পিতৃঋণ সবসময় সুখকর হয় না সবার

ফাহমিদা খানম:

“এতোটা বয়স হলো তবুও আজও কোন সমস্যায় পড়লে অসহায়ের মতো বাবাকেই খুঁজি। মনে হয় বাবা থাকলে খুব সহজ একটা সমাধান দিতে পারতো”!
একজন বয়স্ক মানুষ চোখের সামনে কান্না করছেন, আর নিজের বাবার বিষয়ে স্মৃতিচারণ করছেন কর্মীদের সাথে, অন্যদিন বস হলেও এইদিনে উনি ছোট হয়ে যান। পিতা –পুত্রের কথা শুনে আমাদের সবার চোখেই পানি আসে। প্রতি বছরই শুনি তবুও নতুন মনে হয়।

“আজকে আমি এই পর্যায়ে এসেছি শুধু বাবার জন্যেই, জীবনে যখন যে কাজে নেমেছি বাবার সাথে কথা বলেই ডিসিশন নিতাম। ২০ বছর হলো সেই কণ্ঠস্বর আমি শুনি না!”
অবাক বিস্ময়ে আমরা সকল কর্মী শুনে যাই, বারবার মনে হয় আমার বাবা যদি সামান্য সদয় হতো তাহলে আমাদের পরিবারের অন্যরাও হয়তো মধুর স্মৃতিচারণ করতে পারতাম, তবে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

একটু বোধ হওয়ার পরে দেখেছি বাসার সবাই বাবার মেজাজকে ভয় পায়, সামান্য এদিক-ওদিক হলেই বাবা আমাদের বেদম পিটাতেন। আমাদের বাঁচাতে গিয়ে মায়ের কপালেও সেসব জুটতো। দাদী মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন—
“বউ মনে রাখবা রাগী মাইনষের মন ভালো হয়”

বাবার মন ভালো কী খারাপ সে বিচারের সাহস আমাদের ছিলো না। ধোঁয়া উঠা গরম ভাত, তরকারি আর গরম রুটি বানাতে মাকে সবসময় তটস্থ দেখতাম, এর বাইরে সামান্য ভুল হলেই সামনে যা পেতেন সেটাই মায়ের দিকে ছুঁড়ে মারতেন। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় এক বন্ধু স্কুলে কয়েকদিন অনুপস্থিত দেখে ওর বাসায় খবর নিতে গিয়ে দেখি ও আর ওর বাবা ক্যারামবোর্ড খেলছে। এমন দৃশ্য দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম বৈকি! সন্তানের সাথে বাবার আচরণ যে এমন হতে পারে আমার কল্পনাতেও ছিলো না। আমরা পাঁচ ভাইবোন সবসময়ই বাবাকে প্রচণ্ড ভয় করতাম। এর মধ্যেই আমাদের একটা বোন হয়, তবে সে স্বাভাবিক ছিলো না। ছয় মাসেও যখন সে শব্দ করে না, ডাকলে তাকায় না, মা বাবার কাছে চিকিৎসার কথা বললেও বাবা পাত্তাই দেয় না। এর মধ্যে বড়দা টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করার পর বাবা বেদম মারধর করায় সে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলো।
মায়ের কান্নায় বাবা বলতেন
“পেটে টান পড়লেই ছুটে আসবে”।

নাহ, বড়দার খবর আর পাওয়াই গেলো না। আত্মীয়স্বজনের বাসায় না পেয়ে বাবা মাকেই দোষ দিতেন। ছোট বোনটা গোঁ গোঁ শব্দ করলে মা ছুটে যেতেন। আগের মতোন বাবার পছন্দের খাবার দিতে পারতেন না, তাই বাবা আরও রেগে যেতেন, আর ওর মৃত্যু কামনা করতেন। বড় আপু তখন মাকে সাহায্য করতো, কিন্তু বাবার অদ্ভুত অভ্যাস তার সবকিছু মাকেই করতে হবে, আর খাবার সময় সামনে থাকতে হবে। মা দিশেহারা হয়ে যেতেন আর নিত্যকার গালিগালাজ স্বাভাবিক ছিলো। বাবা ভোজনরসিক ছিলেন বলে পাতিল সামনে নিয়ে বসতেন, উনার খাবার পর বাকিটা মা আমাদের দিতেন। বাবা ঋণ করে ভালো খাবার খেতেন বলে মা প্রায়ই বাবাকে বুঝাতে গেলে উল্টো ঝাড়ি খেতেন। একদিন কলেজ থেকে বড় আপু বাসায় ফিরলেন না, খোঁজ নিয়ে জানলাম পাশের বাসায় পড়াতে আসা মাস্টারের খবরও নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। বাবা মায়ের সাথে রাগারাগি করার পর সেই প্রথম মা স্পষ্ট করে বলেছিলেন—
“আপনি যদি বাচ্চাদের আদর মহব্বত করতেন আজকে সংসারের এই হাল হতো না”।

বাড়িতে দুজন মানুষের অনুপস্থিতি বাবাকে নাড়া না দিলেও প্রায়ই মায়ের মাতম শুরু হতো। এর মধ্যেই ছোট বোনটা হুট করে মারা যাওয়ায় মায়ের সমস্যা দেখা দিলো। সারাদিন বিড়বিড় করে সেই বোনের সাথে কথা বলেন। আমি এসএসসি দিলাম আর কলেজেও ভর্তি হলাম, আর ছোট ভাইটা প্রায়ই বাসায় ফিরতো না। সংসার একরকম অচল প্রায়, কেটে গেছে পাঁচ বছর। বাবা মাকে হুমকি দিলেন তার সংসার চলছে না, তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করবেন।
তবে মা খুব শান্ত গলায় উত্তর দিলেন—
“আপনি দ্বিতীয় বিয়ে করে সুখে–শান্তিতে থাকেন আমার আপত্তি নাই, তবে সন্তানদের অভিশাপ আপনি পাবেনই”।

বাবা কিছুই বললেন না দেখে অবাকই হয়েছি সেদিন। তবে বড়দা হুট করে বউসহ বাড়িতে আসার পর মা খুশি হলেও বাবা সেই বিয়ে মেনে নিলেন না। শুনলাম চিটাগাং শিপইয়ার্ডে কাজ করছে সে আর সেখানেই তাদের পছন্দ আর বিয়ে। কয়েকদিন পর বড় আপু দুই বাচ্চা নিয়ে উপস্থিত, শুনলাম দুলাভাই এক্সিডেন্টে মারা যাবার পর শ্বশুরবাড়ির তারা আপুকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
এই প্রথম বাবাকে দেখলাম কিছুই বললেন না। শরীরে তখন নানাবিধ অসুখ ধরেছে তার। আমাকে বললেন দোকানের হাল ধরতে। পাড়ায় আগে আমাদের একটা জেনারেল স্টোর ছিলো। আগে দোকান ভালো চললেও এখন আধুনিক অনেক দোকান হয়েছে, সেসব দোকানে শীতল বাতাসে মানুষ কেনাকাটা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। দোকান আর আগের মতো চলেও না।
হুট করেই বাবা ভয়ংকর চুপ হয়ে গেছিলেন, আর পড়াশোনা ছেড়ে বাধ্য হয়ে সংসারের ভার আমার কাঁধে এসে পড়ায় পড়ালেখা আর শেষ করা হলো না আমার। প্রায়ই বাসায় দেনাদাররা আসতো, আর টাকার জন্যে চাপ দিতো। সংসারের খরচই সেভাবে চলে না, দেনা মেটাবো কী করে? এতো চাপ নিতে না পেরে একদিন ঘুমের মধ্যেই বাবা মারা গেলেন প্রচুর ধার-দেনা রেখে।

দোকান বিক্রি করে আর মামার সাহায্য নিয়ে আমি চলে এলাম মধ্যপ্রাচ্যে, তবে অমানবিক খাটুনি খেটেও টাকা কম দেয় বলে পালিয়ে গেলাম। এই দোকানে আছি পাঁচ বছর, আর ছোট ভাইটাও কীভাবে জানি আফ্রিকা চলে গেছে কারো দোকানের সহকারি হয়ে। ও নিজেও যুদ্ধ করছে, সাথে আমিও প্রাণপণ চেষ্টা করছি সংসারের অবস্থা ভালো করতে।
ফোন করলেই মা তাগাদা দেয় দেশে ফিরতে, আমার নাকি বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। আমি নিজেও বুঝি বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ধারদেনা শোধ করে এখনও কিছুই গোছানো হয়নি। আরেকজনকে এনে দেশে ফেলে আমি তার সাথে অন্যায় করতে পারি না। দেশে গিয়ে কিছু করার মতো অবস্থা হতে আরও সময় লেগে যাবে। দেশে গেলে আর ফিরতেও পারবো না জেনে চুপই থাকি। এতোবড় সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিজের কথা ভাবা হয় না। বড় ভাইকে দুবার ব্যবসা করার টাকা দিলেও লস খেয়ে ঘরে বসে থাকে। মা বলে বাবার কার্বন কপি হয়েছে, সারাদিন নাকি ভাবিকে আর বাচ্চাদেরকে তটস্থ করে রাখে। আমরা দুই ভাই বিদেশের মাটিতে প্রাণান্তকর পরিশ্রম করে যাচ্ছি সুদিনের আশায়।

বস প্রায়ই বলেন—
“তুমি তো কাজ করতে গিয়ে বিয়ের বয়সটাও পার করে ফেলছো ইয়াংম্যান, চাইলে আমি তোমার আগের কোম্পানির সাথে কথা বলে দেশে যাবার ব্যবস্থাটা করে দিতে পারি”
লজ্জায় বলতে পারি না দেশে আমার উপরে নির্ভর করে বেঁচে আছে অনেকগুলো প্রাণ!
পিতৃঋণ সবসময় সুখকর হয় না সবার।

ফাহমিদা খানম

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.