নারী দিবসে কতশত ভাবনা (৫)

শাহ্‌রীন শবনম মুমু:

জীবন, নারীর জীবন…সময়ের টানে, স্রোতের প্রতিকূলে স্রোতে ভাসতে ভাসতে তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা হয়তো কমে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার কমলো না, বরং বাড়লো।

নিজেকে যদি ঠিক চিনে থাকি, তাহলে তা যে বেড়েই চলবে, এটা ঠিক বলতে পারি আমি। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমি প্রতিদিনের তোমাকে নতুন করে আবিষ্কার করি। আজকের চাইতে কালকে তুমি আরও সুন্দর, আরও পরিণত। আমি রোজ মুগ্ধ হই। আমার ভালোবাসায় তাই আর ভাটার টান নেই।

আমার অবুঝ থাকার দিনগুলোতে কতকিছু ভাবতাম তোমাকে নিয়ে! মনে হতো, তুমি কেবল কষ্টই দিতে জানো। অসহ্য সেসব দিন, আর অসহ্য তুমি। নালিশটা জানানোরও কেউ ছিল না পাশে। কতদিন গেছে শুধু পথ হেঁটেছি, শাওয়ারে ঝর্ণার নিচে দাঁড়িয়ে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মনে হতো, তোমার সাথে কি আমার থাকতেই হবে? এই চাইতে কি মুক্তি ভালো না?

মুক্তি চেয়েছি ঠিকই, সাহসটা করে উঠতে পারিনি। মায়ের মুখ, মেয়ের মুখ …

তুমি হয়তো বলবে, তোমার মুখ? নাহ! মনে পড়তো না। তুমি মানেই আমার জন্য শুধু নোনা জল, নির্ঘুম রাত। তুমি মানেই দুঃস্বপ্ন শুধু। ভালো না লাগা, আর ভালো না থাকারা পাল্লা দিত নিজেরাই। কিছুতেই মন পড়ে থাকতো না তোমাতে আমার।

পরে ঠিক কীভাবে আমাদের বোঝাপড়াটা হলো, আমার ঠিক মনে নেই। তবে বোঝাপড়াটা যে হয়েছে, এটা বুঝি। বুঝি কারণ, এখন আমার অল্পতেই ভালো লাগে, খুশিগুলো বেশ ঘন ঘন ধরা দেয়। আয়নার সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, সাবাস!

অবুঝ কান্নার সময়গুলোতে তোমার ঘ্রাণ ভেসে আসে। নিজেকে সামলে নিতে তুমি পথ দেখাও। সকাল হতেই তুমি মনে করিয়ে দাও, কমতি তো কিছু নেই! আর তখন থেকেই আসলে আমার ভালো লাগার শুরু, ভালো থাকার শুরু।

আমার নীল শাড়িটা আমাকে ভালো রাখে। আমার টিপ, কাজল, চুলের গন্ধ আমাকে ভালো রাখে। তোমাকে ভালোবেসেই আমি আসলে ইগ্নোর করতে শিখেছি মানুষের কথা। তাদের ফিসফাস, কানাঘুষা যে আমার কানে আসে না, তা কিন্তু না। কিন্তু আমি আসলে তাদের দিকে করুনার চোখে তাকাতে শিখে গেছি। তোমাকে ভালোবেসে আমার এই ভালো থাকাকে যার কটাক্ষ, যার ঈর্ষা…, তাকে করুনার বেশি আর কিছু আসলে করা যায় না।

ইদানিং লিখতে ভালো লাগছে, গাইতে ভালো লাগছে। ভালোকে ভালো, সুন্দরকে প্রশংসা করতেও দ্বিধা করছি না। তোমাকে বিষিয়ে দেয়, তোমার প্রতি ভালো লাগাকে বিষিয়ে তোলে, এমন সম্ভাবনাকে সন্তর্পণে এড়িয়ে চলছি। আমাদের একসাথে থাকা যে সুন্দর, এটাই একমাত্র সত্যি।

আচ্ছা, তুমিও কি বলবে আমি অষ্টাদশীতেই বেশি সুন্দর ছিলাম, কিংবা তিরিশে? বা বাকিদের মতো তুমিও কি মনে করো, আমার ব্যক্তিগত সকল ইচ্ছা বিসর্জন দেয়ার সময় এসে গেছে? বয়স হয়েছে যে!

তাহলে শোন, এতো তীব্র প্রেমে আমি তোমার এখন, যা আগে কখনও ছিলাম না! বৃষ্টি, জোছনা, পাহাড়, সমুদ্র এখন আমাকে অনেক বেশি হাতছানি দিয়ে ডাকে। কবিতা, গানে মুগ্ধ তো আমি আগেই ছিলাম। আর ফ্যাশন বা সাজগোজ? কোন ব্র্যান্ড-হাউজ সেল দিচ্ছে শুনলে আমি দৌড়ে যাই, নিজের পছন্দে শপিং করি।

‘এখনও এতো শখ’ যারা বলে, তাদেরকেই কেমন যেন মনে হয় আমার। ব্যাকডেটেড বলবো, নাকি অন্যকিছু? বয়স বাড়লে তা আমার বাড়ছে, তুমি বলার কে হে?

তবে বয়স যে বেড়েছে, সেটা বুঝি, যখন দেখি আমি এড়িয়ে যেতে পারছি কারো অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য। নিজের ভালো লাগা, না লাগাকে গুরুত্ব দিতে পারছি।

নিজের শরীরের যত্ন নিতে, বিশেষ করে মনের যত্নে সচেষ্ট হয়েছি। এমনিতে আমি খুব হাসিখুশি থাকতে পছন্দ করি, ছোটখাটো ভুলত্রুটিগুলোর জন্য মানুষকে নিরন্তর ক্ষমা করে দিতে সময় নেই না। অন্যায় দেখলে রাগ করব না, এমন কথা দিতে পারি না। আর একটা বিষয়, ভুল স্বীকার করে নিতে দ্বিধা হয় না এখন আর।

বয়স বাড়লে যদি ভালো কিছু হয়, তাহলে তো তা বাড়াই ভালো। তবে একটা বিষয়, না জেনে, না চিনে কেউ যদি ‘তুমি’ সম্বোধন শুরু করে, বিশেষ করে বয়সে ছোট কেউ, তখন ভালো লাগে না। কেমন একটা অস্বস্তি হয়, সাথে রাগও…

“লাইফ বিগিনস অ্যাট ফরটি” মেনে তোমাকেই প্রেমিক ভাবতে ভালো লাগে প্রিয় জীবন। প্রেমিকরূপে বাকি যারা এসেছে, বা এখনো আসে, তারা ঠিক প্রেমিক না। কোথাও একটা সুবিধাভোগী তারা, যার নির্দিষ্ট মেয়াদ আছে, শর্ত আছে।

ভালোবাসায় শর্ত চলে না। কারণে ভালোবাসব, অকারণে ভালোবাসব। তোমাকে ছেড়ে কক্ষনো যাব না, নারী দিবসে নারী হিসেবে এটুকুই তোমাকে বলা জীবন আমার।

Being in LOVE with LIFE is key to eternal youth. Happy Women’s Day to ME!

শাহ্‌রীন শবনম মুমু
৫ই মার্চ ২০২২

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.