থ্রি চিয়ার্স ফর ‘আমাদের মেয়েরা’

সুপ্রীতি ধর:

২০২১ সাল শেষ হতে আর মাত্র হাতেগোণা কয়টা দিন বাকি। বছরশেষে এক দারুণ সংবাদ নিয়ে এলো আমাদের মেয়েরা। ভারতকে হারিয়ে সাফ অনূর্ধ্ব -১৯ এর চ্যাম্পিয়ন হয়ে এরা আবারও প্রমাণ করে দিল, যতোই বৈষম্য, যতোই দারিদ্র্য, অবহেলা থাকুক ওদের প্রতি, দেশকে ওরা বিশ্বের দরবারে উঁচুতে তুলে ধরবেই। খবরটি জানার পর থেকেই ফেসবুকে বিভিন্ন জন এর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অধিকাংশই অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি তুলে ধরেছেন মেয়েগুলোর এই  সাফল্যের পিছনে তাদের এক বিবর্ণ জীবনের কথা, যেখানে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য পাল্লা দিয়ে চলে। তারপরও ওরা দমে যায় না।

এবছরই বাংলাদেশ বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করছে। অথচ উল্লেখ করার মতোন তেমন কিছুই ছিল না এই বছরটাতে। শেষদিকে এসে এই ছোট ছোট মেয়েগুলোই বাজিমাৎ করে দিয়েছে।

আমিও যখন ওদের শেষমুহূর্তের গোল দেয়ার ভিডিওটি দেখলাম, এক অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে গেল মন। মাঠজুড়ে ওদের বিজয়ের দৌঁড়টা দেখে ভালো লাগার পাশাপাশি একটা গভীর দু:খও ভর করলো। এইতো কদিন আগেই একটা পেইজে দেখলাম আমাদের আদিবাসী এক ছোট্ট কিশোরী মেয়ে জুতার অভাবে পায়ে ব্যান্ডেজ টাইপ বা স্কচ টেপ লাগিয়ে তাতে ‘নাইকি’ লিখে সেই চিহ্নও এঁকে রেখেছে। ওইভাবেই সে দৌঁড় প্রতিযোগিতায় তিনটা স্বর্ণপদক জয় করেছে। আমি তন্ন তন্ন করে মেয়েটার ঠিকানা বের করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। কত মেধা এভাবেই বুঝিবা কষ্টে বিবর্ণ হয়! একজোড়া জুতা কেনার স্বপ্নটাই সে সত্যি করতে পারে না, তাহলে পেটের ক্ষুধা কি নিবারণ হয় নিয়মিত? মনে হয় না।

পাহাড়ের লোকজনের সাথে যত মিশছি ততোই অবাক হচ্ছি তাদের জীবনযাপনের কথা শুনে, কতোটা রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা নিয়ে ওরা জীবন কাটায়, তা আমরা সমতলের লোকজন কল্পনাও করতে পারবো না। অথচ আজকে যখন অনূর্ধ্ব-১৯ এর ফুটবল টিমের মেয়েদের নামগুলো পড়ছিলাম, একেকটা নাম তীক্ষ্ণফলার মতোন অন্তরে দাগ কেটে যাচ্ছিল। যেমন সুন্দর নাম, তেমনি তাদের গর্বিত পরিচয়। অথচ জীবন তাদের কোণঠাসা হয়ে আছে রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের কাছে। নেই কোন ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সবখানেই চরম বৈষম্যের শিকার আমাদের পাহাড়ি অঞ্চল এবং ততোধিক বঞ্চিত আমাদের আদিবাসী জনগণ। মরার ওপর খাড়ার ঘা এর মতোন আছে বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশংকা, অপহৃত, খুন হওয়ার ভয় পদে পদে। আর মেয়েদের অবস্থা তো তথৈবচ। ন্যূনতম নিরাপত্তাও নেই কোথাও।

সেই পাহাড়সম বাধাকে দুহাতে ঠেলে কীভাবে ওরা বেরিয়ে এলো জয়োল্লাস নিয়ে? ভাবতেই অবাক হই। দুবেলা ঠিকমতোন খেতে না পারা মেয়েগুলোই আজ আমাদের বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠলো। জয় হোক ওদের।

আশা করি, সরকার থেকে শুরু করে ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিরা এবার একটু হলেও নজর দিবেন। ছেলে খেলোয়াড়দের তুলনায় মেয়েদের সাথে এই যে বৈষম্যটা হয়, এটা কেন হয়, এটা একটু ভেবে দেখবেন কর্তারা। মেয়েরা দেশের জন্য জয়মাল্য এনে দিচ্ছে, আর তাদের ন্যূনতম সম্মান ও মর্যাদাটুকু দেয়া হবে না, এটাও মেনে নিতে হবে?

আবারও অভিনন্দন মেয়েরা।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.