গ্যাস লাইটিং একটি সাইকোলজিক্যাল এবিউজ

ইসাবেল রোজ:

গ্যাস লাইটিং একধরনের সাইকোলজিক্যাল এবিউজ, যেখানে ব্যক্তি (গ্যাস লাইটার) তার ভিক্টিমকে এমনভাবে ম্যানিপুলেট করে, ভিক্টিমের সেল্ফ এস্টিম শূন্যের কোঠায় চলে যায়। ভিক্টিম নিজের পারসেপশান, নিজের ভিউকে অবিশ্বাস করে। সবকিছুতেই নিজের দোষ মেনে নেয় এবং নিজের কর্মকাণ্ডকে নিজেই প্রশ্ন এবং সন্দেহ করতে থাকে।

আমার পরিচিত বয়স্ক দম্পতি। তারা ৪৫ বছর যাবৎ সংসার করছেন। একদিনের ছোট একটা ইনসিডেন্ট দিয়ে গ্যাস লাইটিং এর উদাহরণ দিচ্ছি। ধরুন স্বামী-স্ত্রী দুজন দুই রুমে আছেন, পাশের ঘর থেকে স্ত্রী তার স্বামীর গলার আওয়াজ শুনতে পেলেন। যেহেতু বাসায় আর কেউ নেই তিনি ধরে নেন তার স্বামী ফোনে কথা বলছেন।

কথা শেষ হবার পর
স্ত্রী : তুমি কার সাথে ফোনে কথা বললে? কে ফোন করেছিল?
স্বামী: আমি আবার কার সাথে কথা বললাম। আমার তো ফোন আসেনি। তুমি কল্পনা করছো। তোমার মাথা ঠিক আছে? শরীর ভালো? ওষুধগুলো ঠিকমতো খাচ্ছো?
স্ত্রী : ওহ আমারই তাহলে ভুল। আসলে আমার শরীর ভালো নেই।

এখানে গ্যাস লাইটার এর ভূমিকায় আছেন স্বামী এবং ভিকটিম এর ভূমিকায় স্ত্রী।
বাস্তবে স্বামী ফোনে কথা বলেছিল। স্ত্রী ঠিকই শুনতে পেয়েছিল। কিন্তু তার নিজের পারসেপশনের উপর নিজের ভরসা হারিয়ে ফেলেছে। কেন এমন হয়েছে? এর দুটি কারণ, প্রথমত, অনেক বছর যাবৎ তিনি এরকম গ্যাস লাইটিং এর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন বা এখনও যাচ্ছেন।
দ্বিতীয়ত, স্ত্রী কনফ্লিক্ট বা দ্বন্দ্ব এড়াতে মেনে নিয়েছেন তারই ভুল। গ্যাস লাইটিং এর ভিকটিম সচরাচর কনফ্লিক্ট বা দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলতে চায়।
এখানে উদাহরণ দেয়া হয়েছে গ্যাস লাইটার একজন পুরুষ এবং ভিক্টিম একজন নারী। এর উল্টোটাও হতে পারে। ভিক্টিম পুরুষ হতে পারেন, আর গ্যাস লাইটার নারী হতে পারেন। রিলেশনশিপে ক্ষমতাধারী ব্যক্তিটি গ্যাস লাইটার হতে পারে, সে নারী বা পুরুষ যেই হোক।

একটি নতুন রিসার্চে পাওয়া তথ্যে বলা হয় যারা খুব দুর্বল ক্ষমতাসম্পন্ন এবং পরনির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি গ্যাস লাইটিং এর শিকার হয়।
(পরনির্ভরশীলতা বলতে শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক অবস্থান, ইমোশোনালি ডিপেনডেন্ট সবকিছুকেই বোঝায়)।

উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরাও কখনও গ্যাস লাইটিং এর শিকার হয়ে থাকে। যেসব রিলেশনশিপে ক্ষমতার বণ্টন সমান হয় তারা গ্যাস লাইটিং এর অভিজ্ঞতা কখনও অনুভব করে না। এই রিসার্চে ক্ষমতা বা পাওয়ারের সাথে গ্যাস লাইটিং এর কোন সম্পর্ক আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখা হয়।
এই স্টাডিটা করেছেন গ্রেভস এবং স্যাম্প এবং তা প্রকাশ করেছে জার্নাল অফ সোশ্যাল এন্ড পার্সোনাল রিলেশনশিপ, ২০২১ সালের নভেম্বের মাসে।

রিসার্চে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে, পাওয়ার বা ক্ষমতার সাথে গ্যাস লাইটিং এর সম্পর্ক আছে কিনা। গ্যাস লাইটার এর ভিক্টিম যেহেতু নিজের ভিউ, পারসেপশান এর প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে, তাই তাকে অন্যের উপর নির্ভর করে চলতে হয়। এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরনির্ভরতা শুধু অর্থনৈতিকভাবে হয় তা নয়, যখন কোন ব্যক্তি নিজের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, প্রতিটা কাজেই তাকে অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে হয়, সেটা ইমোশোনালি হতে পারে, সামাজিক হতে পারে এবং অর্থনৈতিক হতে পারে। নির্ভরশীলতার অপর নাম পাওয়ার লেস বা ক্ষমতা শূন্য হয়ে যাওয়া।

এই রিসার্চে অংশগ্রহণ করে ২৯৮ জন কলেজ শিক্ষার্থী, যারা পূর্বে অথবা বর্তমানে রিলেশনশিপে ছিল বা আছে। এদের মধ্যে ৭৩% শিক্ষার্থী ছিল মেয়ে।
২৯৮ জন কলেজ শিক্ষার্থীকে প্রশ্নের জবাব দিতে বলা হয়, প্রশ্নগুলোর ভিত্তি ছিল রিলেশনশিপ সম্পর্কিত। এখানে প্রশ্নোত্তর এর উপর ভিত্তি করে যে তথ্য প্রমাণিত হয় সেটা হলো:
নিম্ন এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা গ্যাস লাইটিং এর শিকার হয়।
পাওয়ারলেস বা ক্ষমতাহীন নির্ভরশীল ব্যক্তিরা গ্যাস লাইটিং এর শিকার হবে সেটা বুঝতে কোন অসুবিধা নেই, কিন্তু যারা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন, তারাও গ্যাস লাইটিং এর শিকার হতে পারে, সেটা কীভাবে সম্ভব?

সেটা সম্ভব হয় এভাবে যখন ক্ষমতাবান ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে তার ভিক্টিমকে ভ্রান্ত বলে প্রমাণ করে আসছে, কখনও কখনও এই ভিক্টিমরা গ্যাস লাইটিং এক্সারসাইজ নকল করতে শিখে যায়। তখন তারাও একই পদ্ধতিতে তার পার্টনারকে ভুল প্রমাণ করতে শুরু করে। যদিও সবসময় তারা সফল হয় না, কিন্তু দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর সে নিজের অজান্তেই গ্যাস লাইটিং এর টেকনিক ডিফেন্স ম্যাকানিজম হিসেবে ব্যবহার করতে শিখে যায়।

রিসার্চে আরও বলা হয়, রিলেশনশিপে যদি দুজন সমান ক্ষমতাসম্পন্ন হয় তাহলে তারা কেউই গ্যাস লাইটিং এর অভিজ্ঞতা অর্জন করে না। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে গ্যাস লাইটিং এর প্রধান শর্ত নির্ভরশীলতা। যখন দুজন পার্টনার স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকে, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ইমোশোনাল কোনভাবেই একে অপরের উপর নির্ভর না করে পরিপূরক হিসেবে থাকে, তখন সেখানে গ্যাস লাইটিং এর মতো ম্যানুপুলেটিভ বিহেভিয়ার দেখতে পাওয়া যায় না।

কখন বুঝবেন আপনি গ্যাস লাইটিং এর শিকার হচ্ছেন? তিনটি পয়েন্ট আলোচনা করবো, যেটা দ্বারা আপনি গ্যাস লাইটিং এর আভাস পেতে পারেন।

১) বাস্তবকে অস্বীকার করা:

প্রথমেই যে দম্পতির উদাহরণ দিয়েছি সেখানে স্ত্রী বাস্তবকে অস্বীকার করে অথবা দ্বন্দ্ব এড়িয়ে মিথ্যাকে সত্য বলে ধরে নিয়েছেন। গ্যাস লাইটার তার ভিক্টিমকে বাস্তব থেকে প্রথমেই দূরে সরিয়ে তাকে কনফিউজড করে দিয়েছেন, যেন মিথ্যা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। আপনি যখন দেখবেন আপনার এবং আপনার পার্টনারের সত্য মিলছে না, সে তার ভার্সন বিশ্বাস বা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে এবং একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে, তখন বুঝবেন গ্যাস লাইটিং এর ভিক্টিম হতে যাচ্ছেন।

২) আইসোলেট করা অথবা আলাদা/একঘরে করে রাখা:

এই প্রবণতা খুবই কমন। পার্টনার সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বলা, তার মাথা ঠিক নেই, সে কল্পনায় অনেক কিছু দেখে, একা নিজের সাথে কথা বলে, মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে, ইত্যাদি যখন আপনার পার্টনার অন্যদের বলা শুরু করবে, আপনার কানে এলেই আপনি বুঝতে পারবেন এখানে কী চলছে। এসব কথা প্রতিষ্ঠিত করেই কিন্তু ভিক্টিমকে আইসোলেট করা হয়। আপনার সেল্ফ এস্টিম যতই লো হোক, আপনি যতই পরনির্ভরশীল হোন না কেন, আপনার সম্পর্কে আপনার পার্টনার ভুল তথ্য ছড়াতে পারে না, এমন অন্ধবিশ্বাস করার কোন কারণ নেই।

৩) মায়া দেখিয়ে কাবু করার চেষ্টা:

গ্যাস লাইটিং যদিও একরকম অত্যাচারের মধ্যে পড়ে, তাই বলে মনে করবেন না গ্যাস লাইটার সবসময় অত্যাচারি আচরণ করবে। কেয়ারিং আচরণ দ্বারাও ভিক্টিমকে ঘায়েল করা যায়।
সেটা কীভাবে? ধরুন স্ত্রীকে স্বামী বললো, “আমাকে কেউ কল করেনি, তুমি ইমাজিন করছো।” এবং সাথে সাথে জিজ্ঞাসা করছে, “তুমি ঠিক আছো তো? শরীর ঠিক আছে তো? ওষুধ খেতে ভুল করোনি তো?” এই বাক্যগুলো শুনতে কেয়ারিং মনে হচ্ছে, কিন্তু এটাও গ্যাস লাইটিং এর কৌশল। এখানে মিথ্যা গায়ের জোরে প্রমাণ করতে হবে এমন কথা নেই, ব্যক্তিভেদে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে পারে।

সবশেষে ম্যানুপুলেটিভ আচরণকে চিহ্নিত করতে শিখুন। জেনুইন কেয়ার এবং গ্যাস লাইটিং কেয়ার দুটোর পার্থক্য বুঝুন। আপনার পার্টনার আপনাকে যত্ন করছে, কিন্তু সে তার ভার্সন অফ ট্রুথ প্রতিষ্ঠায় অটল। আপনার পার্টনার আপনার শরীর কেমন তা খবর নিচ্ছে, কিন্তু আপনার সম্পর্কে ভুল তথ্য বলে বেড়াচ্ছে। আপনার পার্টনার আপনার প্রতি খেয়াল রাখছে, কিন্তু সবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে, এই বিষয়গুলো মাথায় রাখুন। এই ধরনের সাইকোলজিক্যাল টর্চার কিন্তু খালি চোখে দেখা যায় না।

আপনার ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স থাকতেই পারে, কিন্তু সেটার সুযোগ যেন কেউ না নেয় সে সম্পর্কে সচেতন হোন।
নিজের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিন, মানসিকভাবে সুস্থ থাকলেই জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগ করতে পারবেন। মানসিক অশান্তি থাকলে মনে হবে জীবন অসহ্যকর।

পৃথিবীতে যখন চলেই এসেছি জীবন যাপন সুন্দর হোক।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.