বাজিমাত

ফাহমিদা খানম:

জেসমিন চৌধুরী তার শ্বশুরকুলের সবাইকে আজকে বাসায় দাওয়াত দিয়েছেন। বহুদিন পরে সবাই একত্রিত হয়েছে বাসায়। আজকাল বিয়েবাড়ি আর মৃতবাড়ি ছাড়া সেভাবে ফুরসত মিলে কই! নাগরিক সভ্যতা ব্যস্ততা বাড়িয়েছে সবারই।

সকাল থেকেই ব্যস্ততার শেষ নাই। দুই মেয়েও ঘরের সবকিছু চেঞ্জ করেছে দেখে তাদের বাবা এসে জিজ্ঞেস করলো –
“কী এমন ঘটলো যে বাসায় সবাইকে দাওয়াত দিলে, আর তোমার গুণধর পুত্র আর বউকে পাঠালে কোথায়?”
“ওদেরকে বাসায় পাঠিয়েছি, একটু পরেই চলে আসবে”।
“তারা মেনে না নেওয়া সত্ত্বেও কেনো সেই বাসায় গেলো? আত্মসম্মান বলতে তোমার ছেলের কি কিছু নেই?”

উত্তর দিতে গেলেই কথা বাড়ে, ৩০ বছরে এই অভিজ্ঞতা অনেক দেখেছেন বলে জেসমিন চুপ করে থাকেন। তিনি জোর করেই দুজনকে সেই বাসায় পাঠিয়েছেন সেটা উল্লেখ করেন না, তাতে তিক্ততা আরও বাড়বে বলে। এতো বছরের সংসার জীবনে কেউই তাকে এতোবড় সারপ্রাইজ দিতে পারেনি যেটা বউই তাকে গতকাল রাতে দিয়েছে। তিনিও বউকে আজ চমকে দিতে সবাইকে ডেকেছেন। সবাই আসার পর ছোট ননদ বলে বসলো –
“কোন সুসংবাদ নাকি ভাবি? দুজনেই এখনও তেমন কিছু করে না, আবার বাড়তি ঝামেলা এলে মুশকিল”।
“আজকে তোমরা ওদের প্রাণভরে দোয়া করবে সেজন্যে ডেকেছি”।
“ন্যাকামি ছাড়ো জেসমিন কী জন্যে আমাদের দাওয়াত দিলে? গত দুই বছরে একবারও বলোনি!”

বড় জায়ের কথায় মনটা খারাপ হলেও চুপ করেই থাকেন, আজীবন খোঁচা দিয়ে কথা বলার অভ্যাস উনার। বিয়ের পর থেকেই দেখে এসেছেন। মনে মনে ভাবলেন, অন্যকে তুচ্ছ করে যে সুখ আজীবন নিয়েছেন, আজকে তার যথাযথ উত্তর পাবেন। মনে মনে আল্লাহর কাছে অসীম শুকরিয়া জানালেন। ছেলে বউ দুপুরের আগে আসতে পারলো না, নতুন জামাইকে না খাইয়ে তারা ছাড়লো না।

“আজকেই পাঠানোর কী দরকার ছিলো? বাসাভর্তি মেহমান আর নবাব শ্বশুরবাড়ি বিনা দাওয়াতে গিয়ে খেতে রাজি হয়ে গেছেন। আক্কেলবুদ্ধি কিছুই হলো না!”
স্বামীর এই ধরনের কথার সাথেও অভ্যস্ত হয়ে গেছেন জেসমিন, তাই নিশ্চুপ থেকে দুপুরের খাবার টেবিলে দিতে লাগলেন।

“তোমার বউয়ের হাতের রান্না খাবার সুযোগ আর হলো না”
“আজকাল সবাই পড়াশোনা আর ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সময় হলে ইনশাল্লাহ একদিন আপনাদের খাওয়াবে”।
“ঘরে থেকে আমাদেরই হয়নি, আর তোরা আশা করিস কীভাবে?”

স্বামীর এই কথায় চুপসে গেলেন জেসমিন। ননদ আর জা মিলে অনেক কথাই শোনালেন, জেসমিন তবুও চুপ। ফিরনি নিতে রান্নাঘরে যেতেই মেয়ে রেগে বললো –
“কেন তুমি উত্তর দিতে পারো না মা? সবাই সবসময় তোমাকে কেবল শুনিয়ে যায়, আমাদের কষ্ট হয় মা”।
“মারে, বোবার শত্রু নাই, আর সবাইর অনেক শখ ছিলো সিয়ামকে নিয়ে, সেটা তো সত্যি”।
“আমাদের বুঝি শখ ছিলো না? কেনো এতো কথা শুনতে হয় আমাদের?”
“তোরা দুজন ফুল ছিটিয়ে দিবি ওরা ঘরে ঢোকার সময়েই, আর মিষ্টি প্লেটে গুছিয়ে রাখিস, আমি আজকে বউ বরণ করবো নতুন করে”।

গুমোট পরিস্থিতি পালটে দিতে চাইলেন জেসমিন-

ছেলে/মেয়ের বিয়ে নিয়ে সবারই মনে স্বপ্ন থাকে, আমিও ব্যতিক্রম ছিলাম না। ইন্টার পাশের পর কোচিং সেন্টারে ভর্তি হবার সময় নাকি দুজনের পরিচয়। পরে দুজন দুই জায়গায় ভর্তি হলেও যোগাযোগ ছিলো। বউয়ের অনার্স শেষ হবার পরে পরিবার বিয়ে ঠিক করলে সিয়ামের কথা বাসায় জানালেও তাদের পরিবারের কেউই রাজি হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই একজন স্টুডেন্ট এর কাছে বিয়ে দেবার সাহস পরিবার করেনি। তাই দুজনে বিয়ে করে বাসায় চলে আসে। এখানেও কেউ সহজভাবে নেয়নি, শুধু আমি তো মা, তাই ফেলে দিতে পারিনি। দুজনেই স্টুডেন্ট বলে মন দিয়ে পড়তে বলেছি, অথচ দিনের পর দিন সবার কটুক্তি হজম করে যেতে হয়েছে ওদের দুজনকে, সাথে আমাকেও। অথচ আমার ভুল কোথায় আমি আজও বুঝে উঠতে পারিনি। ছেলেকে আশকারা দিয়েছি বলেই এমন করেছে, এই কথাটা দিনের পর দিন সহ্য করেছি। সবার কথার বাক্যবাণে আহত করে সুখ নেবার চেষ্টা করেছে, এমনকি ওর বাবাও ছেলেকে দেখলেই আকাইম্মা আর ভাদাইম্যা বলে ডাকতো, শেষে ওরা টেবিলে এসে খাওয়া বন্ধ করে দিলো। ফুফুদের শখ ছিলো ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করলে ছেলে নিয়ে বাণিজ্য করতো। সবার আশায় পানি ঢেলেছে বলে কটুক্তি হজম করতে হয়েছে আমাকে। আমার ছেলে ভালো থাকুক, এটা ছাড়া অন্য কোনো চাওয়া আমার ছিলো না।

বউমা আর ছেলে ঘরে ঢোকার সাথে সাথে মেয়েরা ফুল দিলো, আমিও নতুন করে মিষ্টিমুখ করালাম দুজনকে। সবার সাথে গল্প করার ফাঁকে মেয়েকে বললাম টিভিতে একটা ভিডিও ছাড়তে, আর সবাইকে বললাম সেদিকে নজর দিতে। সবাই নড়েচেড়ে বসলো।
অফিসের একটা প্রোগ্রামের পারফারমেন্সের জন্যে পদক নিতে বউকে স্টেজে ডাকা হলে সেখানে এই পদকের কৃতিত্ব পুরোটাই সে তার শাশুড়ি মাকে দিলো, আর জানালো উনার সাহায্য না থাকলে এটা করা তার পক্ষে কখনোই সম্ভব হতো না।

পুরো ঘরের পরিবেশ বদলে গেলো, কেবল আমার চোখ দিয়ে টপাটপ পানি পড়ছে, সেদিন বউকে মেনে নিয়েছি বলে কেউই পাশে থাকেনি, এমনকি বাচ্চার বাবাও না। আমি যে মা! বিয়ের পর থেকে আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে কটুক্তি শুনে শুনে ছেলেটা নিজেকে গুটিয়ে নিলো, আর কেউ বেড়াতে এলেই শুনতে হতো—
“বিয়ে করেছে ভালো কথা, সংসারের কাজে হাত লাগায় না কেনো? কোন নবাবের বেটি?”

অক্ষম মা, উত্তর দেইনি, শুধুই অপেক্ষা করে গেছি, আমি জানতাম একদিন সব বদলে যাবে। অনার্স শেষ করে বউটা একটা প্রাইভেট ব্যাংকে জব পেলো। সকাল সাতটায় বেরিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে সাতটা/আটটা বেজে যেতো। খুব মায়া লাগতো। বৌ হেল্প করতে চাইলেও জোর করে রেস্ট নিতে পাঠিয়ে দিতাম। বউয়ের জায়গায় নিজের কন্যাদের কল্পনা করতাম। আমি তো ছেলের বউ ভাবিনি কখনও। তিন সন্তানের জায়গায় চার সন্তানের মা ভেবেছি নিজেকে। একমাত্র ছেলের বিয়ে নিয়ে অনেক শখ থাকলেও সবই মেনে নিয়ে শুধু পাশে থেকেছি মাত্র!

“মেয়েটা আমাকে অনেক সম্মান দিয়েছে আর সেজন্যেই আমি আজকে সবাইকে ডেকেছি আর ছেলের অস্ট্রেলিয়ার এক ভার্সিটি থেকে কাগজপত্র সব চলে এসেছে। ও স্কলারশিপ পেয়েছে, আগামী মাসে চলে যাবে। সবাই ওদের দুজনের জন্যে প্রাণভরে দোয়া করো। আমার সামর্থ্য ছিলো না বলে আমি অনুষ্ঠান করতে পারিনি, তবে সেসব নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নাই। এই মেয়েটি আমার সব আক্ষেপ দূর করেছে”।

জেসমিন কথাগুলো বলার পর এবার জোরেই কান্না করতে লাগলেন। বউটা এসে বুকে জড়িয়ে বললো—

“মা বাবার অমতে বিয়ে করেছি বলে এতোগুলো দিন তারা আমাদের মেনেই নেয়নি। দিনের পর দিন আমরা দুজন যুদ্ধ করেছি, কিন্তু আপনি পাশে না থাকলে আমাদের পথচলা এতোটা সহজ হতো না কখনই”।
“আমি তো মা, ছেলের জীবনসঙ্গী আমারও আপন মানুষ। আমি যদি একজনের কন্যাকে সম্মান দেই, আরেকজন এসে আমার কন্যাদেরকেও দিবে, এটাই বুঝি আমি”।
“আপনি আমাকে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন সবসময়। চাকুরী পাবার পরে গাধার খাটুনি খাটতে হয়েছে শিক্ষানবিস হিসাবে। কেউ না বুঝলেও অফিস থেকে বাসায় ফেরার পর আপনি আমার কষ্ট বুঝেছেন, আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই মা”।

জেসমিনের বড় জায়ের চোখে পানি চলে এলো, কত কষ্ট করে দুই ছেলেকে মানুষ করেছেন, অথচ একজন বউয়ের সাথে বনিবনা হয়নি বলে একই শহরে আলাদা থাকে, আরেকজন বউকে নিয়ে কানাডায় থিতু হয়েছে। স্বামী মারা যাবার পর কাজের লোকদের নিয়ে একাই থাকেন।

জেসমিনের বড় ননদের মনে হলো ছেলেকে হাতে রাখতে গিয়ে বউয়ের আড়ালে বউয়ের সুনাম করতেন বলেই কি ছেলে অফিস থেকে ট্রান্সফার নিয়ে সিলেটে চলে গেলো? আগের মতো মাকে ফোন দিয়ে আজকাল আর খবর নেয় না।
ছোট ননদ কান্নায় ভেসে যেতে যেতে ভাবলো, তার শিক্ষিতা মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি আধুনিক দাসী বানিয়ে রেখেছে, মেয়ে নিজের ইচ্ছায় কিছুই করতে পারে না।
সবাই একমত হলো যে জেসমিনকে বোকাসোকা বলে এতোদিন ভেবেছে, দিনশেষে সেই বাজিমাত করেছে। সত্যিকার মা হওয়া আসলেই এতো সোজা না।

ফাহমিদা খানম
২৪/১২/২০২১

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.