ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও আমাদের সীমাবদ্ধতা

Lord Krishnaপ্রভাতী দাস: ২৮ আগস্ট ছিল জন্মাষ্টমী, কৃষ্ণ-কানাই এর জন্মদিন। হিন্দু-সম্প্রদায়ের একটি বিশেষ উৎসব। হিন্দু ধর্মের সব দেব-দেবতাদের মধ্যে কৃষ্ণ অন্যতম। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে তাঁকে বিষ্ণুর অবতার রূপে গণ্য করা হয়; অন্যান্য সম্প্রদায়গুলিতে তিনি স্বয়ং ভগবান বলেই স্বীকৃত। তাঁকে কল্পনা করা হয়ে থাকে বিভিন্ন রূপে: কখনো শিশু দেবতা, কখনো রঙ্গ-কৌতুকপ্রিয়, কখনো আদর্শ প্রেমিক, কখনো দিব্য নায়ক, আবার কখনো বা সর্বোচ্চ ঈশ্বর। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তিনিই আবার পাণ্ডবদের প্রদর্শক ও সহায়ক এক ক্রূর কূটনীতিক, যা বর্ণীত আছে শ্রীমদভগবতগীতায়।

হিন্দুরা গীতা-কে ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী এবং জীবন-চর্চার একটি ব্যবহারিক পথ-নির্দেশিকা বলে মনে করেন। গীতা-র বিষয়বস্তু শ্রীকৃষ্ণদেব সাথে পাণ্ডব রাজকুমার শ্রীঅর্জুনের কথোপকথন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে শত্রুপক্ষে আত্মীয়, বন্ধু ও গুরুকে দেখে অর্জুন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময় শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে ক্ষত্রিয় যোদ্ধার ধর্ম স্মরণ করিয়ে দিয়ে এবং বিভিন্ন প্রকার যোগশাস্ত্র ও বৈদান্তিক দর্শন ব্যাখ্যা করে তাঁকে যুদ্ধে যেতে উৎসাহিত করেন। কৃষ্ণের এই ভূমিকাটি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কৈশোরে বৃন্দাবনে গোপীদের নিয়ে শ্রীকৃষ্ণের লীলা-ই সর্ব সাধারণের কাছে জনপ্রিয়। শ্রীরাধা সহ ১৬০০ গোপিনীর সাথে তাঁর প্রেম-গাঁথা বৈষ্ণব পদাবলির অন্যতম উপাদান, যা বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য ঐশ্বর্য। স্বয়ং ঈশ্বর হলেও আর এই প্রেম আলোচনা, সমালোচনা বা নিন্দার ঊর্ধ্বে নয় কিন্তু। সে কথা বলতে গিয়েই আজকের এই লেখা।

আমার বন্ধুদের সবাই একে অন্যকে শুভেচ্ছা জন্মাষ্টমীর জানিয়েছেন যে যার মত করে। আর কৃষ্ণ-স্মরণ কবেই বা পূর্ণ হয় কৃষ্ণ-প্রেম উল্লেখ না করে, তাই প্রসঙ্গতই এসেছেন শ্রীরাধিকা, এসেছেন ১৬০০ গোপিনী। যে যার মত করেই তাদের মূল্যায়ন করেছেন এই জগত-বিদিত প্রেমের। সেখানেই সব বিপত্তি, অনেকের সেধে সেধেই যেন গরম তেলের ছিটা নিলেন গায়ে, ফোস্কা পরালেন এক রকম জোর করেই। সেখানেই থামলে তবু ভাল হত, নারীবাদীতা, ধর্মাবমাননা এসব বলেও শান্তি না পেয়ে স্বর্গবাসী ঠাকুরমার ধর্মজ্ঞানের অপরিপক্বতা নিয়েও গালভরা বুলি শোনান হলো। কই যে যাই আর, অন্তত ঘনশ্যাম গোপীনাথের ভক্তদের কাছে এমনটি আশা করিনি।! বিষ্ণুবতার রাধাবল্লভের ভক্তরা “মেরেছ কলসির কানা তাই বলে কি প্রেম দেব না” তে আজকাল আর বিশ্বাসী নেই, মনে হলো। এ হলো ঘোর কলিকাল, দ্বাপর যুগ যেমন গত হয়েছে শত শত বছর আগে, হারিয়ে গেছে মথুরা, বৃন্দাবন; আরো হারিয়েছেন রাইবিনোদিনি ১৬০০ গোপিনী সখীসহ, তেমনি কি স্মৃতিভ্রষ্ট হলেন এবার অকৃত্রিম কৃষ্ণ প্রেমীরা, কোথায় আজ তাঁদের সেই অহিংস প্রেম?

এই কলিতে আমরা সবাই অসহিষ্ণু, ভুলে যাই বারবার ধর্ম হোল অন্তরস্হিত বিশ্বাস আর ভালবাসা, যা শুধুই অনুভবের। বাইরে প্রকাশিত ধর্মের যে অংশ সেটি মূলত ঐতিহ্যগত আচারনিষ্ঠা, কুলাচার এবং লৌকিকতা। আর এই অস্থির, অসহিষ্ণু সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হৃদয় উন্মুক্ত করা, উন্মুক্ত করা বিশ্বাস আর ভালবাসার সেই অন্তর্মাধুর্য। কলিতে কৃষ্ণের বাঁশি, যমুনা তীরের কুঞ্জ বা ১৬০০ গোপিনী নেই, হয়ত সেই অর্থে কৃষ্ণ নামের সেই মাদকতাও নেই, তবু আমরা যেন হৃদয়ে ভালবাসার মাগ্গি না ঘটাই।

অপ্রাসঙ্গিক হয়তো, তবু ভুপেন হাজারিকার গাওয়া ‘কলির কৃষ্ণ’ গানটি মনে পড়ল………,
“কাছেতে গঙ্গা আছে, যমুনা বহুদূর
শুনেছি কলের বাঁশি, জানিনা কৃষ্ণ সুর।
কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে ডেকোনা, কলির কৃষ্ণ বলে ডেকনা।
রাস পূর্ণিমা নেই, আছে বিজলী বাতি
কুঞ্জ নেই বলে কি বিফলে যাবে রাতি?
চাওগো লাজুক নয়ন মেলে
১৬০০ গোপিনীর এই কলিকালে
শুধু তোমাকে পেলাম ভাগ্যফলে, আমার অনেক ভাগ্য ফলে ” হায় কৃষ্ণ, কলির কৃষ্ণ, আমরা তোমারই প্রতীক্ষায়…………………। provati das

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.