আমরা কী ধনী হয়েছি, না গরীব?

শান্তা মারিয়া:

সেদিন একটা শপিং কমপ্লেক্সে গেলাম। সেখানে যে পোশাকটাই একটু ভালো লাগে সেটারই দাম দেখি পনের হাজার বা বিশ হাজার, এমনকি ত্রিশ, চল্লিশ হাজার। প্রথমে তো বুঝতেই পারি নাই এত দাম। পরে সব শূন্য ঠিক ঠাক গুণে (আমি আবার এখনও একক দশক করে সংখ্যা গুণি) দেখি ও বাব্বা। কিনি নাই অবশ্য কিছুই। আমার টাকা এত আলগা হয়ে যায়নি যে অত দাম দিয়ে কাপড় কিনতে হবে।

কয়েকদিন আগে আরেকটা দোকানে গিয়েও একই অবস্থা। পনের ষোল হাজার টাকার নিচে একটা হ্যান্ডব্যাগও নেই। নামি দামি রেস্টুরেন্টে ঢুকলেও আজকাল থ খেয়ে যাই। নিজের টাকায় ওসব জায়গায় খাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। সেমিনার বা কোন ফরেনারদের অনুষ্ঠান উপলক্ষেই যাওয়া হয়।
নববর্ষের আতশবাজির নামে বিলাসিতার চূড়ান্ত কিংবা এই সেদিন সাকরাইন উৎসবে টাকার শ্রাদ্ধ হতে দেখেও থমকে যাই বইকি।

মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা। রেশনের দোকানে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে মানুষকে মোটা চাল কিনতে দেখেছি। সিদ্ধ ডিম আধখানা করে খেতে দেখেছি অনেক পরিবারে। শ্রমজীবী নারীরা তখনও কটনমিলের এগারো হাত শাড়ি গায়ে জড়িয়ে রাখতেন। ব্লাউজ, পেটিকোট কেনার কথা চিন্তাও করতেন না। শ্রমজীবী মানুষের পায়ে স্যান্ডেল থাকতো না। কাউকে একজোড়া স্পঞ্জের স্যান্ডেল কিনে দিলে ধন্য হয়ে যেতেন।

সত্তরের দশকে অনেক বাড়িতে কাজের মানুষ রাখা হতো পেটে ভাতে। শুধু দুবেলা দুমুঠো খেতে পাবার ভরসাতে তারা বিনা বেতনে সারা বছর খাটতেন। রাস্তায় অনাহারে মানুষ মরেছে এই বাংলাদেশেই তেতাল্লিশ সনেও। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে অথবা সীমান্তের দিকে যাত্রা করার সময়ও না খেয়ে মারা গেছেন অনেকে। সত্তর ও আশির দশকে আমি নিজেও রাস্তায় অনাহারী ভিক্ষুক দেখেছি। বাড়িতে ভাত ভিক্ষা দিয়েছি নিজের হাতে।

আমাদের নিজেদেরই বা কী ছিল? স্কুলে যেতাম টিনের অথবা রেকসিনের সুটকেস নিয়ে। টিনের টিফিন বক্স। স্কুলের সব ছেলেমেয়েদেরই একই অবস্থা। এত রকম বিদেশি চকলেট চোখেও তো দেখিনি।
আজকাল মানুষের লাইফ স্টাইল আর চাকচিক্য দেখে বুঝতে পারছি আমরা বেশ ধনী হয়ে গিয়েছি। দামি দামি গাড়ি, দামি পোশাক, দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়া, দামি রিসোর্টে থাকা এসব এখন ডাল ভাত।

কিন্তু সত্যিই ধনী হয়েছি আমরা?
চিন্তা, আদর্শ, নীতিবোধ কী বেড়েছে না কমেছে?

একসময় আমাদের মধ্যে ছিলেন শওকত ওসমান, শওকত আলী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মতো লেখক। তখন পুরষ্কারের পিছনে, লাইক কমেন্টের পিছনে দৌড়ানো লেখকরা ছিলেন না।
আমাদের ছিলেন আবদুস সালাম, সন্তোষ গুপ্ত, এবিএম মুসার মতো সাংবাদিক। তখন মিডিয়ায় যৌন হয়রানির কথা কেউ কল্পনাও করতে পারতো? আমাদের মধ্যে ছিলেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা। যারা নকল করে পিএইচডি করার কথা ভাবতেও পারতেন না। প্রফেসর নুরুল ইসলাম, ইউসুফ আলী, জোহরা কাজীর মতো ডাক্তাররা ছিলেন। তখন রোগীকে জিম্মি করে টাকা আদায় করার কথা চিকিৎসকরা চিন্তাও করতেন না। রোগীর চিকিৎসার নামে এত রকম টেস্টের দোহাই দিয়ে বখরা আদায়ের কল্পনাও তাদের মনে ছিল না।
তখন আনোয়ার হোসেন, সুভাষ দত্তর মতো মানুষরা ছিলেন চলচ্চিত্র অঙ্গনে। এখন সব পেশায় সব অঙ্গনে খালি টাকার ধান্দা।

তাহলে আমরা কী ধনী হয়েছি না আরও গরীব হচ্ছি? শুধু ম্যাটেরিয়ালই কি সম্পদ? মনোজগতের সম্পদ কি সম্পদ নয়?
ছোটবেলায় বাবার কাছে শুনতাম, প্লেইন লিভিং, হাই থিংকিং। সেটাই নাকি মানুষের আদর্শ হওয়া উচিত। আর এখন দেখি হাই লিভিং, পুওর থিংকিং চলছে দুনিয়া জুড়ে।

সোভিয়েতের পতনের পর আদর্শ, সাম্য, এসব শব্দ ব্রাত্য হয়ে গেছে। চারিদিকে শুধু ভোগবাদ আর ভোগী মানুষ।
মানসিক দৈন্য আমরা কত আর জিডিপি দিয়ে ঢাকবো?
যে দেশে এখনও ফুটপাথে মানুষ ঘুমায়, যে দেশে এখনও শিশুরা স্কুলে যাওয়ার বদলে কায়িক শ্রম দেয়, যে দেশে মানুষ এখনও বিনা চিকিৎসায় মরে সে দেশে কোন লজ্জায় আতশ বাজি ফুটানো হয়, কোন মুখে লাখ টাকার পোশাক গায়ে চড়ায়?

তখনকার সাদা কালো জৌলুসহীন সিনেমাগুলো আমরা সপরিবারে দেখতে পারতাম। আর এখন ঝলমলে বিগ বাজেটের ওয়েব সিরিজ গোপনে দেখতে হয়। আমি তো গোপনেও দেখতে পারি না। নিজের কাছেই লজ্জা বোধ করি। আমাদের রুচির দৈন্য দেখে কষ্ট হয়।

তখন এত রকম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছিল না। কিন্তু মানুষে মানুষে যোগাযোগটা ছিল। এখন তো আত্মীয়, বন্ধু হারিয়ে আমরা ক্রমশ একা হচ্ছি।
তাহলে কি ঘটছে? আমরা ধনী হচ্ছি না তলে তলে গরীবস্য গরীব হয়ে পড়ছি?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.