আমার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

শাহমিকা আগুন:

সেদিন ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলাম শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে। আমার ছেলের অটিজম, এপিলেপ্সি, Dyscalculia (এক ধরনের লার্নিং ডিজএবিলিটি) আছে। সে কৈশোরের দিকে যাচ্ছে। তাই শরীরে এবং ব্যবহারে কিছু পরিবর্তন আসা শুরু করেছে। কিছু জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য গিয়েছিলাম। শিশু বিশেষজ্ঞ একজন নারী। তার নাতি-নাতনি আছে। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে বিভিন্ন দেশে ডাক্তারি করে এখন ইংল্যান্ডে প্র্যাকটিস করছে। আমার ছেলে তার জন্য নতুন। তাই সময় নিল আমাদের রেকর্ড পড়তে। তার ভ্রু একটু কুঁচকে গেল। আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমি এখনও রেফুজ এ থাকি কিনা। আমি হেসে দিয়েছিলাম। বললাম ওখানে কেউ পারমানেন্টলি থাকে না। আমি আর আমার ছেলেকে ওখানে ষোল মাস রাখা হয়েছিল। তারপর আমরা লোকালয়ে ফেরত এসেছি। নতুন জায়গায় নতুন জীবন শুরু করেছিলাম। ইংল্যান্ডে ডমিস্টিক ভায়োলেন্সের ভিক্টিম মা ও শিশুদেরকে শেল্টার হোমে রাখা হয়। কোন ঠিকানা থাকে না। বলা হয় হোমলেস বা গৃহহীন। সেখানে সিসিটিভি দিয়ে সারাক্ষণ মনিটরিং করা হয়। চাকরি-বাকরি, স্কুল কলেজ, প্রিয় এলাকা সবকিছু ছেড়ে দিতে হয়। পুলিশ যেখানে নিয়ে রাখবে সেখানে থাকতে হয়। নতুন জীবন শুরু করতে হয় একেবারেই শূন্য থেকে। সাধারণত আট মাসের বেশি কাউকে থাকতে হয় না। কিন্তু আমার অবস্থা এতোটাই অসহায় ছিল যে আমাকে থাকতে হয়েছিল ষোল মাস। আমি নিজে ছিলাম আত্মহত্যা করার চেষ্টায়, ছেলে অটিস্টিক। রেফুজে যাবার আগে আমার পার্টটাইম চাকরি ছিল দুটো আর নিজের নিউট্রিশন বিজনেস চলছিল। আমি কাজ করছিলাম সোশ্যাল সার্ভিসের ড্রাগ এবং এলকোহল বিভাগের সঙ্গে নিউট্রিশনিস্ট হিসেবে। আরেকটা চাকরি ছিল অটিস্টিক এবং লার্নিং ডিসএবিলিটি কেয়ার হোমে। আমি যে রেফুজে ছিলাম সেটি ছিল শুধুই মেয়েদের জন্য। সেখানে আবার দুটো মেয়ে ছিল আমার এলাকা থেকে তারা ড্রাগ এডিকট ছিল এবং তারা আমাকে চিনে ফেললো। দুদিনের ভেতর তারা এই রেফুজ ছেড়ে অন্য রেফুজ এ চলে গেল। সবাই জেনে গেল আমার পরিচয়। অনেক মেয়ে ছিল এলকোহল বা ড্রাগ এডিক্ট, তারা খুব ভয় পেয়ে গেল। অনেকে ভাবছিল আমি বোধহয় আন্ডার কাভার। আর আমি ভাবছিলাম, হায় যাদের সুস্থতার পথে ফিরিয়ে আনতে এতদিন কাজ করছিলাম এখন তাদের সঙ্গে আমাকে রেফুজে থাকতে হচ্ছে! তখনও ইগো অনেক বেশি ছিল। আমার আগের কিছু কলিগ এলো দেখা করতে কাউন্সিল থেকে, সোশ্যাল সার্ভিস থেকে, কেয়ার হোম থেকে। আমার ম্যানেজাররা এসেছিল দেখা করতে। তাদের একজনের সামনেই আবার আমার ওপর রেসিয়াল হামলা হলো। আমার কলিগ আমার জন্য প্রটেকশান চাইলো। রেফুজ এর কর্মচারিরাও জেনে গেল যে আমার সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে। ভালো মন্দ মিলিয়ে চলে গেল ষোল মাস। এলাকায় যেতে পারছিলাম না বলে চাকরিগুলো ছেড়ে দিতে হলো। ব্যবসাও লাটে উঠলো। ক্লিনিক ছেড়ে দিতে হলো। হাতে কোন টাকা আর অবশিষ্ট ছিল না। কোর্ট -পুলিশ কতকিছু তখন ডিল করতে হচ্ছিল! সেই একটা সময় ছিল। শিশু বিশেষজ্ঞের কথায় সব মনে পড়ে গেল আবার।

শিশু বিশেষজ্ঞ আমার ছেলে সম্পর্কে অনেক তথ্য নিল। আমার ছেলে তাকে নিজের লেখা বই দেখালো, ‘Henry’s new friend: Mr Spider’ যা এমাজন থেকে প্রকাশিত হয়েছে ২০২১ সালে। বইটা সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। বইটি একটি অটিস্টিক বাচ্চাকে নিয়ে লেখা, যে কথা বলতে পারে না। আমার ছেলে তার অন্য লেখাগুলোর কথাও বললো। শিশু বিশেষজ্ঞ খুব অবাক হলো। বললো যে তার নিজের দুটো নাতি অটিস্টিক। সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, কীভাবে সম্ভব? আমি বললাম তাকে আমার তৈরি ডায়েট, রান্নার পদ্ধতি, সাপ্লিমেন্ট, আমার থেরাপি টেকনিক, বাচ্চাকে পড়ালেখা, অংক শেখানোর টেকনিক আর ট্রমা রিলিজের জন্য আমার তৈরি সারোগেট টেকনিকের কথা বললাম। কীভাবে এসব পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে আমার ছেলে ভালো হয়ে উঠলো, আর কীভাবে আমার তৈরি অংক শেখানোর পদ্ধতির মাধ্যমে আমার ছেলে এখন Dyscalculia থেকে অনেকটা বের হয়ে এসেছে। আমার ছেলে এখন নিজে নিজে অংক করতে পারে, টাকা গুনতে পারে, যেখানে স্কুলের টিচাররা বলেছিল সে কখনওই অংক বুঝতে পারবে না। আমার ছেলের কোন এপিলেপ্সি হয়নি গত প্রায় তিন বছর ধরে। শিশু বিশেষজ্ঞ খুব অবাক হয়ে আমাদের কথা শুনলো। সে আমার সঙ্গে অটিজম নিয়ে কথা বলা শুরু করলো। আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমি এখন কাজ করি কিনা! আমি তাকে আমার কাজের জায়গার ঠিকানা দিলাম। সে চমকে উঠলো। নাম্বার এক, হারলে স্ট্রিট? সে স্তব্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তার কণ্ঠস্বর পরিবর্তিত হয়ে গেল। সে জিজ্ঞেস করলো, কতদিন ধরে ওখানে কাজ করছি? আমি বললাম, পাঁচ বছর হবে। এবার সে আমাকে বললো যে তার নাতি দুটো খুব পাতলা আর বৃদ্ধি অনেক কম। আমি প্রফেশনাল লেবেল থেকে আমার পরামর্শ দিলাম। এক ঘণ্টা বিশ মিনিট ছিলাম। আসার সময় সে আমাকে বললো, এরকম গল্প আর শুনিনি। রেফুজ থেকে হারলে স্ট্রিট! ইনক্রেডেবল। তুমি নিজে জানো না তুমি কত সফল! আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে গেলাম। ওকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে বের হয়ে এলাম।

আমি ডাক্তারের চোখে আমার জন্য সম্মান দেখেছি। তার উপায় থাকলে সে হয়তো আরও সময় কাটাতো আমাদের সঙ্গে। কিন্তু তার জন্য আরো অনেক রোগী অপেক্ষা করছিল। আমি যেকোনো সেমিনারে বক্তব্য রাখার পর পাশ্চাত্যের মানুষ কেঁদে অস্থির হয়ে এসে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। কেউ আমার হাত ধরে বসে থাকে। অনলাইনের সেমিনারেও অনেক কান্নাকাটি করে। বারবার বলে কীভাবে এসেছো এতোটা পথ?

আমি জন্মেছিলাম ঠিকঠাক। কিন্তু জন্মের বার ঘণ্টার মধ্যে আমার একটা পদবী তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আমি জন্মানোর বার ঘণ্টার ভেতর পাশের বাড়ির খড়ের গাদায় আগুন লেগে যায়। সেই আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে যায় আমার নানার বাড়িসহ পুরো পাড়া। আমার নানাদের গাছতলায় থাকতে হয়েছিল তখন। শনিবার হাটবার ছিল বলে গ্রামের সব পুরুষ মানুষ হাটে ছিল। পাতলা দুবলা নারীরা শুধু তাদের গয়না, টাকা-পয়সা আর দলিলপত্র আর কিছু হাঁড়িপাতিল, চাল-ডাল রক্ষা করতে পেরেছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারির খড়খড়ে শুকনো আবহাওয়ার হা হা আগুন নেভাতে সক্ষম হয়নি। বাড়িঘর হারা অসহায় মানুষগুলো দুর্ঘটনার আকস্মিকতায় স্থবির। কোন এক অজানা আক্রোশে তাদের হাত বারবার মুষ্ঠিবদ্ধ হচ্ছিল। কিন্তু আক্রোশ ঝারবে তো কার ওপর ঝারবে? আগুন লাগালোটা কে?

আরে! গতরাতেই তো জন্ম নিয়েছে একটি শিশু। সেই কালনাগিনী! অপয়া!। অশুচি। কুফা! একে তো মেয়ে! তার ওপর কুফা! আমার মাকেও প্রচুর অপমান, অবজ্ঞা শুনতে হতো বছরের পর বছর একজন কুফা সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য। এই আমি নিজেকে কুফা সজ্ঞান করেই বেড়ে উঠেছি। ছোট থেকেই কারো বিয়ের অনুষ্ঠান বা খুব শুভ কিছু হলে আমি যেতে চাইতাম না। আমার নিজের মামাদের বিয়েতেও যাইনি। কোন খালাদের বিয়েতেও যাইনি। সবাই মজা করতো আর আমি ফোনে শুনতাম। সাহস করে যেতে পারতাম না। বান্ধবীদের বিয়ের সময় অনেকটা বড় হয়েছি। কয়েকজনের বিয়েতে গিয়েছি। কিন্তু যাবার আগে লক্ষ বার সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছি যেন আমি অপয়ার কারণ কারও বিয়ে না ভাঙ্গে। সাহস করে কারো সঙ্গে প্রেম করতে পারিনি। বিয়ে করবো তাও কখনও ভাবতে পারতাম না। সবাই জানতো যে আমি বিয়ে করবো না। কারণটা কেউ জানতো না। কুফা শব্দটি আমাকে তাড়িয়ে বেড়াতো।

আমি আমার মায়ের চোখে একটা আতংক দেখতাম আমাকে নিয়ে। পরিবারের ওপর যত বিপদ আসতো তার অলিখিত দায়ভার পড়তো আমার ওপর। আমিই ছিলাম দুর্ভাগ্যের কারণ। আমি প্রচুর সেলফ হার্ম করতাম। দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতাম। সৃষ্টিকর্তাকে গালি দিতাম। আর আমি লিখতাম। গল্প লিখতাম। কিন্তু সাহস করে নিজের কথা লিখতে পারতাম না। আমি নিজেকে নিজে এতো অপছন্দ করতাম যে, যদি কোনদিন সকালবেলা চোখ খোলার পর আয়নায় নিজের চেহারা দেখে ফেলতাম তো নিজেই কেঁদেকেটে একাকার হয়ে যেতাম। কারণ সকালবেলা কুফা দেখে ফেলেছি তো সারাটা দিন খারাপ যাবে। এটাই আমার নিজের প্রতি নিজের অন্ধ বিশ্বাস ছিল।

যেহেতু খুব বেশি একা থাকতাম তাই আমি প্রচুর পড়াশুনা করতাম। বলা যায় পড়াশুনায় নেশাগ্রস্ত ছিলাম। পরিবারও ছিল নিম্ন মধ্যবিত্ত। টাকা পয়সার টানাপোড়েন ছিল সবসময়। তাই নিজের খরচ চালাতে টিউশনি করতাম। জনকণ্ঠ পত্রিকায় নারী পাতা, রকমারি পাতায়, তরুণ লেখক পাতায় লেখা ছাপা হতো। কিছু টাকা পেতাম। আমি রেজাল্ট বরাবরই ভালো করতাম। খুব কম মানুষই আছে যাদের বিজ্ঞান এবং সাহিত্য দুটিই ভালো। আমি তাদের অন্যতম। কারণ বেশিরভাগ মানুষেরই ব্রেইনের একটা অংশ বেশি কাজ করে, আরেকটা অংশ কম কাজ করে। হয়তো ডান অংশ, নয়তো বাম অংশ। তাই কেউ বিজ্ঞানে ভালো হলে সাহিত্যে তত ভালো হয় না, বা সাহিত্যে ভালো হলে বিজ্ঞানে ভাল হয় না। খাদ্যপুষ্টি ছিল কেমিস্ট্রি, বায়ো কেমিস্ট্রি ভিত্তিক। আমি সারাদিন ক্লাস করে, ছাত্র পড়িয়ে, ফিচার পাতার জন্য সাংবাদিকতা করে,বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে, ফরমাইশই লেখা লিখে, সাহিত্য করে, ছোট গল্প লিখে, উপন্যাস লিখে, সাহিত্য আড্ডা দিয়ে, পুরো একমাস বই মেলায় কাটিয়ে,এন জি ও তে কাজ করে, অনুবাদের কাজ করে, খুব অল্প পরিমাণ পড়াশুনা করে খাদ্য পুষ্টি বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় হয়েছিলাম। সাহস করে বাইরে স্কলারশিপ এর জন্য আবেদন করলাম। পেয়ে গেলাম।কিন্তু ফুল স্কলারশিপ না। টিকিটের খরচ, যাতায়াত, ভাড়ার টাকা মিলিয়ে প্রায় ছয় লক্ষ টাকার ধাক্কা। আমি জানি আমার বাবার সামর্থ্য কতটুকু। সে সময় আমার শরীরও খুব ভালো যাচ্ছিল না। পেটের যন্ত্রণার কারণে জীবন তখন লক্ষ্যচ্যুত উল্কাপিণ্ডের মতো অজানার পথে ছুটছিল। বাবা আমাকে জানালো, আমার বিয়ের জন্য তিনি ছয় লক্ষ টাকা জমিয়ে রেখেছেন। আমি সামনে আশার আলো দেখলাম। বললাম টাকাটা দিয়ে আমাকে বিদেশ পাঠিয়ে দিতে। বাবা বলেন, তাহলে তোকে বিয়ে দেব কী করে!

অনেক অনুনয় এর পর বাবা রাজি হলেন। আমাকে পাঠিয়ে দিলেন ইংল্যান্ডে পড়াশুনার জন্য। আমি বিয়ে না করে পড়াশুনাকে বেছে নিলাম। ইংল্যান্ডে শুরু হয়েছিল আরেক ধরনের যন্ত্রণাময় পথচলা। পড়াশুনার ধরন পুরোটা একেবারেই ভিন্ন। আর সবকিছুর খরচও অনেক বেশি। নিজের ল্যাপটপ ছিল না। সারাদিন, সারারাত লাইব্রেরিতে পড়ে থাকতে হতো। দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছি। যাতায়াতের ভাড়া ছিল না বলে খালি পেটে মাইলের পর মাইল হেঁটেছি। খালি পেটে হাঁটতাম বলে রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে থেকেছি। অপরিচিত মানুষজন সেবা করে ঠিক করে দিয়েছে। এম্বুলেন্স ডেকেছে। ডাক্তাররা বকা দিত। খেতে বলতো। কিন্তু বলতে পারতাম না যে খাবার কেনার টাকা নেই। শুকনা ব্রেড চিবিয়ে খেয়ে পড়ে থাকতাম। এভাবে করেই পড়াশুনা করছিলাম। পড়াশুনা শেষে ফুলটাইম কাজ করার অনুমতি পেলাম। টাকা-পয়সার কষ্ট দূর হতে শুরু করলো। এবার আমার ছেলের বাবার সঙ্গে প্রেম হলো। বিয়ে হলো। আমার বিয়ের সম্পূর্ণ খরচ আমি নিজে দিয়েছি। বাবার কাছে চাইতে হয়নি।

সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল নিজেকে আর কুফা মনে হতো না। ছেলের জন্মের পর আবার ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিলাম। কারণ ইংল্যান্ডে স্বাস্থ্য বিষয়ে হাসপাতালে চাকরি করতে হলে নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়াশুনা করতে হয়। এরপর এদেশে প্রফেশনাল চাকরি পেতে শুরু করলাম। হাসপাতাল, কাউন্সিল, সোশাল সার্ভিসসহ অনেক প্রতিষ্ঠানে অনেক ধরনের চাকরি করেছি আর ট্রেইনিং নিয়েছি। আমার যত বিষয়ে পড়বার ইচ্ছে ছিল আমি পড়েছি। আর আমি যেহেতু নিজেকে আর কুফা মনে করতাম না তাই মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারতাম। আমার কঠিন সময় যখন পার করছিলাম, আমার সংসার ভেঙ্গে যাবার পর যখন ডিপ্রেশনের চরমে ছিলাম, যখন সুখের মাছি সব বন্ধু -বান্ধব ফোন ধরা বন্ধ করে দিল, যাদের কাছে টাকা পেতাম তারা কেউ টাকাগুলো ফেরত দিল না, যখন প্রতিদিন ধসে যেতে যেতে প্রার্থনা করতাম সৃষ্টিকর্তার কাছে যেন আজকের দিনটাই আমার শেষ দিন হয়, যখন রেফুজের সবাই আমার অটিস্টিক ছেলের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ট, যখন হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে একমুঠো দুর্বাঘাসকে হাতের পাতায় নিয়ে চোখ ভরে দেখতে চাইবার হাহাকারে আমার কুফা জীবনের অনুশোচনা আবার ফিরে আসায় দুচোখ চিকচিক করে উঠতো; খুব গভীরে গোপনে আমি তখন ঘুরে দাঁড়িয়ে সফলভাবে বাঁচার স্বপ্নও দেখতাম। সেই আশাই আমাকে টিকিয়ে দিয়েছিল। আমি স্রষ্টায় বিশ্বাস করতে শুরু করলাম। না করে উপায় ছিল না। এমন কিছু একটা ঘটেছিল তখন। আধ্যাত্মিকতা, মাইন্ডফুলনেস, ক্রিস্টাল, কোয়ান্টাম ফিজিক্স এরকম অনেক কিছু নিয়ে ট্রেইনিং নেয়া শুরু করলাম তখন।

আমি একটু একটু করে জীবনের দিকে ফিরতে শুরু করলাম। আমার একমাত্র সঙ্গী ছিল আমার অটিস্টিক ছেলে আর আমার অর্জন করা ডিগ্রিগুলো। আমি ল অব এট্রাক্শন শিখলাম। অবাক লাগে যে আমি এখন ল অব এট্রাকশনের মেন্টর। মানুষকে শেখাই। শত শত মানুষকে সাহায্য করেছি সফলতার সঙ্গে ঘুরে দাঁড়াতে। আর আমি জান-প্রাণ দিয়ে খাটলাম আমার ছেলের পেছনে। আরও পড়াশুনা করলাম। খাদ্য, পুষ্টি, নিউরোলজি, নার্ভাস সিস্টেম, গাট হেলথ, কিনেজিওলজি, এপিজেনেটিক্স, এন, এল, পি, ক্রেনিওসেক্রাম, জানা মত সব ধরনের থেরাপি নিয়ে আমি পড়লাম। আমি আরও আরও শিখলাম।

আমার পাঁচ বছরের ছেলে আমার সঙ্গে মাইলের পর মাইল হাঁটতো। যখন আর পারতো না আমি ওকে কাঁধে নিয়ে হাঁটতাম। তার স্কুল অনেক দূরে ছিল। আশেপাশের স্কুলগুলো রেফুজের অটিস্টিক বাচ্চা নিল না। আমরা ট্রেনে, বাসে, পার্কে, মানুষের বাসায়, সবখানে অপমানিত হতাম। পরে আমার ছেলে আমার সঙ্গে অনেক ট্রেনিং করেছে। সারাদিনের ট্রেনিং। আমরা ওসব জায়গাতেও অপ্রত্যাশিত ছিলাম। কেউ চাইতো না। মাঝে মাঝে যখন খুব বেশি অপমানিত লাগতো, মনে হতো সবকিছু ছেড়ে দিই, আর কত! কিন্তু ততদিনে আমার ছেলে সুস্থ হওয়া শুরু করেছিল। আমি দেখলাম আমাদের কঠিন পরিশ্রম বৃথা যাচ্ছে না। নিজেকে বলতাম,’আরে, তুই কোনদিন খুব স্বাগত ছিলি এই পৃথিবীতে? জন্মের পর থেকে তুই কুফা নামে বেঁচে ছিলি। এমন কোন অপমান নেই যে মানুষ তোকে করেনি। তোর জন্মটাই তো একটা অঘটন ছিল। কিন্তু তুই বেঁচে তো ছিলি। এখনও বাঁচ। নিজের মতো করে নিজের জন্য বাঁচ। তোকে পারতে হবে। তোকে সফল হতে হবে। ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া তোর আর কোন উপায় নেই।’

এরপর আমি বেঁচেছি। আমার নিজের জন্য, আমার ছেলের জন্য, আমার হাজার হাজার ক্লায়েন্টের জন্য। আমার ছেলের শরীরে একের পর এক চেলেঞ্জ এসেছে, আমি উত্তরণ করেছি। আমি সেইসব বাচ্চাদের কে সুস্থ করে তুলি যাদের কে প্রতিবন্ধী বলা হয়।সমাজে যাদের কোন মূল্য নেই। সমাজে যাদের কোন সম্মান নেই। আমি নিজে যাইনি হারলে স্ট্রীট এ কাজ করতে। আমাকে অফার দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি ঘরে বসেও পুরো বুকিং থাকি। আমার বাচ্চাদের সফলতার খবর সারা পৃথিবীতে ছড়াচ্ছে। ক্যানাডা, আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউ কে তো আছেই। বাংলাদেশের ও যারা ট্রিটমেন্ট করিয়েছে, বাচ্চা সুস্থ হয়ে গেছে। একটা বাচ্চার অটিজম, লার্নিং ডিসএবিলিটি ঠিক করার জন্য খাবার, পুষ্টি, থেরাপিসহ শরীরের প্রতিটা বিষয় নিয়ে আমি তাকে সাহায্য করি, সেই সঙ্গে তার মত করে তাকে পড়াশুনা করার উপায় দিয়ে দেই, তার এবং তার বাবা- মায়ের ইমোশনাল রিলিজ তো রয়েছেই। আমার বাচ্চারা ভাল করছে।আমি সেমিনার ক্রি। আমি ওয়ার্কশপ করি। পাশ্চাত্য আমাকে অনেক দিয়েছে। আমাকে চিনে নিয়েছে।আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। পথটা যদি অসম্ভব কঠিন ছিল।

আমার কাজের আরেকটি অংশ হলো আমি সেসব মেয়েদের উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছি যাদের প্রিয়জনেরা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। এই লকডাউনে কত মেয়েকে যে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে! আমি ল অব এট্রাকশন করি। তাই ফ্রি’তে কোন কাজ করি না। তারা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে। আমি আমার সাধ্যমতো। দুবছর। ঘটনা ঘুরে গেছে। তাদের মধ্যে কেউ এখন ব্যাংকে কাজ করছে, কেউ কাস্টমার সার্ভিসে, কেউ নিজের বিজনেসে খুব ভালো করছে, কেউ স্কলারশিপ নিয়ে পড়ছে, কেউ ফিটনেস বিজনেস করছে, কেউ ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ে বিজয়ী হয়ে ফিরে এসেছে, কেউ তার অটিস্টিক বাচ্চাদের নিয়ে লড়াইটা করতে শিখে গেছে, কেউ একাডেমিক হিসেবে চাকরি পেয়েছে, কেউ অত্যাচারী বসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বিজয়ী হয়েছে, কেউ কোর্ট কেস জিতে গেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করা বন্ধ করে দিয়ে আবার পড়াশুনা করছে, কেউ পরীক্ষায় বসে একশতে একশ পেয়েছে অসীম আনন্দে ভেসে বেড়াচ্ছে। সবাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এতো মানুষের সফলতা যার ঝুলিতে … হ্যাঁ… সেই অর্থে আমি তো অবশ্যই সফল। আমি ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আমার ছেলেকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছি। তার প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জগুলোকে সফলতায় পরিণত করে তাকে আনন্দ নিয়ে বাঁচতে শেখাচ্ছি। আমি প্রতি মুহূর্তে আনন্দ নিয়ে বাঁচি।

তবু অনেক সময় ধাক্কা আসে। আমি জেনেছি যে আমার ভাই এর শ্বশুরবাড়ির মানুষজন তাকে প্রতারক বলে, কারণ বিয়ের সময় তাদের জানানো হয়নি যে তার বোনের অটিস্টিক ছেলে আছে। অটিস্টিক মানে ‘পাগল’। আমার ভাইকে অনেক কথা শোনানো হয়। কথা শুনতে শুনতে আমার ভাই ডিপ্রেশনে। আমি জানার পর খুব ভেঙ্গে পড়েছিলাম। খুব কান্নাকাটি করেছিলাম। তারপর মনে হলো কেন এতো কাঁদলাম! পাগল বলাতে? আমার এগার বছরের পাগল ছেলে যখন বই লিখতে পারছে, তার স্কুলের বাচ্চাদেরকে হেলদি খাবার খেতে উদ্বুদ্ধ করতে পারছে, তো সে পাগল দিয়ে ভরে যাক পৃথিবী! আমি তার মা হিসেবে সবসময় গর্ববোধ করে যাবো। ‘পাগল’ একটা স্টিগমা শব্দ ছাড়া আর কিছু নয়।একটা শব্দ মাত্র। তার পেছনের অর্থ আর অনুভূতি গুলো আমরা বসাই। এসব বলে আমাদের কে আর আমাদের বাচ্চাদের কে ছোট করে রাখার প্রচেষ্টা করে এখন আর লাভ নেই।আমরা সবাই পরিপূর্ণ ভাবে অপরিপূর্ণ এবং অপরিপূর্ণভাবে পরিপূর্ণ। উঠে দাঁড়াতে হবে বন্ধুরা! নিজেকে আরেকটা সুযোগ দিতে হবে। দিয়ে দেখো।

আমার ছেলের বই এর লিংক:

Henry’s New Friend: Mr Spider
https://www.amazon.co.uk/dp/B08ZJ97LMV/ref=cm_sw_r_wa_apa_WFYW15S2ZCRNPKETT0XZ

Email: [email protected]

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.