বৈষম্য, দারিদ্র্যও রুখতে পারে না ওদের সাফল্য

রাজু নূরুল:

আমাদের মেয়েরা ফুটবলে আরও একবার সাফল্য নিয়ে এলো। ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে সাফ অনুর্ধ-১৯ এর চ্যাম্পিয়নের মুকুট পরলো মেয়েরা। গত ছয় বছরে এটা সম্ভবত ওদের ছয় নাম্বার আন্তর্জাতিক শিরোপা।

বিজয়ের পঞ্চাশ বছর উদযাপন করছি আমরা! ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে এসে গোটা জাতির জন্য এরচেয়ে সুন্দর উপহার আর কী হতে পারে? কংগ্রাচুলেশনস গার্লস! আমাদের প্রাণঢালা অভিনন্দন মারিয়া মান্দা, মনিকা চাকমা, ঋতুপর্ণা চাকমা, রিপনা চাকমা, আনুচিং মগিনি, আনাই মগিনি এবং পুরো বাংলাদেশ দলকে। এই ছোট ছোট মেয়েগুলি আমাদের জাতীয় পতাকাকে আবারও উঁচুতে তুলে ধরেছে। কী বলে যে কৃতজ্ঞতা জানাই এই বাচ্চা মেয়েগুলিকে!

এই আনন্দে অবগাহন করতে করতেই মনে পড়ে যাচ্ছে, এই বিজয়ের পেছনের গল্পটা কতোটা কণ্টকাকীর্ণ! শুধু পরিবার নয়, গ্রাম, সমাজ, রাষ্ট্র তো বটেই; এমনকি যে বোর্ডের অধীনে ওরা খেলে, সেখানেও কতোটা বৈষম্যের শিকার হয় ওরা! প্রতি মুহূর্তে সাঁতরাতে হয় বাধার সমুদ্র!

দৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া তথ্য-উপাত্ত

বছর কয়েক আগের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে! কলসুন্দরের মেয়েরা সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর লোকাল বাসে চড়ে ময়মনসিংহ ফিরেছিল! ওদের জন্য আলাদা একটা বাস ভাড়া করারও প্রয়োজন বোধ করেনি কেউ। বাংলাদেশের খেলাধুলায় নারী ও পুরুষের যে ভয়াবহ বৈষম্য, সেখানে অবশ্য সেটি খুবই ছোটখাটো উদাহরণ। বরং পাহাড়সম বাধা পেরিয়ে খেলাধুলায় নারীদের এই অগ্রযাত্রা অবিশ্বাস্য। আরও কিছু বৈষম্যের নমুনা দেখা যাক। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন নারী ফুটবলারদের বেতন কাঠামো তৈরি করেছে। তিনটি শ্রেণিতে ৩৬ জন নারী সেই কাঠামোতে বেতন পাচ্ছেন। ‘এ’ শ্রেণির বেতন মাসে ১০ হাজার, ‘বি’ শ্রেণির ৮ হাজার আর ‘সি’শ্রেণির ৬ হাজার টাকা। ৩৬ জন মেয়ের বেতন বাবদ বাফুফে মাসে খরচ করে মাত্র ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। ওদিকে একজন নারী ফুটবলারকে মাত্র ৬ টাকায় মাস চলতে হয়। অথচ কোনো ক্লাবের হয়ে খেললে একজন শীর্ষ পুরুষ ফুটবলার বছরে ৫০-৬০ লাখ টাকা পান। ছেলেদের লিগ প্রতিবছর হয়, কিন্তু নারী লিগ বন্ধ ছিল ছয় বছর। গত বছর থেকে চালু হয়েছে। এই লিগে তিন-চার লাখ টাকা করে পাচ্ছেন জাতীয় দলের কয়েকজন নারী খেলোয়াড়। আরও কয়েকজন দুই-এক লাখ টাকা করে পাচ্ছেন। বড় একটা অংশ কিছুই পাবে না।

২০১০ সালে দক্ষিণ এশীয় গেমসে সোনা জেতার পর ফুটবলে ছেলেদের আর সাফল্য নেই। অথচ গত ৫ বছরে মেয়েরা বয়সভিত্তিক ছয়টি টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন বা গ্রুপসেরা হয়েছেন। গত বছর ছেলেরা ফিফার মূল্যায়নে (র‌্যাঙ্কিং) এশিয়ায় ৪১ নম্বরে ছিলেন। একই বছরে মেয়েরা অনূর্ধ্ব-১৬ বিভাগে এশিয়ার সেরা ৮-এ ওঠেন। বলা যায়, ফুটবলের মাঠে মেয়েরাই এগিয়ে। জাতীয় দলের ‘এ-প্লাস’ পুরুষ ক্রিকেটারকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ( বিসিবি) মাসে ৪ লাখ টাকা বেতন দেয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিটি টেস্ট খেলার জন্য তিনি ম্যাচ ফি পান ৬ লাখ টাকা। ওয়ানডের ফি ৩ লাখ আর টি-টোয়েন্টির ২ লাখ টাকা। উপরি আছে বিসিবির বোনাস। ঢাকা লিগে খেলে প্রথম সারির একজন খেলোয়াড় বছরে ৪০-৫০ লাখ টাকা পান। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) গতবার ‘এ-প্লাস’ ক্রিকেটাররা পেয়েছেন ৫০-৫৫ লাখ টাকা করে। ফ্র্যাঞ্চাইজিতে খেললে টাকার অঙ্কটা ১ কোটিও হয়ে যায়। জাতীয় ক্রিকেট লিগে ম্যাচ ফি ৬০ হাজার টাকা। ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বড় দৈর্ঘ্যের (বিসিএল) ক্রিকেটেও টাকার অঙ্কটা একই রকম। এভাবে প্রথম সারির পুরুষ খেলোয়াড় বছরে সর্বোচ্চ তিন কোটি টাকাও আয় করতে পারেন। তার ওপর পণ্যের বিজ্ঞাপনেও মডেল বা শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তাঁরা বড় আয় করার সুযোগ পান বেশি।

ছেলেরা আজও এশিয়া কাপ জিততে পারেনি। ২০১৮ সালে মেয়েরা এশিয়া কাপ (টি-টোয়েন্টি) জিতে ইতিহাস গড়েন। তারপর তাঁদের বেতন ২০ হাজার টাকা করে বাড়ে। তিন-চার বছর আগেও নারী ক্রিকেটাররা ম্যাচ ফি পেতেন না। ওয়ানডে ম্যাচে মেয়েরা এখন পান ১০০ ডলার, অর্থাৎ ৯ হাজার টাকার কম। ছেলেদের ফি দাঁড়াচ্ছে এর প্রায় ৩৫ গুণ।

সাফল্যের দিক থেকে আর কী করলে নারী ও পুরুষের বেতন বৈষম্য কমবে? ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ফুটবল দলে একজন নারী ফুটবলার কিন্তু মেসি কিংবা নেইমারের সমান বেতনই পান। সাফল্য যদি বিবেচনার মানদণ্ড না হয়, তবে এই প্রশ্নটা নিশ্চয়ই অযৌক্তিক হবে না যে, কিসের ভিত্তিতে তাহলে নারী ও পুরুষের আলাদা বেতন ঠিক করা হয়? বলা হতে পারে, স্পনসর নাই। বিজ্ঞাপন নাই। এসব কোনও অজুহাত না। স্পনসর যদি পুরুষের ক্রিকেটে থাকে, তাহলে নারীদের ক্রিকেটে আরও বেশি থাকার কথা। আগ্রহ না থাকলে তাদেরকে বাধ্য করার সুযোগও কিন্তু আছে।

তবে তারচেয়ে বড় কথা হলো, স্পনসর ছাড়া যদি নাই চলে, তবে বোর্ডের দরকারটা কী?

রাজু নূরুল, উন্নয়ন কর্মী

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.