ঠিকানা

ফাহমিদা খানম:

ও ঘর থেকে কন্যার কান্নার শব্দ এলেও আমার যাওয়ার সাহস হচ্ছে না আমি জানি সারা এখন দরজা খুলবে না। আমরা ননদ ভাবি স্তব্ধ হয়ে মুখোমুখি বসে আছি। বলার মতো কোনো কথা আমাদের শব্দভাণ্ডারে আসলে নাই।

“সারার ভেতরে এতো ক্ষোভ জমে আছে আগে তো বুঝিনি ভাবি”
“সারা চাপা স্বভাবের বলে কখনো কিছু প্রকাশ করে না , আমি নিজেও কি জানতাম ওর ভেতরের খবর ?”
“ভাইজানকে কী বলবো ভাবি? উনি আগামী মাসেই দেশে ফিরবেন”
“একদিন আমাকে এই সন্তানকে অস্কীকার করেছিলেন তোমার ভাই”
“পুরনো কথা ভুলে যাও ভাবি, সারার বিয়ের প্রস্তাব এলেই বারবার ভেংগে যায়, ওর কথা ভাবো আর সারার বিয়ের পর তুমি কি একা একা থাকবে নাকি?”
“আমি তো সবসময়ই একা, আমার কথা বাদই দাও, তোমার ভাই বৃদ্ধ বাবা-মাকেও দেখতে আসেনি, অথচ উনারা অপেক্ষা করেছিলেন মৃত্যু অব্দি”।
“ভাইজান জানিয়েছেন, উনি তোমাদের কাছে ক্ষমা চান, আর শেষ বয়সটা নিজের বাড়িতেই থাকতে চান”।

হুট করে রুমের দরজা খুলে সারা এসে উত্তর দিলো –
“উনি এ বাড়িতে উঠবে কীসের অধিকারে?”
“এতো তেজ দেখিও না সারা, মনে রেখো এটা আমাদের পৈত্রিক বাড়ি”
“আমার মা বুঝি তোমাদের বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণকারী ছিলো? এতো বছরে কখনও কি মনে পড়েনি কীসের মায়ায় সে এখানে ছিল? মৃত্যু অব্দি দাদা-দাদীকে মাকেই দেখতে হয়েছে, আর এখন বলছো এখানে আমাদের অধিকার নাই?”
“মাথা ঠাণ্টা কর সারা, মনে রাখিস তোর বিয়ে দিতে গেলেও বাবা লাগবে”
“বাবাবিহীন মেয়েদের বুঝি বিয়ে হয় না? আর না হলে নাই”
“সুযোগ বারবার আসে না সারা, আর উনিতো তোদের কাছে ক্ষমা চাইতে প্রস্তুত”।
“উনি কেনো আসছেন সেটা তুমি না জানলেও আমি খুব ভালো করেই জানি। আমাদের ক্ষত কি উনি মুছে দিতে পারবেন ? আমার মায়ের জীবনের এতোটি বছর ফিরিয়ে দিতে পারবেন? বুঝ হবার পর থেকেই মাকে ঘরে-বাইরে যুদ্ধ করতে দেখেই বড় হয়েছি আমি”।
“আমি কি তোর পর? তোদের ভালো কি আমি চাইতে পারি না?”
“আজীবন সবার করুণা আর দয়ায় যারা বড় হয় তারা আসলে কারোই আপন না ফুফি”। মেয়ে আবার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো আবারো সীমাহীন নির্বাক হয়ে আমরা দুজন বসে আছি।

সবে ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে সেখানে আমার শ্বশুর দেখে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। উনি আমার সেই আত্মীয়ের পরিচিত ছিলেন। সরকারি ব্যাংকে ছেলে চাকুরী করে। ছোট এক ভাই আর বোন। তাদের কোনো চাহিদাও ছিলো না, তাই ভাইয়েরা বিয়ে ঠিক করলো। বাবা ছিলো না তাই ভাইদের পছন্দের উপরে কথা বলার সাহস হয়নি। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এলে বিয়ে হয়ে যায় আমার। বিয়ের পর আমাকে কর্মস্থলে নেবার কথা থাকলেও ছোট বোনের বিয়ে ঠিক হওয়ায় বিয়ের পরেই নিবে ঠিক হয়। ছয় মাসের মাথায় বাড়ি ফেরার সময়ে লঞ্চডুবিতে ওর মৃত্যু হয়, প্রথমে পাওয়া না গেলেও তিনদিন পর যখন পাওয়া গেলো, তখন ফুলে ফেঁপে ঢোল। পুরো পরিবারে মাতমের সামনে আমি ছিলাম নির্বাক, আমার চোখে পানি আসেনি।
বিয়ের পর কতটুকুই বা আমাদের চেনাজানা হয়েছিল! সংসার শুরু করার স্বাদ হয়নি আমার। কয়দিনইবা দেখা হয়েছে! কতটুকুইবা জানা হয়েছে দুজন দুজনকে?
আমাকে সংসার করার স্বপ্ন দেখানো মানুষটা নাই আর কখনও ফিরবেও না।

ভাইয়েরা নিতে এলে শ্বশুর-শাশুড়ি জানায়, ঈদ্দতকালীন সময় শেষ হলে তারপর তারাই দিয়ে আসবেন। সবার চোখেমুখে আমার জন্যে করুণা ছিলো আর কারো চোখে ছিলাম অপয়া। আমি আমার ভাগ্যকে মেনে নিলাম । কোন শোকই জীবনকে থামিয়ে রাখে না প্রকৃতি নিষ্ঠুর তাই ঈদ্দত শেষ হবার পরেও আমার যাওয়া হয় না। ঘরোয়া পরিসরে ননদের বিয়ে হয়ে যায় অথচ দুই ভাই একমাত্র বোনের বিয়েতে কতো কী করবে সেই কথাগুলো মনে করে আমিও কষ্ট পাই। ননদ বিদায়ের সময় বারবার অনুরোধ করে ভাইটা না যতদিন মা-বাবাকে নিতে পারছে, আমি যেন তাদের পাশেই থাকি, আমার আর যাওয়া হয় না। চাচাশ্বশুর গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক নেবে শুনে নিজে আমাকে নিয়ে গেলেন। চাকুরী হবার খুশিতে নিজেরাই আনন্দ ভেসে গেলেন। সবাই অনেক স্নেহ করতেন বলে আমার আর ভাইদের সংসারে ফিরে যাওয়া হয় না। এর মধ্যে মা-বাবাকে ঢাকায় নিতে এলেও উনারা যেতে অস্বীকার করেন। আমি তখন ঘরে-বাইরে একা হাতে সামলাচ্ছি। এক ঈদে সবাই বাড়ি এলে দেবরের সাথে আমার বিয়ে দেবার জন্যে উঠেপড়ে লাগে সবাই, আমার ভাইয়েরাও রাজি, কিন্তু কেউ আমার মতামত নেবার দরকার মনে করে না।

আমাদের বিয়ের রাতেই সে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় সে আমাকে বউ হিসাবে মেনে নেবে না, অথচ আমি বলতে পারি না আমার ভুল কোথায়?
বিয়ের পরেই সে ঢাকায় চলে যায় মাঝেমধ্যে মা-বাবার জন্যে কিছু টাকাপয়সা পাঠালেও কখনও আমার খোঁজ নেয় না। আমি আমার ভাগ্যকে মেনে নেই, তিনমাস হবার পর শাশুড়িমা মিথ্যা খবর পাঠিয়ে বাড়িতে আনায় তাকে। সবাই মিলে তাকে চেপে ধরে কেনো সে স্ত্রীর দায় দায়িত্ব নিচ্ছে না?

“এই বিয়ে আপনাদের পছন্দে হয়েছে, তাই আমার কোনো দায়িত্ব নাই”
বাবা ছেলের বাদানুবাদ আমরা বউ-শাশুড়ি নির্বাক হয়ে দেখি , মা আমার হাত ধরে বলে—
“আল্লাহপাক তোমার পরীক্ষা নিচ্ছেন মা, একটু সবর করো, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে”

এক সপ্তাহ পরে সে ঢাকায় ফিরে যায়, তারপর আর খোঁজ নাই, কিন্তু আমি অনুভব করি অনাগত একজন আসছে। বাড়িতে খুশির ঢল বয়ে গেলেও সেই মানুষটা জানিয়ে দেয় এই সন্তানের দায় সে নিবে না। সারার জন্মের পর উড়ো খবরে শুনি ইউরোপের এক দেশে থিতু হবার জন্যে এক সন্তানসহ নিজের বয়সের অধিক একজনকে বিয়ে করে সেখানে চলে গেছেন। প্রথমে মা, তারপর বাবাও চলে গেলেন। আমার আর কোথাও যাওয়া হলো না, সারাকে নিয়ে এই বাড়িতেই কাটিয়ে দিলাম জীবনের এতোটি বছর। সেই স্কুল সরকারি হয়েছে, আমিও এখন হেডমাস্টার হয়েছি। সারা ঢাকায় ভার্সিটিতে পড়ে। ওর বিয়ের প্রস্তাব এলে ভেংগে যায়। হ্যাঁ, সমাজ, সংসার অনেক বদলেছে, কিন্তু মা- বাবার শাস্তি কেনো সন্তান পাবে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি আমি।

গত সপ্তাহে সারার ফুফু এসে জানালো সে ক্ষমা চায়, নিজের বাড়ি ফিরতে চায়। অথচ নিজের মনে করে এতোটি বছর আমি এই সংসার চালিয়ে গেলেও সত্যিকার অর্থে আমি এ বাড়ির বউ মাত্র! নারীদের একটা ঠিকানা আসলে কখনও হয় না।
দুবার বিয়ে হবার পরেও আমার সংসার করা আর হলো না কেবল দায়িত্ব আর কর্তব্য করে গেছি। এই বয়সে এসে কোনো চাওয়াও নাই, শুধু মানুষটাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, সে যদি আমাকে মন থেকে ভালোই না বাসতো, তাহলে শরীর কেনো সেদিন সামলাতে পারেনি?

সারার কথা, বাবার স্নেহ, ভালবাসা কী আমি জানি না। মা-ই আমার সবকিছু। বাবা বেঁচে না থাকলে তবুও তাকে সম্মান করতাম, কিন্তু যে বাবা নিজের স্বার্থের জন্যে সন্তানের দায় নেয়নি, তার জন্যে আমার মন থেকে কিছুই আসে না। দাদী সবসময় বলতো, তোর মা জীবনে কিছুই পায়নি। আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় উনাদের মতো এতো ভালোমানুষের সন্তান কীভাবে এতো আত্মকেন্দ্রিক হয়েছিল?
বাবার সব খবরই আমি জানি, তার সংসার ভেংগে গেছে, সেটাও জানি। দুজনে মিলে সেখানে যা করেছিলেন সবই স্ত্রীর নামে, তাই সে বিয়ে ভেংগে যাওয়ায় তিনি এখন নিঃস্ব, তবে সে দেশের সিটিজেন বটে! নিঃস্ব হয়েই কি বুঝেছেন, নাকি শেষ বয়সে একাকিত্বকে ভয় পেয়ে দেশে ফিরছেন? মা আমাকে নিয়ে যুদ্ধ করেছেন, আমিও মাকে অসম্মান করা মানুষটার সাথে এক ছাদের নিচে থাকতে চাই না। একটা মানুষ নিজের সবটা উজাড় করে দিলেও সময়ে সবাই নিজের স্বার্থ বড় করে দেখে তাই হয়তো ফুফু মনে করিয়ে দিলেন বাড়িটা তাদের পৈত্রিক!

নারীদের আসলে একটা ঠিকানা বড় বেশিই দরকার।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.