শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেয়া কেন জরুরি?

ইসাবেল রোজ:

ইউকে’তে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সপ্তাহ পালিত হচ্ছে ফেব্রুয়ারি ৭ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত (২০২২)। যেহেতু করোনা মহামারির জন্য গত বছর অনেকটা সময় বাচ্চাদের স্কুল থেকে বিরত রাখা হয়েছিল তাই এই বছরের বাচ্চাদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে বাচ্চাদের স্কুল এখনও বন্ধ। এই বাচ্চাদের সাপোর্ট দরকার। তাদের কীভাবে সাপোর্ট করা যায় এবিষয়ে আজ কিছু আলোচনা করবো:

খুব সাধারণ কিছু পরামর্শ যেটা আপনার বাচ্চার ইমোশোনাল গ্রোথকে সাবলীল করে তুলবে। হয়তো অনেকেই এই কাজগুলো করছেন, তারপরও আমি একটু মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি যেন নিয়মিতভাবে আপনার বাচ্চার সাথে কাটানো সময়গুলো অর্থবহ হয় এবং মানসিক গ্রোথ ভালভাবে হয়।

১) বাচ্চার সাথে তার ছোটবেলার গল্প করা

আমরা অনেকেই হয়তো এই কাজটা করি। বাচ্চাদের তাদের ছোটবেলার অনেক গল্প মনে করিয়ে দেই। আমার মা আমার মতো হয়তো সাইকোলজি পড়েননি, কিন্তু তিনি আমার ছোটবেলার গল্প সারাজীবন করে গেছেন।

একটা বিষয়ে শুধু মনে রাখতে হবে, আপনি যখন আপনার বাচ্চার সাথে তার ছোটবেলার গল্প শেয়ার করবেন, এমন কিছু বলতে যাবেন না যেটাতে সে অপ্রস্তুত হয়। বরং তার যে ডেভলপমেন্ট হয়েছে, মনে করুন, সে যখন প্রথম সাইকেল চালানো শিখলো অথবা সাঁতার কাটতে শিখলো অথবা প্রথমবারের মত বাজারের লিস্ট বানাতে শিখলো, অথবা এসেম্বলিতে যোগ দিয়ে “আমার সোনার বাংলা” গান করলো, এধরনের পজিটিভ ইভেন্টগুলো তার সাথে গল্প করুন। এতে বাচ্চার কনফিডেন্স গ্রো করবে এবং বাবা-মা তার এই এচিভমেন্টকে এপ্রিশিয়েট করছে সেটা সে উপলব্ধি করতে শিখবে। নেগেটিভ অভিজ্ঞতা যেমন, “হঠাৎ দৌড়াতে গিয়ে প্যান্ট খুলে পরা” এধরনের ঘটনা আমার-আপনার জন্য খুব ফানি হলেও বাচ্চার আত্মসম্মান বোধ তৈরি হওয়াতে এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয়া খুব ভুল।
মনে রাখবেন বাচ্চাদের মান-সম্মান বোধ খুবই তীক্ষ্ণ এবং সেই বোধ যেন তাদের মধ্যে বজায় থাকে সেই বিষয়ে আপনাকেই খেয়াল রাখতে হবে।

২) আপনার শিশুর বেড়ে ওঠাকে এপ্রিশিয়েট করুন

আমরা যারা প্যারেন্টস অনেকেই হয়তো দেয়ালে দাগ কেটে দেখি আমাদের বাচ্চারা কত লম্বা হলো। শুধু উচ্চতায় বড় হওয়া নয়, শিশুর ইমোশোনাল গ্রোথকেও স্বাগত জানাতে হবে। ধরুন আপনি পুরানো ছবি দেখছেন, আপনার বাচ্চাকে তার ছোটবেলার ছবিগুলো দেখিয়ে বিভিন্ন ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। তাদের যদি এমন কোন ঘটনা থাকে যেখানে তারা ভাইবোন অথবা বন্ধুবান্ধবকে ছাড় দিয়েছে, অথবা ঝগড়া, মারামারি এড়িয়ে সিম্পলি সেখান থেকে সরে গিয়েছে, অথবা ভুল করে থাকলে সরি বলেছে, এধরনের ঘটনাগুলো বাচ্চাদের সাথে রিকল করুন। তাদের ইমোশোনাল গ্রোথকে আপনি গুরুত্ব দিচ্ছেন সেটা বুঝিয়ে দিন।

৩) বাচ্চাদের নতুন কিছু করতে উৎসাহ দিন

নতুন কিছু মানে নতুন কম্পিউটার গেইম নয়। এটা হতে পারে নতুন কোন খাবার তারা বানাতে আগ্রহী অথবা সে ঘর হুভার করতে আগ্রহী, আবার হতে পারে সে কোন ইন্সট্রুমেন্ট বাজাতে আগ্রহী, যে বিষয়টি সে চেষ্টা করতে আগ্রহী তাদের সেই বিষয়ে উৎসাহ দিন এবং তার প্রশংসা করুন। তাকে বলুন, তুমি যে নতুন বিষয়টি চেষ্টা করছো সেটাতে তুমি ভালো করছো। এতে কনফিডেন্স লেভেল অনেক বাড়তে সহায়তা করবে।

৪) আপনার বাচ্চার আশা ও স্বপ্নের কথা শুনুন

বাচ্চারা কখনও ডাক্তার হতে চায়, কখনো পাইলট হতে চায় কখনো পুলিশ হতে চায়, আবার শিক্ষকও হতে চায়। যখন তাদের মনে যেটা আসে, তাই চায়। এর মানে এই নয় যে তারা যেটা বলছে তাদের সেটাই হতে হবে। অথবা ভিন্নভাবে বলতে গেলে চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। তারা বলেছে ডাক্তার হবে, তাই তাদের ২৪ ঘন্টা তাদের ডাক্তার হওয়ার উপদেশ দেয়া থেকে বিরত থাকুন। বরং তার ছোট ছোট স্টেপগুলোকে এপ্রিশিয়েট করুন। অনেক কর্মজীবী বাবা মায়ের সন্তানরা এখন স্কুল না থাকায় ঘরে একা সময় কাটাচ্ছে। তাদের এই একা সময় কাটাতে পারাকে পজিটিভভাবে তুলে ধরুন। তাদের বলুন, যখন তারা  উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ইউনিভার্সিটির হল বা অন্য কোথাও থাকতে যাবে তখন তাদের একা সবকিছু ম্যানেজ করতে হবে। এই একা থাকার অভিজ্ঞতা তাদের কাজে দেবে। তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে বড় হওয়া একটা প্রসেস বা প্রক্রিয়া, সেই প্রক্রিয়ায় অলরেডি তারা এগিয়ে থাকছে। যে অন্য বন্ধুদের সাহায্য করছে তাকে বলুন হয়তো বড় হয়ে তুমি কাউন্সিলর বা টিচার হতে পারো। তাদের পজিটিভ মেসেজ দ্বারা মোটিভেট করতে হবে।

৫) কঠিন পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ

অনেক সময় বাচ্চাদের অন্য বাচ্চা অথবা টিচারদের সাথেও এডজাস্ট করতে অসুবিধা হয়। খুব অল্পতে রাগারাগী, মনোমালিন্য হতে পারে।  এখানে প্রথমেই আপনি আপনার বাচ্চার পক্ষ নিয়ে ঝগড়া করতে যাবেন না। অনেক প্যারেন্টস নিজের বাচ্চার দোষ দেখে না, অনেকে আবার নিজের বাচ্চার দোষই সবার আগে দেখে।

একজন সচেতন প্যারেন্টস এর কোনটাই করবে না। কারণ যেই বাচ্চাকে আপনি বকাঝকা করছেন সে কোন এডাল্ট নয়. সেও আপনার বাচ্চার বয়সী. হয়ত তার ম্যাচুরিটি কম. হয়ত আপনার বাচ্চার বয়সের তুলনায় ম্যাচুরিটি বেশী/ কম. পরিস্থিতি যেটাই হোক নিজেই সলভ করতে যাবেন না. টিচারের সাথে কথা বলুন. সবার প্রথমে নিজের বাচ্চাকে আস্বস্ত করুন যে সে হয়ত কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে. খুব খেয়াল রাখবেন আপনার বাচ্চা যেন বুঝতে পারে তার পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনি অবহিত.
জীবনে চলতে হলে উত্থান এবং পতন মেনে নিয়ে চলতে হয়. পরিবেশের সাথে অভিযোজন করে চলতে হয়. এই শিক্ষাটি তারা (তাদের মতে) কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে যেন সেখান থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারে. তাদের সাথে আপনার চোখের আড়ালে যা ঘটে সেটা যেন তারা অনায়সে শেয়ার করতে পারে. এক্ষেত্রে আপনার রিয়াকশন যদি অতিমাত্রায় হয় তারা ভবিষ্যতে কোন প্রবলেমে পড়লে আপনার সাথে শেয়ার করতে চাইবে না.

অথবা তারা নিজেরা এডাপ্ট করতে শিখবে না. যে কোন সমস্যায় মায়ের কাছে কান্নাকাটি করে বললেই মা সমাধান করে দেয় এই শিক্ষা তাদের দেবেন না. এই শিক্ষা তাদের মানসিক বিকাশে সাহায্য করবে না বরং নির্ভরশীল করে গড়ে তুলবে.

৬) স্ক্রিন টাইম শেয়ারিং

এই ইন্টারনেটের যুগে স্ক্রিন টাইম শেয়ারিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। যারা কর্মজীবী মা তাদের পক্ষে বাচ্চার এক্টিভিটির উপর নজর রাখা খুব কঠিন। তারা যেসব গেমস এ অংশ নেয় সেগুলো সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করুন। তারা গেমসে জয়-পরাজয় যাই করুক না কেন সে সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করুন। জানতে চান এই গেমস কীভাবে খেলে, কীভাবে স্কোর করে। আপনার বিন্দুমাত্র আগ্রহ না থাকলেও আগ্রহ প্রকাশ করতে হবে। তাদের খেলার সাথে ইনভলভড হতে হবে। এটলিস্ট আপনার বাচ্চার স্কোর কত হলো সেবিষয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করুন। ধীরে ধীরে সে আপনাকে বলতে শুরু করবে আজকে কে জিতেছে, কীভাবে জিতেছে। আপনি আগ্রহ প্রকাশ না করলে জানতে পারবেন না সে আসলে কী করছে!

সন্তানরা মনে করে বাবা-মা বিরক্ত হয় আমার গেইম খেলা নিয়ে, তাই তাদের সাথে এই আলাপ না করা ভালো। স্ক্রিন টাইম কমিয়ে আনার আগে নিজে সতর্ক হোন। আপনার বাচ্চার সামনে আপনি কতক্ষণ মোবাইলে সময় ক্ষেপন করছেন, সেটা পরিমাপ করুন। নিজের ফেসবুক ব্রাউজিং এমন টাইমে করুন যখন আপনার সন্তান আপনার কাছে নেই। আমি উইকএন্ডে এবং বাচ্চা স্কুল থেকে ঘরে ফেরার পর ফোন টাচ করি না। যখনই আমি তাকে গেইমস থেকে সরে আসতে বলি সে যেন আমাকে উল্টে কখনও বলতে না পারে যে তুমি তো সারাদিন মোবাইলে থাকো। বাচ্চারা ব্রুটালি অনেস্ট হয়। তারা মন রেখে কথা বলে না। যেটা মনে হয় বলে দেয়। তাদের হাজার বকা বা মার দিয়ে আপনি যে জিনিষটা শেখাতে পারবেন না, সেই জিনিষটা খুব সহজে শেখাতে পারবেন এক্সাম্পল বা উদাহরণ সেট করে। তাই বাচ্চাদের সামনে নিজেরা যত কম পারবেন মোবাইল ইউজ করবেন। যদি কাজের প্রয়োজনে ল্যাপটপ, মোবাইল ইউজ করতেই হয়, সেটা যেন ভিজিবল হয়। সন্তান যেন বুঝতে পারে আপনি কাজ করছেন। খামোখা ইন্টারনেট ব্রাউজ করছেন না। আর টিনএজার যাদের ঘরে আছে, তাদের এক্সট্রা খেয়াল রাখা উচিৎ। এই উঠতি বয়সে হরমোনের আধিক্যের কারণে তাদের ইমোশোনাল ব্যালেন্সের কিছুটা হেরফের হয়। এসময় বকাবকি প্রচণ্ডরকম ব্যাকফায়ার করতে পারে। তাদের বেলায়ও নিজে উদাহরণ স্থাপন করুন। তাদের ইন্টারনেট এক্টিভিটি সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করুন। তাদের পার্সোনাল স্পেস দিতেও ভুলবেন না।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুধু পাঠদান হয় না মানসিক বিকাশের একটি বড় অংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শুধু পাঠদান সম্ভব, সেখানে একে অপরের সাথে ইন্টারেকশন হয় না। ফলে বাচ্চাদের এংজাইটি, স্ট্রেস রিলিফের কোন পথ খোলা থাকে না। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই বাচ্চাদের যে কোন নন-স্ক্রিন এক্টিভিটিকে এনকারেজ করুন। মোবাইল, কম্পিউটার বাদে তারা যা কিছু করতে চায়, হতে পারে অতি তুচ্ছ কোনকিছু, তবুও উৎসাহ দিন, প্রশংসা করুন। বিভিন্ন ইন্ডোর গেইম যেমন লুডু, কেরাম, টেবিল টেনিস অথবা সিম্পল কাটাকাটি হলেও একসাথে তাদের সাথে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। বাচ্চাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিন। ছোটমানুষ বলে তার ইমোশোনাল গ্রোথকে ইগ্নোর করবেন না। নিজেরা মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হোন, বাচ্চাদেরও যত্নে রাখুন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.