নারী ও আমাদের একচোখা ছাঁচবন্দী মূল্যায়ন

সাবরিনা স. সেঁজুতি:

বিশ্বজুড়ে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও আমাদের মস্তিষ্কে নারীর অবস্থান সবসময়ই নিচের দিকে। জাতীয় পলিসি, প্রাতিষ্ঠানিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় কাঠামো সবকিছুই নারীর জন্য সুস্থ এবং সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। এমনকি “মায়ের পায়ের নিচে বেহেশত” এ জাতীয় প্রবচনও যুগ যুগ ধরে চলে আসা নারীর প্রতি অসম্মানজনক আচরণের কোন পরিবর্তন ঘটায়নি, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরের এটি এখনো একটি স্বাভাবিক ঘটনা এবং আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সচেতনভাবে নারীর যোগ্যতাকে হেয় করে তার প্রতি অসম্মান নিশ্চিত করে এবং নারীকে নিজ গৃহে, নিজ দেশে ২য় শ্রেণীর নাগরিকের সম্মান দেয়। তাই নারী যদি তার যোগ্যতার কারণে সম্মান পাবার অধিকার রাখেও, সমাজ তখন ব্যস্ত হয়ে নারীর দোষগুলোর লম্বা তালিকা তৈরি করে। সমাজ বলতে সমাজের নারী-পুরুষ, কাছের-দূরের, বন্ধু-অবন্ধু, আত্মীয়-অনাত্মীয় সকলেই। নারীর দোষ কম না বেশি সেটা নির্ভর করে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, পারিবারিক-আর্থিক-বৈবাহিক অবস্থা, ধর্মীয় পরিচয়, এমনকি তার শারীরিক-বাহ্যিক সৌন্দর্য্যের ওপর। যেমন ধরুন, আপনি যদি ধনী পরিবারের আলালের ঘরের দুলালী হন, আপনার পেছনে যদি থাকে ক্ষমতাশালী পিতা, ভাই, স্বামী তাহলে আপনার দোষ সমাজ দেখেও না দেখার ভান করতে পারে কিন্তু আপনি যদি হন মধ্যবিত্ত কিংবা দরিদ্র পরিবারের কন্যা, যার না আছে আর্থিক সচ্ছলতা, না আছে রাজনৈতিক ক্ষমতা, তার অগণিত দোষ। তার গুণও লোকের চক্ষুশূল, দোষ তো বটেই। এক কথায় বলা যায়, নারীর দোষ কতটুকু তা নির্ভর করছে সমাজের কোন শ্রেণীতে তার অবস্থান তার উপর। এক্ষেত্রে শ্রেণীর সংজ্ঞা শুধু আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে নয় বরং নারীর অর্থ, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, শিক্ষা সবকিছুর এক সমন্বিত অবস্থা।

যেহেতু অনেকগুলো পরিচয়ের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় নারীর সামাজিক শ্রেণী বা অবস্থান তাই একজন নারীর জীবন-অভিজ্ঞতার সাথে অন্য নারীর জীবন অভিজ্ঞতা মিলে যাবার সম্ভাবনা প্রায় নাই বললেই চলে। একই পরিবারে বড় হচ্ছে এরকম দুই বোনের জীবন-অভিজ্ঞতাও আলাদা হবার সম্ভানাই বেশি। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই, আমরা দুই বোন, আমি বড় আর আমার বোন আমার থেকে প্রায় দশ বছরের ছোট। দশ বছরের ছোট হবার কারণে তার বেড়ে ওঠার পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ আমার বেড়ে ওঠার পরিবেশ থেকে অনেকটাই ভিন্ন ছিল। আমারা লেখাপড়া করেছি ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, আমাদের বন্ধুবান্ধব ভিন্ন, শখ, আহ্লাদ, জীবনের লক্ষ্য সব কিছুই অন্যরকম। আমাদের দুইজনের পারিবারিক পরিচয় অর্থাৎ পিতা, মাতা, ধর্ম, ভাষা একই হবার পরেও আমাদের চলার পথ ভিন্ন, জীবন-অভিজ্ঞতা ভিন্ন, উপলব্ধিও ভিন্ন-ভিন্ন।

আমাদের সমাজে অনেকের মধ্যেই একটি প্রচলিত আচরণ হলো চট করে একজনের সাথে অন্য জনের জীবন অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে ফেলা বা তুলনা করা। বিশেষ করে নারীর সাথে ঘটে যাওয়া কোন একটা ঘটনা বা দূর্ঘটনার পর আমরা অনেকেই বলে থাকি “কি জানি ভাই, জানি না, আমরাও তো ওখানে যেতাম, ওমুকটা করতাম, কই আমাদের সাথে তো এমনটা হয়নি”। যার আরেকটি অর্থ দাঁড়ায় নিশ্চয়ই ঐ মেয়ের বা নারীর কোন দোষ ছিল, তাই তার সাথে এরকম ঘটছে বা ঘটেছে। এটাকে আরেক ভাষায় ভিক্টিম ব্লেমিং বা বাংলায় ভুক্তভোগীর ওপর দোষ চাপানো বলা যেতে পারে। এধরনের মন্তব্য করার পেছনে কয়েকটি কারণ আছে, এক, আমরা প্রতিটি মানুষকে আলাদা করে দেখতে পারি না, দুই, আমরা চট করে নারীর চরিত্র বিশ্লেষণে বসে যেতে ভালোবাসি, এবং তিন, আমাদের মস্তিষ্কে নারীর প্রতি যে অসম্মান গেথে গেছে তা প্রকাশ করার জন্য নিজের মধ্যে একটা তাড়া অনুভব করি। সেকারণে, সাত-পাঁচ না ভেবেই একটা রসালো মন্তব্য করে ফেলি।

আমার কর্ম জীবনের একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। আমি যেই ‘প্রগতিশীল’ প্রতিষ্ঠানে প্রায় পাঁচ বছর কাজ করেছি, সেই প্রতিষ্ঠানের উচ্চ শিক্ষিত নারী ও পুরুষগণ একবার তার এক নারী অফিস এসিস্ট্যান্টের উপর খুব বিরক্ত হলেন। বিরক্তির কারণ, মেয়েটি ২য় বারের মতো গর্ভবতী। রমজান মাসে সে সন্তান সম্ভাবনা অবস্থায়ও রোজা রাখছে দুটো সোয়াবের আশায়, দিনশেষে ঘরে ফিরে স্বামী, সন্তান, শাশুড়ির জন্য রান্না করছে। প্রথম বাচ্চাটি ছোট থাকায় হয়তো রাতে ঠিক মতো ঘুমাতেও পারছে না তাই অফিসে সারাদিন ঝিমাচ্ছে। অফিসের পুরুষেরা তার উপর বিরক্ত কেননা তারা তাদের গর্ভবতী স্ত্রী কিংবা মাকে কখনো ঝিমাতে দেখেননি। অন্যদিকে আমার নারী কলিগরা বিরক্ত কারণ তাদের বেশির ভাগই অবিবাহিতা, গর্ভবতী হবার অভিজ্ঞতা নাই শুধু একজন ছাড়া। সেই একজনও পুরুষদের সাথে তালে তাল মিলিয়ে সেদিন বলেছিলেন “কি জানি বাপু, জানি না, বাচ্চা তো আমাদেরও হয়েছে, কই আমরা তো এরকম ঝিমাই নাই”।

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো; অফিস এসিস্ট্যান্ট পজিশনটা ঐ অফিসে ছোট একটা পজিশন হিসেবে বিবেচ্য, অফিস এসিস্ট্যান্টদের শিক্ষাগত যোগ্যতাও অন্যদের তুলনায় কম, অফিস এসিস্ট্যান্টদের অনেকেই নিজের কাজ ভাল মতো পারেন না বা করেন না। বেতন খুব কম থাকায় নামে মাত্র এই পজিশনে থেকে অফিসের বাইরের অন্য ব্যবসাতেও অনেকে জড়িত। তবে তারা সকলেই নিজের কাজে অদক্ষ বা অসৎ সেটা বলা যাবে না। অবশ্য দক্ষতা এবং সততার প্রশ্নে বাংলাদেশের অনেক কর্মীই হয়তো টেনেটুনে পাশ করবে না।

যাইহোক, আমার আলোচ্য বিষয় হলো আমাদের সেই গর্ভবতী অফিস আসিস্টেন্ট, যার প্রতি সবাই বিরক্ত ছিল কারণ সে নারী, গর্ভবতী, অল্পশিক্ষিতা, সমাজের ক্ষমতাহীন স্তরের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও অফিসে এসে ঝিমাচ্ছে। অন্যদিকে আমার উচ্চশিক্ষিত নারী ও পুরুষ কলিগদের বেজায় ক্ষমতা – কারও রাজনৈতিক, কারও টাকার, কারো বা তেল মারার। তবু তারা কীভাবে যেন তাদের জীবন অভিজ্ঞতার সাথে তাদের অফিস এসিস্ট্যান্টের জীবনটাকে মিলিয়ে ফেললেন। তাদের মস্তিষ্কে গেঁথে থাকা নারীর প্রতি অসম্মানের কাঁটাটি তারা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট দিয়ে উপরে ফেলতে ব্যর্থ হলেন। পুরুষ কলিগদের আচরণ, জ্ঞান, ধ্যান ধারণার হয়তো আরো ব্যাখ্যা আছে, কিন্তু আমি আর সেদিকে যাচ্ছি না। নারীদের এরূপ নারী বিদ্বেষী আচরণের একটাই ব্যাখ্যা, তারা নারী হওয়া সত্ত্বেও পুরুষতন্ত্রের তোষামোদকারী।

লেখক: সাবরিনা স. সেঁজুতি অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি এবং শিক্ষকতা করছেন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.