নারী দিবসে কতশত ভাবনা -১

শাহ্‌রীন শবনম মুমু:

(১)

মার্চ পড়লেই স্বাধীনতা দিবসের বাইরেও আরও একটা দিবসের আমেজে ছেয়ে যায় হোমপেজ, ছেয়ে যায় শোরুম, ছেয়ে যায় মনের উঠোন।

৮ই মার্চ কে ঘিরে কতশতই না আয়োজন বিপণী বিতানে, কর্পোরেট হাউজগুলোতে! কত ফুল, কত ক্যান্ডি-কেক, কত রঙ! যতটুকু জানি, সাদা, সবুজ আর বেগুনী হলো এই দিনের রঙ।

সাদা শুদ্ধতার (পিউরিটি) প্রতীক, সবুজ আশা (হোপ), আর বেগুনী হলো ন্যায়বিচার আর মর্যাদার (জাসটিস এন্ড ডিগনিটি) প্রতীক। বেছে বেছে আমরা বেগুনী রংটাকেই এই দিনের জন্য হাইলাইট করি, বা করতে চাই।
আমাদের যুদ্ধটা তাহলে কি ‘জাসটিস এন্ড ডিগনিটি’কে ঘিরেই বেশি আবর্তিত?

কী জানি!

এই একটা দিনে সম্মান দেখানোতেই যদি ‘জাসটিস এন্ড ডিগনিটি’ এনশিওরড হতো, তাহলে তো ভালোই হতো। কিন্তু বাস্তবচিত্র তো সম্পূর্ণ বিপরীত! কোনটা রাখি, আর কোনটা বলি অবস্থা। ঘরেরটা, নাকি বাইরেরটা!

আট দিনে আটটা গল্প, মন্দ না।

আমাদের, মানে মেয়েদের বায়োলজিক্যাল ক্লক আর ক্যারিয়ার ক্লক যে সম্পুর্ণ দুই মেরুতে ঘোরে, সেটা আমরা ভেবে দেখি কয়জন? কয়জন পাশে থাকি?

একজন ‘মা হয়ে ওঠা’র মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ক্যারিয়ার যদি বাঁধ সাধে! বাচ্চাকে গর্ভে ধারণ করার ঠিক আগে একটা শারীরিক এবং মানসিক প্রস্তুতির দরকার হয়, এরপর গর্ভকালীন সময়, এবং তারপর বাচ্চা ভূমিষ্ট হওয়ার পর বাচ্চা, আর নতুন মা- দুজনেরই কিন্তু নতুন জীবন। যে জীবন সম্পূর্ণ নতুন, সম্পূর্ণ আলাদা, এবং অচেনা।
ঠিক এই সময়টাতে আমাদের চিরচেনা, পুরোনো সম্পর্ক – কি ঘরে, কি কাজের জায়গায়, আমাদের কাছে কি অপরিচিত ঠেকে না?

ঘর বলে, ‘আমি/আমরা তোমার এবং বাচ্চার নিরাপত্তা আর সুস্থতা ছাড়া আর কিচ্ছু বুঝিনা’। বাইরে বলে, ‘এই সময়টাতে তোমার পেছনে কোম্পানীর যে ইনভেস্টমেন্ট, তা তো পুরোটাই লস’!

কত মেধাবী, উদ্যোমী মুখ যে শুধু এই সময়টাকে ফেস করতে গিয়েই ঝরে যায়! যেই সময়টাতে ক্যারিয়ারের দৌড়, ঠিক সেই সময়টাতেই জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের ডাক।

ঠিক এই কারণে আমি ‘ইকুয়ালিটি’র চাইতে ‘ইকুইটি’র কথা বলতে চাই বার বার।

ঘরের মানুষটাকে যেমন এডমিট করে নিতে হয়, নতুন এই মানুষটার দায়িত্বটা যৌথ, নানা-নানী, দাদা-দাদী প্রত্যেকের রোল আছে এই মানুষটাকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করার। যেখানে আমাদের দেশে ডে-কেয়ার ফ্যাসিলিটি খুব সীমিত, যৌথ পরিবার বিলুপ্ত প্রায়।

এরই মাঝে আবার যদি থাকে এমন হীনমানসিকতা! মেয়ের ঘরের বাচ্চা পালতে ক্লান্তি নেই, কিন্তু ছেলের ঘরের বাচ্চাকে দেখে রাখবে, বাড়ির বউ কাজে যাবে – এ যেন পাপ! আবার অন্যদিকে মেয়ের বাসায় মা থাকবে? সে নিয়েও বিলাপ, মেয়ের মা জামাই বাড়ি থাকে! অন্তহীন প্রলাপ…

অন্যদিকে কাজের জায়গাটাতেও নতুন মা-বান্ধব পরিবেশ থাকাটা জরুরি। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বলতে শুনেছি অনেক, কিন্তু আদোতে সাপোর্ট করতে দেখিনি। কোম্পানির কালচারে যদি ইনবিল্ট না থাকে তাহলে কোম্পানির এইচআর বলি, আর সুপারভাইজার বলি, কতটা আর এম্প্যাথিটিক হতে পারে!
একজনকে সুবিধা দিই, আবার অন্যজনকে দিই না – এমন কালচার আমার নিজের চোখে দেখা। সামনেই মা হতে পারে, শুধু এই ভাবনা থেকে প্রমোশন না দেয়া, ম্যাটার্নিটি লিভ থেকে ফিরে আসার পর তার পজিশন ক্লোজ করে ফেলা, ইন্টার্ভিউ, ইয়ার্লি এপ্রেইজাল বোর্ডে বাচ্চা নেয়ার প্ল্যান নিয়ে আলোচনা – সবকিছুই চলে, চলছে।

এসব কিছু একটা মেয়ের জীবনের খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ভেবে নেয়া যেত যদি! যদি পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে তাকে সব রকম সাপোর্ট করে যাওয়া যেত! আমি তো জানি, কতগুলো উদাহরণ আমার মনের কোণায় জ্বলজ্বল করছে, যারা কত ডেডিকেটেড ছিল, মেধাবী ছিল!

মেয়েদের মা হয়ে ওঠার জার্নিটা শান্তির হোক, যুদ্ধের না হোক।

শাহ্‌রীন শবনম মুমু
১লা মার্চ ২০২২

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.