একটি সুন্দর সেল্ফি

ফারজানা নীলা:

ভরা মজলিশে এভাবে আমি কিছু একটা বলে ফেলবো এটা কেউ আশা করেনি। তাও আবার ছেলের বিয়ের আসরে। সবাই খুব টানাটানি করছিল। বিয়ের স্টেজে উঠতে, ছবি তুলতে।
– আরে মেয়ের শাশুড়ি কোথায়?
– ছেলের মা কই?
– একসাথে একটা ফ্যামিলি ছবি তুলতে হবে তো।

আমি বার বারই মানা করছি যে আমি ছবি তুলবো না। সবাই ভেবেছে মজা করছি। কিন্তু কী যেন হলো আমার হঠাৎ করেই। কড়া গলায় সামান্য চিৎকার করে উঠলাম। সবাই থ মেরে গেলো আমাকে দেখে, আমাকে শুনে। তাদের কথা বাদই দেই, আমি নিজেই তো বাক্যশূন্য হয়ে গেলাম নিজের কথা শুনে। এ কী বললাম!
কীভাবে বললাম! এতো ক্ষোভ কীভাবে বের হয়ে এলো!

-আমার মতো বিশ্রী মানুষের ছবি তোলার কী দরকার? তোমরা সুন্দররা তোলো ছবি।

– কী বলেন আন্টি?
– কী বলি মানে? আমি ছবিতে থাকলে ছবিই নষ্ট হয়ে যাবে। ছাড়ো আমাকে।

শোনা গিয়েছিল খুব জোরে।

আমি একজন কালো নারী। কালো, কুৎসিত, অসুন্দর। আমাকে আজ পর্যন্ত কেউ সুন্দর বলেনি। এখন আমার বয়স কত? পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই হবে হয়তো এমন। এই দীর্ঘ জীবনে বোধ হওয়ার পর থেকে আমি শুনে এসেছি আমি বিশ্রী। আমার যেহেতু গায়ের রঙ কালো, তাই আমি বিশ্রী। আমার নাকের নকশা যেহেতু সুন্দর না তাই আমি বিশ্রী। আমাকে বিয়ে দিতে আমার বাবা মার অনেক যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে। শেষমেষ এমন একজনের সাথে বিয়ে দিলো যে আমাকে স্ত্রী বলে একদিনের জন্যও ভালোবাসেনি।

মনে আছে এখনো স্পষ্ট।
আমাকে বিয়ের দিন খুব সাদা বানিয়ে বিয়ের আসরে বসানো হয়েছিল। তখনকার গ্রামের সাজসজ্জা যেমন হয়। কালো মেয়ে, বিদ্যাবুদ্ধি নাই। কোনোমতে এইট পাশ করা। এমন মেয়ের বিয়ে যে হতে পারছে তাই তো অতিরিক্ত বেশি।

শ্বশুরবাড়ি যেতে যেতে গালের সাদা আস্তরণ প্রায় মুছে গেলো। নতুন বৌ দেখতে যারাই আসে তাদের সবার মুখ ভার।

– এ কেমন মাইয়া বিয়া করাইলি রে!
– বউরে তো রাতের বেলা খুঁজে পাওন যাইত ন!

আমি শুনে গিয়েছি। যেভাবে বাপের বাড়িতেও শুনেছি। এখানে আর নতুন কিছু শুনবো না সে জানাই ছিল।

রাতে তিনি এসে যখন দেখলেন আমাকে, চোখ মুখ কুঁচকে ফেললেন। সেই চোখ মুখ কুঁচকে থাকার দৃশ্য আমি আদৌ ভুলতে পারিনি।

আমাকে সাথে করে শহরে নিয়ে আসলেন তিনি। সংসার পাতলাম। মনপ্রাণ ঢেলে দিলাম নিজেকে। যেন সেই প্রথম রাতের কুঁচকানো চোখ, কপাল কোনদিন নরম হয়। হয়নি।

তিনি আমাকে পারতপক্ষে কোথাও নিয়ে যেতেন না। কেউ আমাকে দেখলে তার সম্মানহানি ঘটে এ আমি বুঝতে পেরেছিলাম খুব দ্রুত। বুঝে রাত জেগে বিলাপ করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।

তার একটা কথা অনেকটা তার মুদ্রাদোষের মতো হয়ে যায়, “চেহারা যেমন বুদ্ধিও তেমন, অপদার্থ “।
হয়তো তরকারিতে লবণ কম বেশি হয়েছে, সেই মুদ্রাদোষ লাইন, “চেহারা যেমন বুদ্ধিও তেমন, অপদার্থ”।

কাপড়ের ময়লা পুরো পরিষ্কার হয়নি?
“চেহারা যেমন বুদ্ধিও তেমন, অপদার্থ “
সকালে উঠতে একটু দেরি হয়েছে?
“চেহারা যেমন বুদ্ধিও তেমন, অপদার্থ”

দিনে একবার অন্তত এই লাইন তিনি বলতেনই বলতেন।

ভালোবাসা কী, ভালোবাসার কথা কী জিনিস, শুনতে কেমন লাগে এ আমি শুধু টিভিতেই দেখেছি। নিজের জীবনে ঘটেনি কখনও।

ছেলে যখন পেটে আসলো, তখন দিনরাত শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া চাইলাম ছেলেটা যেন আমার মতো কালো, অসুন্দর না হয়। আল্লাহ এই কথা রেখেছে আমার।

আমার বাপ-মা-ভাই-বোন আত্মীয় স্বজনের কাছে যেমন আমার গায়ের রঙের জন্য, চেহারার জন্য খোটা শুনতে হয়েছে, তেমনি আমার ছেলেও আমাকে বলেছে, “মা বিশ্রী”।

ছেলেকে স্কুল থেকে আনা নেওয়া যখন করি তখন খেয়াল করলাম ছেলে নিজ থেকে একটু সামনে এসে দাঁড়ায়, যেন অন্য মায়েরা আমাকে না দেখে, তার বন্ধুরা যেন আমাকে না দেখে। স্কুলের কোনো দরকারে আমাকে নিতে চাইতো না। তার বাবাকেই নিয়ে যেত। আমি তো দেখতে বিশ্রী, আমাকে স্কুলের কোনো দরকারে নিয়ে গেলে ছেলের তো লজ্জা পাওয়ারই কথা।

অবশ্য ছেলের দোষ দিবো কেন?
সে তো রাতদিন এই দেখেই বড় হয়েছে, মাকে বাবা সবসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলে। মা কালো। মা অসুন্দর। মা সুন্দর করে কথা বলতে পারে না। অন্যদের মা’রা খুব স্মার্ট। সুন্দরও। শুধু তার মা’টাই এমন।

একদিন খুব রাগ হলো ছেলের উপর।
জিজ্ঞেস করলাম,
– কীরে, মাকে নিয়ে যেতে লজ্জা করে? মা বিশ্রী তাই?

ছেলে আমার খুব লজ্জা পেলো। লজ্জায় কেঁদে দিলো। সেদিন আমার বুকফাটা কান্না এসেছিল। এমন প্রাণ নিংড়ে কান্না, এমন তীক্ষ্ণ যন্ত্রণার কান্না বহুদিন আসেনি।

ছেলের বিয়ে কথাবার্তা যখন হচ্ছিল, আমাকে সাথে করে ছেলের হবু শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়নি। সবাই গেছে। ছেলের মামা, চাচা চাচি, ফুফু। শুধু মা যায়নি।

“মায়ের একটু হাঁটুতে ব্যথা” বলা হয়েছিল নাকি ওখানে।

আচ্ছা , যাক। ভালই হলো। আমার না রূপ আছে, না গুণ। কী বলতে কী বলে ফেলবো!

এভাবেই কেটে গেছে জীবন। প্রায় তো শেষ। যেটুকু আছে তাতে আর কান্না আসে না। আসে দীর্ঘশ্বাস। লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস। একটা অসুন্দর বিশ্রী জীবন বয়ে বেড়ানোর দীর্ঘশ্বাস।

বিয়ে শেষ করে যখন সব একটু নীরব হলো, সবাই ঘুমাতে গেলো, তিনি বাথরুম থেকে বের হয়ে বললেন,

– ওখানে এমন করার দরকার ছিল কী? তোমার যে আসলেই চেহারার মতো বুদ্ধিও নাই আবার প্রমাণ করলা। যতসব বেকুব নিয়ে আমার বাস।

আমার চোখ কি ভিজে উঠে এসব শুনে? না এখন আর অত খারাপ লাগে না।

একটা আস্ত জীবন নিজেকে অসুন্দর আর বিশ্রী শুনে শুনে কাটিয়ে দিলাম। এই ক্লান্তিকর জীবন থেকে নিজেকে মুক্ত করার কোনো উপায় পেলাম না। আজ তাই শুধু প্রার্থনাই করি, যেন দ্রুত শেষ হয়।

প্রার্থনা কবুল না হয়ে আবারও ভোর হয়।
নাস্তার পর্ব শেষে ছেলের বৌ সবার জন্য চা করতে চায়। তা করুক।

ট্রে ভর্তি চা নিয়ে এসে সে সবার আগে আমাকে কাপ দেয়। আমিসহ সবাই একটু হতবুদ্ধি হই। প্রচণ্ড ভালো লাগায়, সাথে খানিকটা ইতস্ততা নিয়ে আমি কাপটি হাতে নিই। বৌমা আমার পাশে বসতে বসতে বলে,

– “মা, আপনি নিজেকে কখনও অসুন্দর বা বিশ্রী বলবেন না। আপনি অসুন্দর নন। বিশ্রী নন। আপনি সুন্দর। অবশ্যই সুন্দর। কালো মানে অসুন্দর না। যারা ভাবে কালো মানে বিশ্রী, তারাই আসলে সবচেয়ে বেশি অসুন্দর এবং বিশ্রী মনের মানুষ। তাদের সাথেই বরং ছবি তোলা উচিত না”।

পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর কথাটা মনে হয় শুনলাম এইমাত্র। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের জীবনে এমন কথা আমি জীবনে প্রথমবার শুনেছি।

খুব ইচ্ছে করছে চিৎকার দিয়ে কাঁদি। কিন্তু আমাকে কাঁদবার সুযোগ না দিয়ে বৌমা নিজের মোবাইল বের করে সেল্ফি তুলে ফেললো।

-দেখেন মা, ছবিটা কী সুন্দর হয়েছে!

আমি হতবিহ্বল হয়ে সেই সেল্ফি দেখি।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.