর আসতে পারে না ভেবে হুটহাট বিয়ে দেয়া। একদিনের নোটিশে দেখতে এসেই কবুল। বিয়ের পর আমি জেনেছি, তখন আর আফসোস ছাড়া কিছু করার ছিলো না। বিয়ের মাস চারেক পরই লোকটা আবার সৌদি চলে গেছেন পেটে একমাসের বাচ্চা রেখে। বছর না ঘুরতেই মেয়েকে তালাকনামা পাঠানো হলো। এবার এই মেয়ের কী হবে? একটা ষোল বছরের মেয়ে যে নিজেই হয়তো নিজের খেয়াল রাখতে পারে না, সে কী করে পেটের বাচ্চা, যে আজ না হোক কাল দুনিয়ার আলো দেখবে, তার ভরণপোষণ কে করবে? আরিফার মা, দুশ্চিন্তায় ঘুম খাওয়া তার উড়ে গেছে।

মাঝ বয়সী রেখা, দারুণ আধুনিক আর রুচিসম্মত একজন নারী। শুনেছি বিয়ের আগে চাকরি করতেন এক বেসরকারি সংস্থায়। বিয়ের পর পরপর দু’সন্তানের দেখভাল করতে গিয়ে চাকরি ছেড়েছিলেন। এরপর থেকে সংসার আর সন্তান ছাড়া আর কোনদিকে মুখ তুলে তাকাবার সময় পাননি। ছেলেরা আজ ইঞ্জিনিয়ার, বড় বড় চাকরি হাঁকিয়ে বেড়াচ্ছে। খুব ধুমধামে দু’ছেলের একসাথে বিয়েও দিয়েছেন। এবার জিরোবার পালা। স্বামীর কাছে আবদারও করে বসলেন পাহাড় দেখবার। কিন্তু বিধিবাম, হঠাৎ স্ট্রোক! কোন সময় না দিয়েই রেখাকে অথৈ সাগরে ফেলে পাড়ি দিয়েছেন তার স্বামী, না ফেরার দেশে। আর এর সাথে সাথেই চিরচেনা সংসার কেমন অচেনা হয়ে উঠলো। যে সন্তানদের জন্য একটা জীবন বাবা-মা উৎসর্গ প্রায় করে দিয়েছেন, আজ তারাই কেমন পর হয়ে যাচ্ছে। সংসারের পুরনো আসবাব যেমন একসময় স্টোরে জায়গা করে নেয়, তেমনি আজ রেখা। দু’ছেলে টানাপোড়েনে থাকেন মায়ের দায়িত্ব নেয়া নিয়ে। প্রবল আত্মসম্মান সম্পন্ন প্রিয় রেখা জীবনের হিসেব মেলাতে গিয়ে দেখছেন, ভুলটা তারই। আপন আপন করে কখনও নিজের কথা ভাবা হয়নি, একটা সামান্য ডিপিএস পর্যন্ত খোলা হয়নি নিজের জন্য। স্বামীর যা কিছু তারও ভাগীদার সন্তানরা। নিজের বলতে নিজের আর কিচ্ছু রইলো না।

এই প্রতিটা ঘটনা কি খুব চেনা মনে হচ্ছে না? আমাদের আশেপাশেই এরকম হাজারটা বেলি, আরিফা কিংবা রেখা রয়েছে। অবস্থার শিকার এই নারীরা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা আর নির্ভরতার কারণে আজ এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। এদের পাশের প্রত্যেকটা পুরুষ যদি একবার এদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে, এদের শিক্ষা আর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করে তুলতে পদক্ষেপ নিতো তবে আজ আসলে এই অবস্থায় পড়তে হতো না। এসব নারী এবং তাদের বাবা কিংবা স্বামী একটু সচেতন হয়ে কেবলমাত্র পরিবারের কথা না ভেবে, তাদের পাশে থাকা নারীর কথাও ভাবতো, তাহলে আজ হয়তো নারীসহ তার সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হতো। বেশিরভাগ নারীকে শোষণ করছে তার নিজ পরিবার! বাবা, ভাই, স্বামী থেকে সন্তান। এসকল শোষণে সমানভাবে অংশীদার পরিবারের সব সদস্য। মোদ্দা কথা, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। নারীকে নারী না ভেবে মানুষ ভাবলে, নারীকে পরের বোঝা না ভাবলে, সংসারে ছেলেদের যেভাবে অধিকার ও দায়িত্ব দেয়া হয় সেভাবে মেয়েদেরও অধিকার আর দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলে, এই রকম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সাথে মোকাবেলা করা সম্ভব।

কেবলমাত্র, শিক্ষা গ্রহণ করলেই হবে না, পাশাপাশি প্রয়োজন নারী-পুরুষ উভয়ের সচেতনতা অনুধাবন। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ছাড়া কিছুতেই নারী অধিকার বাস্তবায়িত হবে না। কারণ নারীর আত্মবিশ্বাস শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলেই আনা সম্ভব। পাশাপাশি সমাজ এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী অধিকার সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা সেদিকেও বিশেষ নজর রাখা প্রয়োজন। একজন সফল মা বিকশিত করেন একজন সফল মানুষের, আর একজন সফল মানুষ সমাজ, রাষ্ট্রের জন্য সম্পদ। কাজেই দেশের বিকাশের জন্যই নারী অধিকার সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা একান্ত প্রয়োজন। আসুন, শুধু কাগজে কলমে না, মনে প্রাণে নারীকে নারীর মর্যাদা দিয়ে সমাজ আর রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট হই।

সকলকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা।

কৃষ্ণা দাশ। কল্যানী, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ থেকে

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.