কৃতজ্ঞতা, ক্ষমা, স্বীকৃতি ও সম্মান কেন প্রয়োজন?

আনন্দময়ী মজুমদার:

সেদিন আমার সন্তানকে বলতে চাইছিলাম — সঠিক যোগাযোগের অভাবে, বিশেষ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ আর ক্ষমা চাওয়ার ক্ষেত্রে ভুলে যাওয়া — এইসব থেকে আমাদের অনেক ভুল বোঝাবুঝি আর শীতলতার জন্ম হয়।

কারও সেবাকে আমরা যদি টেকেন ফর গ্র্যান্টেড নিয়ে থাকি, তাহলেই সেটা ভুলে যাওয়া নয় কী? তাকে স্বীকৃতি আর সম্মান দেওয়া তো জরুরি। অনেককে দেখেছি, পারলেই অন্যদের প্রশংসা করে থাকে। তাদের কেমন লাগে আমি জানি না, কিন্তু কাউকে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান দিয়ে কিছু বললে নিজের ভিতরে খুব সুখের অনুভূতি হয়, এইটা সত্য কথা। আবার যখন আমরা ভেবে দেখি সকাল থেকে রাত্রি, রাত্রি থেকে সকাল, আমরা কত মানুষের কত সেবা আর দান গ্রহণ করে থাকি, তখন সত্যি বিস্মিত লাগে।

ভালো থাকা, সুখী থাকার জন্য কৃতজ্ঞচিত্তে অন্যের দান মূল্যায়নের দরকার আছে, এই কথা আমার এক সাইকোলজিস্ট ও লেখক শিক্ষক বলেছিলেন। বলতে ভুলে না যাই, আমি আজন্ম ছাত্র, তাই অনবরত নতুন পাঠের সুযোগ এলে নানা কোর্স করি, বই পড়ি আর নিজের অজ্ঞতার সীমাকে একটু কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে থাকি। ভালোই লাগে। মনে মনে তরুণ থাকা যায় সেকথা সত্যি। সেই শিক্ষক এমন অনেক মানুষকে অনলাইন কোচিং দিয়ে থাকেন। তাঁর কোর্স থেকে বুঝেছিলাম কৃতজ্ঞতা ও ক্ষমা চাওয়া — এই দুটির গুণ কতখানি। যেহেতু ভুল করলেও আমরা অন্তর থেকে ক্ষমা চাইতে ভয় পাই (আসলে আমরা পাই তা নয়, আমরা শিখেছি এতে আত্মসম্মান ক্ষুণ্ন হয়) সেইজন্য আমরা তা করি না। যা হোক, কৃতজ্ঞতা জানানোটাও আমরা অনেক সময় বাহুল্য মনে করি। কিন্তু সব বড় বক্তার কথা শুনতে গিয়ে দেখেছি তাদের কথার সবচেয়ে বড় অংশ হলো কৃতজ্ঞতা। বলা যত সহজ করা ততই কঠিন। গ্রহণ করার সময় মনে থাকে না কত মানুষের কত স্নেহ, প্রশ্রয়, ভালোবাসা, শক্তি, কত দান, কতকিছু আমরা অনায়াসে অবলীলায় গ্রহণ করেই চলেছি।

একজন হেল্পিং হ্যান্ড যিনি একজন সিঙ্গল মাদার, নিজে সারা জীবন অন্যের বাসায় খাটাখাটুনি করে দুই মেয়েকে ভালো শিক্ষা দিয়েছেন, এম.এস পর্যন্ত পড়াশুনো করিয়েছেন, তাদের ভালো-মন্দ বিচারক্ষমতা আর বিচক্ষণতা আর ভদ্রতাবোধ শিখিয়েছেন, তাদের এখন সন্তানাদি হয়েছে, সেই নাতিপুতিদেরও সাপোর্ট দিচ্ছেন, আমি তার কথা ভাবছিলাম।

কোনো এক পর্যায়ে তিনি ও আরেকজনের মধ্যে একটি ভুল বোঝাবুঝি ও মতের অমিল আর অভিমান খুব বেড়ে গেছিল, কিন্তু কৃতজ্ঞতা আর স্নেহ দিয়ে সেইসময় তাঁকে সেই সময় বুঝতে পেরেছি, এবং তাঁকে শ্রদ্ধা দিতে পেরেছি বলে তাঁকে পরে বোঝাতেও পেরেছি আরেকজনের দিকটি, কী করা এই মুহূর্তে জরুরি সেটি তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। তাঁর জন্য, আমার জন্য, সেটা অদ্ভুত খুশি আর বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল। তিনি কখনও ভাবেননি, একজন “বিদেশ-ফেরত জ্ঞানীগুণী প্রফেসর মানুষ” তাকে বুকে জড়িয়ে ধরবেন (এই ধরনের বিশেষণে আমার হাসি পেলেও উনি কিন্তু অন্যদের শ্রদ্ধার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে ভুলে যাননি), যদিও তাঁকে আমি অনেকদিন ধরে দেখছি, এবং আমি তাকে আপা বা দিদি বলেই ডাকি। তিনিও তেমন ডাকই ব্যবহার করেন আমার ক্ষেত্রে।

কিন্তু সেই কৃতজ্ঞতাবোধ সত্যি ছিল, তাই সেদিন একটা কঠিন মতানৈক্যের মুহূর্তে শ্রদ্ধাশীল কৃতজ্ঞতাবোধের কাছে আমি শরণ নিয়েছিলাম, আর ভুল বোঝাবুঝির জন্য ক্ষমাও চেয়েছিলাম। যদিও সমস্যাটা দুই তরফা ছিল, আর আমি তৃতীয়পক্ষ ছিলাম।

দুই পক্ষের দুঃখ বোঝার জন্য, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা আর তার দুঃখভোগের জন্যে এমনি এমনি একজন মানুষ হিসেবে তাকে সরি বলা, একসঙ্গে করেছিলাম বলে কী করে যেন সেদিন আমি নিজেই খুব আনন্দবোধ করেছি। আর এটাও দেখেছি এতে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে। অনেক বাস্তব পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যেতে পারে। যেহেতু একটি স্বচ্ছ মন লাগে, তাই বারবার নিজেকে প্র্যাকটিস করে শিখতে হয়। আর আমরা যদি আমাদের সন্তানদের কৃতজ্ঞতা দেখাতে পারি, শ্রদ্ধা দেখাতে পারি, ক্ষমা চাইতে পারি, তাহলে কোনো দিন তারাও সেটা ফিরিয়ে দেবে বলেই মনে হয়।

এখনো দেখতে পাই, শুধু একটু স্বচ্ছ, সুস্থ, সংযোগের অভাবে কত মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অন্যের কথা জানি না, এই বিচ্ছিন্নতাবোধ আমার যে একেবারে হয় না তা কী করে বলি? বরং সত্যি বলতে গেলে, আমার ভুলে-যাওয়া স্বভাবের জন্য অনেক বকাবকি খেতে হয়েছে আমাকে ছোটবেলায়। অনেক সময় আমরা ইচ্ছে করে অনাদর করি তা নয়, কিন্তু শ্রদ্ধার ব্যাপারে ‘ফেয়ার আর বিশ্বজনীন’ হওয়া খুব জরুরি সেটা বুঝতে পারি।

কৃতজ্ঞতার প্র্যাকটিস আমাদের মনের দুঃখ আর বেদনাও অনেক অনেক কমিয়ে আনে, আমাদের রোগ-বালাই দূর করে, এটা সাইকোলজিস্টরাও আজকাল বলছেন। শুনতে অবাক লাগলেও কৃতজ্ঞতাবোধ আমাদের অনেক ক্রনিক অসুখ সরিয়ে দিতে পারে।

যখন কেউ সত্যি হৃদয় থেকে কৃতজ্ঞতা নিয়ে কথা বলে তখন কী ভালোই না লাগে। আমিও অনেক সময় অন্যের কাজ আর কৃতিত্ব আর দানধ্যানকে মর্যাদা দিতে ভুলে যাই বলে মনে মনে দুঃখ পাই। চেষ্টা করি প্রথম সুযোগে জানিয়ে দিতে, আমি কত কৃতজ্ঞ। শুকনো ধন্যবাদ আর আন্তরিক কৃতজ্ঞতা এই দুইয়ের মধ্যে তো নিশ্চয়ই তফাৎ আছে।

ব্রেনে ব্রাউন বলে খুব বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী আছেন যিনি কৃতজ্ঞতার ওপর রিসার্চ করেছেন, তিনি বলেছিলেন, কৃতজ্ঞতাবোধ আমাদের জীবনে কত কাজে আসে তা বলে শেষ করা যায় না। আমি অনেক সময় সে-কথা ভুলে যাই, অনেক সময় ভুল স্বীকার করতেও ভুলে যাই, কিন্তু আমি জানি আমার কাছে আরেকজনের কৃতজ্ঞতার, আরেক জনের ক্ষমা চাওয়ার যতটা সমাদর আছে, অন্যদের কাছেও তেমনটা আছে। সকলেই চায় তাদের নিজস্ব জায়গায় স্বীকৃতি পেতে, সকলেই চায় মর্যাদা পেতে। মর্যাদা দিয়ে, স্বীকৃতি দিয়ে আমরা আমাদের এই গুনগত জায়গায় অনেক অনেক সুখের সঞ্চার করতে পারি নিজের জন্য, সবার জন্য।

আমাদের খেয়াল করতে হবে, তেলা মাথায় তেল তো আমরা দিয়ে থাকি — যদিও অনেক সময় সেটা অব্লিগেশন থেকে, আন্তরিকভাবে নয়। কিন্তু আমরা বলছি আন্তরিকতার কথা। তাই হয়তো বলতে হবে যে এই কাজটা ছোট জায়গা থেকে শুরু করা খুব দরকার। যে শিশুকে কেউ কখনো স্বীকৃতি দেয় না, যে মেয়েকে কেউ কখনো স্বীকৃতি দেয় না, যে শ্রমজীবী রোজকার রুটিন কাজগুলি করে যায়, কাজগুলি সুষ্ঠুভাবে করে বলে আমরা একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারি, তাদের সেই কাজগুলি টেকেন ফর গ্র্যান্টেড (যা আমি প্রায়শ নিয়েছি, কিন্তু তাই নিয়ে আবার দুঃখ পেয়েছি), তাদের কথা।

এমনকি মানুষ ও প্রাণীর ইতিহাসে যারা ছিল, তাদের সকলের প্রবাহ ধরেই আমরা আজকে বেঁচে রয়েছি। যে-মানুষ অনেক কাজ করে গেছে বলে সেই কাজের সিঁড়ি বেয়ে আজকে আমরা তার সুফল ভোগ করে যাচ্ছি, তাদের কথাও আমাদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে করার। মানুষের আয়ু খণ্ডকালীন, কিন্তু মানুষের নাম না থাকলেও কাজ বেঁচে থাকে। সব মানুষের দানের কথা আমরা জানব না, কারণ বেশির ভাগই আনসাং হিরো। কেউ বেশি, কেউ কম।

সকলের বেঁচে থাকার জন্য সকলেই খুঁটিনাটি, থ্যাংকলেস কাজ করেই যাচ্ছে, নিজেকে আর অন্যদের নানাভাবে সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে, তাদের আমরা কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই।

সকলকে কৃতজ্ঞতা। সকলেই স্বীকৃতি, মর্যাদা আর ভালোবাসার যোগ্য।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.