একই ছাদের নিচে থেকেও একযুগ সহবাসহীন জীবন শুধুই ট্যাবুব্রেকার বলে

ওয়াহিদা সুলতানা লাকি:

ট্যাবু ভাঙ্গার যুদ্ধটা প্রথম শুরু করেছিলাম আমার ছেলেবেলার ঘর থেকেই। যার প্রথম বিরোধীপক্ষ ছিলেন আমার মা। সে বয়সে জানতাম না বড় হয়ে আমি একজন ঘোরতর নারীবাদী অধিকার সচেতন আর এ সমাজের একজন চক্ষুশূল মানুষ হবো। তখনও আমার মা বুঝে উঠতে পারেননি আমি তার সন্তান হয়ে তারই বিরোধী পক্ষ হবো। যখন বুঝলেন তখন প্রায়ই বলতেন, আগে জানলে তোকে আঁতুড় ঘরেই লবণ খাইয়ে মারতাম। জবাবে বলতাম, মা মারতে যখন পারোইনি, কী আর করা, এখন না হয় সহ্য করো। মায়ের হাতে এই প্রতিবাদী ভাষার জন্যই প্রচণ্ড মার খেতাম রোজ। এক সময় জেদ চেপে গেলো। মারলেও আমার শরীরে আর কোনরকম অনুভূতি হতো না। বরঞ্চ মজা লাগতো। আমার জন্য রেডি করা বেত মার হাত থেকে টেনে নিয়ে ভেঙ্গে চুরমার করতে করতে নতুন করে শিখেছিলাম কী করে এ সমাজের ট্যাবুগুলোকেও ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে পারি আমি।

ক্লাস সিক্সে উঠবার পর মা বললো, এবার হাই স্কুলের গণ্ডিতে পা রাখতে যাচ্ছো, রোজ রোজ মাঠে গিয়ে পাড়ার মেয়েদের সাথে খেলতে যাওয়াটা এ বছর থেকে বন্ধ করতে হবে। আমাকে গার্লস স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হলো। আমি মায়ের কথামতো মেয়েদের সাথে খেলতে যাওয়া ছেড়েছিলাম ঠিকই, তবে এবার খেলাটা শুরু করেছিলাম পাড়ার ছেলেগুলোর সাথে। ওদের সাথে খেলতে আমার দারুণ ভালো লাগতো। আমিও ওদের মতো হাই স্পিড নিয়ে দৌঁড়াতাম। রোজই বাড়ি ফেরার পর বকুনি খেতাম, আবার পরদিন একই কাজ করতাম।

তখন আমাদের এলাকাটা বলতে গেলে মফস্বলই ছিলো। জিন্স টপ পরার মতো সাহস এলাকার কোন মেয়ের ছিলো না। আমার ওয়েস্টার্ন ড্রেস ভীষণ ভাল্লাগতো।আমি জিন্স টি শার্ট পরতে শুরু করলাম। প্রায়ই কানে ছি: ছি: শুনতাম, যদিও তা মায়ের মাধ্যমেই কানে আসতো। আমি তা মানিনি। এক পর্যায়ে আমার দেখাদেখি অনেক মেয়েই জিন্স পরতে শুরু করলো। আমার দল ভারী হলো।

‘মেয়ে মানুষ’ এই শব্দ দুটো শুনলে আমার ভীষণই গা জ্বালা করতো। মেয়ে আবার মানুষ। কেন, শুধু মানুষ বলা যায় না? আমি অনার্সে উঠলাম। মার্শাল আর্টে ভর্তি হলাম। সেই নিয়ে বাসায় মায়ের সাথে লেগে গেলো তুমুল ঝগড়া। মা বললো, তোমার কারণে আমি আর সমাজে মুখ দেখাতে পারবো না। আমার আরেকটি মেয়ে আছে। তাকেও তো পার করতে হবে, নাকি? তোমার জন্য আরেকটা মেয়ের কপাল খাই কী করে? যার যার ভাগ্যে সে সে খায়। একজন কী করে আরেকজনের কপাল খায়, বুঝলাম না।

সেবার ‘শবে মেরাজ’ এর রাতে যথারীতি পড়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। বাবা-মা এবাদত বন্দেগী করছেন। ‘শবে বরাত’ হলে ঘরে রুটি হালুয়ার উৎসব দেখে হলেও খানিকটা বিবেকের দায়ে জায়নামাজে বসতাম। শবে মেরাজ সম্পর্কে তেমন কোন ধারণা তখন আমার ছিলো না। ধর্মীয় বিষয়ে ছোটবেলা থেকেই ছিলাম উদাসীন।তাই বলে খোদাবিরোধী ছিলাম না। ঘুমের ঘোরে শরীরে সপাটে চপেটাঘাতে ঘুম ভাঙ্গলো। ক্লাস টেনে পড়ি, নতুন নতুন নখ বড় করে নেলপলিশ লাগিয়ে সাজতে শিখেছি। প্রায়ই মা নখ কাটার ব্যাপারে ভর্ৎসনা করতো। অথচ আমার সাজগোজের একমাত্র শখই ছিলো নেলপলিশ লাগানো। ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। বিছানা থেকে টেনে নামিয়ে মা আমায় মেঝেতে ফেলে দিলেন। রাত তিনটায় নেল কাটার দিয়ে নিজ হাতে সব নখ কেটে রিমুভার দিয়ে নেলপলিশ তুলিয়ে ওজু করতে পাঠালেন। তার পায়ের নিচে আবার আমার বেহেস্ত। সেই ভেবে কথা না বাড়িয়ে ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে ওজু সেরে জায়নামাজে বসলাম। এবাদতের নামে মায়ের বিরুদ্ধে এক ঝুড়ি অভিযোগ আর অভিশাপের বন্যা বইয়ে দিলাম খোদার দরবারে।

এখন বুঝি শবে মেরাজের নামাজ একটা নফল এবাদত। অথচ ফরজ নামাজের জন্য মা আমাকে পাঁচ বেলার কোন বেলাতেই তাগিদ দেননি। তিনি নিজেই তখন নিয়মিত নামাজ পড়তেন না। আর শবে মেরাজের নামাজ নিয়ে এতো কাণ্ড করলেন।

নাচ শিখেছিলাম ক্লাস ফোর থেকেই। স্টেজে পারফর্ম করতাম। সেসব নিয়েও তার কোন মাথাব্যথা ছিলো না। শুরু হলো সালোয়ার কামিজ আর ওড়নার যুদ্ধ। কোথাও বেড়াতে যেতে হলে সকালবেলাতেই এক চোট মা মেয়ের মধ্যে হয়ে যেতো। চুল বেঁধেই বেরুতে হবে। নইলে আমাকে নেয়া হবে না। উঠতি বয়সী মেয়ে চুল খুলে বেরুলে লোকে নাকি উচ্ছৃংখল ভাববে। তর্কে টিকতে না পেরে চুল বেঁধে বেরুতাম। আর দাওয়াত বাড়ি গিয়ে মায়ের সামনেই শখের শ্যাম্পু করা চুল বন্ধনহীন উড়িয়ে দিতাম। মা তখন কটমট করে আমার দিকে তাকাতেন। ওড়না পরার মতো অতোটা সুঠাম দেহের অধিকারী আমি তখন ছিলাম না। লম্বায় ৫’৫”। চলাফেরা ছেলেদের মতো। নারীসুলভ পোশাক, আচরণ, ঘরকুনোভাব কিংবা হেঁশেলের প্রতি আগ্রহ, কোনকালেই আমার ছিলো না। মা বলতো, বিয়ের পর খাবি কী করে রান্না না শিখলে? যে মেয়েরা রাঁধতে জানে না তাদের কপালে যদি খাওয়া না জোটে বিয়ের পর অনেক ছেলেরাই তো রাঁধতে পারে না, তারা খায় কী করে? ছেলেদের যদি রাঁধতে লজ্জা লাগে তাহলে খেতে লজ্জা লাগবে না? জবাব দিয়ে দিলাম মাকে।

এমন হাজারটা ট্যাবু মা আমার উপর চালিয়ে দিশেহারা হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন বিয়েই দিয়ে দেবেন। বললেন, বিয়ে দিলেই মেয়ের তেজ মজে যাবে। এছাড়া আর উপায় নেই। তখন মাত্র অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। ১৭+ বয়স। ওইটুকুন ব্রেইন নিয়ে ভাবতে বসলাম বিয়ে কী করে একটা মেয়ের তেজ মজায়? বিয়ের পরে পার্থক্য কী আজকের আমির সাথে? তখন স্বামী সহবাস করতে হয়, আর এখন হয় না, এই তো? আর কী? তার মানে সহবাস একটা মেয়ের তেজ মজিয়ে দেবার ঔষধ? প্রচণ্ড ঘেন্না জন্মাতে লাগলো এই বিষয়ের উপর। ঘেন্নার ফল পরিপক্কের আগেই হুট করে পরীক্ষার বিরতিতে আমায় দেখতে আসার জন্য দিন তারিখ ঠিক হলো। জোর করেও তারা আমায় সং সাজিয়ে পাত্রপক্ষের সামনে বসাতে পারেনি কোরবানির সাজিয়ে রাখা গরুর মতো। পাত্র বাদে অনেকেই আমায় দেখতে এসেছে। আমার দুর্ভাগ্য তারা আমায় ওই বেশেই পছন্দ করে পাকা কথা দিয়ে গেলেন। অল্প সময়েই বিয়ের আয়োজন হয়ে গেল। আমরা দুজন কেউ কাউকে সামনে থেকে দেখিনি একখানা স্থির চিত্র ছাড়া। দেখে কী হবে? দুপক্ষই যখন রাজি, বিয়ে এখানেই হবে। পাত্রের নাকি এ বিষয়ে কোন হ্যাডাক নেই। বাবা-মা যা বকেন তাই-ই। আমার মতামত এ যাত্রায় আর স্টাবলিস্ট করতে পারলাম না। একজন ভালোবাসার মানুষ থাকলে হয়তো অমন বাল্যবিবাহ আমি আটকেই দিতাম, যেটা এখন পারি। পাত্রকে আমার পছন্দ হলো না। বয়সেও আমার সাথে তার বিশাল পার্থক্য। অত বড় মানুষকে স্বামী হিসেবে কী করে ভালোবাসবো, কী করে আদরে ডুবিয়ে দিবো, কিছুই মাথায় এলো না। তিনি তার বয়সে ঠিক থাকলেও আমি তো ১৭+। দোষটা আমার মায়েরই।

যথারীতি গায়ে হলুদের দিন সারা বাড়ি হলুদের বাটি নিয়ে আমার পেছনে ছুটেও কেউ আমায় হলুদ ছোঁয়াতে পারেনি। হলুদ মেহেদী না দিলে নাকি বিয়েই হবে না।আমি তো চেয়েছিলামই বিয়েটা না হোক। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হয়েও নাক ছিদ্র করিনি বিয়ে ঠিক হবার পরেও। মা তার আরেক মেয়েটার ঠিকই করে ফেলেছিলেন, আমারটা পারেনি। বিয়ের দিন সকালে দাদী নানী ভাবীরা সবাই মিলে গোসল করাবার আয়োজন করলেন। এইদিন নাকি সবাই মিলেই গোসল করাতে হয়। আমি সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে টুপ করে ওয়াশরুমে ঢুকেই দরজাটা লাগিয়ে দিলাম। নিজেই নিজের গোসল সারলাম। আমার শরীর শুধুই আমার। এই শরীরে অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠা আমার অমতে আমি মেনে নিতে পারবো না। বাসর ঘরেও আমিই প্রত্যাখ্যান করেছিলাম বরকে। দীর্ঘদিন পর যদিও সে বাঁধ আমি ভেঙ্গেছি।

শ্বশুর বাড়ির হাজারটা নিয়মের ট্যাবু ভেঙ্গে হয়েছিলাম বেপরোয়া। কারণ মায়ের জেদে আমার শ্বশুর বাড়িটা গ্রামে হয়েছিলো। বর সেনাবাহিনীর গণ্ডিতে আমায় রাখলেও গ্রামে ছিলো শ্বশুর-শাশুড়ি। অতএব প্রায়ই সেখানে যেতে হতো। ভীষণ ভালবাসতাম আমি তাদেরকে। বউ দেখতে এসে আত্মীয়স্বজন বললো, ওমা, বউয়ের তো নাকে নাকফুলই নাই। বিয়ের প্রথম সদাই-ই তো নাকের জিনিস। যা হচ্ছে স্বামীর চিহ্ন। আমার শাশুড়ি আমার পক্ষে বলে দিলেন, ওর নাক ও নিজে কেটে পরের যাত্রা করবে না তাতে তোমাদের কী? আমি অবাক চোখে শাশুড়ি মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মাথায় ঘোমটা পরা নিয়েও শুনেছি বিশাল অনুশাসন। সবাই বলতো, যতোই উকিলের বেটি হও, আর ভার্সিটি চষে বেড়াও না কেন মেয়ে, শ্বশুর বাড়ি এলে শাড়ি চুড়ি পরেই থাকতে হবে। ঘোমটা থাকতে হবে। আমার চুল ছিলো কাঁধ ছোঁয়া। বড় চুল তখন ভাল্লাগতো না। চুল বাঁধতাম না, ঘোমটাও পরতাম না। গ্রামের খোলা বাতাসে চুল উড়িয়ে বেড়াতাম। একদিন শ্বশুর বাড়ির গাছে চড়ে বসলাম।গ্রামের লোক তো এবার ছি: ছি: দিতে আর বাকি রাখবে না জানি। শাশুড়ি মা বললেন, এই পুরানো গাছটায় এক সময় আমিও চড়েছি। মনে মনে শান্তি পেলাম, স্বামী আমার বিপক্ষে হলেও, শত্রুর মতো আচরণ করলেও এই নারী আমার দলেরই একজনা। শাশুড়ি ছিলেন ইউনিয়ন কাউন্সিলের একজন মেম্বার। শখের বশে দেবরের সাইকেলের সামনে বসে স্বামীকে দিয়ে প্যাডেল করালাম। ব্যাটা!! শ্বশুর বাড়ি বলে আমার কি শখ থাকবে না? বউ সেজে থাকতে হবে? দাদা বাড়ির গ্রামে গিয়ে যা যা মজা করতাম শ্বশুর বাড়ি গেলেও আমার তাই মনে হতো। আমার কোন ননদ ছিলো না। তিন দেবর আমার থেকে বয়সে যথেষ্ট বড় হলেও ওদের সাথে নিয়ে গ্রামের মেঠো পথ, নদীর পাড়, ক্ষেতের আইল চষে বেড়াতাম। যে সময় আমার রন্ধন শালায় থাকবার কথা, বেড়াতে গিয়ে ক’দিনের জন্য কূল বঁধুর দায়িত্ব পালন না করে সে সময় ধেই ধেই করে ঘুরে বেড়াই।

এরপর শাশুড়ি মা ব্রেইনে অপারেশনের পর শয্যাশায়ী হয়ে পড়লে দেবরদের নিয়ে রান্না করতাম। ওদের মুখে তুলে খাইয়ে দিতাম। শাশুড়ি মা মৃদু হাসতেন। আমার সাথে সারা দুপুর নিজের গল্প করতেন। কষ্টগুলো শেয়ার করতেন। নিজ হাতে গয়না পরিয়ে মাকে সাজাতাম। চুল বেঁধে দিতাম, ঘর গোছাতাম। মায়ের বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম। শাশুড়ি মা অপেক্ষা করে থাকতেন কবে আমার ভার্সিটি বন্ধ হবে, তার একমাত্র বউ বাড়ি আসবে। রান্নাবান্না তেমন কিছু না করেও বউ হিসেবে শ্বশুর বাড়ির গ্রামেও যেমন সমাদৃত, তেমনই মার্কা মারা হয়ে গেলাম। ভেঙ্গে দিয়েছিলাম এ সমাজের বউ-শাশুড়ির ট্যাবু।

বিয়ের আগে ইয়ে করে বিয়ে করার শখ ছিলো, অথচ হয়নি। সেজন্য বয়সে পর্যাপ্ত সিনিয়র বরকেই আস্তে আস্তে ভালোবাসতে শুরু করলাম। ভার্সিটির ক্লাস চলাকালীন তিনি দূরে থাকতেন বলে চিঠি লিখতাম, হলের বারান্দায় বসে ফোনে কথা বলতাম, তার জন্য কত কী গিফট কিনতাম। তাকে মিস করতাম। শুরুতে তিনি আমার প্রতি মনোযোগী ছিলেন। কিন্তু একসময় তার কথামতো চলতে গিয়ে পড়তে থাকলাম বিপদে। একটু করে মেনে নিতে নিতে তিনি যেন আমায় আরও পেয়ে বসতে শুরু করলেন। একের পর এক তিনি তার স্টিম রুলস আমার কাঁধে চাপাতে লাগলেন। এক সময় অফিশিয়ালিই তাকে চিকিৎসার জন্য পাঠালে জানতে পারি তিনি স্টুডেন্ট লাইফ থেকেই একজন ‘সিজোফ্রেনিয়া’ পেশেন্ট। সন্দেহ করা, অবিশ্বাস করা, ভুলে যাওয়া, কী ঘটবে আগে থেকেই বলে দেয়া, স্বপ্নে যা দেখেন সেটাকে কেন্দ্র করে আমার সাথে অশান্তি, মারধর এবার চরমে উঠলো।

বার কয়েক বাবার বাড়িতে আমায় ফেলে এলেও তৎকালীন বঁধুদের মতো বাবার বাড়ির মাটি কামড়ে থেকে অশান্তি ভোগ না করে ঢাকা থেকে একা জার্নি করে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট চলে যেতাম বরের কাছে। মা প্রচণ্ড বাজে আচরণ করতেন বিয়ের পরও বাড়িতে এভাবে থাকলে। সব টাইম টু টাইম জানিয়েছি তাদের। তবু তারা এর কোন একশনই নেননি। বিয়ের দুই বছরের মধ্যে শ্বশুর শাশুড়ি দুজনই মারা গেলেন। আমার বর আমার উপর আরও বেপরোয়া হয়ে উঠলেন।

আমার ইগো ছিলো বয়সের আগেই যেহেতু বিয়ে দিয়ে দিয়েছে আমার এতো কান্না দেখেও তার মূল্য না দিয়ে বিয়ের ষোলকলা আমি দেখেই ছাড়বো। তাকে স্বাধীন থাকতে দিলাম না। তার ফ্ল্যাটে এসে আমার প্রতি তার প্রতিটি অত্যাচার শুরুতে ভদ্রতা বশে চুপচাপ থাকলেও তারপর প্রতিবাদ করতে শুরু করলাম। তিনি অত্যাচারের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। এক দিনরাত মিলে তার পাঁচবার বউকে বিছানায় লাগবেই। না এলে অশান্তি, চড় থাপ্পড় সবই জুটতো। ওই বয়সে শরীর যেন আমার কুলিয়ে উঠতো না আর। বুঝিয়েও কাজ না হলে তার প্রতি ঘৃণার মাত্রা বাড়তে থাকলো। বাসায় মাকে সব জানালে মা সমাধান দিলেন,

“পাঁচটা মিনিটই তো মা। রোজ রোজ অশান্তি করার চেয়ে একটু দাঁত চিপে সয়ে নিলে কী হয়?”

মাকে বোঝাতে পারলাম না নিজের অমতে বিয়ে করে জীবন বিসর্জন দিলেও শরীর বিসর্জন দিতে আমার বিবেকে বাঁধে, মানসিক রোগী মনে হয় নিজেকে, অসুস্থ লাগে। আমি সবার মতো আত্মবিসর্জন দিতে পারি না। ভালোবাসার অসম্মান আর ম্যারিটাল রেইপ আর সহ্য করতে পারলাম না। স্বামী আমার উপর আরও কঠিন হলেন এইসব প্রতিবাদী ভাষায়। বিয়ের পর স্বামী যখন চাইবে তখনই দিতে হবে, এটাই নাকি ধর্মের নিয়ম। আবারও ধর্মের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে শুরু করলাম। তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম, নাহ সংসার আমি ভাঙ্গবো না। শরীরের ত্যাগ যদি মানতেই হয় রোজ রোজ নিজের অমতে যে আমায় ভালোবাসে না তাকে শরীর দিয়ে নিজের সাথে যুদ্ধ আর নয়। আমি জোরালো প্রতিবাদ চালালাম। ডিভোর্স না করে তাকে আরেক মেয়েকে ম্যারিটাল রেইপের সুযোগ ছিনিয়ে নিলাম। নিজের সংসার নিজে বুঝে নিলাম। ধীরে ধীরে সকল কর্তৃত্ব এখন নিজের মুঠোয়। কে বলেছে বিয়ে হলে স্বামীর ইচ্ছাই সব? এখন আমিই আমার ঘরের রাজা।

“শরীর সায় না দিলেও স্বামীকে শরীর দিতে হয় নইলে সংসার টেকে না”।

কথাটা আমার মায়ের। জেদ জমতে জমতে বিশাল বড় এক পাহাড়ে পরিণত হলো। তিনি কিংবা মা কেউ আর আমার সে পাহাড় ভাঙ্গতে সক্ষম হলেন না। আজ এক যুগ তিনি আমার কাছে প্রত্যাখ্যাত। আমাকে করা তার সমস্ত অপমান, ভালোবাসার অপমানের শোধ রোজ রাতে তার একলা ঘরে ছটফট করার মধ্য দিয়েই শাস্তি হয়। ধার্মিক বলে তিনি বাজে পথেও হাঁটেন না। আমিও তাই কথা বাড়ানো বন্ধ করে দিলাম। তিনিও বছর যেতে যেতে নিরব হলেন। ক্রমশ সব ভুলে যেতে যেতে কেমন যেন একটা শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি হলো। আর সেই শ্রদ্ধাবোধ থেকে ফিজিক্যাল টর্চার কিংবা ম্যারিটাল রেইপের ট্যাবু আমি ভেঙ্গে ফেললেও নিয়মিত তার দেখভাল করি। তার খেয়াল রাখি।

এভাবেই পেরিয়ে গেছে গত এক যুগ। যৌবন থাকলেও আমাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর অন্ধকারের সম্পর্কটি এখন শুধুই আলোর সম্পর্কে দণ্ডায়মান। আমাদের আর ঝগড়া হয় না শরীর দেয়া নিয়ে। অতৃপ্তি নিয়ে আমিও এখন আর মুখে বালিশ গুঁজে কাঁদি না। অনেক আগেই আমার স্টাডি শেষ। সামাজিক কর্মকাণ্ডের বাইরেও ঠিকমতো রান্না, ঘর সাজানো,পার্টি ক্লাব এটেন্ড, শপিং সব আমরা একসাথেই হাসিমুখে করি। আমি যুক্তি দ্বারা ট্যাবু ভেঙ্গেছিলাম বলে আজ দুজন দুজনার কাছে দায়বদ্ধ। শরীরের যুদ্ধটা এখন তার সাথে নয়, বরঞ্চ নোংরা স্মৃতির জন্ম দেবার চেয়ে নিজের সাথে একা নিভৃতে করে নেয়াটাই শ্রেয়।

সংসার করতে হলে যতোদিন বাঁচবো স্বামীর কাছে ইচ্ছেয়-অনিচ্ছায় শরীর কেনো বিকাতে হবে? – প্রশ্নটা আমায় খুব বিদ্ধ করে যাচ্ছিলো। সংসারে যুদ্ধ হবে বলে হয় সবটা মুখ বুঁজে সয়ে দিন কাটিয়ে দুনিয়াতেই কবরের জীবন যাপন করতে হবে নয়তো প্রচলিত ট্যাবু অনুসারে সংসার ভেঙ্গে ফেলে ‘ডিভোর্স’ই একমাত্র সমাধান হবে, কিন্তু কেনো?

আমি তখন এই ট্যাবুটির বিপক্ষে এসে দাঁড়ালাম। আমি আমার মনের খোরাক হিসেবে বই পড়া, লেখালেখি করা, গান শোনা, ক্রিয়েটিভিটি আর বন্ধুদের আড্ডাকেই খুঁজে নিলাম। শরীরের জ্বালা আর কয়দিন! বয়স পঞ্চাশ হলে যৌবন ফুরিয়ে গেলেও মনের খোরাকগুলো তো কখনোই ফুরোবে না। আজকের সাময়িক শারীরিক উত্তেজনা মিটাবার প্রয়াসে কিংবা ভালোবাসার মানুষকেই সব দিতে হবে সেই ভেবে ভালোবাসার একটা মানুষের অভাবে সব ছেড়ে হার মেনে নিয়ে ডিভোর্স দিয়ে বেলাশেষে জীবনের শেষক্ষণেও যখন একাই কাটাতে হবে, দ্বিতীয় কাউকে জীবনের সাথে বাঁধলেও আবার যে ভিন্ন ভিন্ন ঝড় উঠবে না তার গ্যারান্টি কী???

আজ এক যুগ পর এসে তিনিও হয়তো আমার কথা ভাবেন। যদিও মুখে কিছুই বলেন না। শরীরে মিলিত হওয়ার টপিক দুজনেই ভুলে গিয়েছি। আমার প্রতিবাদ মেনে এতোদিন পর তিনি নিরব আছেন বলেই তাকে আমি ছেড়ে আসিনি। সংসার না ভেঙ্গেও একই ছাদের তলায় পাশাপাশি দু’জন যে যার কর্তব্যে সচল থেকে ভেঙ্গে দিয়েছি ডিভোর্সের ট্যাবু, ম্যারিটাল রেইপের ট্যাবু, নারীর মুখ বুঁজে সয়ে যাওয়া সমস্ত অত্যাচারের ট্যাবু।

আজ থেকে বিশ বছর পরেও বেঁচে থাকলে সংসারে দুজন যে আস্বাদ পেতাম সেটা না হয় এখনই পেলাম। ট্যাবু ভাঙ্গতে হ্যামার লাগে না স্যার, সাহসই যথেষ্ট। তবু সংসার ভাঙ্গবেন না।

– ওয়াহিদা সুলতানা লাকি
২৪/০১/২২

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.