রাজনীতি, ক্ষমতা, ধর্ম ও ধর্ষণ

অনুপম সৈকত শান্ত:

এক
একজন পুরুষ (কিংবা একজন মানুষ) কেন ধর্ষণ করে? যৌনচাহিদা মেটাতে? ধর্ষকাম বা ধর্ষণেচ্ছা কি কোন যৌনরোগ? যৌনতার দিক দিয়ে অতৃপ্ত পুরুষরাই কি ধর্ষণ করে? অবদমন থেকে কি ধর্ষণ করে? মানসিক বিকৃতি থেকে ধর্ষণ করে? হ্যাঁ, এই সবকটাই কোন কোন ধর্ষণের ক্ষেত্রে কারণ হিসেবে কাজ করে, যেহেতু ধর্ষণের নানা রকমফের আছে। কিন্তু মোটাদাগে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্ষণের প্রধান কারণ এগুলোর কোনটিই নয়! বিশেষ করে যে ধর্ষণের ঘটনাগুলো ঘটে পরিচিতজন, যেমন স্ত্রী বা প্রেমিকা বা বন্ধু বা পরিবারের কন্যাশিশুর উপরে, সেগুলো বাদ দিলে – বাকি যত ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রধানতম কারণ হচ্ছে ক্ষমতার চর্চা বা ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। এমনকি পরিচিতজনের উপরে ঘটা ধর্ষণের ক্ষেত্রেও কোন কোন ক্ষেত্রে এই ক্ষমতার চর্চার ব্যাপারটাও থাকতে পারে। সামাজিকভাবে দুর্বল, ক্ষমতাহীনরাও এমন ধর্ষণ যখন করে, তখনও বস্তুত তারও চাইতে দুর্বল স্ত্রী, প্রেমিকা কিংবা কোন শিশুকে বাছাই করার মাধ্যমে তুলনামূলক ক্ষমতার চর্চা জারি রাখতে পারে!

তবে, অপরিচিত বা পাড়া মহল্লার কোন নারীকে ধর্ষণ করার কাজটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষমতাবানদের পক্ষেই সম্ভব! দলবদ্ধ ধর্ষণের (গণধর্ষণ শব্দটি ভুল এবং পরিহার্য) ক্ষেত্রে এই ক্ষমতাচর্চার বিষয়টি আরো অনেক বেশি প্রকট! সে কারণেই বাংলাদেশের পারিবারিক ধর্ষণের বাইরে অধিকাংশ ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের সাথে আইন শৃংখলা বাহিনীর যুক্ততা পাওয়া যায়, আওয়ামী লীগ – যুবলীগ – ছাত্রলীগের নেতাদের যুক্ততা পাওয়া যায় (বিএনপি-জামাতীদেরও যুক্ততা পাওয়া যায়), স্থানীয় মোড়ল – জোতদার – অবস্থাপন্ন প্রভাবশালীদের যুক্ততা পাওয়া যায়, শহরগুলোতে ধনীর পোলাপানদের যুক্ততা পাওয়া যায়, এলাকার মাস্তান – সন্ত্রাসী – চাঁদাবাজদের যুক্ততা পাওয়া যায়! এইসব ক্ষমতাধরদের সবারই আবার ক্ষমতার খুঁটি পোঁতা থাকে সরকারদলীয় রাজনীতির সাথে! সরাসরি সরকারদলীয় রাজনীতির সাথে যদি যুক্ত নাও থাকে, তাহলে বুঝতে হবে অন্য ক্ষমতাধরদের সাথে সরকারদলীয় রাজনীতির সম্পর্কটা গিভ এন্ড টেকের!

সেই অর্থে আমাদের দেশে এ ধরনের যত ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, তার সবই বস্তুত রাজনৈতিক ধর্ষণ! একটা রাষ্ট্র যত নিপীড়ক হবে, যত অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট হতে থাকবে, জনগণের উপরে যাবতীয় অত্যাচার, নিপীড়নের মত এমন রাজনৈতিক ধর্ষণের হারও তত বাড়তে থাকবে! এবং এই রাজনৈতিক ধর্ষণের সবচেয়ে বড় লক্ষণ হিসেবে সামনে আসবে প্রতিকারহীনতা তথা বিচারহীনতা! যত আলোচিত ধর্ষণের ঘটনাই হোক, ধর্ষকরা ক্ষমতার জোরে সাজার বাইরেই থেকে যাবে! ভুক্তভোগী পুলিশের সাহায্যই পাবে না বা মামলাই নিতে চাইবে না, মামলা নিলে ধর্ষকদের খুঁজেই পাওয়া যাবে না, খুঁজে পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ঠিকমত প্রমাণ-আলামত সংগৃহীত হবে না, ঠিকঠাক তদন্ত করা হবে না, দায়সারা গোছে চার্জশিট দেয়া হবে, এরপরে আদালতেও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ঠিকভাবে মামলা পরিচালনা করবে না, সঠিক সাক্ষীদের ডাকবে না এবং পরিশেষে বিচারক বেকসুর খালাস দিয়ে দিবে! এই পুরো ধারাবাহিক পর্যায়টির পরতে পরতে আছে- ক্ষমতার ছোঁয়া!

দুই
একজন অপরাধী কেন ধর্ম-কর্ম আঁকড়ে ধরে? একটা স্টাডিতে পড়েছিলাম, এর কারণ দুটো – প্রথমতঃ অনেক সময় ধর্মকর্ম অনেকটা বর্মের মত কাজ করে, ধর্মকর্মের মাধ্যমে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা এবং পরবর্তী অপরাধের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয় এবং দ্বিতীয়তঃ অপরাধ পরবর্তী মানসিক পীড়ন, তথা যে অপরাধবোধ – সেখান থেকে মুক্তি দেয়!

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কারণ দুটো প্রযোজ্য। বস্তুত বাংলাদেশের বড় বড় চোর-বাটপার – খুনী – ধর্ষক সবাই একেকজন অনেক বড় ধার্মিক! আবরারের খুনীদের বেশ কয়েকজন হাজতে বসে কোরআনের হাফেজ হয়ে গিয়েছে বলে খবরে এসেছে। স্বৈরাচার এরশাদের নামের পেছনে ছিল আলহাজ, বস্তুত রাজনৈতিক গডফাদার যতগুলো আছে, সবাই হাজী বা আলহাজ!

৭১ এর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের ধনীরা সবাই স্কুল কলেজ করতো, লাইব্রেরি বানাতো, পুকুর কাটতো। স্বাধীন বাংলাদেশে ধনীরা সবাই মসজিদ বানানো শুরু করলো, মাদ্রাসা বানানো শুরু করলো, এতিমখানা বানানো শুরু করলো। এভাবেই বাংলাদেশ আজ মসজিদের দেশ হয়ে গিয়েছে! কারণ কী? স্বাধীন বাংলাদেশে যে লুটপাটের অর্থনীতি শুরু হলো, সেখানে আমাদের দেশে ধনী মানেই হচ্ছে – লুটপাটকারী, চোরাকারবারি, মজুতদার, এবং জমিখেকো! এরাই নিজেদের ইমেজ রক্ষার জন্যে প্রকাশ্যে ধর্মকর্ম করা, মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা স্থাপন করা- এই কাজগুলো করা শুরু করেছে! সেটাই আজতক অব্যাহত আছে! এই লুটপাটকারীরাই ঘুরেফিরে আমাদের ক্ষমতাধর, প্রভাবশালী হয়েছে। তারাই রাজনীতির কেন্দ্রে। আমাদের সংসদের সিংহভাগেরই পেশা হচ্ছে ব্যবসায়ী। এদেশে সমস্ত লুটপাটকারীর পেশাই হচ্ছে ব্যবসা! ফলে, লেবাস হিসেবে ধর্মটাকেও তারা সবসময় সামনে নিয়ে আসে।

তিন
কক্সবাজারে যে নারীটি স্বামী ও আট মাসের শিশু সন্তানসহ কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হলো, এই ধর্ষণের ঘটনাটিও এরকমই আধিপত্যবাদী ক্ষমতার চর্চারই এক উদাহরণ! ঘটনার বিবরণীতে জানা যাচ্ছে, ঘুরতে গিয়ে ঐ নারীর স্বামীর সাথে ধর্ষকের ধাক্কা থেকে কিছুটা কথা কাটাকাটি হয়েছিলো। তারই ফলশ্রুতিতে সে আরো কয়েকজন সাঙ্গপাঙ্গকে সাথে নিয়ে নারীটিকে এবং তার স্বামী ও শিশু সন্তানকে আলাদা করে অপহরণ করে এবং নারীটিকে দুই জায়গায় দুই দফা দলবদ্ধ ধর্ষণ করে। এই যে ধর্ষকদের দল, ক্ষমতাধর না হলে – স্রেফ কথা কাটাকাটির জেরে ধর্ষণে লিপ্ত হতো না! র‍্যাববাহিনী যে তিনজনকে আটক করেছে, তাদের একজন হোটেলের ম্যানেজার, ধর্ষকদের সহকারি হিসেবে আটক হয়েছে। আরও দুইজনকে ধর্ষক হিসেবে ধরেছে, তাদের ব্যাপারে জানা যাচ্ছে – তারা সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির অপরাধের সাথে জড়িত, তাদের নামে একাধিক মামলা রয়েছে! একজনের ফেসবুক আইডিতে স্থানীয় এমপি’র সাথে ঘনিষ্ঠ ও হাস্যোজ্জ্বল ছবিও দেখা যাচ্ছে! ফলে, এদের ক্ষমতার উৎস কোন জায়গায়, বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না!

চার
আটক হওয়া এক ধর্ষকের ফেসবুক আইডির অনেকগুলো পোস্টের স্ক্রিনশট ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ছেলেটি একের পর এক ধর্মীয় পোস্ট দিয়ে গিয়েছে! রোজা, ঈদ, আল্লাহ থেকে শুরু করে অসংখ্য ইসলামি পোস্ট! একজন সন্ত্রাসী, মাস্তান, চাঁদাবাজ কেন এরকম ইসলামকে আঁকড়ে ধরে? একজন ধর্ষক কীভাবে এরকম ধার্মিক হয়, বা একজন ধার্মিক কীভাবে এমন ধর্ষক হয়? কারণ, ঐ দুটোই। ধর্ম তার অপরাধের বর্ম হিসেবে কাজ করে, এবং অপরাধ পরবর্তী মানসিক প্রশান্তি দিতে পারে! সে কারণেই, বড় বড় অপরাধীরা, বড় বড় খুনি-ধর্ষকরা বড় বড় ধার্মিক হয়! এরা যতখানি না মনে প্রাণে ধার্মিক, তার চাইতেও বেশি জাহির করা ধার্মিক। মানে, এরা লোককে দেখাতে চায়, ধার্মিক হিসেবে নাম ফুটাতে চায়!

পাঁচ
এভাবেই রাজনীতি, ক্ষমতা, ধর্ম ও ধর্ষণ একাকার হয়ে যায়। এরা একে অপরকে আশ্রয় প্রশ্রয় করেই চলে! একে অপরের পরিপূরক। দুই লক্ষ নারীর উপরে বর্বরতম ধর্ষণের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছরের অর্জন হচ্ছে দেশটায় পুরোমাত্রায় ধর্ষণতন্ত্র জারি হওয়া!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.