বিয়েবাজার, বৈষম্য ও নারী জীবন

ইভনাত ভূঁইয়া:

নারী জীবন অনেকটা নাগরদোলার মতন।
চড়াই উৎরাই এর শেষ নেই যেমন, তেমনি ঠিকানায়ও আছে বেশ বৈচিত্র্য। নির্দিষ্ট স্বাধীন ঠিকানা বা জীবন রীতি বেছে নেয়া মেয়েদের জন্য বিলাসিতা, আছে নানান বিধিনিষেধ, তা সে যতই আধুনিক-মুক্তমনস্ক-শিক্ষিত-আত্মনির্ভরশীল হোক না কেন। বিয়ে শব্দের অর্থ যেমন যুগলবন্দী হওয়া, তেমনি নারী শব্দের ব্যবহার সৃষ্টির জন্মলগ্ন থেকেই দ্বৈতার্থক; অর্থাৎ, তার একজন সহচর লাগবেই, সে একা বা স্বতন্ত্র হবার সুযোগ নেই, হলেই সে অনিষ্টকর।

নারী শব্দের সমার্থক শব্দ দেখলে বোঝা যায় একটা সমাজ নারীকে কেমন অবস্থানে দেখতে চায়। অশ্রাব্য গালিগালাজমূলক শব্দ থেকেও ধারণা নেয়া যায় সমাজ নারীকে নিয়ে কেমন ভাবনা পোষণ করে। সমাজের চোখে নারী মানে বধূ, শুধুই বধূ। নমনীয়, অতি সহিষ্ণু, অবনত নয়ন, মিষ্টি হাসি, পতিব্রতা। নারী নিয়ে সমাজের চিন্তা বড় জটিল। এরা ‘মা’ শব্দের বিশালতা ভাবতে নারাজ-উদাসীন, কিন্তু ‘পতিতা’ শব্দের নিচুতা, নিকৃষ্টতা খুঁজতে রাজি-উৎসুক। ভাষা দিয়েও বৈষম্য চলে কিন্তু। ‘পতিতা বা বেশ্যা’ এমন কিছু শব্দ যার পুরুষ বাচকতা সমাজদীক্ষকরা চায়নি আর সমাজ সংস্কারকেরা ভাবেনি। ইংরেজি ভাষা এক্ষেত্রে কিঞ্চিৎ উদার – ‘উইমেনাইজার’।

বিয়ে, নারী, বৈষম্য- একেকটা পর্বতসম বৃহদাকার বিষয় যা একসূত্রে গাঁথার মতন দুরূহ কাজটা এ লেখায় করা হলো। লেখকের প্রচেষ্টার সফল-নিস্ফলতা পরিমাপ পাঠকের উপর রইলো। বিয়ের পিঁড়িতে বসার পর একটা মেয়ের জীবন ‘শ্বশুর বাড়ি মধুর হাঁড়ি’ কিংবা ‘ বিয়ের বাড়ি রসের হাঁড়ি’ প্রবাদের মতন অত সুমিষ্ট হয় না। জন্ম-মৃত্যু নামক বড় দুই অধ্যায় কেটে ফেললে জীবন নামক পাণ্ডুলিপির প্রায় পুরোটা জুড়েই এই বিয়েবন্ধন।

অতএব, জন্মটা দিয়ে শুরু করা যাক।
বঙ্গদেশে একটি শিশু জন্মগ্রহণ করার পূর্বে জন্মদাতাদের মনে যে দৃশ্যটি খেলা করে তা হলো তার অদেখা সৌন্দর্য, স্নিগ্ধতা, এক স্পর্শকাতর কোমলপ্রাণ। একদলা মাটি যাকে নিজের মনের মতোন গড়ে তোলা ‘যাবে’ বা ‘হবে’। ফুটফুটে একটা ক্ষুদ্র মানবশরীর পৃথিবীর আলো দেখলো সেই পবিত্র সত্তাটার প্রথম পরিচয় হয় তার লিঙ্গ।
অধিকাংশ পরিবারগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির কাঁটা, আদরের বাটখারা, স্নেহের দাঁড়িপাল্লা, প্রত্যাশার সূচক, সম্পদের সিন্দুক সবকিছুর কার্যক্রম ও বাটোয়ারা নির্ভর করে শিশুর লিঙ্গের উপর। শিশুটির ‘বায়োলজিক্যাল আইডেনটিটি’ খুব মুখ্য হয়ে পড়ে যখন শিশুটি হয় মেয়ে শিশু। লৈঙ্গিক আদর্শের ভিত্তিতে এই ‘বস্তু’র বাকি জীবনের পঞ্চনামা সব লিখে ফেলা হয়। ছেলে সন্তানের জন্য আহ্লাদের বাক্সটা বিশাল হয় আর মেয়েসন্তানের ক্ষেত্রে সুদীর্ঘ হয় অনুশাসনের খাতাটা।

প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই কমবেশির মানদণ্ডে সন্তানপালন হয়। কোন এক অদ্ভুত কারণে, কারণটা আমার জানা নেই আজ অবধি বুঝে উঠিনি, মেয়েদের ক্ষেত্রে ধরেই নেয়া হয় যে তাদের লালনপালন-খাওন-পরনে অত ভালোটা লাগে না, অত স্বাদ আহ্লাদ থাকতে নেই, সাদামাটা চলবে। ‘বেশিটা ভালোটা দামিটা বড়টা সুন্দরটা’ ছেলে সন্তানের জন্য সযত্নে আবেগে মুড়িয়ে আলমারিতে তুলে রাখা হয়। বড় মাছের টুকরোটা, গোশতের ভালো টুকরোটা, এই একটু আচারটা না হলে ছেলেটা খেতে পায় না, আস্ত ডিমভাজিটা, দুধটা-ঘিটা, ওই কালোজামটা একটু বেশি পছন্দ আমার ছেলের…;

মেয়েদের জন্য কিছু অলিখিত নিয়ম আছে খাবারের ব্যাপারে- মেহমান যাবার পর, ঘরের পুরুষরা খাবার পর খেতে বসা। তরকারি একটা হলেই হয়, কী পছন্দ মেয়ের? ওহ, কখনো জানতেই তো চাওয়া হয়নি! ওই একটু আলুডালচচ্চরিশাকনুনপেঁয়াজমরিচ খেয়েই দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছে তো, আর যাবে তো পরের ঘরেই কেন খামোখা…। মানসিক পীড়াদায়ক বাক্য শোনা বা শারীরিক নির্যাতনের কথা বলা বাহুল্য, শাসনের নামে মেয়েদের উপর এসব তুলনামূলক বেশিই চলে এবং সমাজে ব্যাপারটাকে গ্লোরিফাই করা হয় যে অমুকের মেয়েকে শাসন করে মেয়ে তাই ভদ্র! কী বাপের বাড়ি, কী পরের বাড়ি, হরহামেশাই দুটো শব্দ হাতে হাত রেখে একসাথে চলে – নির্যাতন আর নারী। নারী আত্মবিশ্বাসী হোক এটা সম্ভবত সমাজ বা পরিবার কেউই মনেপ্রাণে চায় না। ছেলেদের শুধরে না দেয়াটা একটা আদিখ্যেতায় করা হয়- থাক ছেলে মানুষ’ এই একটা বাক্য অবিরাম বৈষম্যের ধারক। অন্যদিকে মেয়েদের কথার খোঁটা, খাওয়ার খোঁটা, চালচলন-বলন-কথন সবকিছুতে উঠতে বসতে শুধরে দেয়া মনে করিয়ে দেয়াটাকে গুরুদায়িত্বের পর্যায়ে ফেলে বলা হয়- তুমি মেয়ে এইভাবে চলো, এই কাপড় পড়ো, ঐভাবে বসো, সহজ করে ভাবো…।

যাত্রা শুরু, মৃত্যু অবধি চলে।
এইযে চিরায়ত বৈষম্য গেঁথে দেয়া হয় জন্মের আগে, শুরুটায় এবং পরেও, এটাকে অন্যায় বা অনায্য কিছু বলার আগে আমাদের ভাবতে হবে যে এই জীবনচক্র এভাবে চলে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চালিত হয় এসব সূক্ষ্ম তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, যা খুব স্পষ্ট রকমেই বৈষম্যমূলক, কিন্তু বিষয়গুলো এতোটাই ব্যক্তিগত ও অনুভূতিসূচক করে রাখা হয় যে এসব নিয়ে কথা বলাটা বেখাপ্পা ঠেকে, আমাদের পোষায় না।

জন্মের শুরু থেকে ‘অল্পের’ বলয়ে বেড়ে ওঠা মেয়েসন্তানের জন্য বৈষম্য বিষয়টা নতুনরূপে প্রকট হয় যখন সন্তান বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। ‘বি+বাহ’ কারো কাছে ‘বিমুগ্ধতা’, ‘বিশাল দায়িত্ব বহন’ আর কারও কাছে ‘বিষবাহন’। বিয়ে করার গুরুত্বের অনুধাবনের আগে এটা বোঝা উচিত বিয়ে বিষয়টা জীবনের বড় একটা পরিবর্তন আনে।

ধর্মীয় বিশ্বাসে বিয়ে মানে ‘বরকত’ ‘বরমাল্য’, বাস্তবে অনেকক্ষেত্রেই তা ‘বৈষম্য-ঘটি’। বিয়ে মানুষকে পূর্ণতা দেয়, সুখ-আনন্দ বর্ষণশীল, তবে সবসময় জীবনে বসন্ত আনে না। না আনার অজস্র কারণ থাকতে পারে যা সব উদঘাটন এ লেখার মূল্য উদ্দেশ্য না হলেও এর একটিকে বিশেষায়িত করার প্রয়াসই লেখকের অন্যতম উদ্দেশ্য। বিয়ে নিয়ে মানুষের মনস্তত্ত্বে ‘এক্সপেক্টেশনের’ পসরা থাকে,এই আশাবাদী মনের নিকুচি করা হয় কিছু উদ্ভট অদরকারী অলিখিত অনিয়ম এর দ্বারা। বিয়ে নিয়ে মানুষের কিছু প্রচলিত কাজ ও মতবিশ্বাসের কারণে বিয়ের স্বপ্ন আশা-আকাঙ্খা ও বাস্তবতায় বিশাল ফাটলটা সৃষ্টি হয়।

এবারে মূল আলোচনায় আসা যাক।

বিয়ে করার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ মানুষের আচরণ দেখলে মনে হয় তারা একই রকম একটা রুচি, দাবি বা চাহিদা বহন করে থাকে ঠিক যেমনটা থাকে শপিংমলে গেলে। আবার কিছু ক্ষেত্রে মনে হয় কাঁচাবাজার এ বাজার সদাই করতে এসেছে। এজন্যই হয়তো ‘বিয়ের বাজার’ একটি বহুল প্রচলিত সামাজিকভাবে গৃহীত কথ্য শব্দ। শপিংমলের কোন দোকানে একটা পণ্য পছন্দ না হলে এটার ‘অন্য মডেল-অন্য রং- অন্য ফিচার-অন্য সুবিধা-অন্য অসুবিধা-এমনকি দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা অসুবিধা, একের ভেতর ‘পাঁচ দশ বিশ সুবিধা’ – এসবই হলো বিবেচ্য এবং জিজ্ঞাস্য বিষয়াদির তালিকায় থাকে।

ব্যাপারটা বিয়ের ক্ষেত্রে কেমন?
পুরুষ নারী এ দুই পক্ষই এটার শিকার তবে নারীদের খুব করুণ হাল। ‘পাত্রী-খোঁজা’ অভিযানে একজন মেয়ের শারীরিক সৌন্দর্য (মানসিক ঘুণাক্ষরেও নয়) এর অভিনব বিশ্লেষণ চলে। আকৃতি রূপ ধরণ একদম মনের মত হতে হবে, এলাকায় আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবদের কাছে মান সম্মান থাকবেনা না হয়। গায়ের রং, চুল, উচ্চতা, মুখাবয়ব একদম সাক্ষাৎ হুর-পরীর অথবা দেবীর মতন, এক রত্তি আপোষ নাহ; শুধু একটা সুন্দরী+সুশীল+যাবলবেতাইশুনবে প্রজাতির বউ লাগবে আমাদের, আর কিচ্ছু নাহ।

প্রথম ধাপের পর আসে দ্বিতীয় পর্ব – মেয়ের পরিবার বংশকুল নাড়িনক্ষত্র বিশ্লেষণ। একে বিয়ে করলে কয়টা বাড়ি গাড়ি, জমিজমা, দোকানপাট, ব্যবসায়িক অংশিদারিত্ব বা পেশাগত সুবিধা পাওয়া যাবে তার গবেষণা। এরপর আসে দীর্ঘমেয়াদি কী সুবিধা পাওয়া যাবে:
ছেলেপক্ষ থেকে অনেকটা এমন- যৌতুক দিতে হবে না আর পড়াশুনা করাবেই, ফ্রিজ, ফার্নিচার কিছু লাগবে না, অনুষ্ঠান এর খানাখরচ সব পাত্রের, বিশাল বিয়ের অনুষ্ঠান, বিয়ের পর বিদেশ ইত্যাদি।
মেয়েপক্ষ থেকে সুবিধার লিস্ট- বিশাল বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন, অত তলা ফ্ল্যাট অমুক এরিয়ার, সহায় সম্পত্তি, রাজনৈতিক পদপদবি, চাকরি ব্যবসায় অংশ তো আছেই।
দোকানিদের ভাষ্যে ‘স্পেশাল অফার’, ‘বিশেষ মূল্য ছাড়’ ‘ডাবল ডিসকাউন্ট’ এর মতন অনেকটা। খুবই লোভনীয়, তাই ক্রেতার অভাব হয় না।

এরপর ওই বিয়ে বা বেশিরভাগ জাঁকজমক বিয়ের পরের চিত্র হয় আঁতকে ওঠার মতোন। কেউ হয় বিমর্ষ, কেউ প্রাণহীন, আত্মহত্যাপ্রবণ, কেউ সংগ্রামী আর কেউ জীবন্ত লাশ। কারও জন্য সংসার করার চেয়ে নিজের বাবা-মায়ের সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক সম্মান বাঁচানো হয়ে পড়ে গুরুদায়িত্ব। কেউ সুখী সংসারের তকমাটা ঘষেমেজে পরিস্কার করে প্রতিদিনের বর্ষানো অজস্র কালিমার ধুয়েমুছে। স্ত্রীর চরিত্র কর্তব্য শাস্তি শাসন নিয়ে সরব সমাজ পুরুষের চরিত্র সংশোধন এর ফতোয়া কতটুক দেয়? বরং বউপেটানি পৌরষত্বের রক্ষক এখনো এই একবিংশ শতাব্দীতেও। মোটামুটি সবাই তৎপর বউশাসনের নামে বউয়ের গায়ে হাততোলা বিষয়টাকে জেনারেলাইজ করায়, পাশের বাসায় পিটিয়ে জখম করছে শুনেও কেউ এগিয়ে যায় না ‘এটা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়’। ‘ওই সব সংসারেই থাকে একটু-আধটু গায়ে হাত তোলা, আহামরি কিছু না…’ ভাবটা হয় এরকম। সে প্রসঙ্গে গেলে লেখা সমুদ্র হয়ে যাবে।

যা বলছিলাম, বিয়েবাজার বিষয়ে দুটো উপবিষয় প্রতিপাদ্য হতে পারে – ‘পণ্য’ আর ‘ক্রয়বিক্রয়’ মূলক মানসিকতা। মেয়েরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পিতামাতার জন্যে এক রকম “দায়”। “কন্যাদায়গ্রস্ত” শব্দটা কেমন বিচ্ছিরি ঠেকে। মানে কী রকম অদ্ভুত একটা হীনমন্যতা-দুঃখ-অপরাধ-পাপ এর গন্ধ আসে এ শব্দটা থেকে। এই একবিংশ শতাব্দীতেও এখনও এমন আফসোসের সুর শুনতে হয় মেয়ে জন্ম গ্রহণ করেছে এ খবর এলে। লেখার শুরুতে যা বলা হলো, মৃত্যু অবধি মেয়েশিশুর মূল পরিচয় হয় তার লিঙ্গ।

“শিশু” নামক সত্তাটা মাইক্রো সেকেন্ডেই মুছে ফেলা হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জন্মের আগেই মাতৃগর্ভে যাচাই করা গেলে তখন থেকেই। অর্থাৎ জন্মের আগেই শোকের মাতম শুরু পরিবার পরিজন আত্মীয় স্বজনদের মাঝে। তাকে শিশু বা ব্যক্তি হিসেবে দেখা হলো না, কখনোই বা হয় কি?

মেয়েদের অভিভাবকের তালিকাও অভিনব। জন্মের শুরু থেকে সাবালকত্ব অর্জন অবধি বাবা মা, বিয়ের পর স্বামী ও বৈবাহিক সূত্রের বাবা মা, মাঝ বয়সে সন্তানের অভিভাবকত্ব কপালে কম জোটে, ওই বাবাই সব করে, স্কুলকলেজবিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি গার্ডিয়ান সেকশনটার একচ্ছত্র অধিপতি ‘বাবা’; গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মায়েদের জিজ্ঞাসে কয়জনা? পরিবারে মায়ের অবস্থান কেমন কখনো ভাবা হয়?
সংসারে কর্তা হবার একটা বড় বৈশিষ্ট্য ও প্রতীক অর্থোপার্জন। যা হোক, এরপর বেলাশেষে চোখ বুঁজবার আগ পর্যন্ত নিজ সন্তানদের অবহেলা অযত্ন।
জগতে সবচেয়ে বেশি পরিচয় সংকটে ভোগা জাতি কি তাহলে নারী?

বিয়েবাজার প্রসঙ্গে ফিরি – এই যে “ওহ ছেলে হয় নাই” বা “আহা মেয়ে হলো শেষমেষ” “মেয়েটা গায়ের রং একটু ময়লা, একটু খাটো, একটু বাঁকা তেড়া, একটু….” জাতীয় গীতালি পাঠ হয়, এহেন অবান্তর আহাজারির পেছনের অনেক বড় একটা কারণ হলো এই বিয়ের বাজারে এর কই যে গতি হয় এই ভাবনা। জন্মের পর থেকেই মাথাব্যথা- এর জন্যে নির্ঝঞ্ঝাট একটা গন্তব্যের খোঁজ করা। কারণ এই “বস্তু”র পৃথিবীতে আসার একমাত্র পরিচয়- ‘সন্তান উৎপাদনকারী যন্ত্র’, একটাই কর্তব্য ও উদ্দেশ্য ‘স্ত্রী ধর্ম পালন’। কারও কারও (পিতামাতা বা অভিভাবক সম্প্রদায়) জন্য এই ব্যাপারটা হয় উক্ত “পণ্য” কে সঠিক মূল্যে সঠিক হস্তে বিকিয়ে দেয়া যায় কিনা।

লেখকের শব্দের ব্যবহারে অনেকে সংক্ষুদ্ধ হতে পারেন, কিন্তু বাস্তবেই এরকম দরকষাকষি মূলক পরিস্থিতি দেখেছি, ব্যাপার হলো বিয়ে দেয়ার কাজটাকে ‘ক্রয় বিক্রয়’ পর্যায়ে আনার পেছনে অন্য পক্ষ ছাড়াও নিজ পিতামাতা কি কম দায়ী? এখন প্রসঙ্গ আসবে সবার পরিস্থিতি সমান না এইসেই নানান আলাপ। অবশ্যই, চরম সত্য।
মানে বলীটা হচ্ছে একজনই- কিশোরী যুবতী নারীকুল, এটাও নিখাদ সত্য।
মানুষ বিয়ে করার মত একটা গুরুতর চিন্তার বিষয়কে বিপণী বিতানে পণ্য কেনার মতো স্বাভাবিক কী করে ভাবে, আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে ধরে না। বিষয় হচ্ছে আপনি “পণ্য” কিনতে যাচ্ছেন কি?
বিয়ে কাকে করে – ব্যক্তিকে নাকি তার রূপ-অর্থ-প্রতিপত্তি-পেশাগত অবস্থানকে?

মানুষ হলে মানবীয় গুণ আগে দেখবেন, তার মানসিক সৌন্দর্য, তার অর্জন সাফল্য দেখবেন, তার স্বীয় সত্তাকে মূল্যায়ন করবেন, তার চিন্তার সাথে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন মেলে – এগুলো হওয়া উচিত মুখ্য বিষয়। কিন্তু বাহ্যিক রূপ গৌণ বিষয় এবং অর্থকড়ি, ক্ষমতা আনুষঙ্গিক বিষয় অথচ এগুলো দিনকে দিন মুখ্য বিষয় হচ্ছে।

আমার ধারণা, বিবাহিত নারীর প্রতি সাংসারিক জীবনে যে সহিংসতা বা নির্যাতন করা হয় এর গোড়াপত্তন ঘটে মেয়েটাকে এই ‘পণ্য’ মনে করার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। কিছু বিবেক বর্জিত মাংসাশী আস্বাদকের দল “বউ একটা গেলে হাজারটা পাওয়া যাবে” ঘরানার চিন্তাও রাখে। যেন পাউরুটি কেনার মতো।
বউ এর বাজারে বউ সংকট হয় না, ‘বাজারে অনেকগুলো বউ’। কোনটা প্রিমিয়াম প্যাকেজিং এর, কোনটা সাধারণ প্যাকেট জাত, কোনটা পলিথিন এ মোড়ানো আর কোনটা কাগজে, কোনটা কোনরকম টুকরিতে গাদায় গাদায় রাখা। বিয়ে করার সময়ে এহেন “পণ্য” কেনার মানসিকতা কি কোন প্রভাব ফেলে না সেই বিয়েটিতে? বরং এটাই কি বলা যায় না যে বিয়ের পর এই ব্যক্তিকে “পণ্যসুলভ আচরণ” এর শিকার হতে হয় এবং তা বৈবাহিক স্থিতিশীলতাকে ধীরে ধীরে মারাত্মক নড়বড়ে পর্যায়ে নিয়ে আসে?

ইভনাত ভূঁইয়া

বিবাহ বিচ্ছেদ জোড়া লাগানো বা সম্পর্কে ফাটল মেরামতের আগেভাগেই শুরুটা শুদ্ধ হোক। ব্যক্তিকে ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়টা এই ব্যামো সারাতে পারে। টেকসই বিয়ের ক্ষেত্রে আর্থিক নিরাপত্তা ছাড়াও মানসিক বয়স, বোঝাপড়ার নির্যাস আর মানসিক মেলবন্ধনের উপর বেশি জোর দেয়া উচিত। শুধুমাত্র শিক্ষা বা ধর্ম এ সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট নয়। আমাদের যেহেতু গিলিয়ে না দিলে হয় না, তাই মূল্যবোধ ও নৈতিক চর্চাটা প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক শিক্ষার অংশ করে তুলতে হবে।

আর মেয়ের বাবা-মায়েরা আর্থিক নিরাপত্তা খোঁজেন, কিন্তু বিয়ের পর সন্তানের জীবনের নিরাপত্তা থাকবে এটার নিশ্চয়তা কে দেবে আপনাদের? সন্তান পালন অনেকটাই ‘ইনভেস্টমেন্ট’ মনে করা হয়, পার্পেচুয়াল মেশিন অব লাইফটাইম (ফিনান্সিয়াল+ মেন্টাল) সিকিউরিটি। তাও মানলাম, কিন্তু সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করাটা ভাবুন শিখুন। মেয়ে সন্তানকে আত্মবিশ্বাসী এবং আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলুন। তাহলে বিয়ে বিষয়টা বিভীষিকায় পরিণত হবে না, বা হলেও এক টুকরো মাটি কামড়ে জীবনযুদ্ধ চালায় যেতে পারবে, তখন তাকে ‘বোঝা বা দায়’ মনে হবে না।

কিন্তু সম্ভবত মানুষ এর মাঝে বর্বরতাটা অনেকটা বিবর্তনবাদ-প্রভাবিত, জিনগত। সাদামাটা চলা একটা মানুষ চোখের পলকে খুন বা ধর্ষণ করে ফেলে। বৈবাহিক জীবনে পৈশাচিকতার প্রতিফলন কি কমবেশি কোনোভাবে সব মানুষেরই থাকে?
মাঝে মাঝে মনে হয় বিয়ে করা বিষয়টা স্রেফ একটা ‘সোশ্যাল বা রিলিজিয়াস রিচুয়াল’। মানে করতে হয়, না করলে লোকে কী বলবে, আর মেয়েদের জন্য এর চেয়ে বড় বিষয় “লোকে কী না বলবে”। জীবনের আরো অনেক মহৎ পরিকল্পনা বা উদ্দেশ্য থাকতে পারে – এটা ভাবার মানে হলো দু রকম, হয় আপনি দুশ্চরিত্র, পাগল বা ধর্ম পালনে অনিচ্ছুক!
বিয়ে করাটা হওয়া উচিত অনেকটা “প্রোফেশনাল ডিগ্রি” নেয়ার মতো। সময়, পরিস্থিতি, অবস্থান ও সত্যিকার অর্থে মানসিকভাবে প্রস্তুত কিনা, সেটা চিন্তনে আসুক।

বিয়ে করতে গিয়ে ‘পণ্য’ খোঁজার মানসিকতা বদলে ‘মানুষ’ খোঁজ করলে হয়তো মেয়েদের অস্তিত্ব সংকট ঘুচতো, স্বাধীন সুশিক্ষিত মেয়ের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তো, পরিবারগুলোর মধ্যে বন্ধন দৃঢ় হতো, পিতামাতার উপর মানসিক আর্থিক চাপ কমতো, সামাজিক শান্তিসূচক ঊর্ধ্বে থাকতো, সম্পর্কগুলো আরো সুন্দর হতো।
বৈষম্য বিষয়টার ব্যাপ্তি অনেক বেশি, সবচেয়ে বড় উৎস হলো মানুষের মনস্তত্ত্বে, যতদিন চিন্তায় মননে বৈষম্য না ঘুচবে ততদিন মেয়েরা একচেটিয়া শিকার থেকে যাবে। চিন্তায় স্বচ্ছতা থাকলে সমাজ বৈষম্যমুক্ত হতো।
সমাজ মেয়েদের ও ‘মানুষ’ হিসেবে ভাবতে শিখতো।

বি.দ্রঃ লেখক মূলত মোটাদাগে উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে সকল সামাজিক পারিবারিক প্রেক্ষাপটে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ ও চিন্তার একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এতে সাধারণত সমস্যার শিকার যে শ্রেণীর তার প্রতি দৃষ্টিনিক্ষেপ করা হয়েছে, সমস্যার উৎপত্তিগত বিষয়টি নারীর সাথে বেশি জড়িত কেননা সাধারণের চেয়ে তারা এ সমস্যায় বেশি জর্জরিত। ব্যতিক্রম নেই বা তা অস্বীকার করা লেখকের উদ্দেশ্য নয়।

লেখক:
ইভনাত ভূঁইয়া, রিসার্চ এসোসিয়েট, রেডলিফ পাবলিশিং, ঢাকা।
ই-মেইলঃ [email protected], [email protected]

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.