অনুভূতি, সহানুভূতি, সমব্যথী, সহৃদয়তা

আনন্দময়ী মজুমদার:

আমি গবেষক, প্রফেশনাল কারণে সবকিছুকে গবেষণা বা বৈজ্ঞানিক অর্থাৎ উপাত্তের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা আমার অভ্যেস। কিন্তু নিজের মনন, বোধ, ইন্টিউশন, অর্থাৎ জাগ্রত তৃতীয় চোখ কী বলছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে।

আমরা মানুষ হবে সুবাদে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাই। রাজা থেকে ভিখারি — কেউ বাদ যাই না। এই এক জায়গায় আমরা সকলেই সমান। জন্ম মৃত্যু আর দুঃখভোগের বিচারে আমরা ভাগ্যের কাছে সমান, দুঃখভোগ সকলের আছে। তাই বার বার যা আমাকে পীড়িত করে সেসব নিয়ে এক পীড়িত থেকে আরেক পীড়িত’র কাছে প্রীতি নিয়ে ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছি। এখানে বাছবিচার করিনি।

আমার কাছে সমব্যথী হবার ক্ষমতা একটা মস্ত বড় ক্ষমতা। আমরা কখনো কখনো তা ভুলে যাচ্ছি। সমব্যথী হবার ক্ষমতার কারণে আমরা দুঃখে এক হয়, শোকে এক হয়, একসঙ্গে এক কাতারে দাঁড়াই, ভালোবাসা আমাদের এগিয়ে নিয়ে চলে, হৃদয় আমাদের এগিয়ে নিয়ে চলে।

যদি কেউ বলে বিজ্ঞানে হৃদয়ের কথা নেই তা স্বাভাবিকভাবে ভুল কথা। পৃথিবীতে যেখানে যা কিছু সৃষ্টি হয়, পুষ্টি পায়, স্নেহের ছায়ায় বেড়ে ওঠে, সবক্ষেত্রেই আমাদের সহজাত প্রেম বা ভালোবাসা বা হৃদয়ের শক্তি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। প্রেমের শক্তি প্রকৃতি প্রাণীর শরীরে রেখে গেছেন। মগজে নয়, হৃদয়ে রেখে গেছেন। তাই একজন জননী তার সন্তানকে যেভাবে বোঝেন, আর কেউ হয়তো সেভাবে বোঝেনি, বুঝতে পারে না। আমরা মায়ের ভালোবাসা বলতে নিঃস্বার্থ প্রেম বোঝাতে চাই। সব মা এই নিঃস্বার্থ প্রেম শেখেননি, কিন্তু সে কথা পরে হবে।

প্রেমের আশ্রয় ছাড়া ভেবে দেখতে গেলে মানুষ বা প্রাণীর জীবনে তেমন কোনো আশ্রয় নেই। থাকলেও প্রেমহীন আশ্রয় আসলে মূল্যহীন আর মিথ্যা। আমরা একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে পারি। যে প্রেমের মধ্যে বিনিময় মূল্যর হিসেবেনিকেশ বেশি সেই প্রেমকে প্রেম বলি না, ব্যবসা বলি।

যদিও দেওয়া ও নেওয়া, মেলা ও মেলানো এই দুটোই প্রেমের থেকেও উৎসারিত হতে পারে, তবুও শুধু এই বাইরের দেয়া-নেয়া থেকে প্রেমের বাঁধন তৈরি হয় না, সেকথা সকলেই জানে।

আমি এই মধ্যগগনে এসে দেখতে পাচ্ছি, আমাদের আসল চেহারা খুব অল্প মানুষ জানে। আর আমি যা এবং আমি যা নই, তা নিয়ে আমি যদি কুণ্ঠিত না হয়ে থাকি, যদি স্বচ্ছন্দ হয়ে থাকি, যদি নিজের কাছে প্রতিনিয়ত জবাবদিহিতা আমার থাকে, ক্ষমা আর ভালোবাসা আর মেনে নেওয়ার শক্তি থাকে, তাহলেই বলতে হবে, আমরা নিজেদের সঙ্গে নিজেদের শ্রদ্ধা, প্রেম আর আস্থার সম্পর্ক পাতার বিনিময়ে নিজের কাছে নতুন এক সফলতার মর্ম প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি।

আমি যখন আমি হতে পারি, তখন আমি আমার মধ্যে মহাবিশ্বের শক্তির উৎস খুঁজে পাই। সেটা একটা স্পিরিচুয়াল অনুভূতি। zen গুরুরা মানুষের মধ্যে নিহিত শক্তিকে বলেন ‘কি’ বা ‘কাই’। এই নিহিত শক্তি এক এক সময় আমাদের মধ্যে আমরা বিশেষ করে অনুভব করি। যখন আনন্দে দুঃখে শোকে এক কাতারে দাঁড়াই, গান গাই, আলো জ্বালাই, অন্যের আলো নিভে গেলে নিজের মোমবাতি এগিয়ে দিই, তখন আমরা এই শক্তির সঙ্গে একাত্ম হয়ে দাঁড়াচ্ছি। এমনই বলেন যারা স্পিরিচুয়াল গুরু, আর যারা স্পিরিচুয়াল ব্যাপার নিয়ে গবেষণা করেন (সেরকম মানুষ অনেক আছেন, যারা স্পিরিচুয়াল ব্যাপারটা থেকে ধোঁয়াশা মিলিয়ে খোলাসা করে প্র্যাকটিস করতে শেখাতে পারেন)।

আসলে যা-চাই তাই-এর ওপর আমাদের নিবদ্ধ থাকার ক্ষমতা বাড়াতে পারলে আমরা ভালো বোধ করি। অথচ প্রায়শ আমাদের মন কেড়ে নেয় সেইসব — যা আমরা চাই না। কিন্তু সেইসব আমাদের মনোযোগ পাবার দাবি রাখে না। আমরা একটা বাধাকে শুধু আমার রাস্তার একটা ইঁটের মতো দেখতে চাই, সেটাকে পেরোলে আমি আরেকটু শিখবো, আরেকটু বুদ্ধি বাড়বে, আর হৃদয় আরো সম্প্রসারিত হবে। এতে আমি আরো ভালো বোধ করবো।

মানুষের মধ্যবয়েস অনেকের কাছে ‘মিড্ লাইফ ক্রাইসিস’ এর সময় বলে অভিহিত করা হয়। আমার দেখা সবচেয়ে সফল মানুষ এই মধ্য গগনেই সবচেয়ে স্বচ্ছ ও দারুণ। কারণ এই সময়ে এসে তারা সব ক্রাইসিসকে ‘স্পিরিচুয়াল’ ক্রাইসিস হিসেবে দেখতে পেয়েছেন। বুঝতে পেরেছেন ‘এটিচিউড হলো মোদ্দা কথা’। আমাদের মধ্যে নানা এটিচিউড বাস করে। যখন সহৃদয়তাকে জাগাই, সে জেগে ওঠে। যখন প্রেমকে জাগতে বলি, সে জেগে ওঠে। যখন ভয়কে জাগাই, সে জাগে। আমাদের হৃদয়ের আকাশে নানা ইমোশন আসে যায়, কিন্তু আমাদের স্পিরিট অথবা আত্মা তো এক থাকে। কাজেই আমরা নিজেদের একটা শরীর, আমাদের পরিধানের জামা কাপড় বা আমাদের বাইরের সমস্ত ছোটো ছোটো বিষয় দিয়ে না দেখে, বিশ্বসাগরের একটা অমোঘ শক্তির ঢেউ হিসেবে দেখতে পারি, তাহলে আমরা কিছুটা নিজেদের চিনতে পেরেছি।

মানুষের সঙ্গে মানুষের অমিলের চেয়ে মিল বেশি। এই কথাটা এখন আমরা ক্রমশ বুঝতে পারছি। তাই সহজে আমরা রেগে যাই না। বিরক্ত হলেও, কোথায় আমাদের শান্তি, স্বস্তি, আনন্দ, নিরাপত্তা সেখানে আমরা ফিরে আসতে পারি। সাহস নিয়ে ভালোবাসা নিয়ে এবং আস্থা নিয়ে মহাবিশ্বের কাছে আসতে পারি।

যে নিজেকে প্রেম করে না, অর্থাৎ নিজেকে চেনে না, ভালোবাসে না, নিরাপদ রাখে না, আস্থা করে না, সে অন্যকে প্রেম করতে পারে না, চিনতে পারে না, আস্থা করতে পারে না। মায়া এঞ্জেলু বলেছেন, একটা আফ্রিকান প্রবাদ আছে, যদি একজন দিগম্বর মানুষ তোমাকে কাপড় দিতে চায়, সাবধান থেকো। অর্থাৎ যে নিজেকে ভালোবাসতে শেখেনি, সে কখনও অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারে না।

তাই মধ্যগগনে আমাদের স্বচ্ছতার কারণ হলো, আমরা এই প্রজ্ঞা অর্জন করেছি, আর তাই নিজেকে ভালোবাসার জন্য নিজেদের শক্তি আর জ্ঞানকে একত্র করছি। এই প্রেমের শক্তি আমাদের মধ্যে জাগরিত হলে আমরা হৃদয়ের সবচেয়ে গহীন আলোর ফুল ফোটাতে পারবো, ফুল ফুটবে। সকল কাঁটা ধন্য করে, ফুল ফুটবে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.