পুরুষতান্ত্রিকতা শুধু পুরুষেই নয়, নারীর মাঝেও প্রকটভাবে বিস্তৃত

মারুফা ইয়াসমিন অন্তরা:

বিগত দশকের পর দশক জুড়েই এই উপমহদেশের মানুষ বিশেষ করে নারীরা বিশ্বাস করেছে বা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছে যে পোশাক, তা পরার ধরন, এমনকি সেই পোশাকের রঙ পর্যন্ত বিশেষভাবে শুধু নারীদের জন্যই সংরক্ষিত।
আর এরই সাথে প্রচলিত রয়েছে রঙের সাথে মিলিয়ে লিঙ্গ ভিত্তিক অপমান এবং দুর্বলতা প্রদর্শন। গোলাপি মেয়েলী এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল লিঙ্গ নির্দেশক রঙ। মেয়েদের সাদা রঙের পোশাক মাত্রই বৈধব্যের নির্দেশক। ছেলেদের তাই এই রঙ পরিধান রীতিমতো অপমানের। যদিও কিছু ব্যতিক্রম ইদানীং লক্ষণীয়।
এসব ধারণার উৎপত্তির পেছনে অনেকাংশেই মেইন্সট্রিম মিডিয়া, সিনেমা এবং বিজ্ঞাপন-ই দায়ী বটে।

ষাট-সত্তর দশকের দিকে এদেশের নাটক সিনেমার মূল উপজীব্য বিষয় ছিলো কিভাবে মূল নায়িকাকে ভালো অর্থাৎ খুব উচ্চমানের সমঝতার দেবী রূপে গৃহিণী হিসেবে চিত্রায়ন করা যায়। আর এই চেষ্টার প্রধান হাতিয়ার ছিলো শাড়ী (নির্দিষ্ট ধরন) , ঘোমটা, সালোয়ার কামিজ, স্কারট, চুড়ি, টিপ- যেগুলোকে খুবই সূক্ষ্মভাবে নারীর জেন্ডার স্পেকট্রামে পরিণত করা হয়েছে।

পরবর্তীতে এই শৃঙ্খল নানভাবে আবর্তিত ও পরিবর্তিত হয়ে সমাজে বিস্তৃত হয়ে চলেছে। তবে ফ্যাশন এবং চলচ্চিত্রের মধ্যে নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী যোগসূত্র আছে। গত কয়েক দশক ধরেই মহিলাদের একটি নির্দিষ্ট উপায়ে দেখানো এবং তা গেলানোর চেষ্টা চলেছে – এমন একটি চেহারা যা ক্লাসিকভাবে পুরুষদের থেকে আলাদা। বেশিরভাগ অভিনেত্রী শাড়ি, স্কার্ট, সালোয়ার কামিজ পরে- আর এগুলোই ‘মেয়েলি’ হয়ে ওঠার আরও পরিষ্কার করে বললে নারী হয়ে ওঠার চাবি কাঠি হয়ে উঠেছে।

ওয়েস্টার্ন ড্রেস তা সে ফর্মাল হোক অথবা ক্যাজ্যুয়ালই হোক, পরিধানকারীর চরিত্র বিশ্লেষণে এদেশের শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবারই উঠে পরে লাগার মানসিকতা চোখে পড়ার মতো। সামাজিক বিভিন্নক্ষত্রে এসব গোষ্ঠীপতি শাসিত আদিখ্যেতা উপেক্ষা করা গেলেও কর্মক্ষেত্রে এ যেনো এক সর্বজনসম্মত র‍্যাগিং টপিক। আরও অবাক করা বিষয় হোলো এই ওয়ার্কপ্লেস বুলিং এর মূল হোতা এবং চ্যালা চামুণ্ডা সবাই মেয়েলীপনার সাক্ষাৎ দেবী রূপী নারী। নারী অধিকার বলে বলে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলা নারীবাদীদের উচিত এদের মুখদর্শন করে জ্ঞ্যান স্তবক গ্রহণ করা।

পুরুষতান্ত্রিকতার চাপিয়ে দেয়া প্রথার দাস হয়ে অনেক মেয়েলী পোশাকে আচ্ছাদিত এবং অনুপ্রাণিত নারী আধুনিক পোশাক এবং ফ্যাশনের ঘোরবিরোধী। তাদের মেয়েলীপনার প্রদর্শনে যেমন কোথাও কিছুই যায় আসে না, ঠিক তেমনি তাদের ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক এই সত্য গ্রহণে অপারগ যে তাদের এই ঘোর বিরোধিতার বিন্দুমাত্র গ্রহণযোগ্যতা কোথাও নেই।

২০২২ সালে এসেও যখন ডিগ্রীধারি মেয়েলীপনায় পারদর্শী নারীরা আধুনিক পোশাককে শুধুমাত্র পুরুষদের সাথে প্রতিযোগিতার কারণ বলে শুধু মনেই করে না, বরং ক্ষেত্রবিশেষে অকপটে জাহিরও করে, তখন আসলেই নারীদিবস এবং নারীবাদিতার প্রয়োজনীয়তা খুব করে অনুভূত হয়।

শুধুমাত্র নারী বলেই পোশাক থেকে শুরু করে চলাফেরা, হাঁটা, কথা বলার ঢং, হাসির শব্দমাত্রা এবং জীবনের অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে আরোপিত সব নিয়ম ভাঙ্গার প্রতিজ্ঞাই ‘নারী দিবস’।

I’m guilty of breaking gender norms.
#BreakTheBias
#GuiltyOf

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.