বিদায় বেল হুকস: কিন্তু লড়াই থেমে থাকবে না

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

কৃষ্ণাঙ্গ এই নারীর জন্মের পর নামকরণ হয়েছিল গ্লোরিয়া জিন ওয়াটকিন্স। নারীবাদ নিয়ে লেখালেখি করার জন্যে তিনি নিজের জন্যে বেল হুকস নাম গ্রহণ করেছিলেন, আর তিনি সবসময়ই তাঁর নাম লিখতেন ছোট অক্ষরে bell hooks এইভাবে। অর্থাৎ ইংরেজিতে যে নামবাচক বিশেষ্য লিখতে সবসময়ই যে প্রথম অক্ষরটি বড় হাতের লিখতে হয় সেই নিয়মটি তিনি মানতেন না। তাঁর সকল বইয়ের প্রচ্ছদে তো বটেই, খবরের কাগজগুলিতে বা তাঁকে নিয়ে লেখা বইপত্রে বা তাঁর লেখার উদ্ধৃতিতেও তিনি চাইতেন সকলেই যেন ছোট অক্ষরেই তাঁর পুরো নামটা লেখা হোক। বেল হুকস ছিল তাঁর মায়ের নানীর নাম। মায়ের নানী বা বড় মায়ের নামটি তিনি গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু ছোট হাতের অক্ষরে কেন? তিনি নিজে এইটা ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে যে, ছোট হাতের অক্ষর ব্যবহার করে তিনি যে বার্তাটা দিতে চেয়েছেন সেটা হচ্ছে যে লোকের যেন তাঁর লেখার বিষয়বস্তুটাকেই গুরুত্ব দেয়, তাঁর নামটিকে নয়। এছাড়া এইভাবে লিখলে বড় মায়ের নামের সাথে তাঁর নিজের নামের একটা পার্থক্য তৈরি হয়, এইটাও একটা উদ্দেশ্য ছিল।

বেল হুকস কেন আমাদের ভালোবাসার একজন নারীবাদী বা প্রিয় নারীবাদীদের একজন, সেই কথাটা একটু ভেঙে বলে নিই।

পশ্চিমের নারীবাদী আন্দোলনের কথা আপনারা জানেন। মেরি ওল্ডস্টোনক্রাফটের লেখা, জন্য স্টুয়ার্ট মিলের সাবজেকশন অফ উইম্যান এইসব লেখা নারীবাদের প্রথম তরঙ্গকে উৎসাহিত করেছিল। প্রথম তরঙ্গের উত্তাল সেইসব দিনে, উনবিংশ শতকের শেষ দিক থেকে শুরু করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত, তখন নারীবাদী আন্দোলনের মূল দাবিটি ছিল নারীর জন্যে ভোটাধিকার বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের অধিকার আর তার সাথে সাথে শিক্ষার সুযোগ, চাকরি-বাকরি এইসবের সুযোগ ইত্যাদি সব দাবি। এই যে ভোটাধিকারের দাবি, সেই দাবিটাও কিন্তু স্পষ্ট করে সকল নারীর জন্যে ভোটাধিকারের দাবি ছিল না। বিশেষ করে শ্রমজীবী নারীদের যেসব দাবি ছিল, সেইসব দাবি নারীবাদী আন্দোলনের প্রথম তরঙ্গের মূলধারায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেনি। শ্রমজীবী নারীরা সেসময় আন্দোলন ধর্মঘট করছিল বিলেতে, ইউরোপের অন্যান্য দেশে এবং বিশ্বের অন্যত্র শ্রমিকদের নিজেদের মৌলিক দাবিগুলির জন্যে। সেইসব আন্দোলন আর নারীবাদী আন্দোলন একসময় মিলেমিশে থাকলেও পরবর্তীতে এই দুইটা ধারার মধ্যে, ক্লারা জেটকিনের ভাষায়, একটি সুস্পষ্ট বিচ্ছেদ ঘটে যায়।

পশ্চিমে নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল কেইট মিলেটের ১৯৭০ সনের বই সেক্সুয়াল পলিটিক্স আর সেই সাথে বেটি ফ্রেইডেনের ফেমিনিন মিস্টিক আর সেই সাথে অন্যান্য কিছু বই। আর তার বেশ আগে প্রকাশিত সিমোন দ্য ব্যুভোয়ার এর সেকেন্ড সেক্স বইটির ভূমিকা যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেকথা তো বলাই বাহুল্য। নারীবাদী আন্দোলনের তরঙ্গে নারীর প্রতি বৈষম্য ও নারীর বঞ্চনার মূল কারণ হিসাবে প্রথমবারের মতো পিতৃতন্ত্র বা পেট্রিয়ার্কিকে চিহ্নিত করা হয় এবং সকল দাবির কেন্দ্রে পিতৃতন্ত্র উৎখাতের দাবিটি স্থান করে নেয়। এই যে পিতৃতন্ত্রকে চিহ্নিত করা এবং সেইটাকে যে উৎখাত করতে হবে সেই প্রত্যয়টি যখন নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের কেন্দ্রে চলে আসে এর একটা গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল ছিল যে সমাজতন্ত্রী নারীবাদীরা আর র‍্যাডিকেল নারীবাদীরা সেসময় একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করেছে।

উনবিংশ শতকে সংগঠিত রূপে নারীবাদী আন্দোলনের বিকাশ থেকে শুরু করে নারীবাদী আন্দোলনের দ্বিতীয় তরঙ্গ এই যে কম বেশি পৌনে একশ বছরের নারীবাদী আন্দোলন, সেই সংগ্রামে দেখা গেছে যে ইউরোপে ও আমেরিকার নারীবাদী আন্দোলনগুলি কোন না কোনোভাবে যেন শ্বেতাঙ্গ মধ্যবিত্ত শিক্ষিত নারীদের দাবিদাওয়া, ওদের চোখে দেখা বৈষম্যের রূপ আর ওদের নেতৃত্ব এই নিয়ে সীমিত রয়ে যাচ্ছিল। একদিকে নারীবাদী আন্দোলনের এইরকম শ্বেতাঙ্গ মধ্যবিত্ত শিক্ষিত নারীর আন্দোলন এইরকম একটা ইমেজ, আর একদিকে কম্যুনিস্ট বা মার্ক্সবাদীদের নারীমুক্তি আন্দোলনকে নিতান্ত শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা এবং নারীবাদীদের অর্থাৎ যারা নারীর অধিকারকে প্রসঙ্গে স্বতন্ত্র এবং শ্রেণি নিরপেক্ষ একটি রাজনৈতিক তত্ব তৈরির চেষ্টা করছিলেন ওদের মধ্যে যে দূরত্ব এই দুইটার ফলে ক্রমাগত একটা দূরত্ব রয়েই গেছে সবসময়। এই দুই দলের কোনটাতেই দেখা গেল যে কৃষ্ণাঙ্গ বা আদিবাসী বা এইরকম অন্যান্য প্রান্তিক নারীদের যে আলাদা সংকট ও সংঘাত সেইটা যেন আর গুরুত্ব নিয়ে স্থান অধিকার করতে পারছিল না।

বেল হুকস কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য প্রান্তিক নারীদের প্রসঙ্গটা সামনে নিয়ে এলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, আমি কি নারী নই? আমি কৃষ্ণাঙ্গ, এবং আমি নারী। নারী হিসাবে সকল নারী যেসব বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়, একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীও সেইসব বৈষম্য শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হোন। সেই সাথে আবার কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসাবেও তাঁকে আরেকটি মাত্রার বাড়তি আরও কিছু নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। সেই যে দাসপ্রথার সময় কৃষ্ণাঙ্গ দাস নারীদের উপর নির্যাতন হয়েছে, সেই ধারাবাহিকতা তো কোন না কোনোভাবে এখনও প্রচলিত আছে। আর সেই নির্যাতনের প্রভাব তো এখনো রয়ে গেছে প্রতিটা কৃষ্ণাঙ্গ নারীর জীবনে। বেল হুকস তাঁর লেখায় বক্তৃতায় আলোচনায় নিয়ে এলেন যে আমরা যদি এইরকম বিশেষ গ্রুপের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের নারীদের- যেমন কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা বা শ্রমজীবী নারীরা- ওদের প্রতি বিদ্যমান বৈষম্য ও শোষণ নির্যাতনকে যদি আমরা নারীবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে না পারি তাইলে নারীবাদ তো পরিপূর্ণরূপে নারীবাদই হলো না। এইটাই হলো নারীবাদে এবং নারী মুক্তির আন্দোলনে বেল হুকসের অবদান এবং তাঁর সংযুক্তি। এবং সেইখানেই বেল হুকসের সাথে আমার যোগাযোগ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক এবং আবেগের যোগাযোগ।

আপনিই ভাবুন। এই পৃথিবীতে সকল নারীই কোন না কোনোভাবে বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়। কোন কোন পুরুষও শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়। কিন্তু নারীকে কেবল নারী বলেই এক মাত্রা বেশী বৈষম্য ও শোষণ বঞ্চনার শিকার হতে হয়। শ্রমিকের কথা ধরেন। শ্রমিক হিসাবে একজন নারী শ্রমিক যেরকম শোষণের শিকার হয়, একজন পরুষ শ্রমিকও একইভাবে শোষণের শিকার হন। কিন্তু নারীটি আবার কেবল নারী বলেই বাড়তি আরেকটি মাত্রার বৈষম্যের শিকার হয় যেখানে ওর সাথী পুরুষ শ্রমিকটি আবার শোষকের দলে। একইভাবে আপনি আদিবাসী নারীদের কথা ধরেন। আদিবাসী নারীটি শ্রেণীগত শোষণের শিকার হয় আদিবাসী বা অআদিবাসী সকল নারী অ পুরুষের মতোই, আবার নারী হিসাবে একটা বাড়তি মাত্রার শোষণের শিকার হতে হয় তাঁকে, সেই সাথে আবার কেবল আদিবাসী বলেই তাঁকে আরেকটা মাত্রা অধিক বৈষম্যের শিকার হতে হয়। আবার আদিবাসী নারীটি যখন নারী হিসাবে বৈষম্যের শিকার হয়, তখন আবার আদিবাসী পুরুষও শোষকের রূপ ধারণ করে।

এইখানেই বেল হুকস আলোচনাটা নিয়ে এলেন। ১৯৮১ সনে তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বইটি প্রকাশিত হয়- Ain’t I a Woman? Black Women and Feminism, আর Feminist Theory: From Margin to Centre প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ সনে। এই দুইটি বইয়েই তাঁর মুল চিন্তার সূত্রগুলি গ্রন্থিত আছে। এই দুইটা বইই নারীবাদী আন্দোলনে এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিটা সূচনা করে দিয়েছে, যে নারীবাদী আন্দোলন বলে আর নারী মুক্তির আন্দোলন বলেন, কোনটাই সকল নারীর জন্যে একটি বিশ্বজনীন সংগ্রামের স্থান দখল করতে পারবে না যদি না এই যে কাও নারীরা, আদিবাসী নারীরা, শ্রমজীবী নারীরা, কিষাণি নারীরা বা এইরকম আলাদা আলাদা বিশেষ বৈশিষ্ট্য- যে বৈশিষ্ট্যগুলি একেকটা স্বতন্ত্র শোষণের বা বৈষম্যের ক্ষেত্র তৈরি করে সগুলিকে স্বতন্ত্রভাবে আলোচনায় নিয়ে আসা না হয়। এর পর থেকে তো কৃষ্ণাঙ্গ নারীবাদ, আদিবাসী নারীবাদ এই ধারাগুলিও ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করছে- এই ধারাগুলি স্বতন্ত্র একেকটা রাজনৈতিক অত্ত্ব তৈরি করার চেষ্টা করছে বটে, কিন্তু বিশ্বজনীন নারী মুক্তির সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়।

বেল হুকস গতকাল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। এই সংগ্রামী নারীবাদী লেখক, আমার বন্ধু বেল হুকস আর নেই। কিন্তু তিনি আর নেই কথাটা আবার এক অর্থে ঠিক নয়- তিনি তো আছেন। তাঁর লেখা আছে, সংগ্রামের লিগ্যাসি রয়ে গেছে, তাইলে তিনি আর নেই সেই কথাটি তো আর পূর্ণ সত্যি হচ্ছে না। আমার জন্যে তিনি তো রয়েই গেছেন- আমার বন্ধু বেল হুকস, ছোট হাতের অক্ষরে লেখা নাম বেল হুকস, সংগ্রামী বেল হুকস- আপনাকে সালাম।

লেখক: Imtiaz Mahmood
Advocate, Supreme Court

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.