আত্মহত্যা নয়, বাঁচুন নিজের মতো করে

এম আর ফারজানা:

আজকাল আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে। সামাজিকতা, পারিপার্শ্বিকতা, অর্থবিত্ত, যশ- এগুলোর পেছনে ছুটছে মানুষ। চাই, আরো চাই , এগুলো ধরতে গিয়ে মানুষ তার জীবন থেকে হারিয়ে ফেলছে আনন্দ গুলো, সুখগুলো। এই যে আনন্দহীন জীবন সেখান থেকে সে আর বেরোতে পারে না। হতাশা তাকে ঘিরে ধরে । আর আমাদের সমাজে কিছু মানুষ আছে কাঠ ঠোকরার মত। কাঠ ঠোকরা কাঠকে ঠুকিয়ে যেমন আনন্দ পায়,সমাজের চারপাশে কিছু মানুষ আপনাকে তাদের তিক্ত কথার বাক্যবানে নাজেহাল করে কাঠোকরার মত আনন্দ পায় । আপনার দৃঢ় মনোবলের দেয়ালে বারবার তিক্ত সমালোচনার ছুরি দিয়ে একটু একটু করে মন ছিদ্র করে দেবে ছিদ্রনেশী মানুষগুলো। এতে আপনার জীবন নদীতে উঠবে ঝড় ,আর সেই ঝড়ে আপনি হারাবেন পথ, পথের দিশা। ভঙ্গে পড়বেন মানুষিকভাবে , একাকিত্ব জায়গা করে নেবে আপনার মনের ঘরে।

দেখা যায় অধিকাংশ আত্মহত্যাকারী মানসিক নির্যাতনের শিকার। দীর্ঘদিন সবার অগোচরে মানসিক নির্যাতনের চাবুক সহ্য করতে করতে যখন স্বপ্নগুলো দুঃস্বপ্নে রূপ নেয়, তখন তার কাছে বেঁচে থাকাটা অর্থহীন মনে হয়। আর তখনই ওই ব্যক্তি পা বাড়ায় আত্মহত্যার দিকে। একদিনের ঘটনায় কেউ আত্মহত্যা করে না। দীর্ঘদিন মনের মধ্যে জমে থাকা পাহাড়সম অভিমান জমা হতে হতে এক সময় ভাবে বেঁচে থেকে কী লাভ , মরে যাই সে-ই ভালো।
ভিন্ন ভিন্ন কারণে মানুষ আত্মহত্যা করে। কেউ প্রেমে, কেউ পরকীয়ায়, কেউ বেকারত্বে, কেউ বা প্রতিষ্ঠিত হতে না পেরে। আবার কেউ ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করে। কারণের ধরন যেমনই হোক, মূল বিষয় এখানে হতাশা ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়া। কেউ আবার আপনজনের কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে আত্মহত্যা করে ।

দুইদিন আগেই দেখলাম ব্যবসায়ী মহসিন খান লাইভে এসে আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার আগে নিজের না পাওয়ার কথা, কষ্টের কথা, গ্লানি নিয়ে বয়ে বেড়ানোর কথা বলে গেছেন। কিন্তু তিনি চাইলে সেই জায়গাটা থেকে বের হতে পারতেন। এই চাওয়াটাই হচ্ছে মূলকথা। অর্থাৎ আপনি কী চাইছেন! মহসিন খান তার রাজপ্রাসাদে আটকে গিয়েছিলেন, চার দেয়ালে একাকিত্বের পদচারণা ছিল। নিঃসঙ্গ মানুষটি বের হতে পারেনি আর সেখান থেকে। এই যে রুদ্ধ পথ থেকে বের হতে না পারা, এটাই ছিল তার প্রধান সমস্যা। তিনি যদি ভাবতেন যে কদিন বাঁচি আমার মতো করেই বাঁচবো, তাহলে তিনি তা পারতেন। কিন্তু তার সেই আত্মবিশ্বাসটা, মনোবলটা হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।

মহসিন খান অর্থের পেছনে ছুটতে ছুটতে তার নিজের মনের সুখটুকু হারিয়ে ফেলেছিলেন, একসময় পেছনে ফিরে দেখেন সুখ নেই, অর্থও নেই , তার পাশে প্রিয়জন আপনজন কেউ নেই। আর এই বিষয়টা তিনি মেনে নিতে পারেননি। মহসিন খান হয়তো খেয়াল করেননি এক পা হারানো লোকটাও ক্র্যাচে ভর করে বাঁচতে চায়, হাসপাতালে অক্সিজেন মাস্ক মুখে নিয়েও বাঁচার জন্য মানুষ যুদ্ধ করে। অন্ধ মানুষটাও সারাদিন ক্লান্তি শেষে জোস্নার আলোকিত ভাঙ্গা ঘরে দরাজ গলায় গান গেয়ে উঠে। কারণ তারা সবাই বাঁচতে চায়। এই চাওয়াটাই হচ্ছে মূল বিষয় ।

শুধু মহসিন খান কেন, আপনি যখন অপরের এই জীবন দেখবেন, তাদের কষ্টগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করবেন, তখন আপনার কষ্টগুলোকে তুচ্ছ মনে হবে। মনে হবে তাদের চাইতে আমি অনেক অনেক ভালো আছি।
জীবন মানে লড়াই করে বাঁচতে শেখা। এই যে জীবন, এটা তো আর ফিরে আসবে না! তাহলে কেন বাঁচবো না? কষ্ট, দুঃখ হতাশা, বঞ্চনা পাই বলে? এমন মানুষ কি আছে যে, তার জীবনের পথটা খুব সহজ? না নেই। তাই, কেউ ঠকালে, বঞ্চনা করলে হতাশা নয় বরং ঘুরে দাঁড়ান। জীবনে কষ্ট পেলে সেই কষ্টকে ধারণ করে লড়াই করুন। আর এ লড়াই করতে হয় নিজেকেই। জীবন আপনার, কাজেই লড়াই অন্য কেউ এসে করে দিয়ে যাবে না।

২০১৭ সালে র্যাম্প মডেল ও অভিনেত্রী রিসিলা আত্মহত্যা করেছিল। মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে হতে যখন বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পায় না, তখনই আত্মহত্যা করে। হতাশ হতে হতে নিরাশ হয়ে তার স্বপ্নগুলো মরে গিয়েছিল। অথচ, কী আশ্চর্য! হাজারও মানুষ আমাদের চারপাশে। প্রাণ খুলে কথা বলার মতো, বিশ্বাস করে আপন ভেবে কষ্ট শেয়ার করার মতো তার কি কেউ ছিল না ? আমার ধারণা রিসিলার তেমন কেউ ছিল না। তাই বলে কি আত্মহত্যা করবে? না, আত্মহত্যা কোন সমাধান নয়। বরং আত্মহত্যা করে জীবনের অপচয় করেছিল সে।

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের এক ছাত্র আত্মহত্যা করেছিল ; কারণ তাঁর শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছিল তাঁরই শিক্ষকদের কারণে। মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও শুধু রাজনীতির শিকার হয়ে শিক্ষক হতে পারেননি তিনি। বিষয়টা তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই কষ্টে ও হতাশায় আত্মহত্যা করেন। প্রশ্ন হচ্ছে তাঁকে শিক্ষক হতেই হবে কেন? জীবনে সব স্বপ্ন পূরণ হবে এমন তো নয়। তিনি চাইলে বিদেশে যেতে পারতেন। আসলে তাঁর ভাবনাটা একটা বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। ওই বৃত্ত থেকে তিনি বের হতে পারেননি।

আমরা অরিত্রীর কথা জানি; ভিকারুননিসা স্কুলের এই ছাত্রী শিক্ষক দ্বারা বাবা-মায়ের অপমান মেনে নিতে পারেনি। তাই আত্মহত্যা করেছে। শিক্ষকেরা কী এমন অপমান করেছিলেন যে আত্মহত্যা করতে হবে? আর স্কুল তো একটা নয়। হ্যাঁ, কিছু বছর হয়তো নষ্ট হতো তার; কটুকথা শুনতে হতো আত্মীয়-প্রতিবেশীদের, এই তো। অনেকদিন আগে মডেল জ্যাকুলিন মিথিলা আত্মহত্যা করেছিলেন। আত্মহত্যা করেছিলেন দেশের অন্যতম সংগীত পরিচালক মাইলস ব্যান্ডের কি-বোর্ডিস্ট মানাম আহমেদের বড় ছেলে জাহিন আহমেদও। জাহিন নিজেও এই প্রজন্মের অন্যতম ব্যান্ড ম্যাকানিক্স ছিলেন।

এই যে আত্মহত্যা করার প্রবণতা তা হতাশা থেকে, একাকিত্ব থেকেই আসে। বাঁচতে চাইলে এই হতাশা বা বিষণ্ণতা থেকে আপনাকেই বের হয়ে আসতে হবে।
জীবন খুব বেশি বড় নয়, তাই আপনি কেন আপনার হাতে থাকা সময়টা নষ্ট করবেন? জীবন একটাই। এই জীবনকে খরচ করুন সুন্দরভাবে। আপনজন বা কারও আচরণে যন্ত্রণা না পেয়ে, কষ্ট না পেয়ে আপনি বরং তাকে এড়িয়ে যান। এই এড়িয়ে যাওয়ার সহজ উপায় তাকে ইগ্নোর করা। আপনি যখন তাদের পাত্তা না দিবেন দেখবেন একবার দুবার তিনবার তারপর তারা চুপ হয়ে যাবে। এরপরে ও না হলে আপনি এমন ভাবে দাড়ান তাদের বুঝিয়ে দেন আসলে তাদের এই আচরণের কারনে আপনার কিছু যায় আসেনা।

স্বাস্থ্য দুই প্রকার। শারীরিক এবং মানসিক। আমাদের সমাজে শারীরিক ক্ষতি হলে সবাই দেখে, কিন্তু মনের খোঁজ আমরা রাখি না। নিজেরাই ভাবি এ আর এমন কী, মনের আবার স্বাস্থ্য, এ কেমন কথা! হ্যাঁ, এই যে বলি সে সুখী মানুষ, তার মনের তৃপ্তি আছে বলেই সে সুখী। না হয় হাজারও অর্থের ভিড়ে সে একা হয়ে যায়। আপনার মনের অসুখের প্রথম ধাপ হলো দেখবেন আপনার কিছুই ভাল্লাগে না। বাঁচতে ইচ্ছে করে না, কেউ ভালো কিছু বললেও বিরক্ত লাগে। এর থেকে বের হবার সহজ উপায় হলো আপনার কিছুদিন জীবন থেকে ছুটি নেয়া, মানে কাজকর্ম থেকে বিরতি নিয়ে ঘুরতে যাওয়া। ভ্রমণে যান, যেখানে কখনই যাননি। নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হন। তাদের জীবন দেখেন। আর সবচেয়ে উপকার হয় যদি ভালো বই সঙ্গে থাকে। সোজা কথা মনের গতিপথ পরিবর্তন করা। দেখবেন একটা গাড়ি যখন সুন্দরভাবে চলে আপনার যাত্রাপথ কত সুন্দর হয়, তেমনি জীবনের যাত্রাপথ সুন্দর করার দায়িত্ব কিন্তু আপনার। একঘেঁয়ে জীবন থেকে মুক্তি নিন। যদি আপনার তেমন অর্থ না থাকে, গ্রামে চলে যান যেখানে আপনার শৈশব। আর শৈশব দু:খের হলে সেখানে না গিয়ে অন্য কোন গ্রামে যান, যেখানে অচেনা মানুষ , অচেনা প্রকৃতি । খুব সাধারণ জীবন যাপন দেখেন, আর যদি একেবারেই বাঁচতে ইচ্ছে না করে, চলে যান হাসপাতালে, দেখুন একজন মানুষ কত যুদ্ধ করছে বাঁচার জন্য। জাস্ট নিজেকে তাদের সাথে কমপেয়ার করুন, দেখবেন তাদের দু:খ-কষ্টের তুলনায় আপনার এই সমস্ত দুঃখ কিছুই না।

আসলে বাঁচতে চাইলে অনেক অনেক কারণ খুঁজে পাবেন। আর এমন তো নয় যে আপনি অমর! তাহলে যে জীবনটা পেয়েছেন তাকে উপভোগ করেন। মানুষ আপনাকে তিরস্কার করবে, আপনাকে ধিক্কার দিবে, কিন্তু প্রকৃতি তা করবে না। একবার প্রকৃতির সাথে মিশেই দেখেন কত সুন্দর। কত নিঃস্বার্থভাবেই না তারা বিলিয়ে দেয় মানুষদের। আনন্দ থাকতে চেষ্টা করুন, আর আনন্দ করার মতো বিষয়গুলো আপনাকে সুন্দরের পথ দেখাবে। আপনার মনে সুন্দর একটা বাগান তৈরি করেন, দেখবেন সেখানে রয়েছে শত শত ফুলের সমাহার। অনেক কিট সেখানে বাসা বাঁধতে চাইবে, তবে সেই কিটকে দূরে সরিয়ে রাখার দায়িত্বও আপনার। মানসিক শক্তির মতো আর কিছু নেই, আপনি হারতে হারতে দেখবেন জিতে গেছেন, তা শুধু মানসিক শক্তির কারণেই।

ইচ্ছা বা লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে হতাশা হয়। হীনমন্যতা নয়। সেলফ রেস্পেক্ট দরকার, আত্মবিশ্বাস খুব জরুরি। এই আত্মবিশ্বাস আর মানসিক শক্তিই আপনার পথচলার অনুপ্রেরণা হবে। আপনি সহজেই পাড়ি দিতে পারবেন জীবনের কঠিন ধাপগুলো। তাই আত্মহত্যা নয়, বাঁচুন নিজের মতো করে।

এম আর ফারজানা
নিউ জার্সি ,যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.