নারী দিবসে কতশত ভাবনা – ৪

শাহ্‌রীন শবনম মুমু:

(৪)
“আড়ালে চলে পরনিন্দা
পরচর্চায় কী যে সুখ!
সামনে এলেই নতজানু শির
প্রশংসায় পঞ্চমুখ।“

কথাটা কোথায় পড়েছি মনে পড়ছে না। তবে এই তো আমাদের জীবন…।
ব্যাপারটা যদি এমন হয়, আমরা জানি কেউ আমার সম্পর্কে ঠিক এমন ধারণা পোষণ করে, বা আমরা এমন কাউকে চিনি, যার স্বভাবটা অনেকটাই এরকম, তাহলে?
জীবনে চলার পথে এমন মানুষের সঙ্গে আমাদের কিন্তু দেখা হয়, কখনও কখনও আমরা নিজেরাও কি ঠিক এমন হয়ে উঠি!

এই যে আমি লিখেই যাচ্ছি, বলেই যাচ্ছি অন্যায়ের কথা, অবিচারের কথা, অমর্যাদার কথা, এর সবটাই কি শুধু পুরুষ নারীর সাথে করে?
নারী কি নারীকে অমর্যাদা করে না? অসম্মান করে না? একজন নারীকে ভাঙনের খেলায় যখন আর একজন নারী মেতে ওঠে, তার চাইতে ভয়ংকর যেন আর কিছুই হয় না। নারী তো জানে, কীসে সে সবচাইতে দুর্বল, কীসে তার সবচাইতে ভয়!
আমার সবচাইতে বড় অসুখ হলো আমার স্মৃতিশক্তি – আমি না পারি সহজে কিছু ভুলে যেতে, না পারি সহজে কাউকে ক্ষমা করতে। কখনও মনে হয়, আমি ঘটনাগুলোকে মনে রাখতে চাই বলেই হয়তো আমার মনে থাকে!
আবার মনে হয়, আসলে সেই ঘটনাগুলোর এমন সব কন্সিকুয়েন্স থাকে, যে সেটাকে যখন বয়ে বেড়াতে হয়, তখন ঘটনাগুলোকে, বা ঘটনার সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে আর ভোলা হয় না।

প্রিয় মানুষ, কাছের মানুষ অথচ কষ্টের কারণ, ক্ষতির কারণ – এ যেন মৃত্যুসম। জীবন চলার পথে মেয়ে হয়ে হয়তো আর একটা মেয়েকেই বিশ্বাসটা বেশি করি আমরা। বিশ্বাস করে কথা জমা রাখি, আনন্দ জমা রাখি, গোপনীয়তা জমা রাখি। সেই জমা থেকে যখন বিশ্বাসটা চুরি যায়, তার ক্ষতিটা পোষানোর থাকে না আর।

নারী দিবসে আমরা নারীরা আমাদের মেয়েদের, বোনদের, মায়েদের সাকসেস, স্যাকরিফাইস এর গল্পগাঁথা সেলিব্রেট করতে পারতাম যদি!
যে দশটা ভিত্তি নিয়ে এই দিনের গাঁথুনি – ন্যায়বিচার, মর্যাদা, আশা, সমতা, সহযোগিতা, দৃঢ়তা, প্রশংসা, সম্মান, সহানুভূতি, এবং ক্ষমা। এমন না হয়, আমরা শুধুমাত্র পুরুষজাতির কাছেই এগুলোর প্রয়োগ বা প্রচারটা আশা করি।
আমরা নারীরা যেন আর একজন নারীর পাশে ঢাল হয়ে থাকি, যে কোনো সময়, যে কোনো পরিস্থিতিতে। দশভূজা হয়ে এই দশটা শব্দকে যদি হৃদয়ে ধারণ করে আমরা বাড়িয়ে দিই সহমর্মিতার হাত, এগিয়ে যেতে সাহায্য করি দিগন্ত থেকে দিগন্তে!

এ বছর নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হলো “Break The Bias”…
A world free of bias, stereotypes, and discrimination.
A world that is diverse, equitable, and inclusive.
A world where difference is valued and celebrated.

এই প্রতিটা লাইন পড়তে যতটা সুন্দর, এর প্রয়োগ ততটাই কণ্টকাকীর্ণ। দুটো হাত ক্রস করে একটা সুন্দর ছবি তোলা যতটা সহজ, তার চাইতে অনেক কঠিন এই শব্দগুলোকে হৃদয়ে ধারণ, হৃদয়ে লালন। এটা কয়জন আসলে পারেন, বা পারবেন সেটা আমাকে ভাবায়।

আমি আমার ক্যারিয়ারে একটা ট্র্যানজিশনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি এই ঠিক মুহূর্তে। আমার একাডেমিক আমলনামা ভালো, ভালো মানে বেশ ভালো। বোর্ডস্ট্যান্ড, ডীন’স এওয়ার্ড উইথ ডিস্টিঙ্কশন, ভাইস-চ্যান্সেলর’স মেডেল উইথ হাইয়েস্ট ডিস্টিংশনের মতো কিছু জিনিষ আমার উপর বোঝা হয়ে চেপে বসে আছে। হ্যাঁ, আমি তাদের বোঝাই বলি, কারণ তাদের দৌলতে যে স্বপ্নগুলো আমি একে একে এঁকেছিলাম, সেগুলোর নাগাল আমি পাইনি।

খুব শখ ছিল পড়াবো। গ্রাজুয়েশনের পর এপ্রোচ করলাম, বললো পোস্ট-গ্রাজুয়েশন করে আসো। পোস্ট-গ্রাজুয়েশনের পর এপ্রোচ করলাম, বললো একটা বিদেশি ডিগ্রি কিংবা পিএইচডি ছাড়া আসলে এই পথে হাঁটা যাবে না। পরে দেখি, এই পথে হাঁটা যাবে না, তা না। সঙ্গী হিসাবে থাকতে হবে রেফারেন্স, থাকতে হবে স্বজন। আমার মেধা, শিক্ষা জীবনে আমার ডেডিকেশন, আমার সিনসিয়ারিটি আমার স্বজন হতে পারলো না! এর চাইতে গ্লানির আর কী কিছু হতে পারে!
জীবনের গতি পরিবর্তন হয়, প্রায়োরিটি চেঞ্জ হয়। পালে হাওয়া লেগে কর্পোরেটে ভিড়লাম। সেখানেও সেই একই বাতাস। সুনজরে থাকতে হবে। এদিকে আবার কার যে কীসে সুনজর! কারো ভাল লাগে শান্ত-শিষ্ট, কেউ আবার ধার চায়। মেধার ধার, পরিশ্রমের ধার হলে কঠিন ছিল না। সেই ধার গিয়ে পৌঁছায় অন্য কোথাও। যে সেই ধারটা দেখাতে পারে, সে টিকে থাকে। যে পারে না, তার অনেক লিমিটেশন।

ব্যতিক্রমের কথা আমি বলছি না। আদর্শ নিয়ে চলে, আদর্শ মূল্যায়িত হয়, সেটা সবসময় প্রশংসার।
কিন্তু একটা অলিখিত চর্চা যে আমাদের মজ্জায় ঢুকে গেছে, তার থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? এখানেই আসে বায়াসনেস, এখানেই আসে ডিসক্রিমিনেশন। ভালোকে যাতে ভালো বলতে না হয়, সেইজন্য আপনার যে এফর্ট, সেই এফোর্টটা বরং নিজেকে শোধরাতে দেন।
দেবেন?

একটা ভালো একাডেমিক রেজাল্ট, একটা ভালো প্রজেক্ট, একটা ভালো পারফরমেন্সের পিছনের গল্পগুলো আমরা জানতে পারি না।
কত ঘুমহীন রাত, কত আনন্দ, হুল্লোড়কে দূর থেকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বইয়ের প্রেমে পড়ে থাকা।
কর্মজীবনে আর একজনের অপারগতাকে হাসি মুখে নিজের কাঁধে নিয়ে প্রজেক্ট চালিয়ে যাওয়া, টিমে বারো জনের বারো মতকে এক করে লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া সহজ না।
সহজ না পরিবারের সবার মন রেখে নিজের পারফরমেন্সটা ঠিক রাখা। আমাদের সময় ২৪ ঘন্টা। একটাতে বেশি সময় দিলে আর একটাতে কম পড়বেই। আর যার ভাগে কম পড়বে, সে কথা শোনাবেই। এটা মেনেই পারফর্মার হতে হয়।
এই সবকিছুর পর আপনার বায়াসড এটিচুড, ডিসক্রিমিনেটরি একশনস যখন আমার মন ভাঙ্গে, তখন আপনাকে শ্রদ্ধা করার আর কোন কারণ আমার থাকে না। আর আমার যাতে শ্রদ্ধা নেই, আমার তাতে এফর্টও নেই।

একবার কখনও নারী দিবসের রঙ বেগুনি না হয়ে সাদা হোক, সফেদ হোক…

“চান্দওয়ালা সফেদ, বাদলওয়ালা সফেদ
কাগজওয়ালা সফেদ, গোলাপওয়ালা সফেদ
বরফওয়ালা সফেদ, নমকওয়ালা সফেদ
দুধওয়ালা সফেদ, শঙ্খওয়ালা সফেদ
ঝর্ণাওয়ালা সফেদ, রঙওয়ালা সফেদ”…

শাহ্‌রীন শবনম মুমু
৫ই মার্চ ২০২২

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.