মাকে আমার পড়ে না মনে – ৫

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

মা,

“সত্য মঙ্গল প্রেমময় তুমি, ধ্রুবজ্যোতি তুমি অন্ধকারে।” ভোরে ঘুম ভেঙে চোখ মেলার আগে প্রায়ই বালিশের নিচে ফোনটা হাতড়ে বেড়াই। এই তো সেদিনও সকাল শুরু হতো তোমার সাথে কথা বলে। তুমি বলতে, সকালবেলা আমার গলা শুনলে তোমার কত ভালো লাগে! দিনের কাজকর্ম সারতে সারতে তোমার সাথে বার কয়েক আটপৌরে ফোনালাপ তো হতোই। সারাদিনের পরিকল্পনা, রাজনীতির হালচাল, কী লিখছি, কী পড়ছি, কী পরছি, কোন গানটা ইদানিং ঘুরেফিরে শুনছি, দাদাগিরিতে সৌরভ গাঙ্গুলীর কোন অভিব্যক্তিটা দারুণ লাগলো, “আজ সকালের আমন্ত্রণে”তে কার গানে সকালটা সুন্দর হয়ে গেলো থেকে শুরু করে কন্যারা নতুন কী করছে, আব্বু কেমন কান পেতে আমাদের ফোনালাপ শোনে, যত মনপ্রাণই ঢালি তবু মাছের ঝোলে তোমার মতো টকটকে রঙ আর স্বাদ কেন আসে না সে নিয়েও কথা ফুরাতো না আমাদের। হয়তো রাতে কোনো টিভি চ্যানেল ঘুরিয়ে উত্তম – সুচিত্রার ছবি নয়তো সত্যজিৎ রায়ের কোনো ছবি পেয়ে গেছো – কী খুশিতেই তা জানাতে। আবার কখনও কোনো ছবি দেখে ভালো লাগলো, কিন্তু বলতে পারছো না কী নাম, আমি গল্প শুনে বলে দিতাম, ও আচ্ছা! এটা তো ঋতুপর্ণ ঘোষের অমুক ছবিটা মা!

সংসারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাওয়া না পাওয়ার গোপন দুঃখ ভাগাভাগি তো ছিলোই। আমি চাকরি করি বা ছেড়ে দিয়ে বাচ্চাদের সময় দেই – তোমার সমর্থন সবসময় সাথে ছিলো। আমাদের রোজকার কথামালায় তুমি কেবল এই কথাটি মনে করিয়ে দিতে যে, যা কিছুই করি আমি যেন জীবিকা আর সংসারের আড়ালে নিজেকে হারিয়ে না ফেলি। বেলাশেষে যেন একটু সময় কেবল নিজের জন্য থাকে।
কখনও কখনও তোমার ব্যস্ততা ধারেকাছে ঘেঁষতে দিতো না। আমি অপেক্ষা করতাম। কখনও অনেকটাই দীর্ঘ ছিলো সে অপেক্ষার প্রহর। তোমার নিজস্ব জগতে যে নিমগ্নতা তার প্রতি তোমার সংসার চির শ্রদ্ধাবনত। এতে আমাদের কৃতিত্ব নেই, এ তোমারই অর্জন।

সন্তানদের জীবনে অহেতুক হস্তক্ষেপের মানুষ তুমি কোনোকালেও ছিলে না৷ তুমি তো ছায়া দিতে শতবর্ষী অশ্বত্থের মতো। বিপদে যেমন আগলে রাখতে তেমনি তোমার কাছ থেকেই শেখা ভয়কে ঝেড়ে ফেলে বিপদের মুখোমুখি হতে। যেমন বন্ধু ছিলে তার চেয়ে বেশি ছিলে সমালোচক। ছেলেমেয়েদের দোষত্রুটি সম্পর্কে অকপটেই আলাপ করতে। যে কোনো সৃজনশীল কাজে উৎসাহ দিতে নিরন্তর কিন্তু মা হয়ে সন্তানের প্রশংসায় উচ্চকিত হওয়া তোমার ধাতে ছিলো না। আদর্শ মা হবার অবাস্তব চেষ্টা করোনি কোনোদিন, আমিও তোমার আদর্শ সন্তান ছিলাম না। বরং আমরা একে অন্যকে ভালোবেসেছি “অসীম ক্ষমায়, ভালমন্দ মিলায়ে সকলি।”

তুমি বলতে, আনন্দের মতো বেদনাও এক বিশেষ অনুভূতি। হাসি থাকলে কান্নাও স্বাভাবিক। তাই মন খারাপ হলে যেন তাকে তাড়াতে ব্যস্ত না হই। সময়ে তা এমনিতেই বিদায় নেবে। আর কি কি নিয়ে যেন কথা হতো আমাদের? নারীবাদ নিয়ে কি কোনোদিন কথা হতো? তুমি কতোটা নারীবাদী – এ নিয়ে তোমাকে কখনো মাথা ঘামাতে দেখিনি। কিন্তু মানুষ হিসেবে নিজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, এক বুক সাহস আর আত্মমর্যাদাবোধের অনবদ্য উদাহরণ তুমি এ পৃথিবীকে দেখিয়ে গেলে মা! মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বীরাঙ্গনা মায়েরা যখন সমাজের বঞ্চনা আর রোষানলে নিজেদের জীবনকে অভিশপ্ত মেনে আত্মগোপনে বাধ্য হলেন, তুমি তখন পরিত্যক্ত গাছপালা, শেকড়ের মাঝে নিজের অস্তিত্ব আর অবলম্বন খুঁজে নিলে।

স্বাধীনতার পঁচিশ বছর পর মৌনতা ভেঙে নিজের একাত্তর ব্যক্ত করার মধ্যে দিয়ে আড়াই লক্ষাধিক বীরাঙ্গনা মায়ের প্রতিনিধিত্ব করলে। তথাকথিত সমাজকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলে লালসবুজ পতাকার বিজয়ে তোমাদের অবদানের কথা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে রাজপথে সোচ্চার হলে, ট্রাইবুনালকে সহযোগিতা করলে। আড়াই লক্ষাধিক বীরাঙ্গনা মায়ের হয়ে কপালে স্বাধীনতার সূর্যোদয় এঁকে তুমি টোকিও ট্রাইবুনালে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদর আলশামসের নজিরবিহীন নৃশংসতার। পরাধীনতার শেকলে তুমি বাধা পড়োনি কোথাও। তোমার একটি ভাস্কর্যের নাম “সম্রাজ্ঞী”। এমন নামকরণের হেতু বোঝাতে তুমি তোমার নাতনিদের কাছে গল্পচ্ছলে বলেছিলে, “প্রত্যেক মেয়েই তার মনের সম্রাজ্ঞী। মনটা তার স্বাধীন সাম্রাজ্য। মনের ইচ্ছে পূরণ বা শাসনের ভার একান্তই তার নিজের।”

আজ ৬ মার্চ, ২০২২। তোমার চতুর্থ প্রয়াণ দিবস। প্রতিবছর এই সময়টা বিশ্ব নারী দিবসের প্রস্তুতি চলে গোটা বিশ্বে। নারী দিবসের প্রতিপাদ্য দেখে প্রতিবারই মনে হয়, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী নামটি কত প্রাসঙ্গিক! তোমার জ্বেলে যাওয়া মশাল হাতে আমি পথের দিশা খুঁজে চলি। মনে ভাবি, “সকল গর্ব দূর করি দিব তোমার গর্ব ছাড়িব না।” এই পৃথিবীতে প্রিয়ভাষিণীদের প্রয়োজন কখনো ফুরাবার নয়।

আগের লেখাগুলোর লিংক:

১. https://womenchapter.com/views/26738

২. https://womenchapter.com/views/26918

৩. https://womenchapter.com/views/27039

৪. https://womenchapter.com/views/34180

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.