নারী দিবসে কতশত ভাবনা -৩

শাহ্‌রীন শবনম মুমু:

(৩)

এই যে ৮ই মার্চে নারী দিবস নিয়ে এতো ভাবনা আমাদের – সাদা, সবুজ, নাকি বেগুনিতে সাজাবো নিজেকে সেদিন, কোন রঙে কী বোঝায় তা তো আগের লেখায় লিখেছি।

উদযাপনের চাইতে যাপনে মন দেয়ার পক্ষে আমি। উদযাপন কেমন একটা দিনেই পার হয়ে যায়। কিন্তু যাপন করতে হলে সেটাকে প্রতিদিনের, প্রতি মুহূর্তের অংশ হতে হয়। একটা বেগুনী শাড়ি, একটা কার্ড, কিছু ফুল, কিছু থ্যাংক ইউ, আর কিছু ক্লিক, ব্যাস!

যদি এই দিনের ভ্যালুজ (values) জানা থাকে বরং! যদি এমন হয়, কারো প্রতি অন্যায় করার আগে হঠাৎ করেই কোন একটা ভ্যালু মনে পড়ে গেল, আর সেটা করতে গিয়ে হাতটা কেঁপে উঠলো!

মন বলে উঠলো, নাহ, এটা আমার সাথে হলে কী আমার ভালো লাগতো!

আজকে ভ্যালুগুলোই জানি বরং গল্পে গল্পে –

১। Justice বা ন্যায়বিচার

(the quality of being just; righteousness, equitableness, or moral rightness)

শব্দটা শুনলেই হাজার বছর ধরে মেয়েদের উপর হয়ে যাওয়া অন্যায়ের কথাগুলোই কি মনে হয় না! ধরেই নেয়া হয়, ও মেয়ে, ও দুর্বল। ওকে আঘাত করা যায়, কম দেয়া যায়, ঠকানো যায়। ওর আড়ালে ওর সম্পর্কে বাজে কথা বলা যায়, কুৎসা রটানো যায়।

আমরা ভুলে যাই, প্রকৃতি কিন্তু ঠিক বিচারটা ঠিক সময়েই করে।

২। Dignity বা মর্যাদা

(bearing, conduct, or speech indicative of self-respect or appreciation of the formality or gravity of an occasion or situation)

আমরা তো একপ্রকার ভুলেই যাই মেয়েদের আত্মসম্মান বলে কিছু থাকতে পারে! মনে হলো, আর এক ঘর মানুষের সামনে তাকে যা ইচ্ছা তাই বলে দিলাম, হয়তো এমন সংসারে, হয় না? কাজের ক্ষেত্রেও কি দেখি না আমরা, জুনিয়রের সামনে সিনিয়রকে, কিংবা শোভনীয় নয়, এমন আচরণকে প্রশ্রয় দিতে?

আমাদের জানতে হবে, আমাদের কোথায় থামতে হবে। কী বাস্তব জগতে, কী ভার্চুয়াল জগতে!

৩। Hope বা আশা

(the feeling that what is wanted can be had or that events will turn out for the best)

সংসার তরঙ্গ মেলা, আশা তার একমাত্র ভেলা – কথা আছে না! এই আশা কিংবা স্বপ্ন সবার থাকে, ছেলের যেমন থাকে, মেয়েরও তেমনি থাকে। একটা মেয়ের আশা পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে খারাপ লাগে না? তাকে পড়ালেখা শেষ করতে দিই না, তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দিই না, তাকে বাধ্য করি তার শখের জিনিষটা ছেড়ে দিতে। আহা মেয়ে জীবন!

অন্যের আশা পূরণে ছাড় দিতে ভুলবে কবে তুমি?

৪। Equality বা সমতা

(the state or quality of being equal; correspondence in quantity, degree, value, rank, or ability)

এখানে ইক্যুয়ালিটির কথা বলা হলেও আমি ইকুইটির পক্ষে। শরীরগতভাবেই বলি, আর স্বভাবগতভাবেই বলি, নারী, পুরুষে কিছু ভেদাভেদ সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত। তাই সবসময় সমতা বিধান হয়তো জরুরি না, বরং জরুরি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। ন্যায়বিচার, নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা।

মেধাবী কাউকে যেন মেধাবীই বলি। মেয়ে, কিন্তু মেধাবী – এমন যেন না বলি।

৫। Collaboration বা সহযোগিতা

(individuals work together for a common purpose to achieve mutual/business benefit)

এই জায়গাটাতেই মনে হয় আমাদের স্ট্রাগল সবচাইতে বেশি। আমাদের চিন্তা-ভাবনা এতো বেশি স্টেরিওটাইপড যে, এটা মেয়েদের কাজ, এটা ছেলেদের কাজ বলে আমরা উড়িয়ে দিই। কোলাবের পরিবেশটা তো আমাদেরকেই তৈরি করতে হবে। সময়ে অসময়ে একে অন্যের ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারলেই শান্তি, সমৃদ্ধি নিশ্চিত হবে। আমরা কি এই যুগে এসে এখনও বলি “আপনার ওয়াইফকে জব করতে দেন কেন?” অথবা “পুরুষ মানুষ এভাবে ঘরের কাজ করে আমি দেখিনি বাবা!”

সময়টা বদলেছে, সত্যিই বদলেছে। আমরা বদলাচ্ছি তো!

৬। Tenacity বা দৃঢ়তা

(the quality or fact of being able to grip something firmly; persistence)

হতেই পারে মেয়ে হয়েও আমি opinionated কিংবা Assertive। আমার কোন বিশ্বাস, বা কোন চেষ্টায় আমি লেগে থাকি, চেষ্টা করে যাই লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত। আমার নিজস্ব চাওয়া আছে, স্বপ্ন আছে। আপনার কাজ পাশে থেকে সাহায্য করা। না পারলে চুপ থাকা, ক্ষতির কারণ না হওয়া।

পাশে থাকি।

৭। Appreciation বা প্রশংসা

(gratitude; thankful, recognition)

মন খুলে প্রশংসা করা! আমরা হিংসা করতে পারি সহজে, প্রশংসাটা করতে আমাদের কোথাও একটা কষ্ট হয়। আবার এমন হয়, সবার সামনে প্রশংসাটা ঠিক করতে পারি না, পাছে অন্য কারো মন রক্ষা না হয়, এই ভয়ে। মায়ের ভয়ে বউকে বলতে পারি না, কিংবা বউয়ের ভয়ে মাকে। এক বসকে ভালো বললে যদি আবার অন্য বস বেজার হয়! আহারে! প্রশংসা করলেই যদি বেতন বেশি দিতে হয়! আহারে!

মন খুলে প্রশংসাটা এবার করি বরং!

৮। Respect বা সম্মান

(esteem for or a sense of the worth or excellence of a person, a personal quality or ability, or something considered as a manifestation of a personal quality or ability)

সম্মান ব্যাপারটা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে আজকাল! কী ঘরে, কী বাইরে। সম্মান দেখাতে আমরা ক্যাল্কুলেট করি যেন। মেয়েদের বেলায় সেটা আরও যেন প্রশ্নবোধক! রসিকতার ছলে হলেও যদি একটু হেয় নাই করলাম, তাহলে আর পুরুষমানুষ কীসের! গায়ের রঙ নিয়ে কথা বলবো, শরীরের আকার নিয়ে কথা বলবো, তার রুচি, পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে কথা বলবো। তাই না?

না, তাই না। সম্মান দিতে পারাটা না জানা থাকলে শিখে নিই বরং আজ থেকেই।

৯। Empathy বা সহানুভূতি

(the imaginative ascribing to an object, as a natural object or work of art, feelings or attitudes present in oneself)

মেয়ে/নারী মাত্রেই সহানুভূতির পাত্র, এটা একটা চালু মনোভাব আমাদের। আমরা করুণার সাথে সহানুভূতিকে মিশিয়ে এমন এক শরবত তৈরী করেছি, যেটা দিন শেষে আমাদের অসম্মানেরই কারণ হয়। নারী হিসেবে আমার হার্ডলস, আমার চ্যালেঞ্জেস, আমার স্ট্রাগলস আমার সহযাত্রী, সহকর্মী, অথবা পার্টনার কীভাবে দেখেন, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

সিম্প্যাথিক না, এম্প্যাথেটিক তোমাকে চাই।

১০। Forgiveness বা ক্ষমা

(conscious, deliberate decision to release feelings of resentment toward a person or group who has harmed you, regardless of whether they actually deserve your forgiveness)

মেয়ে হিসাবে বলবো না, মানুষ হিসাবে আমাদের ভুল হয়। সেই ভুলকে পুঁজি করে একজনকে কষ্ট দেয়া, বা শাস্তি দেয়া থেকে বিরত থাকাও কিন্তু এই দিনের মহিমা। ও ভুল করেছে, তাই তাকে সংসার ছেড়ে চলে যেতে হবে, সম্পর্ক থেকে আলাদা হয়ে যেতে হবে, কিংবা অফিসে তাকে হেয় করতে হবে, প্রমোশন আটকে দিতে হবে, তার পজিশনটা ক্লোজ করে দিতে হবে – এগুলোই তো হয়ে আসছে দিনের পর দিন।

ভালোবেসে দেখেছেন কখনও তার শক্তিকে?

শাহ্‌রীন শবনম মুমু
৩রা মার্চ ২০২২

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.